রূপসার জল

প্রতীকি ছবি
বাতাসে খাবারের সুঘ্রাণ উড়ছে। কিছুক্ষণ আগেও কড়াইয়ের গরম তেলে শুকনো মরিচ, পাঁচফোড়ন ছাড়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। রান্নাঘরের সব পরিচিত শব্দ এখন থেমে গেছে। থেমে আছেন ভুবন মিত্রও।

অস্পষ্ট স্বরে শ্বাস টেনে টেনে কথা বলেন ভুবন মিত্র, কখনো কখনো পুনরাবৃত্তি করেন মিনিট পনেরো আগে বলে ফেলা গল্পের। অসুস্থ মানুষটির কুঁচকানো চামড়ার ভাঁজে আঁকা শুকনো মুখ-চোখ গল্প বলতে বলতে চকচক করে। মনোযোগী শ্রোতা পেলে কথা বলতে ভালোবাসেন তিনি। দেবাংশু বাবার ওষুধ আনতে বের হয়েছে, যাবার আগে শাফায়েতকে বলে গেছে, ‘‘একটু মন দিয়ে শুনবেন দাদা, কেউ অবহেলা করছেন টের পেলে মন খারাপ করে বাবা কথা বলাই বাদ দেন।’’ শাফায়েত ভুবন মিত্রের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায়নি। তাছাড়া আলাপের বিষয়বস্তু মানুষটাকে এমন ভেঙেচুরে দিচ্ছিল যে তার কথায় যতি টানার মতো নির্মম সে হতে পারেনি।

 

বেশ কিছুক্ষণ হলো শাফায়েতের হাত ছুঁয়ে ভুবন মিত্র বসে আছেন, কোনো কথা বলছেন না। নীলা বৌদি একটু আগে খেতে ডেকে গেছেন, কাকার ওঠার নাম নেই। শাফায়েতকেও ছাড়ছেন না। শাফায়েত কাকার হাতে মৃদু চাপ দেয়। এই স্পর্শে দুজন মানুষ দুজনের শরীরের উষ্ণতা টের পায়, কোনো শব্দ উচ্চারণ না করে কিছু কথা বলাও হয়তো হয়।

 

ভুবন মিত্রের বাদামি চামড়ার ওপর দিয়ে হাত-পায়ের শিরা-উপশিরা ভেসে উঠেছে। পৃথিবীর মানচিত্রের মতো সহস্র রেখাচিহ্ন তৈরি হয়েছে বয়স্ক শরীরে, যে চিহ্ন ধারণ করছে সময়ের স্বাক্ষর। শাফায়েতের হাত আঁকড়ে ধরে আছেন তিনি, যেন রথের মেলায় হারানো স্বজনকে বহু বছর পর খুঁজে পেয়েছেন। অথচ যেদিন প্রথম দেখা, তার চাহনিতে বিরক্তির চিহ্ন দেখেছিল শাফায়েত। দেবাংশু দাদা বলেছিল, তার বাবা ঘরটা কিছুতেই ভাড়া দিতে চান না। প্রবাসী ছেলের স্মৃতিঘেরা ঘরটি ফাঁকা রাখতেই তিনি বেশি পছন্দ করেন। বয়স যতো বাড়ছে তার, তিনি ততো বেশি স্মৃতির দিকে ঝুঁকছেন। 

 

এই বাড়ির মূল অংশ থেকে খানিকটা বিচ্ছিন্ন এই ঘর সংলগ্ন একটা বাথরুম আছে, একটা ছোট পরিবার থাকার মতো ঘর, বেশ খোলামেলা। যদিও ব্যস্ত সড়কের পাশের বাড়ি বলে চারপাশে হৈ-হট্টগোল লেগেই আছে। ভুবন মিত্রের পরিবার যেই অংশে থাকেন সেই অংশ থেকে এই ঘরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ দরজা নেই, বারান্দা ঘুরে এ ঘরে আসতে হয়। মারকুইজ স্ট্রিটের এই ব্যস্ততম সড়কের পাশে দেড় কাঠা জায়গার ওপরে নির্মিত দোতলা পুরনো বাড়িটি ভুবন মিত্র বহু বছর আগে এক মাড়োয়ারি ভদ্রলোকের কাছ থেকে কিনেছিলেন। তখন এই এলাকা এত জমজমাট ছিল না।

 

প্রায় শত বছরের পুরনো বাড়িটির এখন বেহাল দশা। নিচতলাতে ভাল ভাড়াটিয়া পাওয়া যায় না বলে দেবাংশু বাবার অনুমতি নিয়ে খাওয়ার হোটেল হিসাবে ভাড়া দিয়েছে। হোটেলে অনেক রাত অবধি মানুষের ভিড় লেগে থাকে। ছোট ছেলের বেসরকারি চাকরির মাইনে, হোটেলের ভাড়া আর মাস তিন-চার পর পর বড় ছেলের পাঠানো টাকায় সংসার ভালোমতো চললেও বাড়ির কাজে হাত দেয়ার আর্থিক সঙ্গতি নেই এই পরিবারের। বড় ছেলের ঘর তবু ভাড়া দিতে অনিচ্ছুক ভুবন মিত্র। 

 

দুবছর ধরে ফাঁকাই পড়ে ছিল ঘরটি। হাসপাতালে পরিচয়ের দ্বিতীয় দিনে শাফায়েতের মায়ের অপারেশনের কথা শুনে দেবাংশু নিজে থেকে ওকে এই ঘরে থাকার প্রস্তাব দিয়েছিল। সেদিন বাবাকে ডাক্তার দেখানোর জন্য দেবাংশুও হাসপাতালে গিয়েছিল। পর পর দুদিন একই জায়গায় একই ভাবে দেখা হয়ে যাওয়ায় শাফায়েত আর দেবাংশুর মধ্যে হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল। এছাড়া এর পেছনে অন্য একটা কারণও ছিল বৈকি। যে কারণে ভুবন মিত্র ছেলের মুখে ঘর ভাড়া দেবার কথা শুনে তাৎক্ষণিকভাবে দুপাশে মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানালেও পরে শাফায়েতের জেলার নাম শুনে চুপ করে গিয়েছিলেন। ক্ষণিকের দৃষ্টি বিনিময়ে শাফায়েত দেখেছে, খুলনার নাম উচ্চারণে অসুস্থ মানুষটির চোখে-মুখে অদ্ভুত এক আলো জ্বলে উঠেছিল।

 

শাফায়েত ভালো করে ভুবন মিত্রের মুখটি লক্ষ্য করে। লম্বাটে মুখটি আজ পরিচ্ছন্ন, মাথার চুল কদম ফুলের সাদা রোয়ার মতো একই মাপে ছাঁটা। প্রায় অশক্ত শরীরটি আজ অনেকটা চাঙা দেখাচ্ছে। সকালে যখন মাকে নিয়ে শাফায়েত হাসপাতালে যাচ্ছিল তখন দেবাংশু দাদা কাকাকে শেভ করাতে নিয়ে যাচ্ছিল। ছেলেকে ছাড়া তিনি বাইরে বের হন না। নব্বইয়ের কাছাকাছি পৌঁছে রোগেশোকে কাবু শরীরটি বয়সের ভারে ন্যুব্জ, যদিও ভুবন মিত্র ঘরের মধ্যে নিজে নিজে চলাফেরা করতে পারেন। 

 

পর্দার ফাঁক দিয়ে রূপসার বেণি দুলানো মাথা উঁকি দেয়, ‘‘ঠাম্মা ডাকছে। সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে’’ বলেই পালায়। ওর সঙ্গে এখনো শাফায়াতের ভাব হয়নি, কাছে ডাকলেই ছুটে পালায়।
‘‘খুব লক্ষ্মী আমাদের রূপসা, সারাদিনই রূপসার মতো কলকল কলকল করে...আর ছবি আঁকে। সব চেনে আমার নাতনি, আমার বাড়িঘর, পুকুর পাড়, বটতলা, তিনকাঠার মঠ, আমাদের নদী রূপসা...সব।’’
ভুবন মিত্র আনমনে বিড়বিড় করে আরও কিছু বলেন, সবটা শাফায়েতের কানে পৌঁছায় না।
‘‘আপনি গল্প শোনান নিশ্চয়ই।’’

 

‘‘এখন সবই গল্পের মতো লাগে বুঝলি। নিজের সাতপুরুষের ভিটে ছেড়ে আসা, সে তো গল্পই এখন। ঝোলার মধ্যে ঢুকিয়ে রেখেছি। দম আটকে এলে বের করি।’’

 

ভুবন মিত্রের ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি দেখে শাফায়েতের মনে হয় মানুষটার রোজই দম আটকে আসে। হাসির রেখা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। এখন বিমর্ষভঙ্গিতে ভুবন মিত্র বসে আছেন। তার দম ফুরিয়ে যাওয়া ভঙ্গি দেখে তার বয়সের ভার বোঝা যায়। নরম গলায় শাফায়েত বলে, ‘‘কাকা খেতে যাই চলেন। আমরা শুরু করতে করতে দাদা চলে আসবেন। মা ঘরে একা। কাল মায়ের ভর্তি, দেরি করবো না।’’

 

আজ এই বাড়িতে শাফায়েত আর ওর মায়ের দাওয়াত। শাফায়েতের মা ফৌজিয়া আক্তার বিছানা থেকে উঠতে চাইছিলেন না। কাল তার অপারেশন। দশদিন হাসপাতালে কাটাতে হবে, একটা মানসিক চাপ তো আছেই। শাফায়েত তাই জোর করেনি। নীলা বৌদি মা-র খাবার ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। সকালে হাসপাতালে ভর্তির কাজ সেরে সব টেস্ট করাতে হবে। সকাল সকাল বের হতে হবে। এখান থেকে ট্যাক্সি ধরে মুকুন্দপুর যেতে বেশি সময় লাগে না।


শাফায়েত আর ফৌজিয়া আক্তার এর আগে দুই দফায় কোলকাতা এসেছে, মারকুইজ স্ট্রিটেই কোনো না কোনো হোটেলে থেকেছে, এবারে অপারেশনের জন্য আসা তাই ঘর ভাড়া নিতে হলো। ফৌজিয়া আক্তার মুকুন্দপুরের নারায়ানা হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন, ডাক্তার যাদব ঘোষালের ওপর তার খুব ভরসা। তাই এক মাস বা তার চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে জেনেও তিনি এই ডাক্তার ছাড়া অন্য কারো কাছে অপারেশন করাতে রাজি হচ্ছিলেন না। শাফায়েত তাই বাধ্য হয়ে নিজের ব্যবসায়িক কাজকর্ম ছেড়ে মাস দেড়েকের জন্য কোলকাতা চলে এসেছে।

 

‘‘চল যাই’’ বলে ভুবন মিত্র শাফায়েতের হাত ছেড়ে দেন। কোলের ওপরে রাখা নরম লালচে কাগজটা নরম স্পর্শে তুলে তিনি উঠে দাঁড়ান, ধীর পায়ে ঘরের ডান দিকের টেবিলের কাছে গিয়ে কাগজটা সযত্নে একটা পলিথিনের প্যাকে জড়িয়ে ড্রয়ারের ভেতরে রেখে ড্রয়ারটি তালাবন্ধ করেন।
শাফায়েত এই কয়েক দিনে জেনে গেছে, ঐ ড্রয়ারে আরও অনেক কিছু আছে, যা ছুঁয়ে ছুঁয়ে এই মানুষটা নিজের আয়ুরেখা গুনতেও ভুলে যান।


শাফায়েত আজ কথায় কথায় কৌতূহলী হয়ে কাগজটা দেখতে চেয়েছে। দেখার পাশাপাশি কাগজটার একটা ছবিও তুলে রেখেছে। ভুবন মিত্র হাত-মুখে জল দিবেন বলে ভেতর ঘরে ঢুকলে শাফায়েত ছবিটি দেখতে থাকে। কাগজটার একেবারে ওপরে বাংলা বর্ণমালায় মোটা করে লেখা, ‘‘পশ্চিম-বঙ্গ সরকার, আশ্রয়প্রার্থীদিগকে পুঞ্জীভুক্ত (রেজেস্ট্রী করার প্রমাণপত্র)।’’ পরিবারের কর্ত্তার নামটি অস্পষ্ট। শাফায়েত আন্দাজ করে নামটি পড়ে, ‘ভুবন মিত্র।’

 

২.
রূপসা নদীর ঢেউগুলো ছুঁয়ে দেখতে দেখতে শাফায়েত বলে, ‘‘নদীর পানি নীল কেন রে?’’
‘‘ও তো আকাশের ছায়া পড়েছে। বুঝতে পারছো না?’’ বারো বছর বয়সী রূপসার ভ্রুকুঞ্চন দেখে শাফায়েত হাসে, ‘‘তাই তো, নদীর পানিতে আকাশের ছায়া পড়লে এমনই তো দেখায়। খুব ভালো এঁকেছিস তুই।’’

 

রূপসা খুশিমনে ড্রয়িংখাতার পাতা ওল্টায় আর কথার ঢেউ ভাঙে, ‘‘এটা দেখেছো, এটা ঠাকুরদার বাড়ির চৌচালা ঘর, এটা সুখী গাই আর পুকুরপাড়ে এই যে ঘুড়ির নাটাই হাতে এটা আমার ঠাকুরদা।’’ ছবিতে ঠাকুরদার দেওডোবা গ্রাম এঁকেছে রূপসা। শাফায়েত স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, ভুবন কাকার সুখী গাইয়ের সুখী সুখী মুখ। পুকুরের পদ্মভাসা পানির ওপরে ভুবন নামের কিশোরটির রঙিন লেজওয়ালা ঘুড়ি পড়ে গেছে, সে দুঃখী দুঃখী চোখে ভেজা ঘুড়ির দিকে তাকিয়ে আছে।

 

ফৌজিয়া আক্তার বিছানায় শুয়ে দুজনের কথা শুনে হাসছেন, বেডরেস্টে আছেন তিনি। দশ দিন পর আজ সকালে মা-ছেলে হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন। মাকে নিয়ে এই কদিন খুব দুশ্চিন্তায় কেটেছে শাফায়েতের। যদিও ডাক্তার বারবার বলেছেন, চিন্তার কিছু নেই। ছয়দিন পরেই ফৌজিয়া আক্তার হাঁটতে পেরেছেন। যদিও এই অবস্থায় বিমানভ্রমণ করা সম্ভব না তাই তাদের আপাতত কোলকাতাতেই থাকতে হচ্ছে। এই বাসায় ওঠার পর প্রথম কদিন হোটেল থেকে এনে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করলেও পরে শাফায়েত একটা রাইস কুকার কিনে নিয়েছে। এতে ভাত, ডাল, সিদ্ধ, ভর্তা এসব অনায়াসেই করা যায়। এছাড়া দেবাংশু দাদার স্ত্রী নীলা বৌদি আর মনি কাকীর বাটি তো আছেই। রোজ কাকী বাটিতে করে কিছু না কিছু এ ঘরে দিয়ে যান। শাফায়েত আপত্তি করলে বলেন, ‘‘ও মা এতটুকু করবো না! তোমরা আমার শ্বশুরবাড়ির দেশের লোক।’’ কোনো কোনো দিন আনন্দ-বেদনার মিশ্র অনুভূতিতে কাকীর কণ্ঠস্বরআচ্ছন্ন হয়ে থাকে, ‘‘অসুস্থ মানুষটা খুব ভাল আছে তোমাদের পেয়ে।’’ 

 

শাফায়েতের মনে পড়ে, সেই প্রথম যেদিন হাসপাতালে শাফায়েতের সঙ্গে দেবাংশুর পরিচয়, ওর বাড়ি বাংলাদেশের খুলনা শুনে দেবাংশু বলেছিল, ছোটবেলা থেকে সে দেখেছে তার বাবা খুলনার কথা মনে না করে একটা দিনও পার করেন না। এখন ভুবন মিত্র রোজ একবার শাফায়েতের কাছ থেকে দেশের খবরাখবর নেন, কখনো নরম পায়ে হেঁটে ওদের ঘরের দরজার বাইরে দাঁড়ান, কখনো বা রূপসাকে দিয়ে ডেকে পাঠান। শাফায়েত শহর দেখতে বের হলে ফৌজিয়া আক্তারের সঙ্গে তার গল্প জমে ওঠে।

 

কদিন শাফায়েতকে দেখতে না পেয়ে ভুবন মিত্র বড় অস্থির হয়ে পড়েছেন। হাসপাতাল থেকে ওরা ফেরামাত্র নিজে গিয়ে মা-ছেলের খবর নিয়ে এসেছেন। মনি কাকী শাফায়েতকে রান্নার ঝামেলা করতে দেননি, বড় বাটিতে করে পাঁচমিশালী সবজি খিচুড়ি, কষা মাংস, বেগুনি আর আমের টক দিয়ে গেছেন। তৃপ্তিমতো খেয়ে শাফায়েত এক ঘুম দিয়ে উঠেছে। সন্ধ্যা লাগলে রূপসা শাফায়েতকে ওদের ঘরে ডেকে এনেছে। শাফায়েত দরজার কাছে এসে দাঁড়াতেই ভুবন মিত্র বৌমাকে ডাকেন, অতিথির জন্য চা দিতে বলে ওর হাত ধরে সোফায় নিয়ে বসান। নীলা বৌদি ওর জন্য দইবড়া-চা আর শ্বশুরের জন্য এক বাটি স্যুপ দিয়ে গেছে। গল্প জমে উঠলে বৌদি কয়েক দফা চা পাঠায়। 

 

শাফায়েত সামনে বসা মানুষটির প্রশান্তিমাখা মুখ দেখে টের পায় ওর উপস্থিতি কতটা আরাধ্য ছিল।
‘‘আমার দিদিটি কী করছে?’’
‘‘মা, ঘুমাচ্ছে।’’
‘‘তা বেশ, বেশ। কবে যাবি তোরা?’’
‘‘দেরি আছে কাকা। অন্তত মাস খানেক।’’
‘‘দেরি হলেই ভাল। কেমন একটা দেশী মানুষ পেয়ে গেছি বল তো।’’

 

যেন কোনো রাজ্য জয় করেছেন, ভুবন মিত্র হাসেন। এই প্রথম মানুষটাকে এত শব্দ করে হাসতে দ্যাখে শাফায়েত। আশ্চর্য তো কোন কালে ছেড়ে আসা এক দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য আত্মার ভেতরে এতটা জায়গা পুষে চলেছেন মানুষটা!আজ গল্পের ঝুড়ি একেবারে উপুড় করে দিয়েছেন। একবার থামছেন, একবার হেসে উঠছেন, কখনো বা শাফায়েতের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে নিজেই উত্তর দিয়ে দিচ্ছেন। নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে রিফিউজি পরিচয়ে নতুন করে জীবন-জীবিকা শুরু করার দিনগুলোর স্মৃতি হাতড়াতে হাতড়াতে ভুবন মিত্র শাফায়েতকে মিহি গলায় কত কী বলছেন, তার অস্ফুট কণ্ঠ ভেদ করে শাফায়েত সব বর্ণ স্পষ্ট ভাবে বুঝতে না পারলেও তার কণ্ঠের অকৃত্রিম আবেগ ধরতে পারে। সেই সঙ্গে ধরতে পারে এরই মধ্যে কোনো কোনো গল্প ও একাধিকবার শুনেছে। তবু খুব আগ্রহ নিয়ে শাফায়েত ভুবন মিত্রের কথা শোনে।

 

‘‘দাদা শহরে মাল বিক্রি করতে গিয়ে শুনলো দাঙ্গা লেগেছে, বাড়ির সবাই ভয় পেয়ে গেল, ঠিক হলো ওপাড়ে চলে যাবে। কোলকাতায় তখন দলে দলে উদ্বাস্তুরা আসছে। শিয়ালদা স্টেশন, ওয়েলিংটন স্কয়ার, নেবুতলার মাঠ, শ্রদ্ধানন্দ পার্ক, ছোট বড় সব খেলার মাঠে তখন মানুষের সারি। আমাদের মাইগ্রেশন সার্টিফিকেট ছিল না। রিফিউজি কলোনির জঙ্গল সাফ করে মাটির মেঝে, হোগলা পাতার চাটাই, গরানের খুঁটি দিয়ে আমাদের থাকার ঘর তৈরি হলো। যাদের কোথাও যাওয়ার নেই, ট্রাকে করে সেই রিফুজিদের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে পাঠানো হলো। আমাদের কলোনির কেউ রিফিউজি বলতো না তখন, মুখে মুখে আমরা রিফুজি হয়ে গেলাম।’’

 

এ ক’দিনে শাফায়েতের দৃশ্যপটটা চেনা হয়ে গেছে। প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দকৃত জমিতে বাঁশ, বাঁশের চাটাই, টালি দিয়ে তোলা সারি সারি ঘর, ঘিঞ্জিবসতি, কাঁচা ভিতের ঘরে বর্ষায় পানি জমে থাকা। যে মানুষগুলো নিজের দেশে চাকরি করতো নয়তো ভিটেবাড়িতে চাষবাস করতো তারা দিনভর মাঠেঘাটে বিনা পুঁজিতে পাওয়া নলতে শাক, শালুক, কচুর লতি, মানকচু ফেরি করে বেড়াচ্ছে; আর যারা অল্প কিছু পুঁজি সংগ্রহ করতে পেরেছে তারা বাড়িবাড়ি ঘুরে গামছা, ধূপকাঠি, অ্যালুমিনিয়ামের বাসনকোসন বিক্রি করছে।

 

ভুবন মিত্রের সঙ্গে গল্প করতে করতে কী যেন হয় শাফায়েতের; বন্ধুমহলে কাঠখোট্টা, আবেগহীন বলে পরিচিত শাফায়েতের বুক থমথম করে, বক্তার অলক্ষ্যে চোখের পানি চোখেই লুকায়। আজ পর্যন্ত তেমন কিছুই হারায়নি শাফায়েত, তাই হয়তো শত চেষ্টার পরেও এই মানুষটির সব হারানোর উপলব্ধি অভিন্নভাবে অনুভব করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।

 

নীলা বৌদির দিয়ে যাওয়া মসলা চা-য়ে চুমুক দিতে দিতে শাফায়েত ভুবন মিত্রকে দেখে। তাকে হঠাৎ ভীষণ খুশি মনে হয়, ‘‘বটতলার কাপড়হাটিতে গফুর চাচার চা-য়ের দোকান ছিল। ঐ দোকানের চা ছাড়া বিকালের আড্ডা জমতোই না কারো, সেই চা একেবারে মালাই ভাসা।’’

 

স্যুপ ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। শাফায়েত কাকার হাতে বাটি তুলে দেয়, তিনি এক চামচও মুখে তোলেননি। আকাশ বাতাস মথিত করে ভুবন মিত্রের কণ্ঠ শোনা যায়, ‘‘রূপসার পাড় ঘেঁষে সবুজ আর সবুজ, সবুজের মেলা। সামনে এগোও সোনা, আরও সামনে যাও সোনা। সোনায় ঝলমলে গ্রাম দেওডোবা। দেও নেই, আছে কোড়াপাখির ডাক আর রূপসার ঢেউ।’’ 

 

ভুবন মিত্র চোখের ঝাঁপ বন্ধ করেন। তার সামনে দাঁড়ানো কপালে আলতা রঙের বর্ম আর ঝকঝকে হলুদ ঠোঁটের বাদামি রঙা কোড়া আনন্দে ডেকে ওঠে, মাথা উঁচিয়ে জল ভরা খেতে দাপিয়ে বেড়ায়। ভুবন মিত্রের সমস্ত শরীর ঝনঝন করে। তিনি আনন্দে দুলে ওঠেন।

 

শাফায়েত তাকিয়ে দেখে, একটা দৃশ্যমান সীমান্ত রেখা এই মানুষটির জন্মভিটের সঙ্গে তার এক অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি করেছে; নিজের দেশ, মাটি, পরিজন চলে গেছে এমনই এক অনতিক্রম্য দূরত্বে, যা চাইলেও কোনো জন্মেই মানুষটি ঘোচাতে পারবেন না, তবু সেই দূরত্বকে অতিক্রম করার ক্লান্তিহীন মিনতি ভুবন মিত্রের চোখেমুখে ঝরে পড়ছে।

 

৩.
দেখতে দেখতে ওদের যাবার দিন চলে আসে। ফৌজিয়া আক্তার এখন স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছেন। গতকাল শাফায়েত ডাক্তারের কাছ নিয়ে গিয়েছিল। ডাক্তার বলেছেন, এখনো মোটামুটি তিনচার মাস সাবধানে থাকতে হবে। বাবার অবর্তমানে শাফায়েতের মা-ই ওর সব। তাদের দুজনের সংসারে তেমন কোনো ঝামেলা নেই। ফৌজিয়া আক্তার অবশ্য ইদানিং ‘বিয়ে কর বিয়ে কর’ বলে ছেলের মাথা খাচ্ছেন। শাফায়েত এখনো সম্মতি দেয়নি, ভাবছে আরেকটু গুছিয়ে নেবে। 

 

শাফায়েত ব্যাগ গুছাচ্ছে, ফৌজিয়া আক্তার ছেলের কানের কাছে গুনগুন করছেন, ‘‘রাজিয়াকে বলেছি, ভাগ্নের জন্য মেয়ে দ্যাখ। এবার দেশে ফিরে আমার একমাত্র কাজ হবে তোর বিয়ে দেওয়া। ঢাকা থেকে খুলনা ফেরার আগে অন্তত একটা মেয়ে দেখতে চাই।’’

 

ঘরে কখন রূপসা এসে দাঁড়িয়েছে ওরা টের পায়নি। রূপসা ফিকফিকিয়ে হাসে, ‘‘কী মজা! শাফায়েত কাকুর বিয়ে, শাফায়েত কাকুর বিয়ে! আমাদের নেমন্তন্ন করো কিন্তু।’’
শাফায়েত হাসতে হাসতে রূপসার নাক টিপে দেয়, ‘‘অবশ্যই দিবো রূপসা, তোরা বাড়ি শুদ্ধ লোক বাংলাদেশে গিয়ে আমার বিয়ের নেমন্তন্ন খেয়ে আসবি।’’
রূপসা আঁতকে ওঠে, ‘‘ওমা, আমার তো পাসপোর্ট লাগবে, পাসপোর্টই তো করা নেই। ওদেশে যেতে পাসপোর্ট-ভিসা লাগবে, ঠাকুরদা বলেছে।’’
বলতে বলতে রূপসা খাটের ওপর একটা ভারি কাগজ রাখে। শাফায়েত পিছু ফিরে দেখে একটা ছবি।

 

‘‘কী রে, ছবিটা রেখে যাচ্ছিস যে?’’
‘‘তোমাদের জন্য এনেছি।’’


শাফায়েত ছবিটা হাতে নেয়। ছবিটা দেখতে দেখতে ওর চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। কী বলবে শাফায়েত বুঝতে পারে না, শুধু রূপসার জলের মতো রূপসার টলমল কণ্ঠস্বর শুনতে পায়, ‘‘এই ছবির পৃথিবীতে কোনো বর্ডার নেই বুঝেছো কাকু, কোনো রিফুজিও নেই।’’
আচমকা পাশের ঘর থেকে দেবাংশুর কান্নার শব্দ শোনা যায়। সেই সঙ্গে নারীকণ্ঠের তীক্ষ্ম চিৎকার। রূপসা ফড়িঙের মতো ছুটে যায়। শাফায়েত আর ফৌজিয়া আক্তারও যান পিছু পিছু। বিকাল থেকেই ভুবন মিত্রের শরীরটা ভাল ছিল না, বারবার শ্বাসের টান উঠেছে, কাল সকালে তাকে ডাক্তারের কাছে নেওয়ার কথা। একবার শাফায়েত তার ঘরে ঢুকেছিল, ইশারায় কাছে ডেকে বহুক্ষণ তিনি ওর হাত নিজের শিথিল মুঠোর মধ্যে আঁকড়ে রেখেছিলেন। সকালে ওরা বাংলাদেশ ফিরে যাচ্ছে কথাটা মনে করিয়ে দিতেই ভুবন মিত্রের চোখের কোণ গড়িয়ে কয়েক ফোঁটা পানি পড়েছে। কিছু বলতে চেয়েছিলেন ওকে, বুকে শোঁ শোঁ শব্দ হয়ে শ্বাসকষ্ট হওয়ায় কথাটা স্পষ্ট করে বলতে পারেননি। শাফায়েত কান পেতে শুনেছে, ‘‘রূপসা...রূপসা। আমাদের রূপসা...।’’

 

আর কোনো কথা বলতেও পারবেন না ভুবন মিত্র। কী থেকে কী হয়ে গেল, শাফায়েতের মাথা কাজ করে না। দেবাংশু শাফায়েতকে বুকে জড়িয়ে কাঁদছে। মনি কাকী মেঝেতে লুটিয়ে আছেন, নীলা বৌদি তাকে দুহাতে ধরে রেখেছেন। রূপসা ঠাকুরদার মাথার কাছে বসে আছে। শাফায়েত চারদিকে তাকায়, টেবিলের ড্রয়ারের ছোট্ট তালার সঙ্গে চাবি ঝুলছে। ধীর পায়ে এগিয়ে শাফায়েত চাবিটি খুলে টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে ড্রয়ারে সংরক্ষিত কাগজের অধিকারী এই পরিবারের কর্তার দিকে তাকায়।

 

চাদরে ঢাকা পাতলা শরীরটি বিছানার সঙ্গে মিশে আছে। নিষ্প্রাণ মুখটির দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না শাফায়েত, দৌড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। পরশু এখানে চেয়ার পেতে বসে দুজনে কত গল্প করেছে, মাঝেমাঝে ভুবন কাকা চুপচাপ বসে থেকে কান খাড়া করেছেন, যেন রূপসার জল গড়িয়ে পড়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছেন। কখনো বা শৈশবের বন্ধুদের কথা মনে করে হেসেছেন, একটা লাটিম আজও তার সংগ্রহে আছে। দেশ থেকে শুরু করে কত বাড়িঘর বদলেছেন তবু বন্ধুর দেওয়া সেই লাটিম তিনি হারাননি। 

 

শাফায়েত কাঁদতে পারে না, অসহায়ভঙ্গিতে ও বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকে। বাড়িতে এরই মধ্যে প্রতিবেশী-পরিজন অনেকেই চলে এসেছে। স্নান শেষে ভুবন মিত্রকে সাদা কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে, ফুল চন্দন, ফুলের মালা দেওয়া হয়েছে। বাঁশের খাটিয়াও চলে এসেছে। শাফায়েত বিমূঢ় হয়ে সব দেখছে, সবাইকে দেখছে। 

 

রাতটা ভীষণ এক হাহাকারের মধ্যে কাটে। ভুবন মিত্রের শেষকৃত্য সম্পন্ন হলে সকালে দেবাংশুর কাছ থেকে শাফায়েত বিদায় নিতে আসে। দেবাংশুর কান্না কিছুতেই থামছে না। ফৌজিয়া আক্তারও থেমে থেমে কাঁদছেন। বাড়ির মানুষদের এই অবস্থায় রেখে কোনোভাবেই দেশে ফিরতে মন চাইছিল না শাফায়েতের। কিন্তু ফিরতে হবে, উপায় তো নেই। শাফায়েত আর ফৌজিয়া আক্তার ভেতর ঘরে ঢুকে সকলের সঙ্গে দেখা করে আসে।
শাফায়েত ওপরে তাকিয়ে দেখে রূপসা চুপচাপ বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। ও হাত নাড়তেই রূপসা ছুটে ভেতরে চলে যায়।

 

শাফায়েত রূপসার দেওয়া ছবিটা কাঁধে ঝোলানো ব্যাগে রেখেছে। ট্যাক্সিতে উঠে চালককে ‘‘অ্যায়ারপোর্ট’’-বলে সে ছবিটা বের করে। ছবিতে মেঘের ভেলায় ভেসে বেড়ানো ডানা লাগানো মানুষের অপরূপ পৃথিবী দেখতে দেখতে ফৌজিয়া আক্তার আর শাফায়েতের ভেজা চোখ শত চেষ্টা করেও পানি ধরে রাখতে পারে না।

 

অপূর্ব সুন্দর ছবি। সত্যি সত্যি এ ছবির মানুষগুলোর কোনো পাসপোর্ট-ভিসা লাগবে না, তারা যেখানে ইচ্ছা সেখানে উড়ে যেতে পারবে। এখন যেমন রূপসার ঠাকুরদা ইচ্ছামতো যেখানে খুশি সেখানে চলে যেতে পারবে, এমন কি উড়ে উড়ে সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে প্রিয় রূপসার আকাশনীল জলও ছুঁয়ে দেখতে পারবে।