ধারাবাহিক উপন্যাস- চতুর্থপর্ব

হারল্যান্ড (নারীস্থান) - শার্লট পারকিন্স স্টেটসন গিলমান

হারল্যান্ড (নারীস্থান) - শার্লট পারকিন্স স্টেটসন গিলমান
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঊনবিংশ শতাব্দীর নারীবাদী লেখক ও সমাজ সংস্কারক শার্লট পারকিন্স গিলমান-এর নন্দিত উপন্যাস ‘হারল্যান্ড’ বাংলায় ‘নারীস্থান’ নামে ধারাবাহিকভাবে ছাপানো হচ্ছে পাক্ষিক অনন্যায়।

চতুর্থপর্ব-


দেখে-শুনে মনে হচ্ছে এখানকার মানুষগুলো খুবই দক্ষ, পরিপক্ক। একজন মালী যেমন যতেœর সঙ্গে দামি একটি ফুলের বাগান পরিচর্যা করে, ওরা তেমনি গোটা এলাকার যতœ নিয়েছে। পরিষ্কার মিষ্টি আকাশ। সেই আকাশের নিচে সারিবাঁধা অগুণিত গাছ সুমিষ্ট ছায়া তৈরি করেছে। আমরা নির্বিঘেœ প্রশান্তপথ বেয়ে আগালাম। শুধু পাখির ডাক ছাড়া চারদিকে নিস্তব্ধ, শান্ত।
আমরা যে-পথ দিয়ে আগাচ্ছি সেটি বেশ লম্বা রাস্তা,  সোজা পাহাড়ের দিকে চলে গেছে। যে-গ্রাম বা শহরটির দিকে আমরা যাচ্ছি, এটি সেদিকেই গিয়েছে। আমরা দাঁড়ালাম এবং রাস্তাটা নিয়ে একটু চিন্তা করলাম। জেফ ল€^া নিশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘থরে থরে সাজানো ওই বাড়িগুলো এত সুন্দর আমি না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।’


টেরি সায় দিয়ে বলল, ‘ওদের অনেক স্থপতি আছে বোঝা যায়, বাগানকরা লোকেরও অভাব নেই।’
আমি নিজেও অভিভূত। আমি ক্যালিফোর্নিয়ার মানুষ। সেখানকার গ্রামগুলো বড়োই সুন্দর। কিন্তু যদি শহরের কথা বলা যায়, কী বলবো! বাড়িতে বসে আমি প্রায়ই ক্ষোভ প্রকাশ করতাম। যদিও আমি জেফ-এর মতো শিল্পবোদ্ধা না, তবু বুঝতাম যে, মানুষ কীভাবে শহরের প্রকৃতিকে নষ্ট করেছে। কিন্তু এই শহরের কথা কী বলবো! সব হালকা গোলাপি রঙের পাথর দিয়ে তৈরি। তার মাঝে মাঝে ধবধবে সাদা বাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে। বাড়িগুলোর সামনে সবুজ ছোট ছোট বন এবং বাগান। বড়ো বড়ো গোলাপ ফুটে আছে। মনে হয় যেন গোলাপি প্রবাল। 
টেরি বলল, ‘সামনের ওই বড়ো দালানটি মনে হয় সরকারি ভবন। এটা কোনো বর্বরদের দেশ নয় বুঝলে। কিন্তু এখানে কোনো পুরুষ ছেলে নেই? শোন, এইসব দেখে আমার মনে হচ্ছে, আমাদের ভদ্রভাবে, শান্তভাবে এগিয়ে যাওয়া উচিত।’
জায়গাটি দেখতে সত্যিই সম্পূর্ণ অন্যরকম। যতই আমরা কাছে গেলাম ততই বিস্মিত হতে থাকলাম। 
যেন একটি প্রদর্শনী যা বাস্তবের তুলনায় অনেক সুন্দর। আমরা অসংখ্য প্রাসাদ দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু বসবাসের ঘর কোথায়? হ্যাঁ, ছোট দালানও আছে, কিন্তু সেগুলো ঠিকÑ আসলে আমরা যেসব শহর দেখেছি তার থেকে এটি সম্পূর্ণ আলাদা। 
কিছুক্ষণ বিরতির পর হঠাৎ জেফ বলল, ‘দেখেছ, কোথাও কোনো ময়লা নেই, কোনো ধোয়া দেখা যাচ্ছে না!’
আমি ওর সঙ্গে যোগ দিয়ে বললাম, ‘কোনো শোরগোল নেই।’ জেফ আমার কথায় তিরস্কার করে বলল, ‘এর কারণ সম্ভবত ওরা আমাদের দেখে সতর্ক হয়ে গিয়েছে। আমাদের সাবধানে ওদের কাছে যাওয়া উচিত।’


কিন্তু কোনো কিছুই আমাদেরকে নিবৃত করতে পারবে না। সুতরাং আমরা আগাতে থাকলাম।
সবকিছু সুন্দর, শৃঙ্খলিত এবং পরিচ্ছন্ন।  দেখে মনে হচ্ছে সব চরম সুখী মানুষের ঘরবাড়ি। আমরা শহরের কেন্দ্রের কাছাকাছি পৌঁছে বুঝতে পারলাম, বাড়িগুলো বেশ ঘনঘন। একেকটি বিক্ষিপ্ত প্রাসাদের মতো ভবন ঘিরে গড়ে উঠেছে পার্ক, খোলা জায়গাসহ চত্বর। অনেকটা আমাদের কলেজ বিল্ডিংগুলোর সবুজ চত্বরের মতো। 


আমরা একটি কর্নারের দিকে এগিয়ে যেতেই দেখলাম সারি বেঁধে বেশ কয়েকজন নারী দাঁড়িয়ে আছে। সেখানেও সবাই বেশ শৃঙ্খলাবদ্ধ। ওদের দাঁড়ানো দেখেই বোঝা যায় ওরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। আমরা পেছনে ফিরে তাকালাম। দেখলাম কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আরেকদল দৃঢ়পায়ে আমাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। আমরা সামনে আগাতে থাকলাম। ওদেরকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই। এরপর দেখলাম সবদিকেই ওরা ঘিরে ফেলেছে। কিন্তু  যেটা চোখে পড়ার মতো তা হলো ওদের সবাই নারী। 


অল্প বয়েসিও না, আবার বৃদ্ধও না। তারা অল্পবয়েসি মেয়েদের মতো সুন্দরও না। ওরা একেবারেই ভয়ানক না। তারপরও সামনাসামনি দাঁড়িয়ে ওদের সবাইকে শান্ত, গভীর আর নির্ভীক বলে মনে হলো। ওদের দেখে আমার সেই ছোটবেলার কিছু অনুভূতির কথা মনে হলো। ছোটবেলায় ছোট ছোট পা ফেলে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও সময় মতো স্কুলে গিয়ে পৌঁছাতে পারতাম না। তখন যেমন অনুভূতি এবং অপরাধ বোধ হতো, এখনো তাই হচ্ছে। 
জেফ-এর অবস্থাও তাই। তার মুখ দেখেও সেরকম মনে হলো। আমাদের অবস্থা হলো এমন যেন ক্ষুদ্র দুই শিশু কোনো দয়ালু মেয়েলোকের ঘরে ঢুকে কিছু নষ্ট করে ফেলেছি। কিন্তু টেরির মধ্যে এমন কোনো কিছু দেখা গেল না। আমি দেখলাম তার চঞ্চল চোখদুটো এদিক সেদিক দেখছে। ওদের সংখ্যা গুনছে, ওরা কতটা দূরে আছে এবং ফাঁকফোকর গলে পালানো যায় কিনা সেটা মেপে দেখছে। চারদিকে ওরা কতদূর অবস্থান করছে তা দেখে আমাকে বিড়বিড় করে বলল, ‘ওদের প্রত্যেকের বয়স ৪০-এর উপর।’
তারপরও ওদের কাউকে বয়স্ক বলা যাবে না। প্রত্যেকের শরীর একেবারে যেন গোলাপের মতো ফুটে রয়েছে। শান্ত, কিন্তু প্রত্যেকে যেন একেকজন মুষ্টিযোদ্ধা। ওদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই। কিন্তু আমাদের হাতে আছে। তাহলেও আমরা এগুলো ব্যবহার করতে চাই না। 
টেরি আবার বলল, ‘ওরা আমাদের নিয়ে কী করতে চায়? ওরা মনে হয় কিছূ একটা বলতে চাচ্ছে।’
কিন্তু এরকম একটি অবস্থাতেও টেরি ওর বিশেষ কৌশলটা ব্যবহার করতে চাচ্ছে। টেরি দু’পা আগালো। বিনয়ের সঙ্গে ওদের খুশি করার জন্য হাসল এবং মাথা ন্যুইয়ে ওদের সামনে বোঝালো যে আমরা ওদের অনুগতই। তারপর ওদের আরো একটি উপহার দিয়ে মর্যাদাপূর্ণ করতে চাইল। একটি রঙিন স্কার্ফ। ভারি সুন্দর দেখতে! আমার চোখেই ওটা এমন সুন্দর যে বলার মতো না। টেরি মাথা নিচু করে সামনে যে দলপতির মতো দাঁড়িয়ে আছে নিরস মুখে, তার দিকে বাড়িয়ে ধরল। ওই নারী বিনয়ের সঙ্গে সেটি গ্রহণ করে পেছনে দাঁড়ানোদের মধ্যে একজনের কাছে হস্তান্তর করল। 
টেরি আবার একটি গোলাকার চমৎকার একটি মুকুট বের করল। জিনিসটি এত সুন্দর যে, পৃথিবীর যে-কোনো নারী পেলে খুশি হবে। টেরি সংক্ষেপে আমাদের পরিচয় দিল এবং মুকুটটা তার হাতে দিল। সেটিও গ্রহণ করে নিয়ে  সে পেছনের দিকে চালান করে দিল। 


টেরি চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘মেয়েগুলি যদি আরেকটু কম বয়সের হতো! আসলে এরকম বয়স্ক নারীদের বাহিনীকে কী বলা যায়?’ 
আমাদের সব আলোচনায় এবং কল্পনায় যে নারীরা ছিল তারা আর যাই হোক বয়সে অল্পই ছিল। বেশির ভাগ পুরুষ ছেলে কল্পনা করার সময় তাই করে। আমিও তাই করেছিলাম। নারীর প্রতিরূপ সবসময় আমাদের কাছে তরুণ এবং আকর্ষণীয়। নারীদের বয়স হতে থাকলে তাদেরকে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চের পেছনের দিকে চলে যেতে হয়। কিন্তু এই সুন্দর নারীরা এখনো সামনের কাতারে রয়েছে। কে জানে, এদের কেউ কেউ হয়ত নানি হয়ে গেছে! 
আমরা তাকিয়ে দেখলাম ওদের কেউ নার্ভাস কিনা। না কেউ নার্ভাস না। দেখলাম কেউ আতঙ্কিত কিনা। না কেউ আতঙ্কিতও না। অস্বস্তি, কৌতূহল এবং  উত্তেজনাÑ সবকিছুর মধ্য দিয়ে ওদেরকে মনে হলো যেন একদল ডাক্তার, যাদের দায়িত্ব পড়েছে পাহাড়ার এবং আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার। 
এবার ওদের মধ্য থেকে ৬জন সামনে এগিয়ে এল। আমাদের তিনজনের দু’পাশে দুজন  করে দাঁড়াল। ইশারায় বুঝিয়ে দিল যে ওদের সঙ্গে হেঁটে যেতে হবে। আমরা ভাবলাম প্রথমে ওদের কথা মেনে নেওয়াই শ্রেয়। আমরা ওদের সঙ্গে হাঁটতে থাকলাম। আমাদের দুই কনুইয়ের সঙ্গে ওরা একেকজন প্রায় লেগে আছে। ওদের বাকি সদস্যরা পেছনে সামনে ডানে-বামে চারদিকে। 
ওরা যেখানে আমাদের নিয়ে গেল  দেখলাম আমরা একটি বিশাল ভবনের সামনে। অতি পুরু করে দেয়াল বানানো ভবনটা খুবই আকর্ষণীয়। দেখতে বিল্ডিংটা পুরোনো। তবে ভবনের রং শহরের অন্য দালানগুলোর মতো না। এটি ধূসর রঙের। 


‘এই কাজ করা যাবে না’, টেরি বলল।‘ অর্থাৎ আমরা ওদের    কথায় এই ভবনের মধ্যে ঢুকতে পারি না। সবাই এখন একসঙ্গেÑ’
আমরা দাঁড়িয়ে পড়লাম। এবার আমরা ওদের বোঝাতে  থাকলাম, ওই  যে বড়ো বনের দিক দিয়ে আমরা এসেছি ওখান দিয়েই আবার এক্ষুনি ফিরে চলে যাব। 
কী করছি তাই দেখে আর নিজেরই হাসি পেল। তিনটি উদ্ধত, নির্লজ্জ ছেলে নিজেদের কোনো রক্ষা করার ব্যবস্থা না রেখে অজানা দেশে ঢু মারতে এসেছি। আমরা চিন্তা করেছি যদি পুরুষ থাকে তাহলে ওদের সঙ্গে লড়াই করতে হতে পারে। কিন্তু কেবল নারী হলে কোনো বাধা পাবো না তা কী করে হয়!
জেফের সবসময়ের ধারণা মেয়েরা বুঝি শুধু গাছে ঝুলে থাকা আঙুরের মতো। আর টেরির প্র্যাকটিক্যাল চিন্তা হলো নারীকে কেবল দুই ভাগে ভাগ করা যায়। কাক্সিক্ষত আর অনাকাক্সিক্ষত। অনাকাক্সিক্ষতরা সংখ্যায় অনেক। হলে কী হবে, ওরা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। তাদের নিয়ে ওর কোনো মাথাব্যাথা নেই। 
কিন্তু ও এখন এখানে একদল নারীর সামনে। সংখ্যায় অনেক, এবং সবাই একই রকম। তাদের একটা উদ্দেশ্যও আছে ওকে নিয়ে। যে উদ্দেশ্য সাধনে ওরা এখন বল প্রয়োগও করতে পারে। এখন এদের সম্পর্কে টেরির ভাবনা কী? 
এখন আসলে আমাদের গভীরভাবে চিন্তা করার সময়। ওদের সঙ্গে যাওয়া নিয়ে আপত্তি করা বোধ হয় বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। আমাদের একমাত্র চান্স হলো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা। দ্’ুদলের কাছ থেকেই সভ্য আচরণ আশা করা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, একবার যদি ভেতরে প্রবেশ করি তাহলে এরা আমাদের নিয়ে কী করবে তা জানা নেই। আমরা শান্তিপূর্ণ কোনো আটকের কথা চিন্তা করতে পারি না। আর এই আটককে যদি আমরা বলি কারাবন্দি, তাহলে সেটা হবে আরো ভয়ঙ্কর। 
সুতরাং আমরা একটা স্থির সিদ্ধান্তে এলাম। ওদের বোঝাতে চেষ্টা করলাম যে আমরা উন্মুক্ত আকাশের নিচে থাকতে চাই। 
ওদের একজন কাছে এল হাতে আঁকা আমাদের উড়োজাহাজের চিত্র নিয়ে। ইশারা ইঙ্গিতে জানতে চাইল ওটায় চড়ে আমরাই উড়ে এসেছি কিনা। 
আমরা স্বীকার করলাম। 


আবার ওরা ছবির উপর হাত রেখে জানতে চাইল সেটা কোন দিকে। আমরা এমন ভান করলাম যেন কোন দিকে আমরা জানি না। সত্যি কথা হলো আমরা নিশ্চিতভাবে জানিও না ওটা কোনদিকে আছে। ফলে আমরা একটা অস্পষ্ট দিকে দেখালাম। 
ওরা আবার আমাদের সামনে আগাতে ইঙ্গিত করল। ওরা এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে সারিবেঁধে যে কেবল সামনের দিকের পথটাই খোলা। এখন আমাদের হয় সামনে আগানো অথবা রক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। 
আমরা আবার নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলাম। 


ভীষণ বিব্রত অবস্থায় টেরি বলল, ‘আমার জীবনে আমি কখনো মেয়েদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি নাই। কিন্তু তাই বলে আমি ওই বিল্ডিংয়ের ভেতর যাচ্ছি না। একটা গরুর পালের মতো আমাদের নিয়ে যাবে সেটা মানা যায় না।’
জেফ বলল, ‘আমরা অবশ্যই ওদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারি না। ওরা সবাই নারী। যদিও আলাদা আলাদা পোশাক পরা না, কিন্তু ওরা সুন্দর নারী। মুখাবয়ব খুবই বুদ্ধিদীপ্ত। আমার মনে হয় আমরা ভেতরে যেতে পারি।’
আমি বললাম, ‘আমরা ভেতরে গেলে হয়ত কখনোই আর বের হয়ে আসতে পারব না! ওরা শক্তিশালী এবং বুদ্ধিদীপ্ত সেটা ঠিক। কিন্তু ওরা যে ভালোই সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখ।’
আমরা যখন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছি, দেখলাম ওরা স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আমাদের দিক থেকে মনোযোগ এক মুহূর্তের জন্যও নষ্ট হয়নি।  
ওদের ভাবভঙ্গি সেনাবাহিনীর মতো কঠোর শৃঙ্খলিত মনে হচ্ছে না। ওরা কোনো চাপ অনুভব করছে না।  টেরির বলা ‘সতর্ক প্রহরী’ কথাটাই সঠিক বলে মনে হচ্ছে। ওরা যেন বলিষ্ঠ নগরবাসী, শহরের কমন প্রয়োজন অথবা শহরকে সম্ভাব্য অনিষ্ট থেকে রক্ষা করতে এক ধরনের চিন্তা নিয়ে একই জায়গায় জড়ো হয়েছে। 
এমন নারীর দল আমরা কখনো কোনো শহরে দেখিনি। জেলেদের স্ত্রীদের এবং ব্যবসায়ী মেয়েদের আমরা শক্তিশালী দেখেছি, কিন্তু তারা বেশির ভাগই  মোটাসোটা এবং কর্কশ ধরনের। আর এই মেয়ে লোকরা খেলোয়াড়দের মতো, হালকা-পাতলা এবং তেজোদীপ্ত। আবার আমরা অনেক অধ্যাপক, শিক্ষক এবং লেখক নারী দেখেছি যারা বুদ্ধিদীপ্ত। কিন্তু তাদের আছে নার্ভাসনেস। এমন শান্ত, স্থির বুদ্ধিদীপ্ত নয়। 
আমরা ওদের কাছ থেকে খুব ভালো করে দেখলাম এবং অনুভব করলাম যে, এখন এই সময়টা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 
ওদের দলপতি কিছু একটা নির্দেশনা দিল এবং আমাদের দিকে ইশারা করল। সঙ্গে সঙ্গে ওদের মেয়েদের দল আরো এক পা আমাদের কাছাকাছি এল। 
টেরি বলল, ‘আমাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে!’
উত্তরে জেফ বলল, ‘আমি চাই আমরা ভেতরে যাব।’  কিন্তু আমরা দু’জন ওর কথার বিরোধিতা করলাম। জেফ মেনে নিল। আমরা আরেকবার চেষ্টা করলাম ওদের মধ্য থেকে বের হয়ে আসার। এবার আর অনুনয়-বিনয় করে নয়। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হলো না। 
‘চলো আমরা চেষ্টা করি,’ টেরি বলল। ‘যদি না পারি তখন আমি আকাশের দিকে ফাঁকা গুলি করব।’
আমাদের অবস্থা তখন দাঁড়াল লন্ডনে ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য প্রতিবাদকারী নারীর মতো। 
ওই মেয়েদের বেষ্টনি এত ঘন যে ফাঁক গলে বের হওয়ার মতো না। টেরি দেখল যে, বের হওয়ার চেষ্টা করা বৃথা। টেরি নিজেকে একটু ছাড়িয়ে নিয়ে ওর রিভলবার বের করল এবং আকাশের দিকে গুলি করল। ওরা যখন তাকে ধরে ফেলল, তখন আবার টেরি গুলি করল। আমরা একটা চিৎকার শুনতে পেলাম। 
দেখতে না দেখতে আমাদের একেকজনকে ওরা পাঁচজন করে ধরে ফেলল। কেউ ধরল পা, কেউ হাত, কেউ মাথা। আমাদের শিশুর মতো তুলে নিয়ে চলতে শুরু করল। আমরা মোচড় দিয়ে ছুটতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু কাজ হলো না। 


আমাদের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। আমরা ছুটবার চেষ্টা করলাম; কিন্তু ওরা আরো শক্ত করে শক্তিশালী নারীর মতোই আঁকড়ে ধরল। 
আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো একজন ধূসর চুলের রাজকীয় নারীর সামনে। সম্ভবত তিনি বিচার জাতীয় কোনো কাজের দায়িত্বে আছেন। 
ওদের মধ্যে কিছু কথা হলো। খুব বেশি কথা না। অল্পই। হঠাৎ ওরা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। একটা ভেজা জাতীয় কাপড় শক্ত হাতে আমাদের নাকে-মুখে চেপে ধরল। বুঝলাম, অ্যানাসথেসিয়া। অর্থাৎ অজ্ঞান করার জন্য।


চলবে...