নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার বিষাক্ত সংস্কৃতি শেষ করতে হবে

আনুশে হোসেন
নারীদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে সহিংসতার ইস্যুগুলো এমন এক ভয়াবহ বাস্তবতা, যা আমাদের কাছে কুৎসিত রূপ নিয়ে ধরা দেয়। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ এক অর্থে ‘উন্নয়নের তারকা’র মর্যাদা লাভ করেছে। এই অগ্রগতি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তা সত্ত্বেও, এই সত্য অস্বীকার করা যাবে না যে, নারী ও কন্যাশিশুদের প্রতি সহিংসতার ঘটনাগুলো বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা নীরবে মেনে নিয়ে থাকে।

বাংলাদেশে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা যে একটা জাতীয় সংকট, সেটা আমার দেশের নারীদের অজানা নয়। বলা যায়, এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন পরিসংখ্যান সেই সংকটেরই প্রতিধ্বনি করে। বাংলাদেশ মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, ২০২০ সালের প্রথম ৯ মাসে কমপক্ষে ২৩৫ জন নারীকে তাদের স্বামী বা তার পরিবার হত্যা করেছে। আসক আরো জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৯৭৫ জন নারী ধষর্েণর শিকার হয়েছেন, ধর্ষণ করার পর হত্যা করা হয়েছে ৪৩ জন নারীকে এবং ২০৪ জন নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। এই চিত্র পুরো সহিংসতার হিমবাহের চূড়া মাত্র। কারণ, অসংখ্য ঘটনা কখনো প্রকাশিত হয় না। সেগুলো পত্রিকার পাতায় কিংবা পরিসংখ্যানেও আসে না।

 

কোভিড মহামারি যেন এই সহিংসতাকে আরো উসকে দিয়েছে, বাংলাদেশের নারী ও কন্যাশিশুদের আরো বিপদাপন্ন করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর মার্চ ও এপ্রিলে নারীদের প্রতি সহিংসতার ঘটনা প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা স্পষ্ট হয়েছে ব্র্র্যাকের নথিভুক্ত তথ্যে।

 

তবে বাংলাদেশের মানুষ প্রায়শই যখন এসব কাহিনি ও পরিসংখ্যান শোনেন, তখন এসব সমস্যাকে বাতিল করে দেওয়া হয়। ধরে নেওয়া হয়, এগুলো এমন সমস্যা, যার সমাধান করা যায় না। আমরা যখন এসব দুর্ভোগকে পাশ কাটিয়ে যাই কিংবা মেনে নিই এবং যখন প্রতিনিয়ত দেখি আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে নারীদের দুর্ভোগ ও মৃত্যু, কন্যাশিশুদের বাল্যবিবাহ—ধরে নেওয়া হয়, তারা সমাজে উপেক্ষিত এবং কম ভাগ্যবান। সৌদি আরব থেকে যেসব নারী শ্রমিক ফেরত আসেন মৃতদেহের ব্যাগে করে, যারা মারা গিয়েছিলেন গৃহকর্তাদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়ে—আমার প্রশ্ন হলো—এদের তুলনায় বাংলাদেশের বিশিষ্ট এবং ক্ষমতাবান পরিবারগুলোর নারী ও মেয়েরা কি খুব একটা ভালো আছেন?

 

এর উত্তর হলো—না।

 

সম্প্রতি, একটি সিরিয়াল ধর্ষক-সম্পর্কিত কাহিনি আমার নজরে এসেছে, যে কিনা তরুণী মেয়েদের লাঞ্ছিত করে, ধর্ষণ করে এবং নানানভাবে অত্যাচারের মাধ্যমে হয়রানি করে। এই সিরিয়াল শিকারি হলো ঢাকার উল্লেখযোগ্য নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল (এআইএস/ডি)-এর একজন সাবেক ছাত্র। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গুলশান এলাকার বাসিন্দা ২৬ বছর বয়সি ধর্ষক মাসুদ (আসল নাম পরিবর্তিত), তার সামাজিক ও বন্ধুমহলের মেয়েদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছে। এর জন্য তাকে কখনো খারাপ কোনো পরিণতি ভোগ করতে হয়নি।

 

তবে তার দ্বারা নির্যাতিতরা চিরকাল ধরে নীরব থাকেননি। তারা মাসুদের অত্যাচারের ঘটনা রেকর্ড করেছেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে ‘নাউ উই স্পিক আপ’ নামে একটি পৃষ্ঠা চালু করে সেখানে প্রকাশ্যে তার নামসহ নিন্দাজ্ঞাপন করেছেন। ঐ সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাকাউন্টটিতে হাজারেরও বেশি ফলোয়ার রয়েছে, ফলে এই পোস্টগুলো ভাইরাল হয় এবং সারা বিশ্বের বাংলাদেশি নারীরা এই ধর্ষকটিকে জানতে পারে। তারা আমাদের সমাজে নারীদের দুর্ভোগ নিয়ে কথা বলছে এই প্ল্যাটফরমটিতে। বলা হচ্ছে—মাসুদ :একজন সিরিয়াল ধর্ষক ও শিকারি।

 

 

মাসুদের লালসার শিকার আইশা (আসল নাম পরিবর্তিত) নামে একজন নারী বলেছেন, ‘১০ বছর ধরে এই আঘাতের ভারী বোঝা ধরে রাখা ভীষণ চাপের। তবে অবশেষে আমি নিজেকে তার শেকল থেকে মুক্তি দিতে প্রস্তুত।’ মাসুদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হওয়া আইশা বলেছেন, ‘যখন আমার বয়স মাত্র ১৪ বছর, তখন মাসুদ আমাকে অচেতন করে ধর্ষণ করে। সে সময় আমার মনে হয়েছে—আমি যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি এবং এরপর আমি আমার শারীরিক ও মানসিক আঘাতগুলো যেন একটি বাক্সে প্যাক করে তা বন্ধ করে দিই। আমি এটাও ঠিকমতো উপলব্ধি করতে পারিনি, আমার সঙ্গে আসলে কী ঘটল। আমি সব সময় এটাই জেনে এসেছি, মেয়েদের যারা ধর্ষণ করে, তারা তাকে অপহরণ করে এবং অন্য সহযোগীরা মিলে এসব অত্যাচার করে। কোনো কাছের মানুষ কিংবা বন্ধু কেউ এমন অত্যাচার করতেই পারে না। কিন্তু আমি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিখেছি, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পরেরটিই বেশি সত্য। আমি আর তাকে ছাড়ব না। তার পাশ দিয়ে যারা নিঃশঙ্কচিত্তে হেঁটে যাচ্ছে, তাদের সত্যটা জানা দরকার যে সে একটা দানব। যতক্ষণ না সে ছিন্নভিন্ন ধরাশয়ী হচ্ছে, ভেঙে পড়ছে এবং তার মানুষের মুখোশটি খসে পড়ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত চলুন আমরা যেন হাল ছেড়ে না দিই।’

 

এই ধরনের ধর্ষকের আরেকটি শিকার আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে তিনি শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও এবং বাংলাদেশের বেশির ভাগ ও নারীর যে আইনি ও আর্থিক সংস্থান নেই, সেটা তার থাকা সত্ত্বেও তিনি এক কাছের পুরুষের শিকার হয়েছিলেন এবং ন্যায়বিচারের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

 

তার নাম ধরা যাক অনিতা (আসল নাম নয়)। অনিতা বলেছেন, ‘যখন আমি এই সাইকোপ্যাথিক ব্যক্তি দ্বারা শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছিলাম, তখন আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কলেজগুলোর একটিতে পড়ালেখা করলাম এবং সেটা বুঝতে বুঝতে আমার দুই বছর লেগে গিয়েছিল যে, আমার সঙ্গে যা হয়েছে, আমার দায় নয়।’ অনিতা আমাকে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘তিনি আমার মতো একই আর্থসামাজিক পটভূমি থেকে এসেছিলেন, আমরা একই উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়েছিলাম, তবুও আমি যখন বড় হচ্ছিলাম, তখন ভাবতে পারিনি আমি যাকে সুরক্ষিত বলে মনে করি এমন কারো কাছ থেকে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। আসলে যখন যৌন সহিংসতার বিষয়টি সামনে আসে তখন ধনী-গরিবনির্বিশেষে এর কোনো ব্যতিক্রম হয় না। ধর্ষণ ও লাঞ্ছনার বিষয়টিকে পড়ালেখাও কখনো সীমিত করতে পারে না। এটি কেবল যে ন্যায়বিচারের প্রয়োজন, তা নয় বরং এর জন্য প্রয়োজন আমাদের সমগ্র সমাজের পুনর্গঠন। সমষ্টিগতভাবে আমাদের বুঝতে হবে যে এই সহিংসতার শেকড় কোথা থেকে এসেছে এবং এটি যেই ক্ষীপ্র গতিতে বেড়েছে, তাতে আপনি যেখানেই অবস্থান করেন না কেন, এর কালো ছায়া পিছু ছাড়বে না।’

 

অনিতা ব্যাখ্যা করেন যে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এই সমস্যা আর্থসামাজিক অবস্থার ঊর্ধ্বে কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

 

অনিতা বলেন, ‘আমাদের দেশে এই নির্যাতন-সমস্যা সকল সামাজিক শ্রেণি এবং সীমানাকে ছাড়িয়ে গেছে। এটি এমন পুরুষতন্ত্র—যা কেবল দেশকেই নয়, সমগ্র বিশ্বকে শাসন করে এবং বাংলাদেশে দুর্বল নারীদের জন্য কোনো সুরক্ষাবলয় বা উপযুক্ত সহায়ক ব্যবস্থা নেই বলে এটি আরো বড় সমস্যা। এই প্রতিবাদের অজস্র দিক রয়েছে। আমরা আমাদের মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলতে ভয় পাই না। আমার দেহের অধিকার কেবল আমার এবং আপনি যদি এই অধিকারটি লঙ্ঘন করেন, তাহলে আপনি সব সময় যেমন আড়াল করতে পেরেছেন, তেমনটি এখন করতে পারবেন না।’

 

বাংলাদেশি সমাজের সর্বাধিক প্রভাবশালী অংশের নারীরাই যদি এ সমস্যার ন্যায়বিচার না পান, তবে দেশের পিছিয়ে পড়া অন্যান্য অঞ্চলের নারীরা তা কীভাবে পাবেন? সুতরাং সত্যটি হলো এ সমস্যায় ভুক্তভোগী ও বেঁচে যাওয়াদের জন্য প্রকৃতপক্ষে কোনো বিচার নেই। ধনী বা গরিব, সবচেয়ে ধনী পরিবার থেকে উঠে আসা নারী কিংবা অতি দরিদ্র গ্রামের নারী—সবাই বাংলাদেশ জুড়ে একটি বিষাক্ত ধর্ষণসংস্কৃতি দ্বারা বন্দি। এ সমস্যা দিনের পর উপেক্ষা করা হয়েছে, যা আমাদের শতাব্দীকাল ধরে চুপ করিয়ে রেখেছিল।

 

তবে সেই নীরবতা ভাঙার সময় এসেছে, শেকলভাঙার ডাক এসেছে। এটা কেবল বাংলাদেশিদের #MeToo নামের নতুন আন্দোলন নয়, বরং এটা তার থেকেও আরো বড়। এটা আমাদের নিজস্ব আন্দোলন। এই আন্দোলন আমাদের দেশের নারীদের বিরুদ্ধে এতদিনকার দুর্ভোগ-অত্যাচারের যবনিকা টানার। এটা এমন একটি জাতীয় সমস্যা যাকে আমরা এখন থেকে আর কিছুতেই ‘স্বাভাবিক’ বলতে পারি না। এটাও বলতে পারি না যে, এটা আমাদের সংস্কৃতির অংশ। সোজাসাপটা বলতে—এটা একটা অপরাধ।

 

ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতামুক্ত একটি বাংলাদেশ গড়ার লড়াই চালিয়ে যেতে হবে নারী ও পুরুষ সবাই মিলে এবং এটি এমন নারীদের সঙ্গে শুরু হয়েছে, যাদের হাতে রয়েছে বাংলাদেশের কিছু সম্পদ, তারা উঠে দাঁড়িয়েছেন এবং দ্ব্যর্থহীনভাবে বলছেন, ‘যথেষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশে ধর্ষণ-সংস্কৃতির এখন যবনিকা পতন ঘটাতে হবে।’

 

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: তাপস কুমার দত্ত

লেখক :যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সাংবাদিক, নারী অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ