দুর্গার বাংলায় আগমন

দুর্গার বাংলায় আগমন
কৃত্তিবাসী রামায়ণ থেকে জানা যায় যে, রামচন্দ্র রাবণবধের জন্য অকালে শরৎকালে দেবীর পূজা করেছিলেন। তখন থেকে এর নাম হয় অকালবোধন বা শারদীয়া দূর্গাপূজা। এই শারদীয়া পূজা হয় সাধারণত আশ্বিনের বা কার্তিকের শুক্লপক্ষে। বর্তমানে শারদীয়া পূজাই সর্বাধিক প্রচলিত। প্রতিবছর এসময় শুক্লা ষষ্ঠীতিথিতে দেবীর বোধনের মাধ্যমে দেবীকে পৃথিবীতে আগমন হয় এবং সপ্তমী, অষ্টমী ও মহানবমী পূজার মধ্য দিয়ে দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে দেবী পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড়ো ধর্মীয় অনুষ্ঠান শারদীয় দুর্গাপূজা। প্রতিবছর আশ্বিনের শারদপ্রভাতে বেজে উঠে পুজোর ঢাক। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ঢাক, শাখ বাজিয়ে দেবীকে ধরণীর বুকে আমন্ত্রণ জানায়। হিন্দুদের কাছে এটি ঠিক ধর্মীয় উৎসব নয়, পুনর্মিলনের উৎসব।
শক্তির দেবী হিসেবে পরিচিত দুর্গা পৌরাণিক দেবী। দুর্গ বা দুর্গম নামক  দৈত্যকে বধ করেন বলে তাঁর নাম হয় দুর্গা। জীবের দুর্গতি নাশ করেন বলেও তাঁকে দুর্গা বলা হয়। তিনি আদ্যাশক্তি, মহামায়া, শিবানী, ভবানী, দশভুজা, সিংহবাহনা ইত্যাদি নামেও পরিচিত ।


দুর্গাপূজার প্রচলন সম্পর্কে পুরাণ থেকে জানা যায়, পুরাকালে রাজ্যহারা রাজা সুরথ এবং স্বজনপ্রতারিত সমাধি বৈশ্য একদিন মেধস মুনির আশ্রমে যান। সেখানে মুনির পরামর্শে তাঁরা দেবী দুর্গার পূজা করেন। পূজায় তুষ্টা দেবীর বরে তাঁদের মনস্কামনা পূর্ণ হয়। এ-পূজা বসন্তকালে হয়েছিল বলে এর একনাম ‘বাসন্তী’ পূজা। এই বাসন্তী পূজা হয় চৈত্রের শুক্লপক্ষে। আবার কৃত্তিবাসী রামায়ণ থেকে জানা যায় যে, রামচন্দ্র রাবণবধের জন্য অকালে শরৎকালে দেবীর পূজা করেছিলেন। তখন থেকে এর নাম হয় অকালবোধন বা শারদীয়া দূর্গাপূজা। এই শারদীয়া পূজা হয় সাধারণত আশ্বিনের বা কার্তিকের শুক্লপক্ষে। বর্তমানে শারদীয়া পূজাই সর্বাধিক প্রচলিত। প্রতিবছর এসময় শুক্লা ষষ্ঠীতিথিতে দেবীর বোধনের মাধ্যমে দেবীকে পৃথিবীতে আগমন হয় এবং সপ্তমী, অষ্টমী ও মহানবমী পূজার মধ্য  দিয়ে দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে দেবী পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়।


ঠিক কবে থেকে বাংলায় দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হয় তার সঠিক সময় জানা না থাকলেও, ধারণা করা হয়, বঙ্গদেশে প্রথম দুর্গাপূজার প্রচলন করেন স¤্রাট আকবরের  রাজত্বকালে রাজশাহী জেলার তাহিরপুরের রাজা কংস নারায়ণ। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় সর্বপ্রথম বাংলায় দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। তবে জীমূতবাহনের দুর্গোৎসবনির্ণয়, বিদ্যাপতির দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী, শূলপাণির দুর্গোৎসববিবেক, কৃত্তিবাস ওঝার রামায়ণ, বাচস্পতি মিশ্রের ক্রিয়াচিন্তামণি, রঘুনন্দনের তিথিতত্ত্ব ইত্যাদি গ্রন্থে থেকে অনুমান করা হয় বাংলায় দুর্গাপূজা দশম অথবা একাদশ শতকেই প্রচলিত ছিল। সম্ভবত কংস নারায়ণ বা রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় সময় থেকে জাঁকজমকভাবে এই দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত ব্রিটিশ শাসনের সময় হিন্দু এলিট ও জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে দুর্গাপূজা। সে-সময় দুর্গাপূজা প্রভাবশালী জমিদার ও বিত্তশালীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ১৯৪৭-এর দেশ-বিভাগের পর সার্বজনীন পূজা ব্যাপক আকার লাভ করে। সেসময় থেকে সকলে মিলেমিশে পূজা করার প্রচলন শুরু হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর কিংবদন্তীর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দেশের কেন্দ্রীয় দুর্গাপূজা হয়। তারপর থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠানটি চলে এসেছে সকলের ঘরে ঘরে।


বর্তমানে দেশের সর্বত্র জাঁকজমকভাবে অনুষ্ঠিত হয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড়ো এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানটি। প্রাণের এই উৎসবটিতে জাতিভেদ প্রথা ভুলে সকল স্তরের মানুষের অংশগ্রহণে হয়ে উঠে এক বিশাল মিলনমেলায়। ঢাকের তালে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মেতে ওঠে উৎসব আনন্দে।