গৌতম বুদ্ধ: ত্যাগ ও অহিংসার পথপ্রদর্শক

গৌতম বুদ্ধ: ত্যাগ ও অহিংসার পথপ্রদর্শক
ছবি: সংগৃহীত
বুদ্ধ কোনো ঈশ্বর কিংবা ঈশ্বরের অবতার ছিলেন না। নিজের চেষ্টায় জেনেছিলেন সত্যকে। আহরণ করিছিলেন অগাধ জ্ঞান। তিনি মানবজাতির জন্য কোনো ত্রানকর্তা ছিলেন না। বরং পথ দেখিয়েছেন স্বনির্ভর হওয়ার, আত্মমুক্তির। আজও তাঁর শিক্ষা থেকে আত্মমুক্তির প্রচেষ্টায় মগ্ন হাজারো ভক্ত।

বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ধর্ম বৌদ্ধধর্ম, যে ধর্মের প্রবক্তা গৌতম বুদ্ধ। জীবনভর গৌতম বুদ্ধ মানুষকে ত্যাগ ও অহিংসার  শিক্ষা দিয়ে গিয়েছেন।সমাজ-বাস্তবতায় দিয়ে গিয়েছেন বিভিন্ন নৈতিক উপদেশ। পথ দেখিয়েছেন নিজেদের মুক্তির জন্য।


সংস্কৃত শব্দ বুদ্ধের বাংলা অর্থ "যিনি পরম-শাশ্বত বোধ বা জ্ঞান লাভ করছে।" বৌদ্ধ ধর্ম অনুসারে তিনিই বুদ্ধ যিনি জগতের সার সত্যি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন এবং নিজে নির্বাণলাভের পূর্বে ধরিত্রীর  সকল-জীবকে নির্বাণলাভের উপদেশ প্রদান করে গেছেন।


গৌতম বুদ্ধের পিতা ছিলেন তৎকালীন শাক্য-বংশের রাজা শুদ্বোধন এবং মাতা মায়াদেবী। বিবাহের দীর্ঘদিন পর গর্ভবতী হন মায়াদেবী। সন্তান জন্মদানের জন্য সেকালের প্রচলিত রীতি মত পিতৃগৃহে যাত্রা করেন রানী মায়াদেবী। কিন্তু পথেই লুম্বিনি উদ্যানের নিকটে প্রসববেদনা উঠে রানীর এবং এক মুক্ত আকাশের নিচে লুম্বিনী উদ্যানে  জন্ম নেয় এক রাজপুত্র। জন্মদাত্রী মাতার স্নেহ-ভালোবাসা লেখা ছিলোনা ভাগ্যে। তাই তার জন্মের মাত্র সাত দিনের মাথায় ইহলোক ত্যাগ করেন মাতা মায়াদেবী।  


জন্মের পর তার নাম রাখা হয় সিদ্ধার্থ গৌতম। মায়ের মৃত্যুর পর যে বিমাতা কর্তৃক  লালিত হন তার নাম ছিলো গৌতমী। তাই অনেকের ধারনা তার নামের গৌতম অংশটি বিমাতার নাম থেকেই এসেছে। তবে কথিত আছে, জন্মের পঞ্চম দিনে ৮ জন জ্ঞানী ব্যক্তিকে ডাকা হয়। যাদের দায়িত্ব ছিলো রাজপুত্রের নামকরণ ও ভবিষ্যৎবানী করা। সেখানে রাজকুমারের নাম ঠিক করা হয় সিদ্ধার্থ। যার অর্থ - "যে সিদ্ধিলাভ করেছে, বা যার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।" সেই ৮ জনের মধ্যে একজন ভবিষ্যৎ বানী করেন, রাজকুমার একদিন সত্যের সন্ধানে বেরিয়ে যাবেন এবং বোধিপ্রাপ্ত হবেন। 


তাঁর বিয়ে সম্বন্ধে দুধরনের মত প্রচলিত আছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন মাত্র ১৬ বছর বয়সে, এক প্রতিযোগীতায় তাঁর স্ত্রীকে জয় করেন। অতঃপর পুত্র রাহুলের জন্ম হয়। আবার অন্য একটি মতবাদ হচ্ছে সংসারের প্রতি মনোযোগী করার লক্ষ্যে রাজকন্যা যশোধার সঙ্গে বিয়ে দেয়া হয় তাকে।  তখন রাজকুমার সিদ্ধার্থের বয়স ছিলো ২৮। পরবর্তীতে জন্ম হয় পুত্র রাহুলের।


ঘটনা যাই হোক তবুও সংসারের প্রতি তিনি ছিলেন সেই উদাসীনই। ভোগ বিলাসিতা কখনই আকৃষ্ট করতে পারেনি তাকে। সমস্তকিছুর ঊর্ধ্বে তাঁর মনে একটিই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, কেনো মানুষের জীবনে এতো দুঃখকষ্ট। সারাদিন খুঁজতে চেষ্টা করতেন প্রশ্নের উত্তর। 


কথিত আছে একদিন রাজকুমার সিদ্ধার্থ বেড়াতে বের হলে ৩ জন ব্যক্তির সাথে তার দেখা হয়। যাদের মধ্যে প্রথমে ছিলো একজন বৃদ্ধ, অতঃপর এক অসুস্থ মানুষ, শেষে এক মৃত মানুষ। তাঁর সহিস চন্ন তাকে এপ্রসঙ্গে বলেন,এটিই সকল মানুষের নিয়তি। তেমনি চন্নকে নিয়ে আরো একদিন ভ্রমনকালে একজন সাধুর দেখা পান। যিনি ছিলেন মুণ্ডিতমস্তক এবং পরিধানে ছিলো পীতবর্ণের জীর্ণ বস্ত্র। চন্নকে তৎক্ষণাৎ রাজকুমার সিদ্ধার্থ এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে চন্ন জানায়, তিনি একজন সন্ন্যাসী যিনি নিজ জীবন ত্যাগ করেছেন মানুষের দুঃখের জন্য।


সেই রাতেই রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ করেন। প্রথমে চন্নকে সাথে নিলেও বনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে তলোয়ার দিয়ে কেটে ফেলেন তাঁর লম্বা চুল। অতঃপর চন্নকে বিদায় জানিয়ে যাত্রা শুরু করেন একা। মাত্র ২৯ বছর বয়সে সিদ্ধার্থ এই যাত্রা শুরু করেন। যাকে  মহানিষ্ক্রমন বলা হয়।


সত্য ও জ্ঞানের অনুসন্ধানে সিদ্ধার্থের নতুন যাত্রা। দুঃখ ও দুঃখের কারন সম্পর্কে জানতে বদ্ধ পরিকর রাজকুমার সিদ্ধার্থ অব্যাহত রাখেন তার যাত্রা। শুরুতে তিনি কয়েকজন সন্ন্যাসীর কাছে গিয়েও আশানুরূপ ফল পাননি। কিছু দিন পরে তিনি মগধের উরুবিল্ব নামক স্থানে গমন করেন। এই স্থানেই দীর্ঘ ছয় বছর কঠোর তপস্যার মাধ্যমে অবশেষে বুদ্ধত্বপ্রাপ্ত হন সিদ্ধার্থ, পরিচিত হন বুদ্ধ নামে। তিনি দুঃখ, দুঃখের কারন, প্রতিকার সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করেন। এই ঘটনাই বোধিলাভ নামে পরিচিত।

 
অতঃপর বাকী জীবন তিনি তাঁর দর্শন এবং বানী প্রচার করে বেড়ান। অবশেষে আনুমানিক ৫৪৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ৮০ বছর বয়সে বৈশাখী পূর্ণিমাতিথিতে মহাপরিনির্বান লাভ করেন।


বুদ্ধ কোনো ঈশ্বর কিংবা ঈশ্বরের অবতার ছিলেন না। নিজের চেষ্টায় জেনেছিলেন সত্যকে। আহরণ করিছিলেন অগাধ জ্ঞান। তিনি মানবজাতির জন্য কোনো ত্রানকর্তা ছিলেন না। বরং পথ দেখিয়েছেন স্বনির্ভর হওয়ার, আত্মমুক্তির। আজও তাঁর শিক্ষা থেকে আত্মমুক্তির প্রচেষ্টায় মগ্ন হাজারো ভক্ত।