শত বাঁধাতেও মুন্নার সফলতার পথচলা

মুন্না
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে গ্রহণ করেছেন জাতীয় পুরষ্কার। ২০১৯ সালের ৫ই ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবসের বর্ণিল আয়োজনে তাকে সফল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ক্যাটাগরিতে এ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ইন্টারন্যাশনাল এক্সিলেন্সি অ্যাওয়ার্ড, সমাজসেবা অ্যাওয়ার্ড এবং ভারতের উচ্চ পর্যায়ের সম্মাননা হিসেবে অশোকা অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।

৩রা ডিসেম্বর। বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস। আজকের দিনে শোনানো হচ্ছে এক বাঁধা পেরুনো তরুণের এগিয়ে চলার গল্প-

২০০৩ সালে একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে চাকরি নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি দেন হেদায়েতুল আজিজ। সেখানে চাকুরির পাশাপাশি নিজের ব্যবসাও ছিল তার। ভালোই কেটে যাচ্ছিল জীবনযাত্রা। কিন্তু ২০০৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ওলোট-পালোট করে দেয় তার জীবনগল্পের সুখের অধ্যায়।

সে বছরেই আগস্টের প্রথম দিকে নিজে গাড়ি চালিয়ে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে ফেরার পথে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। দুমড়ে-মুচড়ে যায় মুন্নার গাড়িটি। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে সেখানকার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দুর্ঘটনায় প্রাণে রক্ষা পেলেও স্পাইনাল কর্ড ইনজুরির কারণে শারীরিকভাবে চিরপঙ্গুত্ববরণ করেন মুন্না। দীর্ঘ ২২ দিন কোমায় থাকার পর পারিবারিক সিদ্ধান্তে মুন্নাকে দেশে এনে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।এরপর অবস্থার উন্নতির আশায় সাভারের সিআরপিতে নিয়ে এলে সেখানেও থাকতে হয় বহুদিন। পরবর্তীতে বাড়ি ফিরে এসে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে ভিন্নকিছু করার চেষ্টা করেন মুন্না। তবে তিনিও যে প্রতিবন্ধী! নিজেই স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না। হুইলচেয়ারে ভর করে চলতে হয় তাকে। তাই চ্যালেন্জ নিলেন প্রতিবন্ধীদের জন্যই কিছু করবেন।

এক সময় তিনি অনুভব করলেন তাঁর সংকল্প অনুযায়ী কাজ করতে হলে এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক। সময় ও সুযোগের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে তিনি কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় হতে মা ও শিশুর প্রতিবন্ধীতা ও প্রতিবন্ধকতা বিষয়ে শর্ট গ্র‍্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। ডিগ্রি লাভের পর হোমিওপ্যাথি বিষয়েও ডিএইচএমএসডিগ্রি লাভ করেন।

এরই মাঝে তিনি জীবনসঙ্গিনী হিসেবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন লাকী আক্তারের সাথে। বলা বাহুল্য যে, তাঁর স্ত্রী একজন মেধাবী, মননশীল ও বিদূষী ব্যক্তিত্ব। পেশায় তিনি দক্ষ ফিজিওথেরাপিস্ট।

পরিবার ও কাছের মানুষের অফুরন্ত ভালোবাসা, প্রেরণা ও উদ্যম নিয়ে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ড্রিম ফর ডিসএ্যাবিলিটি ফাউন্ডেশন। যার মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের সমাজের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করার জন্য পুরোদমে কাজ শুরু করেন মুন্না ও তার দল। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা হয়েই সভাপতি মুন্না থেমে থাকেন নি। প্রতিবন্ধী মেধাবী তরুণদের স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে একটি একীভূত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে প্রতিবন্ধীদের কম্পিউটার সহ নানাবিধ কারিগরি প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মু্ন্না জানান "ক্রীড়া ও সংস্কৃতি খাতে প্রতিবন্ধীদের অংশগ্রহণ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি অর্জন এবং কর্মক্ষম প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বনির্ভর করে তোলা ই তাঁর লক্ষ্য। এই সংগঠনের গঠিত ডিডিএফ হুইল চেয়ার ক্রিকেট টিম বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধিত্ব করে ভারতের হুইল চেয়ার ক্রিকেট টিমকে সিরিজ হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিও অর্জন করে দু বার। এছাড়াও তিনি ডিডিএফ ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ক্রিকেট দল এবং ডিডিএফ শারীরিক প্রতিবন্ধী ফুটবল দলও গঠন করেন।

তাঁর সাফল্যগাঁথা শুধু এটুকুই নয়। বছরজুড়ে নানাবিধ শিক্ষা, সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে নিয়মিতভাবে প্রতিবন্ধী সমাজকে অনুপ্রাণিত করে চলেছেন তিনি।

করোনা সংকটে নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে স্বশরীরে দল নিয়ে ছুটে গিয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সাথে যৌথ উদ্যোগে বিতরণ করেছেন খাদ্য ও ত্রাণসামগ্রী।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে গ্রহণ করেছেন জাতীয় পুরষ্কার। ২০১৯ সালের ৫ই ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবসের বর্ণিল আয়োজনে তাকে সফল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ক্যাটাগরিতে এ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ইন্টারন্যাশনাল এক্সিলেন্সি অ্যাওয়ার্ড, সমাজসেবা অ্যাওয়ার্ড এবং ভারতের উচ্চ পর্যায়ের সম্মাননা হিসেবে অশোকা অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।