শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭
হোম / ফিচার / পড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়াতে পারলেই না দৃঢ়তা আসবে: সোনিয়া বশীর কবির
০৩/১২/২০১৭

পড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়াতে পারলেই না দৃঢ়তা আসবে: সোনিয়া বশীর কবির

-

কলেজের গণ্ডি পার হতে না হতেই বিয়ে। স্বামী সন্তান সংসার সামলেই গণিতে স্নাতক, তারপর এমবিএ করে সিলিকন ভ্যালিতে কর্মজীবন শুরু। সান মাইক্রোসিস্টেম থেকে মাইক্রোসফট-এর প্রধান নির্বাহী। বাংলাদেশের প্রযুক্তি জগৎ-এ অতি পরিচিত সোনিয়া বশির কবীর এক সময় জাতীয় ভলিবল এবং ক্রিকেট দুটি দলেই নিয়মিত ছিলেন। তিন ভাইবোনের বড় সোনিয়া এখনও দৌড়াতে ভালবাসেন। একসময় পেশাদার খেলোয়াড় হবার স্বপ্ন-ও হয়ত দেখতেন। তবে সেটা ছাপিয়েও ছিল বাবার মত বড় কোন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে থাকার ইচ্ছা।

“ছোটবেলা থেকেই বাবার ন্যাওটা ছিলাম। উনি আইসিডিডিআরবি-তে ফাইনান্স ডিরেক্টর ছিলেন। প্রায়ই দেশ বিদেশ যেতে হতো। আর আমাদের গল্প বলতেন। তখন থেকেই শখ ওনার মত হবো,” বলেন সোনিয়া কবীর। “যেমন চেয়েছিলাম তার খুব একটা দূরে নই, কাছাকাছিই আছি।” বক্তব্যে কোন বিনয়ের রেশটুকুও নেই, পুরোপুরি বিশ্বাস থেকেই বললেন।

বিশ্বখ্যাত কম্পিউটার ব্র্যান্ড ডেল-এর প্রাক্তন বাংলাদেশ প্রধান বললেন তার কাছে সাফল্যের মাপকাঠি দুটি। “এক হলো আমি খুশি, নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট। আরেকটি হলো আমার অন্যদের জন্যে আরও কিছু করা উচিত মনে হয়। যেটা এখনও হয়ে ওঠেনি।”

প্রাক্তন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড-এর নারী শাখার সদস্য, সোনিয়া বলেন তিনি চেষ্টা করেন নারী এবং শিশুদের নিয়ে কাজ করার। “তবে এদিক দিয়ে আসলে আমি কিছুই করতে পারিনি। বলতে পারেন পথচলা মাত্র শুরু হয়েছে।” সেই প্রসঙ্গে বললেন ডি মানি-র কথা। এই স্টার্টআপটি নগদ লেনদেনকে ডিজিটাল লেনদেন-এ রূপান্তর করে।

মাত্র শুরু হওয়া পথচলা দশ বছরের মাথায় কোথায় গিয়ে ঠেকবে জানতে চাইলে তিনি বললেন ততোদিনে তিনি চাকরি-বাকরি ছেড়ে নিজের উদ্যোগ নিয়েই থাকবেন।

বাংলাদেশীদের নিয়ে গড়া আইটি কোম্পানিকে দেখতে চান বিশ্বমানের কোম্পানি হিসাবে। প্রথম সারির আইটি কোম্পানির মধ্যেই যেন সেটিকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। “তৃতীয় বিশ্বের নারী উদ্যোক্তার গড়া কোম্পানি বলে করুনা করে ভাল বলবে তা চাইনা। আমার কোম্পানির কাজের মান, কর্মদক্ষতা হতে হবে অন্য যে কাউকে টেক্কা দেবার মত।”

সোনিয়া বলেন ভারতে এরকম কয়েকটি আছে। টিসিএস, ইনফোসিস ইত্যাদি। বাংলাদেশে এখনও নাই। “না থাকার কোনও কারণ নেই কিন্তু।”

গণিতে স্নাতক, এমবিএ, সান, ডেল, মাইক্রোসফট সব মিলিয়ে চলি­শোর্ধ্ব সোনিয়া কবীর বরাবরই পুরুষ প্রধান, পুরুষ শাসিত কর্মক্ষেত্রে ছিলেন। কিন্তু তাতে কখনোই দমে যাননি। “আমি বড় হয়েছি এমন একটা পরিবেশে যেখানে ছেলেমেয়ে আলাদা করে দেখতে শিখিনি।” ফলে শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসের কোন কমতি ছিলনা। “তুমি পারলে আমিও পারবো, সবসময় এরকম মনোভাব নিয়ে এগিয়েছি। আর আমার মনে হয় আজকাল এই জায়গাতেই প্রথম ধাক্কাটা লাগে। আত্মবিশ্বাস থাকেনা যে আমিও পারবো।”

বিশেষভাবে বাংলাদেশের কর্মপরিবেশে নারীর কথা বলতে গেলে সোনিয়া বললেন নারী নির্যাতন এবং বৈষম্য আছে বটে। একই সাথে তিনি বলেন এদেশে পেশাদার কর্মপরিবেশে আবার নারীদের আলাদা করেই অনেক সন্মান দেয়া হয়। “আমি এখানে যতদিন ধরে কাজ করছি, কখনও বৈষম্যের স্বীকার হইনি। আমি বলবো নারীদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে।” সমাজ সাহায্য করবে, সহযোগিতা করবে কিন্তু মাঠে না নামলে কিভাবে হবে। নিজেও একসময় জাতীয় পর্যায়ের ক্রিড়াবীদ ছিলেন বলেই হয়তো মাঠের উদাহরণ দিলেন। “হারবো না কি জিতবো খেলায় না নেমে তো বোঝা যাবেনা। খেলতে গিয়ে পড়ে যেতে পারি। কিন্তু সেই ভয়ে খেলায় না নেমে আমি নারী বলে সুবিধা চাইবো তাতো হয়না।”

অদূর ভবিষ্যৎ-এ কর্মক্ষেত্রে ঢুকবে এমন নারীদের উদ্দেশ্যে বলেন খেলার মাঠে দর্শক হয়ে বসে থাকলে কখনো কেউ হার-জিত-এর মধ্যে আসবেইনা। মাঠে নামলে পড়ে যেতে পারে। কিংবা হেরেও যেতে পারে। “কিন্তু বারবার পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়াতে পারলেই না দৃঢ়তা আসবে, এগিয়ে যাবার জেদ চাপবে, লক্ষ্য তাড়া করবার প্রবল নেশায় পেয়ে বসবে। তা না হলে সাফল্য ধরা দেবে কেন?”

আশেপাশের মানুষজন, পরিবার-পরিজন এবং স্বামীর কাছে সহযোগিতা পেলেও আজকের সফল সোনিয়া বশির কবীর-এর পথ মোটেও খুব সহজ ছিলনা। “এমনও সময় ছিল যে আমি সারাদিন থাকতামনা, বাচ্চার দেখাশোনা করতেন আমার স্বামী। স্বাভাবিকভাবেই সময় সময়ে ওরও ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যেত। তবে হ্যাঁ আমার স্বামীর সহযোগিতা না পেলে আমি কখনোই আজকে এখানে আসতে পারতামনা। তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।”

সিলিকন ভ্যালির সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের সাথে বিয়ে হবার কারণে সোনিয়ার আগ্রহও তথ্য প্রযুক্তি কেন্দ্রিক হয়ে গিয়েছিল। “আশেপাশে সারাক্ষণ এই স্টার্টআপ, ঐ কোম্পানি, মানুষজন, বন্ধুবান্ধব পরিচিতরা সবাই ঐ একই ক্ষেত্রে কাজ করে।” কলেজ পাশ করেই বিয়ে হয়ে যাওয়ায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো সময়টা সোনিয়ার কেটেছিল সিলিকন ভ্যালির আবহে। “সেজন্যে এই লাইনে কাজ শুরু করাটাই তখন স্বাভাবিক ছিল।”

ক্রিকেট বা ভলিবলের জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পেলে আজকের দিনেও সেটা বিরাট সাফল্য। ইচ্ছাও ছিল সোনিয়ার পেশাদার খেলোয়াড় হবার। “কিন্তু স্বামী, সংসার, পড়াশোনা, চাকুরি এসব ভেবে খেলা ছেড়ে দিলাম।” তবে খেলার মাঠের শিক্ষা এখনও কাজে দেয়। “খেলাধুলা করলে হারতে শেখা যায়। কিভাবে হার থেকেও শিখতে হয়, কিভাবে হেরেও হাসি মুখে উঠে দাঁড়িয়ে পরের ম্যাচের জন্যে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে নামা যায়। খেলাধুলা না করলে আমি কখনও এটা শিখতে পারতামনা।”

যে বিভিন্ন উদ্যোগের সাথে তিনি জড়িত, তাতে নারীদের জন্যে আলাদা কোন ব্যবস্থা রাখেননা সোনিয়া। “এই নারিবাদী বিষয়টায় আমার বিশ্বাস নেই। আমি সারাজীবন অন্য সবার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এসেছি। আমি সারা জীবন জেনেছি তুমি যা পারবে আমিও তাই পারবো। তবে নারী-পুরুষের প্রতিযোগিতা হতে হবে সমানে সমানে। আলাদা সুবিধা কেন?”

তবে হ্যাঁ বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে স্বীকার করেন যে প্রথমে কিছু বাড়তি সুবিধা দরকার হবেই নারীদের। “কিন্তু আসল প্রতিদ্বন্দ্বিতা সমানে সমানেই হবে।” সোনিয়া কবীর একটি উদ্যোগের কথা বললেন যেটা গ্রামে প্রযুক্তির ব্যবহার আরেকটু সহজ করতে পারে। তিনি বলেন বাংলাদেশ সরকার প্রাইমারি স্কুলে কম্পিউটার কিনে দেয় অনেক। লক্ষ লক্ষ কম্পিউটার একবার নষ্ট হলে ঠিক করাবার উপায় থাকেনা। একেবারে অজ পাড়াগাঁয়ে কোন কম্পিউটার সারাইয়ের ব্যবস্থা থাকেনা।

নতুন একটি উদ্যোগে বাংলাদেশের ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে যে তথ্য কেন্দ্র আছে সেখানে একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে সহকারী থাকবে যারা সাধারণ মানুষকে সাহায্য করবেন এবং কিছু ফি-এর বিনিময়ে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সাহায্য করবেন। সেই ৫,২০০ নারীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে কম্পিউটার ঠিক করার। মার্চ মাসে এরকম প্রশিক্ষণ পাওয়া ৫০ জন নারী শক্তি ফাউণ্ডেশন থেকে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে কম্পিউটার সারাবার কাজ শুরু করবে। “এই প্রথম বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে তথ্য প্রযুক্তি সম্পর্কিত কিছু করা হবে।” আগামী এক বছরের মধ্যে ৫,২০০ সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার তৈরি হবে যারা ইউনিয়ন পরিষদে বসে কম্পিউটার সারাতে পারবে এবং চাইলে স্বনির্ভর ব্যবসার জন্যে আরও ঋণও নিতে পারবে। “তবে চ্যালেঞ্জ হলো এই ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি শোধ করার মত ব্যবসা হবে কিনা। সেটা নিয়েই এখন কাজ। কারণ ঐ প্রথম ৫০ জনকে সফল হতেই হবে। তবেই না সবাই বুঝবে এইখানে সুযোগ আছে। এরা যদি ব্যবসা না পায় তবে কিন্তু আর দাঁড়াবেনা।”

কর্পোরেট খাতে সাফল্যের জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করার জন্যে বাংলাদেশে মাইক্রোসফট-এর প্রধান বলেন নিজের ওপর পূর্ণ আস্থা থাকতে হবে। আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা এসবের বিকল্প নাই। “সেজন্যে প্রয়োজন নিজেকে জানা। আমার জন্যে ধ্যান কাজে দেয়। এখানে আসা মানে একটা ম্যারাথন রেসে ঢোকা। প্রস্তুতি ছাড়া কিংবা নিজের ওপর আস্থা ছাড়া নামলে ব্যার্থতা অবশ্যাম্ভাবী।”

তিনি বলেন মানসিক এবং শারীরিক ভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ থাকতে হবে। না হলে এই ম্যারাথনে জেতা যাবেনা। এই ম্যারাথন দৌড়ে যে কোন নারী অংশ নিতেই পারে কিন্তু ছোটবেলা থেকে অনেকের বেড়ে ওঠা, অনেকের মানসিকতা, মূল্যবোধ এমন হয়ে যায় যে তারা সমানে সমানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্যে আর নিজেকে তৈরি করতে পারেনা। সেজন্যে ভিতটা নিশ্চয়ই বাড়িতে সেই ছোটবেলাতেই গড়ে তুলতে হয়। সোনিয়া কবীর একমত হয়ে বলেন, “আর দশটা মেয়ের মত আমাকেও বাবার কাছে বলে যেতে হতো আমি কোথায় যাচ্ছি, কি করছি। কিন্তু বন্ধুদের তুলনায় আমার সুবিধা ছিল। আমার
ওপর কিছু চাপিয়ে দেয়া হয়নি।” বাবা-মায়েদের, বিশেষ করে মেয়ের বাবাদের উদ্দেশ্যে সোনিয়া কবীর বলেন, “মেয়েকে খেয়াল রাখতে গিয়ে নিরাপদে রাখতে গিয়ে এমন না হয়, যে তার পাখা দুটোই কেটে ফেললেন। কে কোন বিষয়ে কোন দিকে কখন কিভাবে জ্বলে উঠবে কেউ জানেনা। সন্তানদের তাদের মত করে এক্সপেরিমেন্ট করতে দেয়া দরকার। নিজেদেরকে নিজেরাই যেন খুঁজে পায়। নিজেরাই তাদের পছন্দটা টের পেলে তাদের আত্মবিশ্বাসও বাড়বে।”

- ছবি ও লেখাঃ তানিম আহমেদ