বুধবার,২৬ Jul ২০১৭
হোম / স্বাস্থ্য-ফিটনেস / সামাজিক মাধ্যমের মোহগ্রস্ততা: নতুন যুগের মানসিক ব্যাধি
০৩/০৬/২০১৭

সামাজিক মাধ্যমের মোহগ্রস্ততা: নতুন যুগের মানসিক ব্যাধি

-

আমরা এমন এক সময়ে এসে পৌঁছেছি, যখন আঙুলের একটি ক্লিকেই একজন মানুষের সান্নিধ্য বেশ সহজলভ্য হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর এমন প্রসারে আমরা জেনে যাচ্ছি আরেকজন ব্যক্তি সারাদিন কী করছে, কী খাচ্ছে, কার সাথে ওঠাবসা করছে, কার সাথে দহরম-মহরম অথবা কার সাথে চলছে শীতল সম্পর্ক। এখন কথা হলো, এই যে আমরা একজনের জীবনের ভেতর উঁকি দিয়ে দেখছি, অথবা কারো জীবনযাপন অনুসরণ করছি, এই স্বভাব আমাদেরকে ধীরে ধীরে অনাহূত পর্যবেক্ষকে পরিনত করছে, না কি? এটা নিতান্তই বদভ্যাস, যা ক্ষেত্র বিশেষে তৈরি করে মানসিক বৈকল্য আর সীমা অতিরিক্ত করলে যা অনেকাংশেই হয়ে উঠতে পারে আইনভঙ্গকারী অপরাধ। আপনারও কি এইরকম অভ্যাস আছে? থাকলে তা নিয়ে ভাবনার সময় এখনই।

একটা কথা আমাদের সকলেরই মনে রাখা উচিত যে, ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে তারাই আপনার বন্ধু হন, যাদের সাথে আপনার আগ্রহ বা রুচি অনেকাংশে মেলে। কারো প্রোফাইলে প্রতিদিন নিয়ম মেনে গিয়ে তার প্রতিটি লেখায়, ছবিতে লাইক দিয়ে থাকলে আসলে বুঝতে হবে আপনি খুব একটা ভালো কিছু করছেন না। কেননা যে সবকিছুতেই 'থাম্বস আপ' বলে, সে খুব একটা সুবিধার ব্যক্তিত্বের অধিকারী নয়।

ধরা যাক, কেউ একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। সেখানে তিনি একটি ট্রেনিং করছেন। তার ট্রেনিংয়ের খবরটি সম্বন্ধে আরো জানতে আপনি তাকে মুখোমুখি কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না। বাড়ি ফিরে তার ফেসবুক প্রোফাইলে ঢুকে তার বিভিন্ন পোস্ট থেকে সেইসব খবরাখবর দেখে নিলেন। দেখতে দেখতে তার বছরখানেক আগেকার পোস্টও আপনার চোখে পড়ল। এতক্ষণে আপনি জেনে গেলেন তার বৈবাহিক অবস্থা, তার অবসর কাটানোর সময়, প্রিয় খাবার, এমনকি প্রিয় প্রাণীটির নামও।

আপনার মনে হতে পারে আপনি ব্যক্তিটিকে ভালো করে জানতে চান। কিন্তু ততক্ষণে আপনি তার একটু বেশি কাছে চলে গেছেন। এটা নিঃসন্দেহে একপ্রকার ডিজঅর্ডার। বেশিরভাগ সময়েই সোশ্যাল মিডিয়ায় মোহগ্রস্তেরা আসল জগতের সাথে ভার্চুয়াল জগতের পার্থক্য নির্ণয়ে ব্যর্থ হন। ধরা যাক, আপনার ছোটবেলা থেকে ভালোলাগা এমন কেউ অনলাইনে একটি গানের অনুষ্ঠানে শ্রোতা হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বলে জানলেন। তারপর তা দেখে আপনি তাকে কাছ থেকে দেখার জন্য এবং তার বন্ধুবান্ধবের সাথে পরিচিত হবার জন্য যথাসময়ে সেই অনুষ্ঠানে হাজির হলেন। সেখানে তাকে খুঁজে পাওয়ার পর এমন ভাব করলেন, যেন আপনি জানতেনই না তার এখানে আজ আসার কথা ছিল। তারপর তার সাথে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপনের বুনিয়াদ স্থাপন করলেন। কারো স্বভাব এমন হয়ে পড়লে তার অবশ্যই একজন মনোচিকিৎসকের সাথে এ বিষয়ে কিছু কথা বলার আছে ধরে নিতে হবে।

প্রাক্তন প্রেমিকা অথবা মনে মনে প্রেমিকা ভাবা নারীর প্রোফাইলে অন্য যুবকের সাথে ট্যাগড কোনো ছবি দেখলে মাথা গরম হয়ে যাওয়া পুরুষের সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছে। দেখা যায় যে, সেই অন্য যুবকের প্রোফাইলে ঘণ্টাখানেক কাটানোর মাধ্যমে চরিত্রের একটা মানচিত্র বা স্কেচ দাঁড় করায়। তার ফ্রেন্ডলিস্টে যাওয়ার মাধ্যমে ফাইনালি তার সামাজিক অবস্থান সম্বন্ধে জানার চেষ্টাও আলোচিত মোহগ্রস্ত পুরুষটি করে। এটা আরবান নৃতত্ত্ববিরোধী কাজ এবং মানসিক অসুস্থতাও।

ডিমভাজি থেকে মহাকাশে রকেট উৎক্ষেপণ পর্যন্ত সবকিছুই আজকের সামাজিক মাধ্যমগুলোতে মানুষের আলোচনার বিষয়। এখানে সবাই সব কিছু নিয়ে কথা বলতে থাকে। এই অসম তথ্যপ্রবাহ মানুষের মাথায় জট লাগানোতে ভূমিকা রাখে না, একথা বলা যাবে না। আপনার বান্ধবী বলল, ‘আমার আইসিক্রিম খেতে ভালো লাগে’, আর আপনি পরের দিন তার বাসার নিচে আইসক্রিম হাতে দাঁড়িয়ে থাকলেন, তা কিছুটা হাস্যকর তো বটেই।

সম্পর্কে ভাঙনের পরেও অতীতের বিভিন্ন ছবিতে সম্পর্কের সুগন্ধ লেগে থাকে। কিন্তু সেই সুগন্ধ অনেকের হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় মোহগস্ত মানুষের কাছে তিন মাসের বিরহ ধীরে ধীরে বিতৃষ্ণায় রূপ নেয়। মোহে কাতর মানুষের কাছে ভাঙনকে জীবনের আর দশটা ঘটনার মতো মেনে নেয়া কষ্টকর ও দুঃসাধ্য কাজ।

কাউকে মেসেজ পাঠালেন, সে কোনো উত্তর দিল না। এই কারণে তার অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমের আইডিতেও আপনি ঐ একই মেসেজ বারবার পাঠাতে লাগলেন। এই আশায় যদি সে উত্তর দেয়! কিন্তু না, আপনি এটা বুঝতে অক্ষম যে, বন্ধ দরজায় কড়া নেড়ে লাভ নেই।

সামাজিক মাধ্যমের মোহগ্রস্ততা আমাদের সময়গুলোকে ঘোলা করে দিচ্ছে। আরেকটু সচেতন হলে বিষয়গুলো আরো সুন্দর ও স্বচ্ছ হয়ে উঠবে।

- নিনি সরকার