শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / এইসব দিনের একদিন
০৩/০২/২০১৭

এইসব দিনের একদিন

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

- অনুবাদ: ফজল হাসান

সেদিন ছিল সোমবার এবং সকলটা ছিল উষ্ণ এবং বৃষ্টিহীন। অরেলিও এস্কোভার একজন ডিগ্রিবিহীন দন্তচিকিৎসক। সাত-সকালে ঘুম থেকে জেগে ওঠা তার নিত্যদিনের অভ্যাস। ভোর ছটায় নিজের ডাক্তারখানা খুলে সে কাচের বাক্সের ভেতর থেকে প্লাস্টারের মোল্ডের সঙ্গে আটকানো কয়েকটা নকল দাঁত তুলে নেয়। তারপর আকৃতি অনুযায়ী বেশ কিছু যন্ত্রপাতি টেবিলের ওপর এমনভাবে সাজিয়ে রাখে, যেন ওগুলো ডিসপ্লের জন্য সাজানো হয়েছে। একসময় সে কলারবিহীন একটা ডোরাকাটা কুর্তা পরে এবং সোনালি বোতাম আটকিয়ে গলা বন্ধ করে। পরনের প্যান্ট সে সাসপেন্ডার দিয়ে আটকিয়েছে। অরেলিওর দেহের গড়ন ঋজু এবং হালকা-পাতলা। বোবা মানুষের মুখের আদলের মতোই দেখতে তার চেহারা।
টেবিলের ওপর বিভিন্ন সরঞ্জাম সাজিয়ে রাখার পর অরেলিও ডেন্টাল চেয়ারের দিকে ড্রিল মেশিনটা টেনে নেয়। তারপর সে চেয়ারে বসে নকল দাঁত পালিশ করতে শুরু করে। তার ভাবভঙ্গি দেখে বোঝা যায় সে যা করছে, তা নিয়ে মোটেও ভাবছে না। কিন্তু অবিচলিতভাবে সে কাজ করছে। পা দিয়ে ড্রিল মেশিন চাপ দিচ্ছে, এমনকি যখন চাপ দেওয়ার দরকার নেই, তখনও সে চাপ দিচ্ছে।
বেলা আটটার পর অরেলিও কাজ বন্ধ করে খানিকটা সময় জানালা গলিয়ে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেই সময় সে দেখতে পেল, পাশের বাড়ির খুঁটিতে বসে দু’টি বিষণœ বাজপাখি রোদে গা শুকাচ্ছে। দুপুরের আগে আবার বৃষ্টি আসার সম্ভাবনার কথা ভেবে সে পুনরায় কাজে মনোনিবেশ করে। কিন্তু এগারো বছর বয়সী ছেলের তীক্ষè চিৎকারে তার মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটে।
‘বাবা।’
‘কি ?’
‘মেয়র জানতে চাচ্ছেন, তুমি তার দাঁত তুলে দেবে কিনা।’
অরেলিও এস্কোভার তখন একটা সোনালি দাঁত পরিষ্কার করছিল। ওটা সামনের দিকে ধরে অর্ধনিমীলিত চোখে নেড়েচেড়ে সে পরীক্ষা করে। ছেলেটা অপেক্ষমাণ দর্শনার্থীদের ছোট্ট কামরা থেকে পুনরায় চিৎকার করে ওঠে।
‘মেয়র বলেছেন, তুমি এখানেই আছো। তিনি তোমার গলার স্বর শুনতে পেয়েছেন।’
ছেলের কথায় কোনোরকম কর্ণপাত না করে দন্তচিকিৎসক দাঁতের পরীক্ষা করতে থাকে। পরীক্ষা শেষে সে দাঁতটা অন্য দাঁতের সঙ্গে টেবিলের ওপর রেখে স্বগতোক্তির মতো করে বলল, ‘আরেকটু সময় হলে ভালো হয়।’
অরেলিও এস্কোভার পুনরায় ড্রিল মেশিন নিয়ে কাজ করতে থাকে। কার্ডবোর্ডের বাক্সের ভেতর থেকে সে আরো কয়েকটা দাঁত বের করে আনে। অসমাপ্ত কাজগুলো সে বাক্সের ভেতর গুছিয়ে রাখে এবং অবসর সময়ে বের করে এনে পালিশ করে।
‘বাবা।’
‘কি ?’
তখনও অরেলিও এস্কোভার তার মুখের অভিব্যক্তি বদলায়নি।
‘মেয়র বলেছেন, তুমি যদি তার দাঁত তুলে না দাও, তাহলে তিনি তোমাকে গুলি করবেন।’
ত্রস্তব্যস্ত না হয়ে, বরং প্রচÐ ঠান্ডা মাথায়, দন্তচিকিৎসক ড্রিল মেশিনে প্যাডেল দেওয়া বন্ধ করে এবং চেয়ার থেকে ওটা দূরে সরিয়ে রাখে। তারপর ড্রয়ার সম্পূর্ণ খোলে। ড্রয়ারের ভেতর একটা রিভলবার রাখা আছে।
‘ঠিক আছে,’ সে বলল, ‘তাঁকে ভেতরে এসে গুলি করতে বল।’
চেয়ারটা ঘুরিয়ে অরেলিও এস্কোভার দরজার উল্টোদিকে মুখ করে বসে থাকে। তার এক হাত খোলা ড্রয়ারের ভেতর। মেয়র দরজায় এসে দাঁড়ালেন। তিনি তাঁর বাম গালের দাড়ি কেটেছেন, কিন্তু অন্য গাল ব্যথায় ফুলে আছে। ওখানে পাঁচদিনের পুরনো দাড়ি। মেয়রের নিষ্প্রভ চোখের তারায় দন্তচিকিৎসক কয়েক রাতের দুশ্চিন্তা দেখতে পেল। একসময় দন্তচিকিৎসক আঙুলের ডগা দিয়ে ড্রয়ার বন্ধ করে নরম গলায় বলল, ‘বসুন।’
‘শুভ সকাল,’ মেয়র বললেন।
‘সুপ্রভাত,’ উত্তরে বলল দন্তচিকিৎসক।
যন্ত্রপাতিগুলো যখন গরম পানিতে সিদ্ধ হচ্ছিল, তখন মেয়র চেয়ারের পেছনে মাথা রাখার জায়গায় হেলান দিয়ে স্বস্তি অনুভব করছিলেন। তাঁর নিঃশ্বাস হিমশীতল।
দন্তচিকিৎসকের অফিসের চেহারা খুবই করুণ। পুরনো একটা কাঠের চেয়ার, পায়ে চালানো ড্রিল মেশিন এবং সিরামিকের বোতল রাখার জন্য একটা কাঠের বাক্স। চেয়ারের উল্টোদিকে কাঁধ অবধি পর্দা ঝোলানো একটা জানালা। মেয়র যখন টের পেলেন যে, দন্তচিকিৎসক তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে, তখন তিনি মেঝেতে দুই গোড়ালি শক্ত করে চেপে ধরে মুখটা হা করলেন।
দন্তচিকিৎসক মেয়রের মাথাটা আলোর দিকে ঘুরায়। সংক্রামিত দাঁত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর সে মেয়রের চোয়াল আলতো হাতে চাপ দিয়ে বন্ধ করে বলল, ‘অ্যানেসথিসিয়া ছাড়াই করতে হবে।’
‘কেন ?’ জানতে চাইল মেয়র।
‘আপনার দাঁতের মাড়িতে ফোঁড়া হয়েছে।’
দন্তচিকিৎসকের চোখে চোখ রেখে মেয়র তাকালেন।
‘ঠিক আছে,’ মেয়র মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে বললেন।
মেয়রের হাসির কোনো জবাব না দিয়ে দন্তচিকিৎসক জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি এনে টেবিলের ওপর রাখে। কোনোরকম ব্যস্ততা না দেখিয়ে সে ঠান্ডা একটা চিমটা দিয়ে পানিতে ডোবানো যন্ত্রপাতিগুলো তুলে আনে। তারপর জুতার সামনে দিয়ে পিকদানির ঢাকনা খোলে। পরে সে হাত ধোওয়ার জন্য বেসিনের দিকে এগিয়ে যায়। সে মেয়রের দিকে না তাকিয়ে এসব কাজ করে। কিন্তু মেয়র একবারের জন্যও তার দিক থেকে দৃষ্টি সরায়নি। মেয়রের সংক্রমিত দাঁতটা আসলে আক্কেল দাঁত। দন্তচিকিৎসক পা ফাঁক করে বসে ফরসেপ দিয়ে দাঁতটা শক্ত করে ধরে। প্রচন্ড ব্যথায় মেয়র দুই হাত দিয়ে জোরে চেয়ারের হাতল ধরে রাখেন। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে তিনি পা দু’টিকে শক্তভাবে চেপে ধরেন। সেই সময় তিনি কিডনিতে একধরনের বরফ-শীতল শূন্যতা অনুভব করেন, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ উচ্চারণ করলেন না।
মনের ভেতর কোনধরনের ক্ষোভ পুষে না রেখে দন্তচিকিৎসক কব্জি সরিয়ে নিয়ে তিক্ত সহানুভূতির সঙ্গে বলল, ‘এখন আপনি আমাদের কুড়িজন মৃত মানুষের ক্ষতি পূরণ দেবেন।’
চোয়ালে শক্ত করে চিবানোর মতো মেয়র এক ধরনের আওয়াজ অনুভব করলেন। তাঁর দুই চোখ অশ্রæতে ভরে যায়। দাঁত তুলে আনা পর্যন্ত তিনি রীতিমতো দম বন্ধ করেছিলেন। তারপর তিনি অশ্রæভরা চোখে দাঁতটাকে দেখলেন। ব্যথার জন্য ওটাকে কেন জানি তার কাছে অবাস্তব মনে হলো। গত পাঁচ রাতের যন্ত্রণার কথা তিনি বুঝতে পারলেন না।
পিকদানির উপর নিচু হয়ে মেয়র ঘামছেন এবং হাঁফাতে থাকেন। কুর্তার বোতাম খুলে তিনি প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করার জন্য হাত বাড়ালেন। দন্তচিকিৎসক একটা পরিষ্কার কাপড় তাঁর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘চোখের পানি মুছে নেন।’
মেয়র চোখের পানি মোছেন। প্রচÐ ব্যথায় তিনি কাঁপছেন। দন্তচিকিৎসক হাত ধোওয়ার সময় মেয়র সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন ওখানে ধূলিমাখা মাকড়সার জালে মাকড়সার ডিম আর মৃত পোকামাকড় আটকে আছে। হাত মুছতে মুছতে দন্তচিকিৎসক ফিরে আসে মেয়রের কাছে।
‘বাড়ি গিয়ে সোজা বিছানায় শুয়ে পড়ুন,’ মেয়রকে উদ্দেশ্য করে দন্তচিকিৎসক বলল, ‘এবং লবণ-পানি দিয়ে কুলকুচি করবেন।’
মেয়র চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন এবং স্বাভাবিক নিয়মে মিলিটারি কায়দায় অভিবাদন জানিয়ে বিদায় নেন। তারপর তিনি কুর্তার বোতাম না লাগিয়ে পা দুটিকে টান টান করে দরজার দিকে হেঁটে যান।
‘বিলটা পাঠিয়ে দিও,’ মেয়র বললেন।
‘আপনার, নাকি শহরের, কাছে ?’
মেয়র দন্তচিকিৎসকের দিকে ফিরেও তাকালেন না। দরজা বন্ধ করে জালি পর্দার ওপাশ থেকে তিনি বললেন, ‘সেই একই প্যাঁচাল।’