শনিবার,২২ Jul ২০১৭
হোম / ফিচার / উপেক্ষিত নারী ভাষাসংগ্রামী
০২/১৯/২০১৭

উপেক্ষিত নারী ভাষাসংগ্রামী

- বাশার খান

'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' দাবির আন্দোলনে সহযোদ্ধা হয়ে পুরুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন নারীরা। পাকিস্তান আর্মি ও পুলিশের তাক করা বন্দুকের নল উপেক্ষা করে ভাষার দাবির মিছিলগুলোতে নারীরা ছিলেন সামনের কাতারে, অকুতোভয় হয়ে। সে সময় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও অন্যদের তোলা ছবি, তখনকার আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ, ভাষাসংগ্রামীদের স্মৃতিচারণ এবং দলিল ও বইপত্রে এর বহু ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা রাতে লুকিয়ে ভাষার দাবির বিভিন্ন স্লোগান সংবলিত পোস্টার আঁকতেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে নারীরাই পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙেন। আহতদের চিকিৎসায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রীরা। আহতদের চিকিৎসায় সাহায্যের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েরা চাঁদা তুলে আনেন। পুলিশের তাড়া খাওয়া ছাত্রদের নিজেদের কাছে লুকিয়ে রাখেন। আন্দোলনের খরচ চালাতে অনেক গৃহিণী অলঙ্কার খুলে দেন। অনেক নারীকে জেলও খাটতে হয়েছে। কেউ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে হয়েছেন বহিষ্কৃত।

মহান একুশেতে নারীদের এই অবদান একদিকে যেমন উপেক্ষিত ও প্রায় অনালোচিতই থেকে গেছে, অপরদিকে দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদকেও নারী ভাষাসংগ্রামীরা উপেক্ষিত হয়েছেন।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, ১৯৭৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র একজন নারী ভাষা আন্দোলনে অবদানের জন্য একুশে পদক পেয়েছেন। তাও মরণোত্তর। সেটা ২০১২ সালে নারায়ণগঞ্জের মমতাজ বেগম।

এ বছরও চারজন ভাষাসংগ্রামীকে একুশে পদক দেওয়া হলো। কিন্তু নেই কোনো নারী ভাষাসংগ্রামীর নাম। যে চারজন পেয়েছেন, তাদের অবশ্যই অবদান আছে। কিন্তু এর সঙ্গে সংখ্যাটা বাড়িয়ে হলেও কি এক-দু'জন নারী ভাষাসংগ্রামীকে একুশে পদক দেওয়া যেত না?

এটা ভাষা আন্দোলনে নারীর অবদানকে যেমন অসম্মান ও বৈষম্যের দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে, অপরদিকে সর্বক্ষেত্রে নারীর ৩০ শতাংশ কোটাকেও মানা হচ্ছে না। অথচ বাংলাদেশের সরকারপ্রধান, জাতীয় সংসদের স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা ও প্রধান বিরোধী দলের নেতা নারী।

১৯৪৮ সালের ৩১ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ঢাকার বার লাইব্রেরিতে সর্বদলীয় সভায় ছাত্রীদের প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে ইডেন কলেজের ছাত্রী মাহবুবা খাতুন বলেন, 'বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি স্বীকার করিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন হলে মেয়েরা তাদের রক্ত বিসর্জন দেবে।' আন্দোলনের শুরুর দিকে একজন ছাত্রীর মুখে এমন সাহসী উচ্চারণ কর্মীদের মনে উদ্দীপনা জোগাতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

পরে ১৯৪৮ সালের ঘটনা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন '১১ মার্চ ভোরবেলা থেকে শত শত ছাত্রকর্মী ইডেন বিল্ডিং... ও অন্যান্য জায়গায় পিকেটিং শুরু করল। ... সকাল ৮টায় পোস্ট অফিসের সামনে ছাত্রদের উপর ভীষণভাবে লাঠিচার্জ হল। ... কয়েকজন ছাত্রীও মার খেয়েছিল। ... তখন পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার অধিবেশন চলছিল। ...আনোয়ারা খাতুন ও অনেকে মুসলিম লীগ পার্টির বিরুদ্ধে (অধিবেশনে) ভীষণভাবে প্রতিবাদ করলেন।'

আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু আরও লিখেছেন- যে পাঁচদিন আমরা জেলে ছিলাম, সকাল ১০টায় স্কুলের মেয়েরা (মুসলিম গার্লস স্কুল) ছাদে উঠে স্লোগান দিতে শুরু করত, আর ৪টায় শেষ করত। ছোট্ট ছোট্ট মেয়েরা একটু ক্লান্তও হতো না। 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই', 'বন্দি ভাইদের মুক্তি চাই', 'পুলিশি জুলুম চলবে না'- নানা ধরনের স্লোগান।

২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার মূল কাজটা রওশন আরা বাচ্চুসহ আরও কয়েকজন ছাত্রীর দ্বারাই হয়। কারণ ১০ জন করে বের হওয়া প্রথম দুটি দলের অনেকেই গ্রেফতার হন। ছাত্ররা ব্যারিকেডের ওপর ও নিচ দিয়ে লাফিয়ে চলে যান। পরে তৃতীয় দলে বেরিয়ে ব্যারিকেড ধরে টানাটানির কাজ শুরু করেন ছাত্রীরাই। সেদিন পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ার শেলে অনেক ছাত্রী আহত হন। এর মধ্যে রওশন আরা বাচ্চু, সারা তৈফুর, বোরখা শামসুন, সুফিয়া ইব্রাহীম, সুরাইয়া ডলি, সুরাইয়া হাকিম ছিলেন।

সেদিন (বর্তমান জগন্নাথ হল) চলা অ্যাসেমব্লিতে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্য আনোয়ারা খাতুন প্রতিবাদী বক্তব্যে বলেন, 'মিস্টার স্পিকার, পুলিশের লাঠিচার্জে মেয়েরা আহত হয়েছে। ... মেয়েদের মোট আহতের সংখ্যা ৮ জন। মন্ত্রিসভা এমন একটা আবহাওয়ার সৃষ্টি করেছেন যাতে নাকি মেয়েরা পর্যন্ত লাঞ্ছিত হয়েছে।'

ঢাকার বাইরের নারীরাও ভাষা আন্দোলনে একাত্ম হতে গিয়ে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জের মমতাজ বেগমের কথা সবার জানা- কারা নির্যাতনের এক পর্যায়ে সরকারের চাপে স্বামী তাকে তালাক দেয়। মমতাজ বেগমের ছাত্রী ইলা বকশী, বেণু ধর ও শাবানীর মতো কিশোরীকেও পুলিশ গ্রেফতার করে।

সিলেটের কুলাউড়ার সালেহা বেগম ময়মনসিংহ মুসলিম গার্লস স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী থাকাকালীন ভাষাশহীদদের স্মরণে স্কুলে কালো পতাকা উত্তোলন করেন। এই অপরাধে সেখানকার ডিসি ডি. কে. পাওয়ারের আদেশে স্কুল থেকে তাকে তিন বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়। সালেহা বেগমের পক্ষে আর পড়ালেখা করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

চট্টগ্রাম ও সিলেটে ছাত্রীরা আন্দোলনে জোরালো ভূমিকা রাখেন। এদের মধ্যে স্কুলের কোমলমতি কিশোরীদের অংশগ্রহণই ছিল সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন তথ্য ও বইপত্র ঘেঁটে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও একই চিত্র পাওয়া যায়।

ভাষা আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণে সবচেয়ে বড় অঘটন ঘটে ১৯৫৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। সেদিন ১৪৪ ধারা ভাঙার দায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ জন ছাত্রী গ্রেফতার হন। তাদের মধ্যে লায়লা নূর, প্রতিভা মুৎসুদ্দি, রওশন আরা বেণু, ফরিদা বারি, জহরত আরা, কামরুন নাহার লাইলি, হোসনে আরা, ফরিদা আনোয়ার ও তালেয়া রহমান উল্লেখযোগ্য।

সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা প্রক্টরের অনুমতি নিয়ে এবং প্রক্টরের সামনে পুরুষের সঙ্গে কথা বলতে হতো। গ্রামের নারীরা ছিলেন পর্দাপ্রথার আড়ালে বন্দি। এমন সময় সামাজিক, ধর্মীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় বাধা-বিপত্তি ঠেলে বাংলা ভাষার দাবিতে নারীদের রাজপথে নেমে আসা তো বিরাট ব্যাপার। পুলিশি বাধা ছাড়া ছাত্রদের তো আর তেমন কোনো বাধা ছিল না। আন্দোলনে অংশ নিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটাই নিয়েছেন নারীরা। তাই উপরে উল্লিখিত সব নারী ভাষাসংগ্রামীই ভাষা আন্দোলনে অবদানের জন্য একুশে পদক পাওয়া যোগ্য।

বাঙালি নারীর অগ্রগতির বড় ধাপ ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়া। এই নারীরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা পর্বের সাহসী অংশীদার, জাতীয় বীর। দেশের সর্বোচ্চ পদগুলোতে নারীরা থাকা সত্ত্বেও নারী ভাষাসংগ্রামীদের একুশে পদকে উপেক্ষা করা মহান একুশের ইতিহাসকেই উপেক্ষা করার নামান্তর।

- ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক