সোমবার,২৩ অক্টোবর ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / উপেক্ষিত ইতিহাসের পুনরুদ্ঘাটন
০১/২৬/২০১৭

উপেক্ষিত ইতিহাসের পুনরুদ্ঘাটন

- আবু সাঈদ তুলু

‘বিবাদী সারগাম’ নাটকটি যেন স্বদেশী চেতনার নতুন জাগরণ। ব্রিটিশদের শোষণ, শাসন ও আধিপত্য বিরোধী চেতনায় কত স্বদেশী অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন তার পরিসংখ্যান অজানা। আজও গুরুত্বপূর্ণ অসংখ্য চরিত্র-ঘটনা উপেক্ষিত। সেই সাহসিকতার কাজটি করেছেন শিশির রহমান। বিংশ শতকের শুরুর দিকে যখন স্বদেশী আন্দোলন চলছিল সেসময়ের বিনয়, বাদল ও দীনেশ তিনটি চরিত্রকে প্রধান করে স্বাধীকার সংগ্রামে এক অবিসম্ভাবী বিরুদ্ধ সুরধ্বনির প্রতীকে এ নাটক ‘বিবাদী সারগাম’। প্রাঙ্গণেমোর নাট্যদলের এটি এগারোতম প্রযোজনা। নাটকটি রচনা ও নির্দেশনায় এ সময়ের তরুণ প্রতিভাবান নাট্যকর্মী শিশির রহমান।

নাটকে দেখা যায়- ১৯০৫ সালের দিকে ব্রিটিশদের সৃষ্ট বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে বাংলার প্রায় সর্বত্রই স্বদেশী আন্দোলনের জাগরণ। বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ বিক্ষোভে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সৃষ্টি হতে থাকে নানা গুপ্ত সংগঠন। তখনই বিনয়, বাদল ও দীনেশকে দেখা যায় স্বাজাত্য আন্দোলনের ভূমিকায় বলিষ্ঠ পুরুষ হিসেবে। গুপ্ত সংগঠন বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স-এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে আনতে চায়। উপনিবেশের বিলুপ্তি চায়। ক্ষুদিরাম, বারীন্দ্রকুমার ঘোষসহ নানা প্রসঙ্গও ওঠে আসে। সমকালীন নানা ঘটনা-উপঘটনার মধ্য দিয়ে কাহিনী এগিয়ে চলে। ব্রিটিশ আধিপত্যবাদী শক্তি পুলিশ সুপারকে কলকাতা রাইটার্স ক্লাবে হত্যা করে তারা। কিন্তু দুভার্গ্যক্রমে সে ভবনেই বিনয়, বাদল ও দীনেশ আটকে পড়ে। ব্রিটিশ উপনিবেশের কাছে বিনয়, বাদল ও দীনেশ নতি স্বীকার করে নি। ঘটনাস্থলেই বিনয় ও বাদল আত্মহত্যা করে। আর দীনেশকে ফাঁসির মঞ্চে জীবন বিসর্জন দিতে হয়। স্বাজাতিকে ভালোবেসে, স্বাজাত্য অধিকার আদায়ে অকাতরে প্রাণ উৎসর্গ করে এ তিন বীর সেনানি।

নাটকটিতে বিনয় চরিত্রে অভিনয় করেছে আহমেদ সুজন, বাদল চরিত্রে রিগ্যান সোহাগ রত্ন এবং দীনেশ চরিত্রে মাইনুল তাওহীদ। তিনজনের অভিনয়ই প্রাণবন্ত ছিল। হেমচন্দ্র চরিত্রে রামিজ রাজুর স্বরের উঠানামার প্রশংসা না করে তো পারাই যায় না। বাচিক কৌশল ও স্বাত্তিক ভাবপ্রকাশ ক্ষমতা অভিভূত করে দর্শককে। প্রীতিলতা চরিত্রে শুভেচ্ছা রহমানের অভিনয়ও প্রাণবন্ত।

নাটকটি প্রসেনিয়াম মঞ্চবিন্যাসে ও বাস্তববাদী ধারায় উপস্থাপিত। মঞ্চবিন্যাসে নিরাভরণ না হয়ে দৃশ্যবিভাজনের সাজেশন কিংবা নৈর্ব্যক্তিক জাতীয় কিছু ব্যবহার করা যেতো। নাটকের নামকরণটি অত্যন্ত বিষয়ঘণিষ্ঠ। নাটকটিতে নির্দেশকের অসাধারণ কল্পনা ও ইতিহাস সচেতনতার পরিচয় পাওয়া যায়। তৎকালীন ঘটনাগুলোকে নাটকীয়তায় চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন নির্দেশক। জোনভিত্তিক দৃশ্য রূপায়নে আরও সুক্ষাতিসূক্ষ আলোয় দৃশ্য মায়া তৈরি প্রয়োজন। নাটকের শেষ পর্যায়ে পেছনের সায়াক্লোমায় রাইটার্স বিল্ডিংএর আলোক সাজেশনটি অত্যন্ত দৃষ্টি নন্দন ও শৈল্পিক। মিউজিক অসাধারণ।

তারুণ্যদীপ্ত, প্রাণবন্ত ও মেধাবী প্রযোজনা ‘বিবাদী সারগাম।’ অনবদ্যভাবে ধরা দিয়েছে ইতিহাসের উপেক্ষিত বিনয়, বাদল ও দীনেশের আত্মত্যাগের জীবন। আজকের বাংলাদেশের অনেকেই এ বিপ্লবী স্বজাতিপ্রেমীর ইতিহাস জানে না। নির্দেশক নাটকটির উপস্থাপনীয় প্রেক্ষাপট এত বিস্তৃত ধরেছেন যে তা এক-দেড় ঘটনায় উপস্থাপন আদৌ সম্ভব নয়। এরূপ বিস্তৃতিতে নাটকীয় বিমোক্ষণও কঠিন হয়ে পড়ে। নির্দেশক বিনয়, বাদল ও দীনেশ চরিত্রের স্বাজাত্যবোধের বিকাশ, আন্দোলন ও আত্মত্যাগকে উপজীব্য করে সামগ্রিক স্বদেশী চেতনাকেই চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। নাটকের ক্যানভাস নিয়ে নির্দেশকের আরও ভাবনার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়। তবে, এমন নাট্যভাবনা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশিকে স্বাজাত্য প্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

নাটকটির অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন-বন্ধু তুহিন, সবুক্তগীন শুভ, লিটু রায়, আহমেদ সুজন, চৈতালী চৈতী, শিশির চৌধুরী রাহুল, নিরঞ্জন নীরু, সুজন গুপ্ত, মনোয়ারা মান্নান প্রীতি, মাহমুদুল হাসান, সোহাগ রহমান, স্বাধীন আরুশ, নুরজাহান আক্তার নুপুর, মিঠুন, উর্মিল মজুমদার, মৌসুমী মৌ, পরশ আহমেদ, বাঁধন সরকার প্রমুখ। নেপথ্যে আলোয় তৌফিক আজীম রবিন, মঞ্চ ও সংগীত- শিশির রহমান, পোষাক ও প্রপসে শুভেচ্ছা রহমান, রূপসজ্জায় সুভাশিষ দত্ত তন্ময়, জনি সেন, মঞ্চ ব্যবস্থাপনায় আহমেদ সুজন। নাটকটির রচনা ও নির্দেশনায়- শিশির রহমান।