শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭
হোম / বিবিধ / ফিদেল কাস্ত্রো : অনির্বাণ এক বিপ্লবশিখা
১২/১৮/২০১৬

ফিদেল কাস্ত্রো : অনির্বাণ এক বিপ্লবশিখা

-

অতি সম্প্রতি চিরবিদায় নিলেন কিউবার বিপ্লবী নেতা এবং বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক আদর্শের অন্যতম পথিকৃৎ ফিদেল কাস্ত্রো। যুক্তরাষ্ট্রসহ পুঁজিবাদী দেশগুলোর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এই নেতা গত অর্ধশতাব্দী ধরে ছিলেন মুক্তিকামী জনতার অনুপ্রেরণা, ছিলেন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে অকুতোভয় এক যোদ্ধা। মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে তিনি এদেশের মানুষদের মনেও প্রিয় বন্ধুর জায়গা দখল করে নিয়েছেন। সদ্যপ্রয়াত এই নেতার জীবন যেন এক রোমাঞ্চকর উপন্যাস, আর তিনি বাস্তব জীবনের এক মহানায়ক।

কাস্ত্রো কথন
১৯২৬ সালের ১৩ আগস্ট, কিউবার পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বিরান নামক এলাকায় স্পেনীয় বংশোদ্ভূত এক অভিবাসী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ফিদেল আলেহান্দ্রো কাস্ত্রো। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনে পড়াশোনার পাশাপাশি তুখোড় অ্যাথলেট হিসেবে খ্যাতি লাভ করা কাস্ত্রো আইনজীবী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। তবে খুব দ্রুতই রাজনীতির সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে তাঁর। সমসাময়িক সময়ে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের আরো এক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তি -- চে গুয়েভারার সঙ্গে পরিচয় হয় কাস্ত্রোর। পঞ্চাশের দশকের সেই উত্তাল দিনগুলোতে চে এবং কাস্ত্রোর মতো বিপ্লবীরা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধে নেমেছিলেন, তার প্রভাব বিশ্ব রাজনীতিতে এখনো বেশ প্রবল।

মূলত সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে কিউবার মার্কিন সমর্থিত একনায়ক বাতিস্তাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে বিশ্বদরবারে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের নতুন এক নেতা হিসেবে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন কাস্ত্রো। ১৯৫৬ সালের ২৬ জুলাই থেকে ফিদেল কাস্ত্রোর এই আন্দোলন ঐতিহাসিক ‘জুলাই টোয়েন্টি সিক্স মুভমেন্ট’ নামে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। হাতেগোনা কয়েকজন গেরিলাকে নিয়ে শুরু করা এই আন্দোলন পরবর্তীকালে কিউবা তথা পুরো বিশ্বেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে।

বাতিস্তা সরকারের ১০,০০০ সৈন্যের বিশাল বহরও তখন ইস্পাতসম দৃঢ়মনোবলের কাস্ত্রো এবং তার গেরিলা বাহিনীকে রুখতে পারেনি। বরং ১৯৫৯-এর ১ জানুয়ারি নববর্ষের দিনে কিউবা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন একনায়ক বাতিস্তা। পরবর্তী সময়ে সামরিক বাহিনীর সিনিয়র জেনারেলরা আরো একটি সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলেও ততদিনে জনগণের আস্থাভাজন হয়ে ওঠা কাস্ত্রোর সামনে সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যায়। ’৫৯-এর ৯ জানুয়ারি রাজধানী হাভানায় ঢুকে দেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন কাস্ত্রো এবং এরই মধ্য দিয়ে নতুন এক কিউবার যাত্রা শুরু হয়।

পুঁজিবাদী ধ্যান-ধারণার অন্যতম বাহক যুক্তরাষ্ট্রের চোখের সামনেই সমাজতান্ত্রিক কিউবা গড়ে তোলেন তিনি। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসন বন্ধ করাই ছিল কাস্ত্রোর মূল রাজনৈতিক আদর্শ। মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে কাস্ত্রোর দ্বন্দ্ব তাই অনিবার্য ছিল। তার পরের চল্লিশ বছর ধরে একের পর এক মার্কিন প্রেসিডেন্ট এসেছেন এবং ‘চিরশত্রু’ ফিদেল কাস্ত্রোকে হত্যার চেষ্টা করে গিয়েছেন। ফিদেলের নিরাপত্তারক্ষী ফেবিয়ান এসকালান্তের ভাষ্যমতে, নব্বই বছরের জীবনে এই মহান নেতাকে হত্যা করার জন্য ৬৩৮ বার ব্যর্থ চেষ্টা চালায় যুক্ত্ররাষ্ট্র। হামলার ধরনও ছিল বেশ অভিনব; কখনো চুরুটের মধ্যে বিস্ফোরক দ্রব্য রেখে, কখনো পোশাকে জীবাণু ছড়িয়ে এমনকি কোল্ডক্রিমের কৌটায় বিষাক্ত ক্যাপসুল রেখেও চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে কোটি মানুষের ভালোবাসা যিনি পেয়েছেন, তাঁকে মারা দুঃসাধ্য বৈকি; মার্কিন প্রশাসনের কপালে বছরের পর বছর চিন্তার ভাঁজ ফেলে কাস্ত্রো তাই অধরাই থেকে গিয়েছেন।

ফিদেল কাস্ত্রো ও বাংলাদেশ
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন কাস্ত্রো। পঞ্চাশের দশকে রাজনৈতিক বিপ্লবের দুই পুরোধা- চে গুয়েভারা এবং ফিদেল কাস্ত্রোর গেরিলা যুদ্ধের রণকৌশল অবলম্বন করে বাঙালি জাতি একাত্তরেও চূড়ান্ত সফলতা পেয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও বেশ কয়েকবার প্রশংসা জলে ভাসিয়েছেন কাস্ত্রো। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তিনি একবার বলেছিলেন, “আমি হিমালয় দেখিনি, শেখ মুজিবকে দেখেছি।” বাংলাদেশের পরম বন্ধু ফিদেল কাস্ত্রোকে তাই বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করে।

১৯৫৩ সালে আন্দোলরত অবস্থায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিচার চলাকালীন সময়ে ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন, “আমাকে অপরাধী বানাতে পারো, আদতে তা কোনো গুরুত্ব বহন করে না। ইতিহাস আমাকে মুক্তি দেবে।” গত ২৫ নভেম্বর পৃথিবী থেকে প্রস্থানকারী এই মহাবীর কালের পরিক্রমায় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছেন। তাঁর দীর্ঘ জীবন তাই এখন এক গৌরবময় ইতিহাস, যার প্রত্যেক পাতায় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিপ্লবের মন্ত্র নিজ হাতে লিখে দিয়েছেন বিশ শতকের মহানায়ক -- ফিদেল আলেহান্দ্রো কাস্ত্রো।

- শাহরিয়ার মাহি