মঙ্গলবার,১৮ Jun ২০১৯
হোম / জীবনযাপন / মানসিকভাবে শক্তিশালী নারীরা যে-কাজগুলো করে না
০৫/০৫/২০১৯

মানসিকভাবে শক্তিশালী নারীরা যে-কাজগুলো করে না

-

প্লেটো তাঁর ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘‘আমি এজন্য ঈশ্বরের নিকট কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি যে, একজন গ্রিক হয়ে জন্মগ্রহণ করেছি, অ-গ্রিক হয়ে নয়; স্বাধীন হিসাবে দুনিয়ায় আগমন করেছি, দাস হিসেবে নয় এবং পুরুষ হিসেবে সৃষ্ট হয়েছি, নারী হিসেবে নয়।’’
আসলে নারীর প্রতি যে বৈষম্যমূলক আচরণ আমাদের বর্তমান সমাজে দেখতে পাই, তা মূলত কোনো নতুন কিছু নয়। আর তাই পারিবারিক জীবন বা কর্মক্ষেত্র যেখানেই হোক না কেন একজন নারী কর্মীকে তাঁর পুরুষ সহকর্মীর চাইতে অনেক বেশি যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয়। মূলত নারী-পুরুষের মধ্যে শারীরিকগত পার্থক্য নিয়ে কোনো ভেদ না থাকলেও মানসিকগত দিক থেকে কে বেশি সক্ষম সেটি একটি বিতর্কিত বিষয়, যা নিয়ে বিভিন্ন সময় পরিচালিত হয়েছে বিভিন্ন গবেষণা। ২০১৭ সালে সংঘটিত এক গবেষণায় দেখানো হয়, সংকটাপূর্ণ পরিস্থিতিতে নারীরা পুরুষের চাইতে অধিকতর ভালো সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম। অ্যারিস্টটল তাঁর ‘পলিটিক্স্’ গ্রন্থে বলেছিলেন, ‘নারী ও পুরুষের মধ্যকার পার্থক্য কেবল ‘পরিমাণগত’ নয়; বরং গুণাবলীর দিক থেকেও তারা পরস্পর স্বতন্ত্র’। আর তাই নারীর মানসিক সক্ষমতাকে উপেক্ষা করার অবকাশ নাই।
তবে প্রশ্ন হলো একজন নারীর সাথে অপর একজন নারীর মানসিক সক্ষমতার মাত্রাগত তারতম্য থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের লেখিকা অ্যামি মরিন তাঁর ‘১৩ ঞযরহমং গবহঃধষষু ঝঃৎড়হম ডড়সবহ উড়হ : উড়’ বইটিতে মানসিকভাবে শক্তিশালী নারীদের কিছু বৈশিষ্ট্য লিপিবদ্ধ করেছেন, যেখানে বলা হয় মানসিকভাবে শক্তিশালী নারী কখনোই নিজের সাথে অন্যের তুলনামূলক আলোচনা করেন না। কারণ তিনি জানেন প্রতিটি মানুষই স্বতন্ত্র। বরং তিনি ‘বর্তমানের আমি’র সাথে ‘গতকালকের আমি’-র তুলনামূলক পর্যালোচনা করে দেখেন, আজ কতটুকু উন্নত হলেন। , সকল নারীই কি মানসিকভাবে সমান শক্তিশালী? অবশ্যই নয়। পুরুষের চাইতে নারীর মানসিক সক্ষমতা বেশি হলেও তিনি নিখুঁত হবার চেষ্টা না করে ভুল থেকে শিক্ষাগ্রহণের চেষ্টা করেন। কঠিন চ্যালেঞ্জকে উপেক্ষা না করে বিভিন্নক্ষেত্রে ঝুঁকি নিয়ে থাকেন, যা সাময়িক বিব্রতকর অবস্থা বা লজ্জাজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করলেও পরবর্তীসময় সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় রাখতে সহায়তা করে।

মানসিকভাবে শক্তিশালী একজন নারী তাঁর চিন্তায় ইতিবাচক বিষয়টিকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন; ফলে হয়ে ওঠেন আত্মবিশ্বাসী। তিনি ‘করিতে পারি না কাজ, সদা ভয়, সদা লাজ, সংশয়ে সংকল্প সদা টলে, পাছে লোকে কিছু বলে’Ñ এই মানসিকতামুক্ত। পাশাপাশি তিনি অন্যকে হীন করা বা অন্যকে স্বীয় যোগ্যতা পরিমাপের পরিমাপক হিসেবে বিবেচনা করতে নারাজ। ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ আর প্রতিনিয়ত নিজেকে আবিষ্কারের আগ্রহ তাকে আত্মপ্রত্যয়ী হতে সহায়তা করে। ফলে অন্তর্মুখী জীবনযাত্রা থেকে বেরিয়ে এসে সে সোচ্চার হয় সমাজের প্রচলিত গোঁড়ামীর বিরুদ্ধে। চৈনিক দার্শনিক লাও জু বলেছেন, “যখন তুমি ভাবনার প্রতি নজর দাও, সেগুলো শব্দ হয়। যখন শব্দের প্রতি নজর দাও, সেগুলো কাজে পরিণত হয়। যখন কাজের প্রতি মনোযোগী হও তখন সেগুলো অভ্যাসে পরিণত হয়। যখন অভ্যাসের দিকে নজর দাও, তখন সেগুলো আপনার চরিত্রে পরিণত হয়। যখন তুমি চরিত্রের প্রতি নজর দাও, তখন সেটা আপনার ভাগ্য নির্ধারণ করে।” একজন মানসিকভাবে শক্তিশালী নারী তাঁর দৃঢ়তা ও আত্মপ্রত্যয় দ্বারা ভাগ্য পরিবর্তন করতে সক্ষম। খরভব, ঃযব ঞৎঁঃয ধহফ ইবরহম ঋৎবব-এর লেখক স্টিভ মারাবোলি বলেছেন, “তোমার জীবনে তখনই অবিশ্বাস্য পরিবর্তন আসে যখন তুমি এমন সিদ্ধান্ত নাও, যেটা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তোমার আছে এবং যা তোমার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নেই, সেখান থেকে সরে আস।” যে নারী মানসিক দৃঢ়তার অধিকারিণী তিনি নিজের জীবন, চিন্তা, সক্ষমতা এবং অক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। মানুষ হিসেবে তারা দয়ালু কিন্তু প্রয়োজনে তারা বজ্রকঠিন। ঝুঁকি গ্রহণে পশ্চাৎপদ না হলেও তারা সচেতন। অন্যের সমালোচনায় তারা সময় ক্ষেপণ না করে, করে থাকেন সৃজনশীলতা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা। এলিনর রুজভেল্টের ভাষায়, “বড় মন আইডিয়া নিয়ে চর্চা করে, গড়পড়তা মন ঘটনা নিয়ে চর্চা করে, ছোট মন মানুষকে নিয়ে চর্চা করে।”

--রুদমিলা মাহবুব
প্রভাষক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়


মডেল : মৌ
ছবি : তানভীর আহমেদ