শনিবার,২৩ মার্চ ২০১৯
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / বুদোরামের কূপে পড়া
০৩/০৬/২০১৯

বুদোরামের কূপে পড়া

-

বাংলাদেশে সত্তরের দশকে প্রতীকী নাটকের চর্চা জোরোশোরে দেখা গেলেও গত দুদশককে খুব একটা চোখে পড়ে না। সম্প্রতি এক ধরনের প্রতীকী; স্যাটায়ার নাটক দেখা গেল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমন্টাল মঞ্চে। নাটকটি ‘বুদোরামের কূপে পড়া’। রাজশাহীর অনুশীলন নাট্যদলের প্রযোজনা। নাটকটির রচনা ও নির্দেশনা- মলয় ভৌমিক। সম্ভবত গত বছর ঢাকায় প্রদর্শিত তাদের ‘ম্যাওকীর্তন’ নাটকেও প্রায় একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় যখন স্বতন্ত্র শিল্পভাষা তৈরি করতে তৎপর তখন সমাজের ঠুনকো হাসাত্মক সুরে নানাব্যঙ্গ-বিদ্রুপাত্মক নাট্যপ্রযোজনা নানাভাবেই কৌতূহলীই করে তোলে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ তারিখে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে নাটকটি প্রদর্শিত হয়।
নাটকে দেখা যায়Ñ বুদোরামের কূয়ায় পড়ে মরার ইচ্ছা। তাই সর্বস্ব দিয়ে সে লোক ভাড়া করেছে। বুদোরামজানে যে বাঁচতে হলে মরতে হবে। দুই লোক তাকে লাশের মতো কাঁধে করে কূয়োর দিয়ে নিয়ে চলে। পথে নানাবিপত্তি পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত কূয়োর কাছে এসে পৌঁছায়। মরার পূর্বে শেষ ইচ্ছা হিসেবে পানি খেতে চাইলে কূয়োর অকৃপণ পানির ইঙ্গিত করে। অবশেষে কূয়োয় নিক্ষিপ্ত হয় বুদোরাম। কিন্তু কূয়োর ভেতরের পরিবেশ এতই নোংরা যে সে অতিষ্ঠ হয়ে উঠে। কোনোভাবেই সে মরতে পারে না বরং যন্ত্রণারকাতর হয়ে উঠে। বুদোরাম জীবনে যন্ত্রণা চান না। তিনি চেয়েছিলেন নিশ্চিত নিরাপদ মৃত্যু। তাই কূয়া থেকে উঠার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন। এটি টের পেয়ে যায় এক এনজিও কিংবা গবেষণা সংস্থা। মানুষকে কষ্টের দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে বাঁচাতে সে তৎপর হয়ে উঠে। তাই এ উদ্ধারকর্মের পরিকল্পনা, প্রোপোজাল তৈরি কিংবা ডোনার এজেন্সিকে আহবান করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অপরদিকে টেলিভিশনের সাংবাদিক কূয়োয় পড়া মানুষটিকে উদ্ধার না করে নিউজ তৈরিতে তৎপর হয়ে উঠে। এমনকি কূয়োর ভেতর ক্যামেরা নামিয়ে লাইভ নিউজ করতে চায়। শেষ পর্যন্ত বুদোরাম উঠে আসেন। সমাজ বাস্তবতার কূয়োর নোংরা জীবনে বুদোরাম বাঁচতে চান না। স্বাধীনতা সম্মান ও জীবনের আনন্দে তিনি বাঁচতে চান অথবা সম্মানজনক মৃত্যু তিনি কামনা করেন। এমনই সমাজের নানা রূপ ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও প্রতীকী ব্যঞ্জনায় নাটকটির পরিসমাপ্তি ঘটে।

নাটকটি সহজ-সরল পথনাটকের মতো নিরাভরণভাবে উপস্থাপিত। বাহুল্যবর্জিত এবং সর্বত্র প্রদর্শন করা যায় এমন সহজবোধ্যতায় নির্মিত। নাটকটির গল্প ছোট্ট হলেও নানাক্রিয়া, অনুষঙ্গ কিংবা সংলাপে নানা গূঢ় অর্থের ইঙ্গিত করেছেন। নাট্যকার-নির্দেশক হাসিঠাট্টার মধ্যে দিয়ে তার দৃষ্টিতে বতর্মান সমাজের নানা অসঙ্গতিগুলোকে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। ‘কূপ’সহ নানাশব্দ ও বিষয় প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে নাটকে। নিজে কূয়োয় পড়ে আত্মহত্যা করার জন্য লোক ভাড়া করার প্রসঙ্গটি সমাজের প্রবণতাই তুলে ধরে। সমাজের হীন নিচু সংকীর্ণতায় মানসিক পীড়নে কিংবা আনন্দহীন চ্যুত বন্দিজীবনে বাঁচতে চান না বুদোরাম। তাই তো বুদোরাম মরে বাঁচতে চান। স্যাটায়ার নাটকের ধরনে একদিকে যেমন দর্শককে হাস্যকৌতুক কিংবা বিনোদিত করে ঠিক তেমনি প্রতিটি সংলাপ কিংবা ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সমাজের নানা অসঙ্গতিকে চিত্রিত করে। বুদোরাম নাম, উপুড় হয়ে কাঁধে থাকা, কূয়োয় পড়াসহ নানা বিষয়েরই সমকালীন জীবনের নানা দিককে ইঙ্গিত করে। এমনকি শেষে নামের শেষে রাম থাকায় সে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পের শিকার হয়। নাটকটিতে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। প্রায় প্রত্যেকের অভিনয়েই হাস্য-কৌতুক ও পরিহাসপ্রবণতা বিদ্যমান। সহজসরল কালারফুল পোশাক। এমনকি দিনের আলোতেও নাটকটি প্রদর্শন করা সম্ভব। হালকা বিনোদননির্ভর গূঢ় অর্থমূলক নাটক এটি। নাটকটির উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।


-আবু সাঈদ তুলু