শনিবার,২৩ মার্চ ২০১৯
হোম / বিশেষ সংবাদ / ভাষাআন্দোলনে নারীর ভূমিকা
০২/২০/২০১৯

ভাষাআন্দোলনে নারীর ভূমিকা

-

ফেব্রুয়ারি মাস চলছে। প্রকৃতিতে একদিকে যেমন বসন্তের ডাক এসেছে, দেশবাসীর প্রাণের বইমেলাও চলছে পুরোদমে। জাতীয় জীবনে ফেব্রুয়ারির গুরুত্ব কিন্তু আরো বেশি এবং এর নেপথ্যের মূল কারণ এই মাসটা ভাষার মাস। একুশে ফেব্রুয়ারি যখন সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ এমনকি বিশ্ববাসীর জন্যেই মহাগুরুত্বের, তখন এত গৌরবের মাঝেও একটা না পাওয়া থেকেই যায়। আর তা হলো ভাষাআন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়া। ভাষা দিবসের সঙ্গে যুক্ত সমগ্র মানুষদের প্রতি পরম শ্রদ্ধা রেখেই বলছিÑ একুশে ফেব্রুয়ারির যাবতীয় ঘটনাপ্রবাহে কোনো নারীর নাম সেভাবে শুনেছেন কি? আমাদের গর্বের একুশে ফেব্রুয়ারিতে কি তাহলে নারীর অংশগ্রহণ তেমনভাবে ছিল না?

ফিরে দেখা
দেশের কোনো প্রান্তে কোনো ধরনের আন্দোলন-সংগ্রাম নারী, পুরুষের একইসাথে অংশগ্রহণ ছাড়া পূর্ণাঙ্গভাবে সফল হয়েছে এমন নজির খুব সম্ভবত একেবারেই নেই। তবে ইতিহাসে ঘটনাপ্রবাহ যেভাবেই ঘটুক, ভিন্ন একটি প্রজন্মের কাছে তা উপস্থাপন হয় ইতিহাস লেখনীর মাধ্যমে। হতাশাজনক হলেও সত্য জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনায় নারীর অংশগ্রহণ ইতিহাসের পাতায় তেমনভাবে জায়গা পায়নি। তাই বিশ্বের নানা প্রান্তে যখন শত শত বছর পুরনো ইতিহাসে স্ব স্ব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্পষ্ট ইতিহাস থাকলেও সে তুলনায় ‘মাত্র’ অর্ধশতাব্দীর কিছু বেশি পুরনো এই ঘটনায় নারীর অংশগ্রহণ কীভাবে সবার চোখ এড়ালো তা রীতিমতো গবেষণার বিষয়। তবে তার আগে মহান ভাষাআন্দোলনে নারীর ভূমিকার যথাযথ বিশ্লেষণ করা যাক।
পাঠক নিশ্চয়ই জেনে থাকবেন যে, তৎকালীন সময়ে মেয়েদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার সুযোগ এখনকার তুলনায় কম ছিল। তখনকার রক্ষণশীল সমাজে অনেকে মেয়েদের শিক্ষাই কিন্তু উর্দু, ফার্সি বা আরবি ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে এতকিছুর পরেও ভাষা নিয়ে আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ কোনো অংশে কম তো ছিলই না বরং কোনো কোনো দিক থেকে বিবেচনা করলে তা ছিল ব্যতিক্রমীভাবে বেশি। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫১Ñ এই সময়টায় তমদ্দুন মজলিস থেকে শুরু করে যে-কোনো সাংস্কৃতিক, সামাজিক আন্দোলনে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশগ্রহণ করেছে। আর এই অংশগ্রহণের ব্যাপারে একেবারে সঠিক এবং আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত তথ্যভা-ার তৈরি করা না হলেও বিক্ষিপ্তভাবে নির্ভরযোগ্য কিছু তথ্য জানা যায়। আর সেই তথ্যের ভিত্তিতে উঠে আসে অনেক নারীর নাম, যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই আন্দোলনে অংশ নিলেও বরাবরের মতো পর্দার আড়ালেই থেকে গিয়েছেন।

এই যেমন বায়ান্ন’র ভাষাআন্দলোনে অগ্নিকন্যা নাদেরা বেগমের কথা বলা যায়। বাংলার প্রাণের দাবি মাতৃভাষার আন্দোলনে একজন সংগঠক ও একনিষ্ঠকর্মী হিসেবে কাজ করে গেছেন এই মহীয়সী নারী। ভাষাআন্দোলন যখন মাত্রই অঙ্কুর থেকে বিকশিত হচ্ছে তখন তাঁর প্রচেষ্টায়, কামরুন্নেসা স্কুল, বাংলাবাজার স্কুল, ইডেন মহিলা কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারীরা ধীরে ধীরে সংগ্রামের মূল ¯্রােতে যুক্ত হন। ভাষাআন্দোলনের এই কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব অনেকবার জেল খেটেছেন, অত্যাচার সহ্য করছেন কিন্তু কখনো পিছপা হননি। ভাষাআন্দোলনে সর্বজন শ্রদ্ধেও কবি সুফিয়া কামালের অবদানের কথাও এখনকার প্রজন্মের কানে কাছে কতটুকু এসেছে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকেই সব ধরনের সহযোগিতা ও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র। ভাষাকন্যা নাদেরা যখন পুলিশ থেকে আত্মগোপন করেছিলেন তখন তাকে নিজ বাসায় লুকিয়ে রেখেছিলেন এই কবি। এছাড়াও আরো কতভাবে ভাষা আন্দোলনে এই নারী অবদান রেখেছেন তার ইয়ত্তা নেই।
গত বছর না-ফেরার দেশে পাড়ি জমানো ভাষা সৈনিক হালিমা খাতুনের কথাও বলতে হয়। ভাষাআন্দোলনের শুরু থেকে সরব এই নারী ৫২’র অন্যতম সংগঠক ছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের আমতলার সমাবেশে মুসলিম গার্লস স্কুল এবং বাংলা বাজার গার্লস স্কুলের মেয়েদের নিয়ে তিনি উপস্থিত হন। ১৪৪ ধারা ভেঙে মেয়েদের যে মিছিল বের হয়েছিল তাতে হালিমা খাতুন প্রথম সারিতে ছিলেন। তাঁর সাথে আরো ছিলেন জুলেখা, রওশন আরা বাচ্চু, নূরী আর সেতারা নামের এক এক দুঃসাহসী ভাষাসৈনিক। মিছিলে গুলি চালানোর ছবি এই নারীরাই প্রথম পত্রিকা অফিসে সরবরাহ করেছিলেন।

সমসাময়িক সময়ে এমনই দেশপ্রেম দেখিয়েছেন সুফিয়া খাতুন, সামসুন নাহার, সারা তৈফুর, কাজী আমিনা, মাহফিল আরা, খুরশিদি খানম, আনোয়ারা খাতুন, বেগম দৌলতুন্নেছা, নূরজাহান মুরশিদ, আফসারী খানম, রানু মুখার্জী, ড. সাফিয়া খাতুন ও নাদিরা চৌধুরী প্রমুখ। এর বাইরেও অনেকেই রয়েছেন যাদের অবদানের কথা বলে শেষ করা যাবে না। এত এত অবদান যাদের, দুঃখের বিষয় তাদের নিয়ে বিস্তারিত তথ্য, প্রামাণ্যচিত্র, সাহিত্য সেভাবে তৈরি হয়নি, কতটা সম্মাননা পেয়েছেন বা কতটা স্মরণীয় হয়ে আছেন সেই প্রশ্নতেই জাতির জন্য রয়েছে অনিঃশেষ লজ্জা।
ভাষাআন্দোলনে নারীর অবদান সবার সামনে বড় আকারে তুলে ধরার সময় এসেছে। বর্তমান প্রজন্ম যাতে এই দেশপ্রেমী ও সংগ্রামী নারীদের সম্পর্কে জানতে পারে সে জন্য সরকারি, বেসরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে এই দায়ের বোঝা স্বাধীন জাতিকে তাড়িয়ে বেড়াবে শত থেকে সহস্রাব্দ জুড়ে।


-শাহরিয়ার মাহি