সোমবার,২২ Jul ২০১৯
হোম / ফিচার / অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার ১৪২৫ পেলেন আকিমুন রহমান
০১/২৬/২০১৯

অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার ১৪২৫ পেলেন আকিমুন রহমান

-

আকিমুন রহমানের জন্ম ১৪ জানুয়ারি ১৯৬০ সালে, নারায়ণগঞ্জে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এবং পিএইচডি। লেখালেখির শুরু আশির দশকের অন্তিমে, তবে ১৯৯৬ সালে ‘বিবি থেকে বেগম’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি ব্যাপক ভাবে আলোচিত হন। লেখালেখির পাশাপাশি শিক্ষকতা করেছেন ইনডিপেন্ডেট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ-এ। বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনারত তিনি। পিএইচডি করেছেন বহুমাত্রিক লেখক ড. হুমায়ুন আজাদের তত্ত্বাবধানে। গবেষণাপত্রটি ‘আধুনিক বাংলা উপন্যাসে বাস্তবতার স্বরূপ (১৯২০-৫০)’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় বাংলা একাডেমি থেকে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছেÑবিবি থেকে বেগম, আধুনিক বাংলা উপন্যাসে বাস্তবতার স্বরূপ, সোনার খড়কুটো, পুরুষের পৃথিবীতে এক মেয়ে, রক্তপুঁজে গেঁথে যাওয়া মাছি, এইসব নিভৃত কুহক, জীবনের পুরোনো বৃত্তান্ত, নিরন্তর পুরুষ ভাবনা, পৌরাণিক পুরুষ, বাংলা সাহিত্যে বাস্তবতার দলিল (১৩১৮-১৩৫০ বঙ্গাব্দ), সাক্ষী কেবল চৈত্রমাসের দিন আদি পর্ব ইত্যাদি।


প্রশ্ন : আপনার লেখালেখির শুরুটা কবে থেকে?
আকিমুন রহমান: লেখা শুরু হয়েছে কিশোরবেলা থেকেই। তখন চট্টগ্রাম কলেজে পড়ি। সত্তুরের মাঝামাঝি সময়ে! সেই সময় কিশোরদের জন্য চমৎকারএকটা পত্রিকা বেরুতো, নাম “কিশোর বাংলা”। সেখানে প্রথম লেখাটা প্রকাশিত হয়। গল্প সেটা।

প্রশ্ন : মননশীল এবং সৃজনশীল- সাহিত্যের দুই শাখাতেই আপনি সমানভাবে সক্রিয়। সমন্বয়টা আপনি কিভাবে করেন?

আ. র. : বিষয়টা এমন নয় যে, জোর করে বা বেশ একটা বুঝ-বন্দোবস্ত করে সমন্বয়টা আনতে হয়! আমার ক্ষেত্রে ওটা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই হয়ে এসেছে! এই সমন্বয়ের ব্যাপারটা! কখনো কখনো আমার শুধুই ব্যাখ্যা ও ভাষ্য রচনা করতে ইচ্ছা হয়। তখন মনের মধ্যে গল্প বলার বাসনাটা মাথা উঁচোলেও,তাকে আমল দিই না! অপেক্ষা করতে বলি! আর ওই সময়টায় আমি আমাকে পুরোপুরিই সপে রাখি গবেষণায় বা ভাষ্য রচনায়।
আর,যখন গল্প বলার বাসনা জাগে,তখন গবেষণাকে বলি, অপেক্ষা করো! আসছি!
এই যেমন এখন, গল্পেরা আমাকে তুমুল্ রকমে দখল করে রেখেছে!আমি গল্প বলারই চেষ্টাটা চালাচ্ছি! এদিকে, গবেষণার একটি ভূভাগ আমার জন্য অপেক্ষা করেই চলছে,আজকে বছর তিনেক হয়!
গবেষণার জন্য আমার রক্তে চাঞ্চল্য জাগে! আর,গল্প বলে উঠতে উঠতে আমি একটি বিষম মৃত্যু ও অতুল্য এক নবজন্মকে পাই!

প্রশ্ন : বাংলা উপন্যাসে বাস্তবতার স্বরূপ বিষয়ে আপনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন বাংলাদেশের খ্যাতিমান বহুমাত্রিক লেখক ড হুমায়ুন আজাদের অধীনে। এই বিষয় নির্বাচনের পেছনে বিশেষ কোনো কারণ ছিল কি?
আ. র. : আমার এই মানবজন্মের সেরা প্রাপ্তিগুলোর একটি হচ্ছে এই যে, আমি আমার পিএইচডি তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে পেয়েছিলাম প্রফেসর হুমায়ুন আজাদকে! এবং আমার পিএইচডি-র বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমার শিক্ষকের খুব বড়ো ভূমিকা ছিলো।
কেমন সেটা বলি।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পড়াশোনা শুরু করার গোড়া থেকেই আমি বিপুল মুগ্ধ হয়ে পড়েছিলাম বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগেরসাহিত্যকর্ম, বিশেষত বৈষ্ণব সাহিত্য দিয়ে! অই মুগ্ধতা নিয়ে অনার্স পেরুনো হলো,মাস্টার্সও পেরুলাম। দেখি যে, বৈষ্ণব সাহিত্যের জন্য অনুরাগ ফিকে হবে কী,বরং

ক্রমে ক্রমে যেনো আরো ঘন হয়ে উঠছে!
আকাশে বাতাসে যেনো অনুক্ষণ বাজতে শুনতে পাই, এ-ঘোর রজনী মেঘের ঘটা কেমনে আইলো বাটে/ আঙ্গিনার মাঝে বঁধুয়া ভিজিছে দেখিয়া প্রান ফাটে! বা লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়া রাখলুঁ/ তব হিয়া জুড়ন না গেল!
আমার এই সামান্য জীবনের সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত পর্যন্ত তখন নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে বৈষ্ণব পদাবলী দিয়ে! কাজেই আমি গভীর ভাবেই মনস্থির করে ফেলি যে,উচ্চতর গবেষণা করতে হবে এই বৈষ্ণব সাহিত্যেই! অন্য কোনো বিষয়েই নয় নয় নয়!
তো, গবেষণার বিষয়-আশয় ঠিক করার ব্যাপারে গবেষণা তত্ত্বাবধায়কের সাথে কথা বলে নিতে হয়! স্যারের কাছে গিয়ে অতি কুণ্ঠা ও অতি আকুলতা নিয়ে আমার আগ্রহের এলাকার কথা জানাই!
স্যার কিছুক্ষ্ণ বাক্যহারা চোখে চেয়ে থাকেন আমার দিকে! আমি মনে করি যে,ওটা বুঝি সম্মতি! আমি তখন ভয়ে ভয়ে বলি, ‘তাহলে স্যার, আমি সিনোপসিস লিখে এনে দেখাই আপনাকে?’
“ মধ্যযুগ নিয়ে কাজ করার ভাবনাও আনবে না মাথায়!” স্যার জানিয়ে দেন! কেনো আনবো না-সেই কথাটা অবশ্য জানার খুব ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু তাঁকে সেই প্রশ্ন করার সাহসটা কোনোকালেই আর ম্যানেজ করতে পারলাম কই!
এই হলো মধ্যযুগ নিয়ে কাজ করার স্বপ্ন বাতিলের গল্প।
গবেষণার জন্য যেহেতু আমি পুরো মধ্যযুগমনস্ক ছিলাম,সেই আমাকে নিয়ে বোধহয় স্যার একটু নিরীক্ষাই করতে চেয়েছিলেন!
স্যারের প্রিয় কাল ছিলো- আধুনিক যুগ।
তাই তিনি আমার জন্য আধুনিক যুগের খুব গুরুত্বপূর্ণ ওই আন্দোলন – বাস্তবতাবাদী আন্দোলন ও বাংলা উপন্যাসের দুনিয়ায় সেটার প্রভাব

নির্ধারণের এই বিষয়টি ঠিক করলেন! সেই সাথে এও জানালেন যে, আমার জন্য সবচেয়ে যথাযথ বিষয় হতো-রোম্যান্টিসিজম! তবে স্যার দেখতে চান,আদ্যোপান্ত একজন র্যো মান্টিক-বাস্তবতার বিষয়টিকে কীভাবে সামাল দেয়! কতোটা পারে সামাল দিতে! বা, আদৌ পারে কিনা!
তো,তখন আমার এমন আতঙ্ক হয়েছিলো !
কোথায় আমার – “মেঘ আন্ধিয়ার অতি ভয়ঙ্কর নিশি/একসরী ঝুরোঁ মো কদমতলে বসি”-র সরল পৃথিবী, আর কোথায় ১৮৫৭ সালের ফ্রান্স! যেখানে পরিমিতি আর শোভনতায় মোড়ানো শিল্পকলার জগত ঝমঝমিয়ে কেঁপে উঠছে নতুন এক আন্দোলনের গর্জনে! সাহিত্য এবং শিল্পকলা এখন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবতার কথা বলবে!
তারপর থেকে তো আর বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের কাছে আমার ফিরে যাওয়াই হলো না!

প্রশ্ন : ড হুমায়ুন আজাদের একরোখা আচরণের নানাগল্প আমরা শুনি। কিছু সত্য, কিছু হয়তো অতিরঞ্জন। আপনি ওনাকে কিভাবে পেয়েছেন?
আ. র. : প্রফেসর হুমায়ুন আজাদ একরোখা ছিলেন কি? আমার তা মনে হয় না! তবে তিনি নানা ভাবে নিরীক্ষা করতে ভালোবাসতেন! আর,ছিলেন দুর্মর রকমের রোম্যান্টিক!
একটি জোনাকের জন্য আকুল হতেন তিনি! কেঁপে উঠতেন শিমুলের লাল সৌন্দর্যে! বা মঞ্জরিত হয়ে উঠতেন প্রেমের জন্য বা একখ- উদাস সাদা মেঘের জন্য!

প্রশ্ন : আপনার নিজের গবেষণার পাশাপাশি “ বাংলা সাহিত্যে বাস্তবতার দলিল” শীর্ষক আপনার সম্পাদনায় উল্লেখযোগ্য একটি প্রকাশনা। সাহিত্যে বাস্তবতা প্রসঙ্গে আপনার নিজস্ব অভিমত কি? আপনার গল্প উপন্যাসে কতটুকু বাস্তবতা কতটুকু নির্মিতি ?
আ. র. : বাস্তবতার মতো গভীর,ব্যাপক, অবিশ্বাস্য সুন্দর আর অসহ রকম ভয়াবহ আর কিছু আছে কি? সেই বাস্তবতার ভিত্তির ওপরে সাহিত্যকে দাঁড় করানোরই পক্ষপাতী আমি।এখন,বাস্তবতার কোন এলাকা কার বেশী ভালো লাগবে,সেটা তো নির্ভর করে স্রষ্টার মানস গঠনের ওপর !
তবে এটা খুব কঠিনভাবেই মানি যে,শিল্পকে শিল্প হয়ে ওঠার জন্য পরিশীলিত হওয়ার বড্ডই প্রয়োজন আছে।
কথাসাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে আমি আসলেবানিয়ে কিছুই বলতে পারি না! কোনো না কোনো ভাবে আমার পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপলব্ধি করা হয়নি যে বাস্তবতাকে, তার কথা বলে উঠতে পারিই না আমি। কোনো ভাবেই যে জীবনের ভেতর দিয়ে যাওয়া হয়নি,তার গল্প কীভাবে বলা যায়;এবং বললে সেটা কতোখানি জ্যান্ত করে তোলা সম্ভব হয়-এটা আমার কাছে এখনও একটা কঠিন প্রশ্ন!
বাস্তবতার উপস্থাপনার এই প্রবণতাটি যতোটা আমার নিজসব,ততোটাই ফরাশি ঔপন্যাসিক এমিল জোলার প্রভাব সঞ্জাত।

প্রশ্ন : উনিশ এবং বিশ শতকের প্রায় শেষ পর্যন্ত লেখকেরা ছিলেন সামাজিক মুখপাত্র । তখন এতো মিডিয়া,প্রযুক্তিগত যোগাযোগ তৈরি হয়নি।এখন কোনো ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে তার বৃত্তান্ত জনগণ জেনে যাচ্ছে। সাহিত্যিকদের দিকে কেউ তাকিয়ে থাকছেন না। এই পরিস্থিতিতে সাহিত্যের সামাজিক দায়বদ্ধতার স্বরূপ বদলেছে কিনা?
আ. র. : হুড়মুড় করে সমাজ সমস্যার প্রচার করেন কি লেখক? তিনি তো বরাবরই সমস্যার মূলে প্রবেশ করেন এবং শিল্পিত ভাবে তাকে তুলে ধরেন। আর পথ নির্দেশ দেন।তো,এখনও তেমনটাই হবে। কোনো পরিস্থিতিতেই সাহিত্যের সামাজিক দায়বদ্ধতা ঘোচার কোনো কারন নেই। তবে

সেটা উপস্থাপনার ধরণটা বদলে যাবে।

প্রশ্ন : আপনার গল্প-উপন্যাসে নারী চরিত্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ। আপনি কি সচেতনভাবে নারী চরিত্রগুলোকে নির্মাণ করেন?
আ. র. : আমার গল্পে বা উপন্যাসে নারী চরিত্রগুলোই আধিপত্য নিয়ে বিরাজ করে! এই ব্যাপারটা যে খুব পরিকল্পিত ভাবে, একটা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই করে থাকি,তা নয়। আসলে যে জীবনটাকে এবং যেই বাস্তবতাকে আমি তন্ন তন্ন করে জানি,এবং অনেকখানি চিনি,সেটা নারীরই জীবন। তার সংগ্রামকে চিনি,তার অভিলাষকে চিনি, হীনতাকে চিনি,হীনতা থেকে মুক্ত হবার সাধনাটাকে চিনি! তার অন্তরলোককে চিনি, তার বাইরের অবস্থানটাকেও চিনি। সেই কারণে মনুষ্য সম্প্রদায়ের এই গোত্রটির গল্প বলাটাই আমার জন্য সহজ!
সেই সাথে ভেতরে ভেতরেআরেকটা গভীর তাগিদও কাজ করছে। নারীর জীবনের সত্য বাস্তবতার গল্পটা, যেটা আদতে বহু যুগ ধরেই উপেক্ষিত হয়ে আসছে ,সেই বাস্তবতার সত্য প্রতীয়মান রচনা করার গভীর তাগিদটাও তো বোধ করি আমি ।

প্রশ্ন : নারী সাহিত্যিকদের প্রতি পুরুষ পাঠক বা সমালোচকদের বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির কথা উল্লেখ করেছেন কানাডীয় নারীবাদী কথাসাহিত্যিক মার্গারেট অ্যাটউড। এ ধরণের বৈষম্য আমাদের দেশের সাহিত্যেও আছে বলে কি আপনার মনে হয়?
আ. র. : একটা সময়ে মনে হতো যে, আমাদের দেশে নারী লেখকের প্রতি পুরুষ পাঠক বা সমালোচকেরা বেশ বৈষম্যমূলক আচরণই করে থাকে! নামটাসুদ্ধ উল্লেখ করতে যেনো তাদের কষ্ট হতে থাকে!
তবে এখন ভালো করে লক্ষ্য করে দেখি,এই দেশে একই যন্ত্রণা তো একজন পুরুষ লেখকও পাচ্ছেন! কিছু ব্যতিক্রম বাদে, এইখানে সব কিছুই তো নিয়ন্ত্রিত হয় দলবাজি দিয়ে। নিজের মাথাটা না বিকিয়ে এবং দলবাজির বাইরে দাঁড়িয়ে,কেউ যখন মাথা উঁচোতে চাচ্ছেন ,উপেক্ষা ও অবহেলার শিকার হয়েই চলেছেন তিনি।
তবে খুব ভরসার কথা এই যে, যে লেখক-তিনি নারী হোন বা পুরুষই হোন- তৈরি করতে সমর্থ হন নিজস্ব কণ্ঠস্বর এবং যিনি সততার সাথে কাজ করে চলেন, মহাকাল থাকে বরমাল্য দেবেই। সমকালের দলবাজি সেটা আটকাতে পারে না! সাধনার আসলে বিকল্প তো নেই।

প্রশ্ন : বিশ্বসাহিত্যের একটা ব্যাপক অংশে নারীকে নির্মাণ করা হয়েছে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। এই ‘নির্মাণ’টা কতটা অথেনটিক বা নির্ভরযোগ্য?
আ. র. : কেমন করে নির্ভরযোগ্য হবে এই “ নির্মাণ” ? পুরুষ লেখকেরা নারীকে, তার সমস্তটাসহ, আদৌ তো তুলে ধরেন নি! যাঁরা যেই ভাবে এবং যেমন করে নারীকে দেখতে চেয়েছেন,ঠিক সেইরকমের ছাঁচ গড়ে নিয়েছেন। সেই কারণে কারো নারী কেবলই মধুরা। কারো নারী কেবলই অন্ধকারবাসিনী। কারো নারী কেবলই সেবাদায়িনী। কারোটা শুধুই ক্রূরা। তবে শুধু পুরুষ লেখকদের কথাই বলি কেনো,অনেক অনেক নারী লেখকও তো এমন নারী-ফ্যান্টাসি রচনাই করে চলেছেন!
সুখেদুঃখে,পতনে উত্থানে, অদিনে-সুদিনে এই মনুষ্য গোত্রটি কোনলড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যায়, ভালো ও মন্দের সাথে যুঝে যুঝে আদতেই কোনো চরিতার্থতা সে লাভ করে কিনা-সেই বাস্তবতার ওপর ব্যাপক আলো পড়তে আদৌ দেখা গেছে কি?

প্রশ্ন : বাংলা উপন্যাসে পুরুষের যৌনানুভূতি যেভাবে প্রকাশ পেয়েছে,নারীর ক্ষেত্রে সেভাবে পায়নি। বরং এক্ষেত্রে পুরুষ লেখকেরা ফ্যান্টাসি মিশিয়ে নারীদের প্রকৃত যৌনতার বোধ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন বলে আমার মনে হয়। আপনার কি মনে হয়?
আ. র. : হাজার হাজার বছর ধরে তো নারীর জন্য এই ট্যাবুই তৈরি করা হয়েছে যে, নারীর কোনো কামবাসনার প্রকাশ থাকতে পারে না! নারী লাজুক থাকবে। নত নেত্র থাকবে। চির মৌন থাকবে। তার পুরুষটির কামবাসনা নিবৃত্তির উপকরণ মাত্র হয়েই বর্তে থাকবে! সে উপভোগ করবে না। সে উপভোগের সামগ্রী হবে। যেই নারী এমনটা করবে, সেই প্রকৃত “ভালো” বা সতী নারী! আর যে নারী নিজের ভোগ বাসনার কথা প্রকাশ করে ফেলবে,তাকে স্বৈরিণী বলে গণ্য করতে হবে।
তো, এই বোধ-বিশ্বাসেরই প্রকাশ কিন্তু নানাভাবে আমরা ঘটতে দেখি আমাদের পুরুষ লেখকদের লেখায়! অধিকাংশ নারী লেখকও তাইই করছেন!

প্রশ্ন : আপনার একটি বইয়ের নাম “ নিরন্তর পুরুষভাবনাঃ নারী রচিত রোমাঞ্চ উপন্যাসে পুরুষ ভাবমূর্তি ”। এক্ষেত্রে নারী লেখকেরা সমাজে পুরুষের প্রতিষ্ঠিত ভাবমূর্তির বাইরে সরে এসে পুরুষ চরিত্রকে কতটা গভীরভাবে নির্মাণ করতে পেরেছেন?
আ. র. : “ নিরন্তর পুরুষভাবনাঃ নারী রচিত রোমাঞ্চ উপন্যাসে পুরুষ ভাবমূর্তি” বইয়ে আমি নারীর পুরুষভাবনার ওপর খানিকটা আলো ফেলার চেষ্টা করেছি। ষাটের দশকে আমাদের ভাষা এলাকায় দেখা দেন রোমেনা আফাজ। তিনিই আমাদের ভাষা এলাকার একমাত্র নারী লেখক,যিনি তাঁর রোমাঞ্চ উপন্যাসগুলোতে অভিনব এক নায়ককে গড়ে তোলেন। তার নাম বনহুর! কেনো তাঁকে তৈরি করতে হয় এমন এক সমাজ বহিরিস্থিত দস্যু নায়ককে? সেটা কি শুধুই চমক সৃষ্টির জন্য? না,তাঁর সময়ের অন্য রোমাঞ্চ উপন্যাসের পুরুষ লেখকদের অনুকরণ করার ইচ্ছা থেকে এমনটা করেছিলেন রোমেনা আফাজ? নাকি আরো গূঢ় কারণ ছিলো?
আমি সেটা উদঘাটন করার চেষ্টা চালাই।
রোমেনা আফাজের নায়ক সৃজনবাসনার কারণ যেমন অনুসন্ধান করছিলাম,পাশাপাশি দস্যু বনহূরের সাথে আমাদের সাহিত্যের মূল ধারার নারী এবংপুরুষ লেখকদের গড়া নায়ক চরিত্রদেরও একটা তুলনামূলক আলোচনার উদ্যোগ নিই।
এবং একটা বেশ কৌতূহল উদ্দীপক সত্য তখন আমার চোখে ধরা পড়ে। সেটা হলো এই যে, রোমেনা আফাজের সমকালীন মূল ধারার নায়কেরা সকলেই গড়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠিত পুরুষ ভাবমূর্তির ছাঁচমাফিক। একেবারে সমাজনির্ধারিত সুগুণ সম্পন্ন পুরুষ তারা। সুবেশধারী,মার্জিত, বিবেচক,সীমা মান্যকারী ইত্যাদি।
অন্যদিকে, রোমেনা আফাজ যে পুরুষটিকে গড়ে তোলেন,তার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় প্রতিটি নারীর অন্তরের পুরুষ ভাবনাটি। নতুন এক পুরুষ ভাবমূর্তি গড়েন রোমেনা আফাজ এইখানে! যে পুরুষ বন্য- অথচ শুদ্ধতার প্রতিমূর্তি। অন্যায়ের প্রতিবিধানকারী, নির্দয় ; অথচ গরিমাশূন্য দয়াময়। প্রণয়ী ,তবুও অনিকট।
এমন পুরুষের স্বপ্নেই বোধ হয় নারী চিরকাল ধরে হয়ে আছে আকুল,তৃষিত, অধীর। একই সাথে বিতৃষ্ণ এবং ভীতও।
রোমেনা আফাজ অত্যন্ত গৌণ একজন লেখক- তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন নারী হৃদয়ের সেই তীব্র প্রণোদনা- পুরুষ ভাবনা যার অন্য নাম-তার অবাধ ও অকুণ্ঠ প্রকাশকারী হিসেবে।

প্রশ্ন : “পৌরাণিক পুরুষ” শিরোনামে গুরুত্বপূর্ণ একটি বই লিখেছেন আপনি। নারীর ঐতিহাসিক অবদমনের পেছনে পুরুষ নির্মিত পুরাণের ভূমিকা কীরূপ?
আ. র. : এই পুরাণগুলোর তো বিপুল ভূমিকা ছিলো এবং আছে! কারণ এগুলোর মধ্য দিয়ে আদিপিতারা তাদের জন্য সুবিধাজনক নারীছাঁচ তৈরি করেছিলো, এবং সমাজে ওই ছাঁচের মহিমা রটিয়ে চলেছিলো। তারা শুধু ওই নারী ছাঁচই তৈরি করেনি, ছাঁচমাফিক সতীলক্ষ্মী নারীও গড়ে তোলে পুরাণগুলোতে । এবং সেইসব নারীর মতো হয়ে ওঠার ফজিলতও জ্ঞাপন অরে চলে তারা, এই পুরাণগুলোতেই।

প্রশ্ন : আপনার সৃজনশীল সাহিত্যচর্চার উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে আছে পুরুষভাবনার বিষয়টি। আপনি পুরুষকে কিভাবে দেখেন?আপনার ব্যক্তিগত পুরুষভাবনা আসলে কি?
আ. র. : আমার কাছে কিন্তু বরাবরই মনে হয়ে এসেছে যে, পাঠ করার জন্য বিষয় হিসেবে পুরুষ একটা অতি চমৎকার সাবজেক্ট । আমি নানাভাবে তাকে পাঠ করে উঠে, কখনো চমকিত হই! কখনো আতঙ্ক বোধ করি!কখনো বিমল আনন্দ পাই! কখনো বেদনা ও করুণায় ছলকাই। বেচারা!কী মহা চাপে তাকে থাকতে হচ্ছে,সভ্যতার সেই গোড়া থেকেই।
সে তার নিজের জীবনটাকেই তো নিজের মতো করে দাঁড় করাবার অধিকার পায় না! তাকে যাপন করতে হয় তার জন্য বানানো ছাঁচ মাফিক। কি আছে সেই ছাঁচে? সে পুরুষ, তাই তার নিজেকে বলশালী বলে চিন্তা করতেই হবে। সক্রিয় দেখাতে হবে। ত্রাতার ভূমিকায় থাকতে হবে। যতোই নষ্ট-ভ্রষ্ট হোক সে,কিছুই তার সতীত্ব ক্ষুণ্ণ করতে পারবে না-এমন ভুল বিশ্বাস নিয়ে চলে থাকতে হবে!এমন আরো বহু বহু কিছু।
অথচ বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা। এই ছাঁচমাফিক চলতে চলতেই কিন্তু সে নিজের আদত রূপটা অলজ্জভাবে প্রকাশের সুবিধাটা পাচ্ছে না! সেটা পেলেই ভালো হতো তার ! আমরাও পরিষ্কার চোখে দেখতে পেতাম মনুষ্য সম্প্রদায়ের এই গোত্রটি আদতে কেমন!
দেখতে পেতাম সে আসলে কতোটা বাঁকাচোরা। কতোটা হীনতায় ও ক্ষুদ্রতায় পরিপূর্ণ । মহৎ বলে নিজেকে প্রতিপন্ন করতে আদ্যোপান্তই কি সে অনিচ্ছুক এবং লজ্জাহীন? নাকি অন্য কিছু!
এই অবস্থাটা কিন্তু সমাজের পুরুষকুলের বড়ো অংশটার মধ্যেই বিরাজমান। তার পাশে ব্যতিক্রমও তো আছে! রামমোহন রায় আছেন! ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আছেন। এবং আরো কেউ কেউ আছেন!
আমার ব্যক্তিগত পুরুষ ভাবনার কথাটা যদি বলতে হয়,তাহলে বলবো- আমি আমার সমাজে ও সংসারে সেই পুরুষটিকে দেখতে চাই- যিনি গভীর মানবিক,হৃদয়বান,সৎ এবং করুণা ও মমতায় পরিপূর্ণ এক মানুষ।

প্রশ্ন : আপনার “বিবি থেকে বেগম”গ্রন্থে উঠে এসেছে বিশ শতকের বাঙালি মুসলমান নারীর ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস। এই বিবর্তনে নারী কতোটা স্বয়ম্ভূ? কতটা মৌলিক? কতটা মিথ ভাঙতে পেরেছেন বাঙালি মুসলমান নারীরা?
আ. র. : বিশ শতকের বাঙালি মুসলমান নারীর যে বিবর্তনের পরিচয় আমরা পাই, সেখানে আমাদের নারী পূর্বসূরীগণের কোনো গৌরবের পরিচয় ছড়িয়ে নেই। বরং তাঁদের কেমন করে নতুন রকমের শেকল বা ছাঁচে বন্দী করে ফেলা হলো-তার পরিচয়ই ছড়িয়ে আছে।
“বিবি থেকে বেগম” বইয়ে সেই পরিস্থিতিটাকেই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। মিথ তাঁরা ভাঙবেন কী,তাঁদের জন্যই তো নতুনরকম নারী-মিথ তৈরি করলো সমাজ। এবং নতুন রকমের শেকলের জীবনে প্রবেশে বাধ্য করা হলো।
বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে বাঙালি মুসলমান রচিত কয়েকটি সাহিত্যমূল্যশূন্য উপন্যাসে তৈরি করা হয় এক অভিনব নারী ভাবমূর্তি । আসলে তৈরি করা হয় এক অভিনব পত্নীর ছাঁচ-যে পত্নী হবে অতি রূপবতী কিন্তু অতি পর্দানশীন ; অল্প লেখাপড়া জানা এবং একান্ত পতি অনুগতা। এই ছাঁচটি তখনকার অল্প শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান সমাজে ছিলো একেবারেই অভিনব।
তো, অচিরেই অই উপন্যাসগুলোর ছাঁচে বাস্তব সংসারে অমন নারীগণ বা নব্য বিবিরা তৈরি হতে থাকে। পতির জীবনকে নানাভাবে সুখশান্তিতে ভরে দেওয়ার জন্যই তাদের নারী জন্ম।
এর পরে যতো দিন যেতে থাকে,বাঙালি মুসলমান পুরুষ যতো উচ্চ শিক্ষার দিকে যেতে থাকে, ততো তারা তাদের শিক্ষা রুচি ও সুবিধা মতো নতুন নতুন ছাঁচ প্রস্তুত করতে থাকে। এবং বাস্তব নারীদের সেই ছাঁচ মতো গড়ে তোলারও ব্যবস্থা নিতে থাকে।
একেবারে আদিতে যার পরিচয় ছিলো “বিবি”,কালক্রমে সে পায় “ বেগম” অভিধা; তারপর সে পায় “ মিসেস” অভিধা বা “ আমার ওয়াইফ” নামটি।
এরা কেউই স্বাবলম্বী স্বনির্ভর জীবন যাপন করেননি, বরং করেছেন শৃঙ্খলিত বিকলাঙ্গ দাসীর জীবন। ওই আদি পিতামহীদের বিকলাঙ্গতা ও অথর্বতার জন্য তাদের পতিপ্রভুরা দায়ী ছিলো; তবে এখন দেখা যাচ্ছে নারীর বিকলাঙ্গতা আর অথর্বতার জন্য নারী নিজেও কম দায়ী নয়।

প্রশ্ন : আপনি কি নিভৃতচারী লেখক? সাহিত্যের অনুষ্ঠানে আপনাকে খুব বেশি দেখা যায় না। এর কারণ কি?
আ. র. : আমি তো একেবারে তুমুল রকমেই বিশ্বাস করি যে, সাহিত্য হচ্ছে একাকী এক বিজন সাধনার ফসল! জীবনকে চিনতে হলে জীবনের ওঠাপড়ার ভেতর দিয়ে যেতে হবে। অভিজ্ঞতা পেতে হবে। কিন্তু লেখার জন্য হয়ে উঠতে হবে চূড়ান্ত নিঃসঙ্গ! আমি তেমনটাই অনুশীলন করি। তবে কেউ ডেকে উঠলে,আমি সাড়া দিই না-এমনটা তো নয়! কী কারণে জানি আমাকে কেউ ডাকই পাঠায় না! এখন অনাহূত হয়ে যাই কী করে ! কুণ্ঠা-সংকোচ-লাজ তো-এই সামান্য লেখকটারও আছে!

প্রশ্ন : সাহিত্যচর্চার এই পর্যায়ে এসে অনন্যা সাহিত্য পুরষ্কার পাচ্ছেন আপনি। গত ২৪ বছর ধরে এই সাহিত্য পুরষ্কারটি দেওয়া হচ্ছে। আপনার অনুভূতিটা জানতে চাই।
আ. র. : ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে! ভারী অস্বস্তি ! মনে হচ্ছে,এমন আর কী-ই বা লিখে উঠেছি! আমার পূর্বসূরীদের তুলনায়! আমি তো মাত্র চেষ্টাটাই করে যাচ্ছি! শুধুই চেষ্টা। এর মধ্যেই এমন ভালোবাসা! এতো আমার প্রাপ্য ছিলো নাকি!