মঙ্গলবার,২২ জানুয়ারী ২০১৯
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / ম্যারি কুরি
০১/০৭/২০১৯

ম্যারি কুরি

-

‘আমি সেইসব মানুষের ভেতর একজন যারা মনে করে বিজ্ঞানের সৌন্দর্য অসীম। যখন একজন বিজ্ঞানী তার ল্যাবরোটরিতে কাজ করে তখন তিনি কেবল একজন টেকনিসিয়ান না। তিনি একজন শিশু যে এইসব বিজ্ঞানের নানাবিধ ঘটনায় বিস্মিত ও অভিভূত।’ এই কথাগুলো বলেছেন বিজ্ঞানী ম্যারি কুরি। তিনিই একমাত্র নারী যিনি ফিজিক্স ও কেমিস্ট্রি এই দুই বিষয়ে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি রেডিও এ্যাকটিভিটি ও রেডিয়ামের উপর কাজ করেছেন। রেডিয়াম নামের এই জিনিসটি তারই আবিষ্কার।

তিনি গবেষণা শুরু করেন তাঁর স্বামী পিয়ের কুরির সঙ্গে। স্বামী ১৯০৬ সালে মারা যাবার পরেও তিনি গবেষণা চালিয়ে যান। এ্যাটমের ভেতরে কি আছে তা নিয়ে তিনি গবেষণা করেন। এই এ্যাটম নামের ক্ষুদ্র জিনিস বিশ শতকের বিজ্ঞানকে চালিত করে। তিনি বিজ্ঞানীদের মধ্যে অন্যতম প্রধান। আলবার্ট আইনস্টাইন বলেন, তিনি এমন একনারী খ্যাতি যাকে নষ্ট করেনি। তার কাছে কাজ বড়। এরপর স্বামী ছেলেমেয়েরা। তিনি আলবার্ট আইনস্টাইনের বিশেষ বন্ধু ছিলেন।

তাঁর জন্ম ওয়ারসও, পোলান্ডে ১৮৬৭ সালে। তাঁর নাম ছিল ম্যারি কালডাওয়াস্কা। চারবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচাইতে ছোট। তাদের একটি ভাইও ছিল। তাঁর ছেলেবেলা বেশ কষ্টে কেটেছে। রাশিয়ার অধীনে ছিল পোলান্ড যাদের নিয়মরীতি মানতে মানতে জীবন অস্থির। তাঁর বাবা ভালডিস্লাব ছিলেন একজন ফিজিক্স প্রফেসর। তিনি একসময় চাকরি হারান। রাশিয়ানরা তাঁর শিক্ষকতার কাজটি কেড়ে নিয়েছিল। মা একটা বোর্ডিং স্কুলে কাজ করত। তারা সেখানে বাস করতে শুরু করেন। এরপর বাবা কিছু ছাত্র জুটিয়ে পড়াতে লাগলেন। বাবা চাইতেন তাঁর মেয়েরা ও ছেলে সমভাবে পড়াশুনার সুযোগ পাবে। বর্তমানের সংকট কালে রাশিয়ার ক্ষমতার কারণে ম্যারিকে অনেক কষ্টে পড়াশুনা করতে হয়েছিল।

বোনকে মেডিকাল কলেজে পড়তে পাঠান প্যারিসে। আর সেই বোনের পড়াশুনার খরচ সংগ্রহ করতে তাকে কাজ করতে হয়। ধারণা এই বোন যখন পড়াশুনা শেষ করবে তখন ম্যারিকে সাহায্য করবে। চিরকালের উজ্জ্বল নক্ষত্র ম্যারি তখন একজন বড়লোকের বাড়িতে গর্ভনেস হিসাবে কাজ করেন। দেখেন এই পরিবারের সকলে কতগুলো পুরনো নীতি নিয়ে জীবন কাটায়।

১৮৯১ সালে ম্যারির পুরো পরিবার প্যারিসে চলে আসে। তিনি সরবোনে ভর্তি হন বিজ্ঞান পড়তে। সরবোন ইউরোপের গুটিকয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এমন একটি যারা নারীর বিজ্ঞান পড়তে কোনো বাধা দেয় না। একা থাকেন তিনি। কেবল রুটি, কিছু ফল আর হটচকলেট খেয়ে জীবনযাপন করেন। পরে বলেনÑ এ জীবনে বেদনা ছিল। আমি অনেককিছু ত্যাগ করেছিলাম এই সরবোনে পড়তে। এ আমাকে এক ধরনের স্বাধীন জীবনের স্বাদ এনে দিয়েছিল। ১৮৯৪ সালে তিনি ফিজিক্স ও অংকে এম এ করতে শুরু করেন। সেই বছর তাঁর পিয়েরের সঙ্গে দেখা হয়। মিউনিসিপাল স্কুল অফ ফিজিক্সে তিনি প্রফেসর ও ডিরেকটর ছিলেন। তাদের দুজন দুজনকে পছন্দ করেন এবং ১৮৯৫ সালে তারা বিয়ে করেন। এরপর পিয়েরের ল্যাবরোটরিতে রেডিও আকটিভ নামের বিষয়টি নিয়ে তিনি গবেষণা করেন। তার পড়াশুনার কারণে একটি ডিসারটেশন পেপার তৈরি করতে হয়েছিল। এ এইচ ব্যেকারেল নামে যিনি এই বিষয়ে গবেষণা করছিলেন তার কাজ থেকেই মেরি উৎসাহ পান।

তিনি ইউরেনিয়াম নিয়ে কাজ করছিলেন। রেডিও আকটিভিটি ও ইউরেনিয়ামের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করছিলেন। এর সঙ্গে আর একটি বিষয় নিয়েও কাজ করছিলেন যার নাম থোরিয়াম। এরপর এ্যাটমের ভেতরের পদার্থ নিয়েও গবেষনা। তাঁর গবেষণা সফল হয় এবং তিনি সারা পৃথিবীতে পরিচিত হন। ১৮৯৮ সালে তিনি ইউরোনিয়ামে নতুন একটি বস্তু পান। পিয়ের কুরি তখন তার সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন। তারা দুজন আরো

দুটি জিনিস পান যার নাম পলোনিয়াম ও রেডিয়াম। একটি জিনিস নিয়ে গবেষণা করতে করতে আরো দুুটি জিনিসের সন্ধান পান। পোলানিয়াম নামটি তিনি রেখেছিলেন তার দেশ পেলান্ডের কথা ভেবে। রেডিয়ামএর একটি ছোট জিনিস যেখান থেকে তাপ ও আলো বের হয়। সকলে বলে অক্সিজেনের পর এতবড় জিনিস আর আর আবিষ্কার হয়নি। তিনি দিনের পর দিন এই দুই বস্তুকে জানতে নানা ধরনের গবেষণা করেন। এই কাজটি করতে অনেক সময় লাগে। রাতারাতি কোনো কিছু জানা যায় না। তার প্রায় চার বছর লেগিছিল পলোনিয়াম আর রেডিয়াম আবিষ্কার করতে। এতে করে ওরা দুজন বারবার অসুখে পড়তেন। কারণ রেডিয়াম-এর সংস্পর্শে থাকার ফলে তাদের শরীর খারাপ হয়। অনেকে মনে করে এটাই ম্যারি কুরির মৃত্যুর কারণ। তখন ঠিক ক্যানসার শব্দটির সঙ্গে পরিচিত ছিল না সকলের। তাই তারা ঠিক বুঝতে পারেনি তাঁর মৃত্যুর আসল কারণ কি?

১৯০৩ সালে তিনি যখন তার ডক্টরেটের থিসিস সাবমিট করেন সকলে বলে এত বড় থিসিস একজন ডক্টরেট করতে গিয়ে কোনোদিন করেনি। ‘গ্রেটেস্ট ডকটোরাল সাইনটিফিক কনট্রিবিউশন বাই ও ডকটোরাল কান্ডিডেড।’ তাঁর থিসিসের বিষয় ছিল ‘রেডিওআকটিভিটি’।
সেই বছর তিনি এবং তাঁর স্বামী পিয়ের কুরি তাদের গবেষণা কাজের জন্য নোবেল প্রাইজ পান। তারাঁ দুজন পান অর্ধেক আর বাকি অর্ধেক পান বেকারাল নামের আর এক বিজ্ঞানী। তখন সারা পৃথিবী তাঁকে জানে এবং সাড়া পড়ে যায়। নোবেল প্রাইজ বিজ্ঞানে পুরস্কার দেন এমন কথাও জানে সকলে। তিন বছর পর তাঁর স্বামী পিয়ের গাড়ি চাপা পরে মারা যান। সরবোনে পিয়েরের জন্য যে প্রফেসরের চেয়ার ছিল তা মেরিকে দেওয়া হয়। ৬৫০ বছরের ইতিহাসে আর কোনো নারী এই সম্মানে ভূষিত হতে পারেনি। ওদের দুটি মেয়ে ছিল। বড় মেয়ে আইরিন জলিয়েট কুরি ১৮৯৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনিও একজন বড় বিজ্ঞানী ছিলেন। ১৯৩৫ সালে তিনি কেমিস্ট্রিতে নোবেল প্রাইজ পান। মাত্র আটান্ন বছর বয়সে আইরিন জলিয়েট কুরি মারা যান। কারণ একই রেডিয়েশন। নোবেলের ইতিহাসে পুরো পরিবার নোবেল পুরস্কার পায় এমনটি আর দেখা যায়নি। বাবা, মা আর মেয়ে। আইরিন জুলিয়েটের ছেলেমেয়েরাও মস্ত বিজ্ঞানী। ১৯১০ সালে মেরি কুরি আর সব উপাদান থেকে রেডিয়ামকে আলাদা করেন। এরপর তাঁকে আবার নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। এত বড় নারীকে একবার অপবাদ দেওয়া হয়েছিল পল লংগেভিন নামে একজনের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক করেছেন। তিনি সেই অপবাদ খ-ন করেন।

প্রথম মহাযুদ্ধের সময় মা ও মেয়ে মিলে একটি ‘মোবাইল রেডিওলজি’ স্থাপন করেন। যেখানে রেডিওলজি করবার সুযোগ ছিল। যেখানে মিলিয়নেরও বেশি রোগীর এক্সরে করা হয়। তিনি আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে টাকা তুলতেন অন্যদের সাহায্যের জন্য। কুরি ইনসটিটিউট অফ রেডিয়ামে তিনি ছিলেন ডিরেকটর। জীবনে ১২৫টিরও বেশি পুরস্কার পেয়েছেন। চোখ একটু খারাপ হয়েছিল তারপরেও কাজ করে গেছেন। ১৯২৭ সালে বোন বরোনিকে লেখেন- আমাকে কাজ করতেই হবে। কারণ ল্যাবরেটরি ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না। মারা যান ৬৭ বছর বয়সে। এখন সকলে বলে এ ছিল লিকুমিয়া। দুহাতে নেড়েছেন যেসব উপাদান তাই তাঁকে ক্যান্সার এনে দেয়। তবে তিনি বেঁচে থাকতেই তাঁর মেয়ে আইরিন জলিয়েট কুরি এবং তাঁর স্বামী ফ্রেডরিক জলিয়েট কুরী কেমিস্ট্রিতে নোবেল প্রাইজ পান।

পুরুষরা সেদিন বুঝতে পেরেছিল একজন নারী ও পুরুষ বিজ্ঞানীর সমকক্ষ হতে পারে কিম্বা তাদের চাইতে ভালো কিছু হয়ে উঠবার শক্তিও আছে নারীর। চারপাশের পুরুষের জগতে তিনি একজন প্রদীপ্ত নারী।

-সালেহা চৌধুরী