সোমবার,২২ এপ্রিল ২০১৯
হোম / ফিচার / রাজনীতিতে নারী
১২/২৭/২০১৮

রাজনীতিতে নারী

-

নির্বাচনের দামামা বেজেছে, সারাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৩০ ডিসেম্বর। নারীর অংশগ্রহণ ও নারী নেতৃত্ব বিগত নির্বাচনগুলোর ভাগ্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলেছে, এবারও যে প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, অতীতের তুলনায় বিগত এক দশকে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কিন্তু সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তা কি যথেষ্ট? অনন্যার স্পটলাইটে আজ তাই দেশিয় রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হলো।

আমাদের দেশের রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন
রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের সবচেয়ে বড় পরিচায়ক হলো নির্বাচনে দাঁড়ানো মোট নারী প্রার্থীর সংখ্যা। বর্তমান জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য ৫০টি সংরক্ষিত আসনের বিধান যখন কিছুটা আশা দেখাচ্ছে, ঠিক তখনই নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে অংশ নেওয়া নারীর সংখ্যা শুনলে আশার বেলুন চুপসে যেতে বাধ্য। এই যেমন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে চূড়ান্ত নারীপ্রার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৫৭জন যা মোট প্রার্থীর মাত্র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাটা আরো কমে ২৮-এ নেমে এসেছিল। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই যেখানে নারী সেখানে সংসদ নির্বাচনে নারীপ্রার্থীর সংখ্যা শতকরার হিসেবে এক অংকেই থেকে যায় এবং বলার অপেক্ষা রাখে না যে, জাতিগত দিক থেকে এটা আমাদের জন্য মোটেও আনন্দের কোনো সংবাদ নয়।

এ তো গেল জাতীয় নির্বাচনের কথা। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রেও যে নারীর অংশগ্রহণ আশাব্যঞ্জক এমনটা বলার সুযোগ নেই। ২০১৬ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চার হাজার সিটে নারী চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছেন মাত্র ২৯জন। উপজেলা নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ার বদলে বরং কমেছে। পৌরসভা নির্বাচনের মাধ্যমে মেয়র পদে নির্বাচিত নারীর সংখ্যা ২ শতাংশতেও পৌঁছায়নি।

একইভাবে রাজনৈতিক দলগুলোতেও নারীর প্রতিনিধিত্ব সদস্য সংখ্যার অনুপাতের সাথে একেবারেই সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। ২০০৮ সালে হওয়া গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে সব স্তরের নেতৃত্বে ৩৩ শতাংশ নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচিত আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ দেশের কোনো দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে নারীর সংখ্যা এখনো ২০ শতাংশের কাছাকাছিও আসেনি। সব মিলিয়ে বলা যায়, সক্রিয় রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কিঞ্চিৎ বাড়লেও হারটা এতটাই মন্থর যে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা পৌঁছানো এখনো বহু দূরের ব্যাপার। তাই অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রের মতো রাজনীতিতেও যে, দেশের নারীরা যথেষ্ট সুযোগ পাচ্ছেন না, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

আমাদের রাজনীতিতে নারীর পথ যে বেশ বন্ধুর তা পাঠক এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝেছেন। তবে এই হতাশার মাঝেও আশার আলো হয়ে পথ দেখাচ্ছেন বেশ কয়েকজন নারী, যারা রাজনীতিতে মনোনিবেশ করে নিজেদের করে তুলেছেন সর্বজন শ্রদ্ধেয়। সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের সবাইকে নিয়ে বলা এখন সম্ভব নয়। নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন তিনজন নারী রাজনীতিবিদের কথা এখন বলব, যারা একেবারে নিজেদের একান্ত পরিশ্রমে রাজনীতির ময়দানে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

মতিয়া চৌধুরী
রাজনীতির কিঞ্চিৎ খোঁজখবর রাখেন, কিন্তু মতিয়া চৌধুরীকে চিনেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। স্বাধীনতার পূর্বে থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় এই নারী বর্তমান সরকারের কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। ছাত্রজীবনে মতিয়া চৌধুরী ইডেন কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬৫ সালে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৬৭ সালে যখন পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন, ততদিনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকার জন্য ‘অগ্নিকন্যা’ উপাধি পাওয়া হয়ে গিয়েছে তার। পাঁচ দশকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে নানাঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে বর্তমান সরকারের কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন

করছেন। কোনো সন্দেহ নেই এই গুরুদায়িত্ব তিনি পালন করছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। যার ফলে কৃষিক্ষেত্রে বিদ্যমান নানাসমস্যা পেরিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠছে বাংলাদেশ। এতবড় গুরুদায়িত্ব পালন করলেও নিজের জন্য বাড়তি কোনো সুযোগ-সুবিধা নেন না এই নারী। চলাফেরা করেন অন্য আট-দশজন সাধারণ মানুষের মতো। এখনো মোটা কাপড় পরেন, অনেক সময় ঘরের বাজার-সদাই করতে নিজেই চলে আসেন কারওয়ান বাজারে। সরকারি গাড়ি কিংবা অফিসে এসি থাকলেও পারতপক্ষে তা ব্যবহার করেন না। নিজের আরাম আয়েশ বাদ দিয়ে মনোযোগের সম্পূর্ণটা তিনি দিয়েছেন রাজনীতিতে। সাদামাটা জীবনযাপন ও সততার জন্য অনেকের কাছে আদর্শ এই রাজনীতিবিদ দেশের নারীদের জন্য অনুকরণীয় এক আদর্শ।

বেগম মন্নুজান সুফিয়ান
খুলনার গণমানুষের প্রিয়মুখ বেগম মন্নুজান সুফিয়ান বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অগ্রগণ্য একজন নারী। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী কর্মজীবনের পুরোটা অংশ জুড়ে সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা কুড়িয়েছেন। শ্রমজীবী মানুষদের প্রতিনিধি হিসেবে বিগত কয়েক দশক ধরে নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন এই নারী। তাদের কারো কাছে তিনি মা, কারো কাছে খালা, বোন, ভাবী ইত্যাদি। প্রতিমন্ত্রী থাকা অবস্থায় বিদেশের মাটিতে প্রটোকল ভেঙে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যেমন মিশেছেন, তেমনি নিজের সারাটি জীবন খুলনাসহ আশপাশের অঞ্চলের বঞ্চিত নিপীড়িত গণমানুষের দাবি আদায়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে চলেছেন। শ্রমজীবীদের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের ন্যায্য দাবি আদায় ও দেশের শ্রমবাজারে নানাসমস্যা নিরসনে এই নারীর ভূমিকা ধন্যবাদার্হ। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কীয় সংসদীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই নারী শুধুনাত্র খুলনা নয়, বরং সারাদেশের মানুষদের জন্য অনুপ্রেরণার এক অনন্য উৎস।

সাহারা খাতুন
সাম্প্রতিককালে কিছুটা লাইমলাইটের বাইরে থাকলেও দেশের রাজনীতিতে সাহারা খাতুন পরিচিতমুখ বলা চলে। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় এই নারী বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। একই সাথে তিনি দেশের ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী হিসেবেও কাজ করেছেন। ছাত্রজীবনে সেই ১৯৬৬ সাল থেকে রাজনীতিকে ধ্যান-জ্ঞান মেনে নিরলস কাজ করে চলেছেন এই নারী। ৬৬-এর ছয়দফা আন্দোলনে অংশ নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছয় দফার বই বিতরণ করেছেন। সেই থেকে শুরু, এরপর দেশের নানা রাজনৈতিক সংকটের সময়ও বৈরি পরিবেশে নিজের মতো করে কাজ করেছেন। অন্যায়ের প্রতিবাদে সব সময় থেকেছেন সক্রিয়। কর্মজীবনে আইনজীবী হিসেবে সফলতা অর্জন করা এই নারী আশির দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে থেকে শুরু করে ২০০৭ সালের ওয়ান ইলেভেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে শত চাপের পরও নিজের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি, বরং একনিষ্ঠ একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

ভিন্ন ভিন্ন দল ও মতাদর্শের চেয়েও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষ হলো, দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য রাজনীতিতেও নারীর থাকতে হবে সমান সুযোগ ও অংশগ্রহণ। আর সেটা সম্ভব হলেই আগামী দিনগুলোতে আরো অনেক মতিয়া চৌধুরী কিংবা মন্নুজান সুফিয়ান বের হয়ে আসবেন, যারা নিজেদের শ্রম ও নিষ্ঠার মাধ্যমে দেশকে নিয়ে যাবেন নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে।

নাইব রিদোয়ান