রবিবার,২৬ মে ২০১৯
হোম / বিজ্ঞান-প্রযুক্তি / ডিজিটাল ডিটক্সের সময় এখনই
১২/২০/২০১৮

ডিজিটাল ডিটক্সের সময় এখনই

-

ডিজিটাল এই যুগে আমাদের জীবন অনেকখানি প্রযুক্তিনির্ভর। অফিস ডেস্কে সাজানো কম্পিউটারের পর্দা থেকে শুরু করে অবসরের ফেসবুক কিংবা বিনোদন দুনিয়ায় সদ্যযোগ দেওয়া নেটফ্লিক্স; জীবন এখন অনেকটাই ভার্চুয়াল। তবে ইন্টারনেটের রঙিন দুনিয়ায় অতি মাত্রায় ডিভাইস নির্ভরতা কিন্তু অনেক সময় শারীরিক-মানসিক প্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই এই ডিজিটাল ¯্রােতে গা ভাসনো শরীরে ‘ডিটক্সিফিকেশন’-এর প্রয়োজন এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়।

প্রযুক্তি যখন অভিশাপে রূপ নেয়
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার যখন ফেসবুকের নীল দুনিয়ায় দিনরাত সময়জ্ঞান না করে অযথা উপস্থিত হয়, তখন তাকে আশীর্বাদ বলতে পরম আশাবাদীরও শঙ্কা হবে। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাই বলছে সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত আসক্তি এবং অফিস ডেস্কে থেমে থাকা লাইফস্টাইলের মানুষরা প্রতিনিয়ত স্থূলতা, নীদ্রাহীনতা, উচ্চরক্তচাপ, কোলেস্টেরল এমনকি হৃদরোগে পর্যন্ত ভুগছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় যার হাজারের উপরে ‘বন্ধু’ আছে অনেক সময় বাস্তবে তিনি সঙ্গীহীন নিস্তরঙ্গ একজন ব্যক্তি। তার এই একাকিত্ব দিনে দিনে জন্ম দিতে পারে নানা মানসিক সমস্যার। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান-এর একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, অতিমাত্রায় ফেসবুক আসক্তি এবং একাকিত্বের মধ্যে রয়েছে গভীর সম্পর্ক, অতি মাত্রায় ওয়েব জগতে বিচরণ আবার স্ট্রেসের অন্যতম প্রধান কারণ।

দরকার ডিটক্সিফিকেশন
শরীর থেকে ক্ষতিকারক উপাদান অপসারণের জন্য যেমন ডিটক্সিফিকেশন পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়, তেমনি এই ডিজিটাল মাধ্যম প্রসূত অসুস্থতা থেকে বাঁচতে হলে নিতে হবে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ। এমনই কিছু ডিজিটাল ডিটক্স সম্পর্কে চলুন এবার জেনে নিই।

চোখের প্রদাহ
কর্ম হোক বা বিনোদন, চোখের সামনে কম্পিউটার, টেলিভিশন বা মোবাইলের স্ক্রিন আমাদের সারাদিনের স্বাভাবিক চিত্র। তবে এই স্ক্রিন নির্ভরতার কারণে মাথা ব্যথা, চোখ ব্যথা, দৃষ্টি সমস্যাসহ চোখের নানাবিধ প্রদাহ দেখা দেয়।

ডিটক্স স্টেপ
-চোখের এ-ধরনের সমস্যা এড়ানোর জন্য একটানা সর্বোচ্চ ৪৫ মিনিট স্ক্রিনের সামনে থাকার পর কিছুক্ষণ বিরতি নেওয়ার পরামর্শ দেন সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা।

-অথবা ২০ মিনিট স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার পর অন্তত ২০ সেকেন্ড ২০ ফুট দূরত্বের কিছুর দিকে (গাছপালা বা প্রকৃতি হলে ভালো হয়) তাকিয়ে থাকুন। আই ভিশন ঠিক রাখার জন্য এই অনুশীলনকে ২০-২০-২০ বলে আখ্যায়িত করা হয়।

হাতে ব্যথা বা অস্বস্তি
অনেক্ষণ ধরে টাইপিং, ব্রাউজিং বা টেক্সটিং-এর জন্য অনেক সময় হাতের নানা অংশ যেমনÑ আঙুল, কব্জি, তালুতে ব্যথা ও অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে। অনেক সময় শরীরের এসব অংশে দুর্বলতাও দেখা দেয়, এমনকি কার্পাল টানেল সিনড্রোম কিংবা টেক্সট ক্ল সিনড্রোমের মতো জটিল উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

ডিটক্স স্টেপ
-টাইপিং বা টেক্সটিং-এর সময় পাঁচ মিনিট পর পর বিরতি নিন। কীবোর্ড এমন দূরত্বে রাখুন যাতে করে কিছুক্ষণ পর পর কব্জির অংশ টেবিলে রেখে রেস্ট করা যায়।

-অফিসে লম্বা সময় ধরে কাজ করলে বাসায় এসে কুসুম গরম পানিতে হাত ডুবিয়ে রাখতে পারেন। এতে করে এই অংশে রক্ত প্রবাহ বাড়বে।

-অবস্থা বেশি খারাপ হলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শমতো থেরাপি নিন।

ঘাড় ও পিঠে ব্যথা
কম্পিউটারের সামনে লম্বা সময় ধরে বসে থাকতে থাকতে ঘাড় ও পিঠে ব্যথা অনুভব করেন অনেকেই। অন্যদিকে মোবাইল বা অন্যান্য ডিভাইসের দিকে ঝুঁকে টেক্সট করতে করতে অনেকেই ঘাড়সহ শরীরের বিপরীত দিকের উপরিভাগে অস্বস্তি অনুভব করেন যাকে টেক্সট ন্যাক- এর মাধ্যমেই আখ্যায়িত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডিটক্স
-পিঠে উপযুক্ত সাপোর্ট পাবেন এমন চেয়ার বেছে নিন।
-প্রতি ঘণ্টায় অন্তত একবার উঠে হাঁটা-চলা করুন।
-অফিসে থাকলে ডেস্কে বসেই কিছুক্ষণ পরপর ঘাড়, কোমর হাতের কবজি, চোখ আলতো করে বাঁকিয়ে মৃদু অনুশীলন করে নিন।
-চেয়ারে সঠিকভাবে বসুন। দরকার হলে কুশন ব্যবহার করে সোজা ও আরামদায়কভাবে আসন নিন।

পর্যাপ্ত ঘুম
উপরোক্ত উপসর্গসহ অতিমাত্রায় প্রযুক্তি আসক্তির জন্য অন্যান্য সমস্যায় যারা ভুগছেন তাদের জন্য ডিটক্সিফিকেশনের অন্যতম প্রধান ধাপ হচ্ছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম নিশ্চিত করা। সুস্থতা ফিরে পেতে দিনে ৭-৮ ঘণ্টা নিবিড় ঘুম একান্ত প্রয়োজন। ঘুমাতে যাওয়ার আগে ফোন বা অন্যান্য ডিভাইস দূরে রাখুন, শান্তিমতো বিশ্রাম নিন।

সুষম পুষ্টিকর খাবার
যে-কোনো ধরনের ডিটক্সে সুষম পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের বিকল্প নেই। যারা খাবারের টেবিলেও ডিভাইস নিয়ে আসেন তাদের মধ্যে পুষ্টিহীন এবং প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার গ্রহণের প্রবণতা দেখা দেয়। তাই এই অভ্যাস একেবারে বাদ দিন।

ডিভাইস আসক্তি কন্ট্রোল করুন
মোবাইল ফোন বা এ-ধরনের ডিভাইস যত কাছে রাখবেন তত ডিজিটাল জগতে আসক্তি বাড়বে। মোবাইল ফোন ব্যবহারে ক্যান্সার ঝুঁকি বাড়ে কিনা এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক অনেকদিন ধরেই চলছে। তবে তা সত্য নাহলেও অনেকের ক্ষেত্রে মোবাইল আসক্তি এতটাই প্রবল যে, এ ডিভাইসকে পকেট বোমার মতো ধ্বংসাত্মক বলাই যায়। দরকার ছাড়া ডিভাইস থেকে দূরে থাকুন, সুস্থ থাকুন।

প্রযুক্তি আসক্তি এখন মোটেই হাসি-ঠাট্টার বিষয় নয়। সময় এসেছে বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভেবে দেখার। ডিজিটাল ডিটক্সের সময় এখনই।

নাসিফ রাফসান

মডেলঃ ফারিয়া আফরিন

ছবিঃ শাহরিয়ার শিতাব