রবিবার,২৬ মে ২০১৯
হোম / ভ্রমণ / নিখাদ আনন্দের লঞ্চ ভ্রমণ
১২/১৯/২০১৮

নিখাদ আনন্দের লঞ্চ ভ্রমণ

-

একঘেয়ে জীবনকে একটু ফুরসত দেওয়া বা মনের নিছক আনন্দ খুঁজতে গেলে আপনার মাথায় প্রথমেই কোন অপশনটি আসবে? ঠিক ধরেছেন, ট্যুর বা ঘুরে বেড়ানো। আর সেটা যদি হয় নদী ভ্রমণ, তাও আবার বিলাসবহুল লঞ্চে? নদীর মাতাল হাওয়ার সাথে সাথে লঞ্চের মজাদার রান্না চেখে দেখা বা নিস্তব্ধ রাতে নদীর সাথে ছুটে চলার অভিজ্ঞতা নিতে হলেও একবার লঞ্চে নদী ভ্রমণটা জরুরি।


খোজখবর নিন আগে থেকেই
লঞ্চ জার্নিগুলো সাধারণত রাতে হয়, তবে কিছু রুটের লঞ্চ দিনের বেলা ছাড়ে। বরিশাল আর অন্যান্য রুটের জন্য অসংখ্য লঞ্চ সার্ভিস আছে। আপনি লঞ্চে নদী ভ্রমণ ঠিক কতটুকু করতে চান তা ঠিক করে রুট বাছাই করবেন। যেমন, ঢাকা থেকে বরিশাল যেতে সাধারণত গড়ে ৭-৮ ঘণ্টা সময় লাগে। বরিশালের লঞ্চ ঢাকা সদরঘাট থেকে রাত ৮.৩০-এ ছেড়ে যায় আর ভোরের আগেই বরিশাল পৌঁছে। এরচেয়ে একটু বেশি সময় নিয়ে যদি নদী দেখতে চান তবে পটুয়াখালী, ভোলা বা বরগুনার লঞ্চে যেতে পারেন, সকালের নদীও দেখতে পারবেন তাতে। তবে খাবারের মান, বিলাসের ব্যবস্থা আর অন্য সবদিক থেকে বরিশালের লঞ্চগুলো সবার চেয়ে এগিয়ে আর দ্রুত গতির। তাই হাতে সময় কম থাকলে আর পরিপূর্ণ উপভোগের চিন্তা করলে বরিশালের লঞ্চ সবচেয়ে ভালো।

লঞ্চের টিকেট বুকিং একটু অন্যরকম, বুকিং অফিস থেকে করতে পারেন বা চাইলে সরাসরি ঘাটে এসেও অগ্রিম করে নিতে পারেন। অথবা হুটহাট প্ল্যান করা ট্রাভেলার হলে লঞ্চ ছাড়ার আগে ঘাটে এসেও ম্যানেজ করতে পারেন, তবে এতে কেবিন পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।

লঞ্চে সাধারণত ডেক, কাউচ আর কেবিনÑ এই তিন রকমের ব্যবস্থা আছে। ঢাকা-বরিশাল লঞ্চের ডেক ভাড়া জনপ্রতি ২০০ টাকা, কাউচ (সোফা) ৬০০ টাকা আর কেবিন ক্লাস আর আকার ভেদে ১০০০-৬০০০ টাকা। সিঙ্গেল কেবিন ১০০০ টাকা, ডাবল ১৮০০-২০০০ টাকা। রাতের খাবার আর স্ন্যাক্স, কফির ব্যবস্থা লঞ্চের ভিতরেই আছে। নদী ভ্রমণের জন্য শীতকাল আর দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ছাড়া বছরের পুরোটা সময়ই উপযুক্ত।

অনন্য এক অভিজ্ঞতা
দৈনন্দিন জীবনটা খুব বোরিং হয়ে যাওয়ায় আমাদের ৪ বন্ধুর হুট করে খায়েস জাগলো ভ্রমণে যাব; কিন্তু কারোই তেমন ছুটি নেই। এদিকে মাসের শেষের দিক, পকেটও গড়ের মাঠ। এমন সময়ে বুদ্ধি এল লঞ্চে নদী ভ্রমণের। অ্যাডভেঞ্চার-১ লঞ্চের কেবিন অগ্রিম বুকিং দিয়ে রাখলাম। চলে এল সেইদিন, সদরঘাট পৌঁছে সোজা লঞ্চে উঠে কেবিন বুঝে নিলাম। রাত ৮.৩০ মিনিটে লঞ্চ ছেড়ে দিল। ঘাট থেকে লঞ্চের বের হয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া আর দুলুনিটাও বেশ মজার। তবে তারস্বরে হুইসেলের আওয়াজ থেকে সাবধান! রাত ৯টার দিকে কেবিন বয় এসে খাবারের অর্ডার জানতে চাইল। উল্লেখ্য যে, বরিশালের লঞ্চগুলোর সেবার মানের দিকে মালিকপক্ষের সর্বদা সতর্ক নজর থাকে। তাই লঞ্চের কর্মচারীদের ব্যবহার, পরিবেশ আর সেবার মান যথেষ্ট ভালো বলেই মনে হবে আপনার।

লঞ্চের খাবার খুবই প্রসিদ্ধ। বেশ নামডাক আছে খাবারের। মানের তুলনায় খাবারের দাম কমও নয়, আবার একেবারে বেশিও নয়। নানারকমের ভর্তা পাবেন ২০ টাকার মধ্যে, ডাল চচ্চড়ির দাম ৩০-৪০ টাকা, ইলিশ, রুপচাঁদা, পাবদা ও আইরসহ নানা জাতের মাছ ১৫০-২০০ টাকা প্রতি পিস, মুরগি ১২০ থেকে ৪৮০ (ফুল) টাকা পড়বে। গরুর মাংস সব লঞ্চে সবসময় পাওয়া যায় না, ভাগ্য ভালো থাকলে ১৫০-১৮০ টাকায় পরিমাণমতো পেতে পারেন।

ভাত, আলুভর্তা, চিংড়িভর্তা, মিক্সড সবজি ভাজি, চিংড়ি ভুনা, বিফ আর অতি জনপ্রিয় ডালচচ্চড়ি অর্ডার করে দিলাম আমরা। উল্লেখ্য যে, আপনি আপনার সুবিধামতো সময়ে খাবার সার্ভ করতে বলতে পারেন। তাই আমরাও রাত ১০টায় খাবার দিতে বলে বেরিয়ে পড়লাম লঞ্চ ঘুরে দেখার জন্য। পুরোটা লঞ্চেই যতœ আর পরিচ্ছন্নতার ছাপ চোখে পড়ার মতো। কিনারের দিকের কেবিনের পাশে সারবেঁধে চেয়ার থাকে বা চাইলে সরাসরি লঞ্চের একদম সামনে ক্যাপ্টেনের কেবিনের সামনেও দাঁড়িয়ে প্রাণভরে নদীর সৌন্দর্য দেখতে পারবেন। ঢাকাকে ফেলে লঞ্চ যখন এগিয়ে যায় তখন আপনি ব্যস্ত নদীর রূপ আর দুই পাড়ের শিল্প কারখানার হাজারো ঝিলমিল বাতির ঝলকানি দেখে অন্যমনস্ক হয়ে যাবেন। এ যেন প্রকৃতির মায়াজাল আর শহুরে ব্যস্ততার অকৃত্রিম যুগলবন্দি। রংবেরঙয়ের আলোর সাথে সাথে নদীর ঢেউয়ের মিতালি যেন জাদুর মতো মায়াবী মনে হয়।

রাত ১০টায় আমাদের রাতের খাবার পরিবেশন করা হলো। আশাহত হতে হয়নি। খাবারের স্বাদে যেন একইসাথে পাকা বাবুর্চির হাতের ছোঁয়া আর ঘরোয়া রান্নার মিশেল। আর ডাল চচ্চড়িকে মাস্ট ট্রাই আইটেমের খাতায় ফেলে দেওয়া যাবে কোনো সন্দেহ ছাড়াই। খাবার পরে কেবিন বয়কে দিয়েই চা বা কফি এনে নিতে পারেন, জম্পেশ খানাদানার পর আয়েশ করে এসি কেবিনে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে লঞ্চের দুলুনি উপভোগ করার মধ্যে একধরনের রিল্যাক্সেশন কাজ করে বৈকি।

রাতের খাবারের পরেই নদীর সাথে আসল সখ্য শুরুর সময় শুরু হয়। নদী ভ্রমণ করার ইচ্ছে হলে খেয়াল রাখবেন ভ্রমনের দিন যেন আকাশে জোছনা পাওয়া যায়, চাঁদের আলোয় নদীর অপরূপ সৌন্দর্য দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছিল। রাত বাড়ার সাথে সাথে সামনের ডেকে ভিড় কমতে থাকে। শুধু আপনি আর প্রকৃতি মিলেমিশে একাকার। আলো-আঁধারির মাঝে হঠাৎ করেই নদীপাড়ের ছোট ছোট জনপদগুলো দেখতে খুবই ভালো লাগবে। লঞ্চের পাশাপাশি বিভিন্ন নৌযানের ছুটে চলা আর জেলেদের ছোট

ডিঙি নৌকা দেখা যায় প্রায়শই। প্রকৃতির এত এত রূপের পসরার পর্দা তুলতে তুলতে যদি একটু ব্রেক চান, বা খিদে পেয়ে যায় তো আপনার জন্য লঞ্চের স্ন্যাক্সবার তো আছেই। নাস্তার সাথে কফিও পেয়ে যাবেন, গভীর রাত পর্যন্ত স্ন্যাক্সবার খোলা থাকে।

এককাপ কফি নিয়ে ডেকের পাশের চেয়ারে বসুন আর হারিয়ে যান। একের পর এক ঢেউ গুণতে গুণতে আপনার নিজেকে নদীমাতা বাংলার সন্তান বলেই মনে হবে, খুঁজে পাবেন নিজের অস্তিত্বকে। আপনি চাইলে সামনের ডেকে বেডশিট বিছিয়ে শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখতেও পারেন। একেবারে গরমের সময়ে না গেলে চাদর নিতে ভুলবেন না। লঞ্চ ইট-কাঠের ঢাকা পেরিয়ে নদীর যত ভেতরে যাবে ঠান্ডার প্রকোপ তত বাড়বে। লঞ্চে যদি একটু ঘুমিয়ে নিতে চান তবে কেবিন তো আছেই, চাইলে পুরোটা রাত বাইরে বসে বা শুয়েও পার করে দিতে পারেন। নদীর সাথে এগিয়ে যেতে যেতে কখন যে বরিশাল পৌঁছে যাবেন তা টেরও পাবেন না।

বরিশালের লঞ্চগুলোর কোনো স্টপেজ নেই, বিরতিহীন চলে। তবে লম্বা রুট যেমন পটুয়াখালীর লঞ্চ অনেকগুলো ঘাটে যাত্রী নামায়। সকালেও নদীর সৌন্দর্য দেখতে চাইলে এগুলোতে ভ্রমণ করতে পারেন। নদীপাড়ের জনপদ আর তাদের জীবণযাত্রাও দেখা হয়ে যাবে তাতে।

সবমিলিয়ে লঞ্চে নদীভ্রমণ কম ঝামেলা আর কম খরচে মানসিক প্রশান্তি পাওয়ার এক কমপ্লিট প্যাকেজ বলতে পারেন। তবে ভ্রমণের সময় সুনাগরিকের পরিচয় দিন। নির্দিষ্ট ডাস্টবিন ব্যবহার না করে নদীতে ময়লা ফেলতে যাবেন না। মনে রাখবেন পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রতিটি সুনাগরিকের দায়িত্ব।


তানভীর

ছবিঃ ফুয়াদ তানভীর অমি