মঙ্গলবার,১৮ Jun ২০১৯
হোম / জীবনযাপন / অটিস্টিক শিশুর পরিবারকে যা কখনও বলতে নেই
১২/১০/২০১৮

অটিস্টিক শিশুর পরিবারকে যা কখনও বলতে নেই

-

যদি আপনার শিশু অটিজমে আক্রান্ত হয় তবে আপনার কাঁধে অনেক দায়িত্বই বর্তে যায়। কিন্তু যখন অন্যের কাছে তার সন্তানের অটিজমে আক্রান্ত হবার সংবাদ পান তখন? তখন অনেকটা ঝোঁকের বসে কিংবা তাৎক্ষণিক উত্তর হিসেবে অনেক কিছুই বলে ফেলার আশঙ্কা থাকে, যা সেই বাবা-মায়ের জন্য সহ্য করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। চলুন দেখে নেওয়া যাক তেমন কিছু উদাহরণ এবং সেসবের পরিবর্তে যা বলতে পারেন।

‘আমি দুঃখিত’
এই কথাটা প্রায় সবাইই এমন কোনো খবর শুনলে মুখ ফসকে বলে ফেলি। ধরুন, আপনি অটিজমে আক্রান্ত শিশুর অভিভাবককে বেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং সরল মনেই বলে ফেললেন ‘খুব কষ্ট লাগলো মেয়েটা/ছেলেটার কথা শুনে’। কথাটি আপনি সমবেদনা জানানোর জন্য বললেও এটি অটিজমে আক্রান্ত শিশুর বাবা কিংবা মাকে দারুণ ব্যথা দিতে পারে। তিনি ব্যাপারটাকে সম্পূর্ণ অন্য দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখতে পারেন। তিনি আপনার সমবেদনা কামনা নাও করতে পারেন। সুতরাং, সবার আগে অটিজমে আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা চোখে দেখার প্রবণতা বাদ দিন। এসব ক্ষেত্রে সান্ত¡না দেয়া কিংবা সমবেদনা জানানোর পরিবর্তে অভিভাবককে সন্তানের ভালোলাগা, মন্দলাগাসহ নানা জিনিস সম্পর্কে স্বাভাবিক খোঁজখবর নিন। অথবা পরিবেশ এবং মেজাজ মর্জি বুঝে জানতে চাইতে পারেন সব মিলিয়ে তাদের অবস্থা কী। এভাবে আবেগ-অনুভূতি ভাগ করলে বোঝা অনেকটাই হালকা হয়ে যায়। এবং দিনশেষে এই ভার লাঘবের বিষয়টি সেই বাবা-মাকে মানসিকভাবে শক্ত হতে সাহায্য করতে পারে।

‘আহা রে!’
অটিজম মানুষের বিশেষ স্নায়ুতান্ত্রিক অবস্থা। এক অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতাও বলা চলে। এমন কোনো অবস্থার কথা যখন জানবেন তখন উপরোক্ত কথাটি বলবেন না কখনো। কেননা যা শুনে আপনার কাছে বেশ দুঃখজনক মনে হচ্ছে তা সেই বাবা মার জন্য কঠিন

বাস্তবতা। আর সে সংবাদ আপনাকে জানানোর ফলে যদি এমন কোনো উত্তর শোনেন তারা, তবে তা তাদের ক্রোধান্বিতও করে তুলতে পারে। আপনার এই অতি আহ্লাদময় আচরণে কিছুটা অবজ্ঞাভাব ফুটে উঠতে পারে যা কখনোই উচিত নয়।

‘তার বিশেষ ক্ষমতা কী?’
যারা অটিজম সম্পর্কে খুবই কম ধারণা রাখেন তাদের সবারই একটা ভুল ধারণা থাকে যে অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে থাকে। যার ফলেই এমন সংবাদ শোনার পরেই জিজ্ঞেস করে ‘আপনার সন্তানের বিশেষ ক্ষমতা কী’? অনেকেরই অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ আগ্রহ, আসক্তি কিংবা দক্ষতা থাকে চাই সে মানুষটি অটিজমে আক্রান্ত হোক বা না হোক। কিন্তু একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে যে প্রত্যেকটা মানুষই আলাদা এবং যোগ্যতা ও দক্ষতা প্রদর্শনীর ক্ষেত্রেও তারা প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র। ‘আপনার সন্তানের বিশেষ দক্ষতা কী’ জিজ্ঞেস করার চেয়ে ‘সে কেমন জিনিস পছন্দ করে’ কিংবা ‘কোন কোন ব্যাপারে তার আগ্রহ বেশি’ জিজ্ঞেস করায় অধিক সৌজন্য বজায় থাকবে। তাতে করে আক্রান্ত শিশুর বাবা-মার জন্য সন্তানকে নিয়ে কথা বলা সহজ হয়।

‘আপনি যে কি করে ম্যানেজ করেন, আমি ভাবতেই পারি না’
অটিজমে আক্রান্ত শিশুর বাবা-মার সবচেয়ে বেশি শোনা মন্তব্যের যদি তালিকা করা হয় তবে এই মন্তব্যটি বেশ উপরের দিকেই
অবস্থান করবে। এটাকেও আরেকটা স্বতঃস্ফূর্ত মন্তব্য বলেই ধরে নেওয়া চলে; কিন্তু একবার ভেবে দেখুন, এটা তার মানসপটে কেমন প্রভাব ফেলে। অথচ তারা আর সব বাবা মায়ের মতোই সন্তানকে খাওয়ান, পড়ান, লালন-পালন করেন। হ্যাঁ, হতে পারে সেটা একটু কঠিন। কিন্তু অটিজমে আক্রান্ত শিশুর লালন-পালনে তাদের অনেক সমস্যা পোহালেও অন্য বাবা-মায়ের মতই তারা সন্তানের কাছ থেকে পায় অনেক আনন্দের মুহূর্তও।

আমি পড়েছি এর কারণ...
দয়া করে অটিজম আক্রান্ত শিশুর মা-বাবাকে বলতে যাবেন না যে বাচ্চার অটিজমের কারণ তাদের কেউ! পৃথিবীতে রোজই হরেকরকমের গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। খেয়াল করলে দেখবেন অটিজম সম্পর্কিত বেশিরভাগ 'গবেষণাই' শেষমেশ জিনগত সমস্যাতে গিয়ে ঠেকে। আর বেশিরভাগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং তাদের গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নাতীত নয়। সুতরাং আপনার পড়া কোনো কিছুতেও যদি এমন লেখা থাকে তবে সেটা অটিজম আক্রান্ত শিশুর বাবা-মাকে বলা থেকে বিরত থাকুন। কেননা আপনার এ তথ্য তাদের কোনো প্রকার উপকারে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বরং উলটো আপনার মন্তব্য তাদেরকে মানসিকভাবে পীড়া দিতে পারে।

নাহিয়ান ইসলাম
মডেলঃ রাকা আবেদীন, ওয়ানিদা আবেদীন, শাইয়েদুল আবেদীন
ছবিঃ শুহরাত শাকিল চৌধুরী