শনিবার,২০ অক্টোবর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / ফ্রিদা কাহলো
১০/০৪/২০১৮

ফ্রিদা কাহলো

- সালেহা চৌধুরী

২০০৭ সালে ফ্রিদা কাহলোর জন্মশতবার্ষিকী পালিত হয়েছে। বড় একটি মিউজিয়ামে তাঁর যাবতীয় শিল্পকর্মের প্রদশর্নী চলেছিল অনেকদিন ধরে। তাঁর লেখা অসংখ্য অপ্রকাশিত চিঠির এক্সজিবিশনও হয়। কাসা আজুলে যে বাথরুমটি ব্যবহার করতেন ফ্রিদা তার নানা ছবি ও জিনিস এ-প্রদশর্নীতে ঠাঁই পেয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর পঞ্চাশ বছর এ-বাথরুমটিকে তালাবন্ধ করে রাখা হয়। সুরিয়ালিস্ট শিল্পী ফ্রিদা শিল্পের স্বাক্ষর ছিল বাথরুমের দেয়ালে, কাবার্ডে এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিকে। তাঁর মেক্সিকান চরিত্র এখানে কতখানি পরিস্ফুট হয়েছে তাও বোঝা যায় বাথরুমটাকে ভালো করে পরীক্ষা করলে। সেইসময় ইতালির এক থিয়েটার কোম্পানি এই উপলক্ষে থিয়েটার দেখাতে শুরু করে। থিয়েটারে দুটো চরিত্র। এক ফ্রিড কাহলো এবং এক তার বন্ধুস্থানীয় নার্স বা ন্যানি। দি ‘ওয়াকার আর্ট সেন্টার’ তার বিবিধ ছবি দেখাতে শুরু করেছে। বলছে ফ্রিদা সর্বকালের একজন বড় শিল্পী। মেক্সিকোর রাজধানীর এয়ারপোর্টে ফ্রিদা এবং তার স্বামী ডিয়েগো রিভেয়েরার ছবি টানানো হয়েছে। দুজনের জটিল সম্পর্কের মধ্যেও যে মিল ছিল বা অমিল ছিল সবকিছুই স্থান পেয়েছে ওদের আঁকা ছবিতে।

কে এই নারী?
এ সেই নারী যিনি পঙ্গুতার দেয়াল চুরমার করেছিলেন। বেরিয়ে এসেছিল এমন এক ফ্রিদা যাকে তিনিই কেবল ভালো করে জানতেন, আর কেউ নয়। কেউ কেউ বলেছিল, ওর ছবি? বোমার গলায় বেঁধে দেওয়া হয়েছে একটি নীল ফিতে। তার নানাছবি, তার বিমূর্ত ভাবনা তাকে মেক্সিকোর একজন বড়মাপের শিল্পী হিসাবে চিহ্নিত করেছে। কেউ কেউ বলেন ফ্রিদা কাহলো মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় আঁকিয়ে। তিনি শিল্পের এমন এক ঐতিহ্য রেখে গেছেন যা সকলকে ছাড়িয়ে যায়। তার সেই গ্রাম্য গাথার ভঙ্গিমা তাঁর একার। যাকে ইংরাজিতে বলা হয় “ফোকলরিক” স্টাইল। যেন ফ্রিদা দিন দিন ধরে কেবল নিজের কথাই ছবিতে ফুটিয়ে তুলেছেন। তার সারাজীবনের ভাবাবেগের যন্ত্রণা, শরীরের পঙ্গুত্বা সব কিছু নিঃশব্দে মেনে নিয়ে তিনি এঁকেছেন ছবি। একা, আপনমনে। বিয়ে তাকে সুখী করেনি। একবার নাকি প্রেমও করেছিলেন তাতেও শান্তি আসেনি। এঁকেছেন দুইশোরও বেশি ছবি।

জন্মগ্রহণ করেছিলেন জুলাই মাসের ছয় তারিখে, ১৯০৭ সালে। মারা যান জুলাই মাসের তেরো তারিখে, ১৯৫৪ সালে। তাঁর ছবি ইউনিক। কারণ প্রতিটি ছবিতে তিনিই বিরাজ করেনÑ নানাভাবে, নানাভঙ্গিমায়। বলেন, আমি কেবল নিজেকে আঁকি। “আই প্রিন্ট সেল্ফ-প্রটেট।” কারণ? “বিকজ আই এ্যাম অফেন এ্যালোন। বিকজ আই এ্যাম দি পারসন আই নো বেস্ট।” নিজেকে তিনি নিজে যেভাবে জানেন তেমন আর কেউ জানে না। তার জীবনীকার হেইডেন হেরেরা বলেন, ফ্রিদার ছবিগুলোকে একধরনের মনস্তাত্তি¡ক সার্জারি বা শল্যচিকিৎসা বলা যায়, বলা যায় যে জীবনকে তিনি ক্রমাগত অস্বীকার করেছেন তারই রূপকার। কি সার্জারি করেছেন ফ্রিদা? নিজেকে? না জীবনের নানা ঘটনাকে? হয়তো দুটোই। তাঁর বেদনাকে আর একটা ফ্রিদায় ঢেলে দিয়েছেন তিনি। যে ফ্রিদা তাঁর নিজের আঁকা। তাঁর স্বামীর সঙ্গে এক বেদনাদায়ক সম্পর্ক। তাঁর স্বামীও ছিলেন শিল্পী। বলেছেন একবার স্ত্রীর ছবি সম্পর্কে -ফ্রিদা তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করে, তার হৃদয় উৎখাত করে বলতে চেয়েছেন তার বেদনা বা অনুভবের স্বরূপ কি ছিল। তাঁর স্বামীকে কেউ কেউ মার্কসিস্ট বলেন। ডিয়েগো রিভেয়েরা তার নাম।

মেক্সিকো শহরের শেষ প্রান্তে একটা নীল বাড়িতে জন্ম তাঁর। সকলে বাড়িটাকে বলত ব্লুহাউস। বাবার নাম গিলেমারো কাহলো। পাঁচ ভাইবোনের একজন ফ্রিদা। বাবা ছবি তুলতেন, ছবি আঁকতেন। অস্ট্রোহঙ্গেরিয়ান জুইশ রক্ত ছিল তাদের বংশে। মায়ের নাম মাটিলডা কাহলো। একজন ধর্মপরায়ণ নারী তিনি। ১৯২২ সালে কাহলো যখন স্কুলে ভর্তি হন, বলেন তাঁর বয়স দশ বছর। কারণ? দীর্ঘদিন অসুখে স্কুলে আসার যোগ্যতা অর্জন করেননি। ফলে আর সব ছোট ছেলেমেয়ের সঙ্গে তাকে কি করে মানায়? তাই বয়স কমানোর চেষ্টা। ১৯১০ সালে মেক্সিকোতে বিদ্রোহ হয়। কেউ কেউ বলেন নিজের জন্ম-তারিখ ১৯১০ বলে সেই বিদ্রোহকে জীবনের অংশ বলতে চেয়েছেন। উনিশশো কুড়ি সালের দিকে তিনি একজন নিবেদিত কমুনিস্ট হন। ছোটবেলায় পোলিও তাকে গ্রাস করেছিল। তিনি মানুষের অবরোধের যন্ত্রণা বুঝতেন। তিনি লঙ্ঘন করতে চেয়েছেন দেয়াল, দুর্মর হয়ে উঠেছিল তাঁর শিল্পের অনন্ত পিপাসা। লাস্ট ফর লাইফ নয়, লাস্ট টু সারভাইভ। হয়ে ওঠেন আঁকিয়ে, হয়ে ওঠেন কমুনিস্ট, হয়ে ওঠেন কবি। এরপর থেকে নানা সব সামাজিক জীবনের চালচিত্র তাঁর ছবির ভেতরে চলে আসে। চারপাশের নানাঘটনা। একটা ছবি এঁকে নাম দিয়েছিলেন- মাই ড্রেস হ্যাংগ দেয়ার। কাপিটালিস্ট নিউইয়র্ক নিয়ে আঁকা ছবি। যে জীবনযাপন তার প্রাণের সঙ্গে কথা কয় না। যে নিউইয়র্কের কাপিটালিজম তাঁর পছন্দ নয়।

তিনি ভালো ছাত্রী ছিলেন, লিখতে পারতেন, একজন ঈশ্বর অনুমোদিত আঁকিয়ে ছিলেন। তার বিকালঙ্গতাই জীবনের শেষ কথা ছিল না। তিনি ছিলেন - হাই স্পিরিটেড। প্রাণের পেয়ালায় জীবনের মদ সর্বদা উচ্ছল। ডাক্তার হতে চেয়েছিলেন। ১৯২৫ সালে স্কুল বাসের এক মর্মান্তিক দুর্ঘনায় পড়েন ফ্রিদা। তাঁর ছোটবেলার পোলিও তাঁর জীবনের শেষ ছোবল নয়। এবার যেটা হলো সারাজীবনের জন্য বিকলাঙ্গ হলেন তিনি। তাঁর মেরুদণ্ডের যে ক্ষতি হয়েছিল তা আর কোনোদিনই ভালো হয়নি। এইভাবে বেঁচে রইলেন ফ্রিদা কাহলো আমাদের বলতে জীবনের সীমাবদ্ধতা নিয়ে ভাববে না। তোমার হাতেই আছে মুক্তিপণের চাবি। যখন শয্যায় ভালো হয়ে উঠবার চেষ্টা করছেন শুরু করলেন ছবি আঁকা। খুলে গেল এক অনাবিষ্কৃত প্রদেশ। ফ্রিডা পা রাখলেন এক দিব্য জীবনে। একজন আঁকিয়ের কাছ থেকে একবার ছবি আঁকার হাতে খড়ি হয়েছিল এ ছাড়া কোনদিন ছবি আঁকার স্কুলে বা কলেজে তিনি যান নি। ফারনার্ডো ফারনানডেয তাঁকে হাতেখড়ি দিতে গিয়ে বলেছিলেন তিনি কাজ করছেন এক সুপ্ত আগ্নেয়গিরীর সঙ্গে। যেন একটা বোমা, কেবল গলায় বাঁধা একটা সমঝোতার নীল ফিতে। যে-কোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে পারে। কিউবিজম, ইতালিয়ান রেনেসাঁ, আর্ট নুভো, অরিয়েন্টাল আর্ট, এছাড়া সেই সময় মেক্সিকোতে ছবি আঁকার যে ধারা চলছিল তাকেও গ্রহণ করেছিলেন ফ্রিদা। আর সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল তাঁর নিজের স্টাইল। একশো বছর পরে যাকে একেবারে অভিনব, আনকোড়া বলে ভাবছেন সকলে। একশোরও একটু বেশি পরে।

১৯২৬ সালে নিজের একটা আত্মপ্রতিকৃতি করেছিলেন তিনি। মডিগলিওনির ছবির মতো। জোড়া ভ্রু, সুচারু বুদ্ধিদীপ্ত মুখ সে ছবিতে ফুটে উঠেছিল। ভ্রু দুটো কপালের উপর একটা ভি অক্ষর তৈরি করেছে। মনে হয় ঠোঁটের উপর পাতলা একটু গোঁফের রেখা। তারপর যেসব ছবি আঁকেন নিজের সঙ্গে সেইসব ল্যান্ডসস্কেপে ফুটে ওঠে বেদনার বুদবুদ। এর সঙ্গে আছে আনন্দের খবর। আসলে বেদনা ও বিষাদ তো একই পাত্রের পানীয়।

১৯২৮ সালে ফ্রিদা তাঁর আঁকা ছবিগুলো ডিয়েগো রিভিয়েরাকে দেখতে দেন। যিনি ছবি দেখে শিল্পীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য উদগ্রীব হ’ন। ১৯২৯ সালে তাদের বিয়ে হয়। কিন্তু সম্পর্কটা ছিল বেশ ঝড়ঝঞ্ঝাপূর্ণ। ইসমা নুগুচি নামে একজনকে ভালোওবাসেন ফ্রিদা। কিন্তু সে সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। লিওন ট্রটস্কিও নাকি তার বিশেষ বন্ধু ছিলেন। যিনি রাশিয়া থেকে পালিয়ে যান দেশের বাইরে। এরপর আর একটা দুঃখ ছিল কাহলোর। সেটা এই কোনোদিন তিনি সন্তানধারণ করতে পারবেন না এমন এক ব্যাপার। সন্তানের যত্নে যাদের সৃষ্টি করেছিলেন তার ভেতরেও দুঃখের সুঁচ তাকে ক্রমাগত বিদ্ধ করত। তাঁর শিশু জন্ম বা শিশু সর্ম্পকিত বিখ্যাত ছবিগুলোর নাম- মাই বার্থ (১৯৩২), হেনরি ফোর্ড হসপিটাল (১৯৩২, যেখান থেকে একটা অকালগর্ভপাত থেকে তিনি সেরে ওঠেন), মাই নার্স অ্যান্ড আই (১৯৩৭), মি অ্যান্ড মাই পালস (১৯৩৭)। এরপর দু’একটা ছবিতে নগ্ন ডিয়েগাকে হাতের ভেতর তুলে নিয়েছেন এমন করে মনে হয় এ তার একটা প্রিয় ছোট মানুষের অবয়ব। যে তার শিশুর পিতা হতে পারত কিন্তু পারেনি। ছবিগুলোর নাম দি লাভ এমব্রেস অব দ্য ইউনিভার্স, দি আর্থ, ডিয়েগো মি এ্যান্ড সিনিয়র জিলট।

১৯৩৮ তাঁর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। যখন আন্দ্রে ব্রিটন তাঁর ছবিগুলোকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করিয়ে দেন। যখন তাঁর ডান পা কেটে ফেলা হয়েছে তার শরীরকে পচনের হাত থেকে বাঁচাতে। এরপর তাঁর শরীর আরো খারাপ হয়ে যায়। সেই নীল বাড়িতে যে মাসে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই মাসেই মারা যান। কেউ কেউ বলেন তিনি নিজেকে হত্যা করেছেন। কারণ? এমন এক পচনশীল জীবনকে আর মেনে নিতে পারছিলেন না।