শনিবার,২০ অক্টোবর ২০১৮
হোম / স্বাস্থ্য-ফিটনেস / কিছু কমন স্ত্রীরোগ ও তাদের প্রতিকার
০৯/২৩/২০১৮

কিছু কমন স্ত্রীরোগ ও তাদের প্রতিকার

-

সবসময় ক্লান্ত বোধ করা, কোমরে ব্যথা, মাসিকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ অথবা মানসিক অবস্থার হুটহাট পরিবর্তন হতে পারে বিভিন্ন স্ত্রীরোগের লক্ষণ। বিশেষজ্ঞদের মতে বেশিরভাগ স্ত্রীরোগের সঙ্গে অনিয়মিত ও অস্বাস্থ্যকর জীবনাচরণের সম্পর্ক রয়েছে। তাই দৈনন্দিন জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসের কিছু পরিবর্তন আনলে বেশ কিছু স্ত্রীরোগের প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।

এন্ডোমেট্রিওসিস
গর্ভের আস্তরণে যেই টিস্যু থাকে তা প্রজননতন্ত্রের অন্যান্য অঙ্গ, যেমন- জরায়ু, ফ্যালোপিয়ান টিউব, মুত্রনালী অথবা পরিপাকতন্ত্রের আশপাশে দেখা দিলে তাকে এন্ডোমেট্রিওসিস বলে। সাধারণত কিশোরী ও তরুণীদের এ সমস্যা বেশি দেখা দেয়। এর প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে মাসিকের সময় তীব্র ব্যথা ও অতিরিক্ত রক্তপাত, পেটব্যথা, যৌনমিলনের সময় ব্যথা বা অস্বস্তি প্রভৃতি। তবে তীব্র ব্যথা এর প্রধান লক্ষণ এবং ব্যথার ফলে রোগীর
বিষণ্ণতার রোগও দেখা দিতে পারে। এ রোগটি ক্রমেই বাড়তে থাকে। ফলে এর লক্ষণগুলো দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া জরুরি। এছাড়া খাদ্যতালিকা থেকে কৃত্রিম দুধ, মাংস, অতিরিক্ত চিনি ও কার্বোহাইড্রেট, ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল বাদ দিয়ে খাদ্যপ্রাণসমৃদ্ধ খাবার, বিশেষ করে শাকসবজি, নন-জিএমও খাদ্য, মাছ ও আঁষযুক্ত খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস করলে এ সমস্যা কমতে পারে।

পলিসিস্টিক ওভারি (পিসিওএস, পিসিওডি বা পিসিও)
পলিসিস্টিক ওভারি মূলত ওভারিতে অনেকগুলো সিস্টের উপস্থিতি থাকা। এর জটিলতা শরীরের অন্যান্য অঙ্গের, যেমন- পিটুইটারি গ্ল্যান্ড, জরায়ু, অগ্নাশয়, এমনকি ত্বকের কাজেও বাধা সৃষ্টি করতে পারে। গর্ভধারণেও বাধার সৃষ্টি হতে পারে। পলিসিস্টিক ওভারির লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে মাসিক অনিয়মিত হওয়া অথবা একেবারে না হওয়া, ব্রণ, শরীরে অতিরিক্ত রোম, চুলঝরা, অতিরিক্ত ওজন প্রভৃতি। অতিরিক্ত ওজন থাকলে তা কমিয়ে ফেললে এই সমস্যার প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে।

পিএমএস
প্রি মেন্সট্রুয়াল সিনড্রোম বা পিএমএস নারীদের শুধু মানসিক নয়, শারীরিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। চিকিৎসকদের মতে, পিএমএস’র কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো পেট ফুলে যাওয়া, ব্যথা, স্তনে ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য অথবা ডায়রিয়া, ক্লান্তি ও সবসময় মাথাব্যথা করা। পিএমএস মোকাবেলা করার জন্য নিজের মাসিকের দিন-তারিখের হিসাব রেখে লক্ষণগুলো দেখা দিতে শুরু করলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

ভ্যাজাইনাল ইনফেকশান
প্রদাহ বা ইনফেকশানের সমস্যা মূলত ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মত চিকিৎসকদের। মাসিকের সময় প্যাডের ঘর্ষণে র‌্যাশ ওঠা, ইস্ট ইনফেকশান, ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস, ট্রাইকোমোনিয়াসিসের মতো যৌনসঙ্গমবাহী ইনফেকশানও এই সমস্যার মধ্যে পড়ে। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার লক্ষণ রাখা এবং নিরাপদ যৌনাচরণ এই সমস্যার প্রতিকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য মেয়েদের মাসিক শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পরিচ্ছন্নতার অভ্যাসগুলো গড়ে তোলা উচিত। একইসঙ্গে নারীদের হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচভিপি) সম্পর্কেও ধারণা রাখা উচিত, যা সারভিকাল ক্যান্সারের কারণও হয়ে উঠতে পারে।

ক্রনিক পেলভিক পেইন
কোমরে অর্থাৎ পেলভিক বোনের আশপাশে ব্যথা অন্যান্য স্ত্রীরোগের প্রভাবেও হতে পারে অথবা নিজেই সমস্যা হতে পারে। এই ব্যথা প্রচণ্ডভাবে হতে পারে, অথবা থেকে থেকে হতে পারে। ব্যথা পেশির টানের আকারেও হতে পারে। এছাড়া যৌনমিলনের সময় অথবা প্রসাবের সময়ও তীব্র ব্যথা হতে পারে। এসব সমস্যায় অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়া যাবে না।

পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ (পিআইডি)
পেলভিক অঞ্চলের আশপাশে প্রদাহ বা ইনফেকশান হলে তা পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ (পিআইডি) বলে। গর্ভধারণের পরে অথবা কোনো স্ত্রীরোগবিষয়ক পরীক্ষা বা অস্ত্রোপচারের পরে এটি হতে পারে। এর সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে যোনি থেকে অস্বাভাবিক ধরনের রস নিঃশরণ, যৌনসম্পর্কের সময় ব্যথা এবং অনিয়মিত ঋতুস্রাব প্রভৃতি। কখনও কখনও পিআইডি’র কোনো লক্ষণও দেখা যায় না। তাই এ বিষয়ে সতর্ক হওয়া জরুরি, কারণ এ থেকে বন্ধ্যাত্ব দেখা দিতে পারে। সাধারণত পিআইডি নিয়ন্ত্রণে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা। নিরাপদ যৌনাচরণও এর থেকে প্রতিকারের জন্য জরুরি।

ফাইব্রয়েডস
চিকিৎসকরা বলেন, ফাইব্রয়েডস আসলে জরায়ুতে উৎপন্ন হওয়া ছোট আকারের টিউমার। তবে এগুলো বিশাল আকারের হয়ে উঠতে পারে, এবং বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের জন্য মারাত্মক সমস্যার কারণ হতে পারে। ফাইব্রয়েডের দুই ধরনের প্রতিকার হতে পারেঃ অস্ত্রোপচার করে জরায়ু অক্ষত রেখে টিউমার ফেলে দেয়া, অথবা টিউমারের সঙ্গে জরায়ুও ফেলে দেয়া। ফ্রাইব্রয়েডের অবস্থানের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রোপচার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ফাইব্রয়েডের কোনো স্থায়ী সমাধান নেই।

ওভারিয়ান সিস্ট
ওভারিয়ান সিস্ট নারীদের জরায়ুতে হয়ে থাকে এবং সাধারণত এগুলো তরলে পূর্ণ থাকে। কিছু ওভারিয়ান সিস্ট চিকিৎসা ছাড়াও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। শরীরের কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণেও ওভারিয়ান সিস্ট হতে পারে। তবে এ ধরনের সিস্ট খুব বেশি দেখা যায় না। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে পেলভিক অঞ্চলে ব্যথা, ঘন ঘন প্রসাবের বেগ, ঋতুস্রাবের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত, শরীর ফুলে যাওয়া।

ঋতুস্রাবে বিভিন্ন সমস্যা
ঋতুস্রাবের সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে ডিসমেনোরিয়া, মেনোরেজিয়া/মেটোরেজিয়া এবং অ্যামেনোরিয়া। ডিসমেনোরিয়া হলো ঋতুস্রাবের সময় তীব্র ব্যথা হওয়া। এই ব্যথা এতো বেশি হতে পারে যে দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কাজকর্মও বাধাগ্রস্ত হয়। সাত দিনের বেশি স্রাব চলতে থাকলে তা মেনোরেজিয়া, আর দুই মাসিকের মাঝের সময়ে রক্তপাত হলে তা মেটোরেজিয়া। আর একেবারেই ঋতুস্রাব না হওয়াকে অ্যামোনোরিয়া বলে। এই সবগুলো সমস্যাতেই চিকিৎসকের নিবিড় পরামর্শ ও প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন। কারণ এগুলো আবার ফাইব্রয়েড, পলিপ অথবা হরমোনের অস্বাভাবিকতার লক্ষণ হতে পারে। সঠিক কারণ জানার জন্য হরমোনের পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো নির্ভুল হওয়া দরকার। এগুলোর মধ্যে কিছু সমস্যা ওষুধ ও জীবনযাপনে সামান্য পরিবর্তন আনার মাধ্যমে প্রতিকার করা সম্ভব।

- কাজী শাহরিন হক