শনিবার,২০ অক্টোবর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / মুরাশাকি শিকিবুঃ পৃথিবীর প্রথম ঔপন্যাসিক
০৯/২৩/২০১৮

মুরাশাকি শিকিবুঃ পৃথিবীর প্রথম ঔপন্যাসিক

- সালেহা চৌধুরী

মুরাশাকি শিকিবুর আসল নাম নিয়ে অনেকের নামের মতো রহস্য আছে। জাপানের হাইন ডায়ানিস্টিতে তাঁর জন্ম। ওর বাবা ছিলেন একজন মস্ত স্কলার ও সে কালে প্রদেশের গর্ভনর। তিনিই মেয়েকে বড় করেন। তখন জাপানের মেয়েরা চাইনিস ভাষা ইচ্ছা করলেই শিখতে পারত না। চিনে ভাষা শেখা তাদের নিষেধ ছিল। কিন্তু মুরাশাকি শিকিবু প্রায় নিজের জেদে ও মনের ক্ষুধা মেটাতে চাইনিস ভাষা শেখেন। বাবা দেখলেন মেয়ে ভাষা শেখায় এত ভালো করছে তিনি বলতে লাগলেন- আহা আমার মেয়ে ছেলে হলো না কেন। ছেলে হলে কত ভালো হতো। এমন মন্তব্য মুরাশাকির কেমন লেগেছিল কেউ বলতে পারবে না। তবে এ খেদ বাবার আজীবন ছিল।

এরপর একসময় দেখা গেল তাঁকে জাপানের রানি ‘লেডি-ইন ওয়েটিং’ করবার জন্য অনুমোদন করেছেন। রানি আকিকো তাঁর এই বিদ্যানুরাগের খবর পেয়েছিলেন মনে হয়। যখন তিনি রাজদরবারের কাজে গেলেন এটাই হলো তাঁর নাম। তার আগে কি নাম ছিল কে বলবে। বেশ অজানা ছিল তাঁর অবস্থান। কাজেই মুত্যুর পরও কেউ জানেনি সত্যিই তিনি কবে মারা গিয়েছিলেন। কাজেই আনুমানিক জন্মদিন ৯৭৮ খ্রিস্টাব্দ এবং মৃত্যু ১০১৪/১০২৫/৩০-এর মধ্যে। সেই কালে কোনো নারীর জন্মদিন ও মৃত্যুদিন ঘটা করে লিখে রাখা হতো না।

তিনি রাজ দরবারে গিয়ে ওখানে থাকতে শুরু করেন। তারপর ভালোমতো এই রাজদরবারের ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা ও খোঁজখবর করেন। হাজার বছরের ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেন। এছাড়া প্রতিদিন সেখানে কি ঘটছে তার একটা ডায়েরিও রাখতেন। যে ডায়েরি আজো আছে। সেই গোপন জগতের সব ঘটনা যা দেখেছেন, যা শুনেছেন সব লিখে রাখেন। ঠিক সেইসময় তিনি একটি উপন্যাস লিখতে শুরু করেন। নাম দিয়েছিলেন ‘দি টেল অফ গেঞ্জি।’ একজন রাজকুমারের সোনালি দিনের নানাঘটনা। তাঁর জীবন যে কত আকর্ষণীয় ও জানবার সেটাই তিনি প্রমাণ করবার চেষ্টা করেছেন। মুরাশাকি ওখানেই যা ঘটছে, যা জানছেন তাই লিখছেন। খোঁজ করবার দরকার কি? এই ভাবে লিখতে লিখতে চুয়ান্নপর্ব লিখে ফেলেন। একজন একা এতবড় বই লেখা সহজ নয়। তার চারপাশে যা ঘটছে সব লিখছেন। বইটি নাকি খুবই সমাদৃত হয়েছিল। সেই কালে অনেকে মিলে একটা বই লেখে। কিন্তু ‘টেল অফ গেঞ্জি’ লেখার সবটুকু কৃতিত্ব তাঁর। তাঁর আর একটি কাজ ছিল রাজপরিবারে যত সন্তাস জন্মগ্রহণ করে তাদের নাম লিখে রাখা। ফলে বৈধ অবৈধ অনেক শিশুর জন্ম তারিখ তাঁর জানা ছিল। সে-সূত্রে এদের পিতামার নাম।

আসল যে বই লিখেছিলেন তাকে আর সেইভাবে পাওয়া যায় না। পরে ‘স্ক্রল’ করা দড়ি বাঁধা কিছু কাগজ পাওয়া যায়। নাম দি ‘গোল্ডেন যুবরাজের জীবনী’। সেটা থেকেই বই হিসাবে বাজারে আসে। সেখানে এই নামেই তাঁকে পাওয়া যায়। তখনও তাঁর সত্যিকারের নাম পাওয়া যায় নাই।
কেউ কেউ বলেন তাঁর আসল নাম ছিল ফুজিআরা টাকাকো। অন্যরা নিশ্চিন্ত করে বলতে পারেন না। যে সব নারী রাজদরবারে কাজ করতে আসে তাদের নামধাম গোত্র কোথাও লেখা থাকে না। তারা সব রাজদরবারের একপাল মেয়ে। ওই পালের ভেতর থেকে একজনকে চিহ্নিত করা হতো না। তবে অন্য কেউ না করলেও মুরাশাকি নিজেই নিজেকে বিশেষ একজন করেছেন। যখন ‘কে এই নারী’ বলে হৈ চৈ পড়ে গেল তখন সকলে বলতে শুরু করল ওর বাবার কথা। ওর নিজের কোনো পরিচয় নাই। গভর্নরের মেয়ে এই ওর পরিচয়। তাঁর উপন্যাসের নায়িকার নামও ছিল মুরাশাকি শিকিবু।

দেখা গেল এই পৃথিবীর প্রথম উপন্যাসটি লিখেছেন তিনি। আর প্রথম উপন্যাসটি লেখার কারণে এখনতো অবশ্যই তাঁর একটা নাম হয়েছে।
উপন্যাস কেন লেখা হয়, সে নিয়ে মুরাশাকি শিকিবু লিখেছেন- ‘(দি আর্ট অফ নভেল) নানাঘটনা ঘটে কারণ যিনি লিখছেন তাঁর কিছু বলার থাকে, তাঁর বলার থাকে মানুষ ও চারপাশের জগতের কথা, ভালো বা মন্দ যাই তিনি দেখেন মনের গভীরে জমা হতে থাকে, কেবল দেখা নয়, অনেক ঘটনা তিনি নানাভাবে জানতে পারেন, কিছু কিছু তিনি অন্যের কাছে শুনেছেন, তারপর সেইসব ঘটনার একত্রিকরণে তাঁর ভেতরে একটা ভয়ানক পীড়া চলতে থাকে বের করে আনবার জন্য, আমি এই ঘটনাকে অন্য লোকজনকে বলব। বুকের ভেতর বন্ধ করে রাখতে পারছি না।’

এই তা হলো লেখার পেছনের ইতিহাস। বুকের ভেতর আটকে রাখা যায় না।

যদিও তিনি প্রচুর লিরিক কবিতা লিখেছিলেন কিন্তু ‘টেল অফ গেঞ্জি’ কে বলা হয় প্রোজ রোমান্স। ফলে এই বইটির গল্প বলার ধরনে ও কাহিনির বুননে পৃথিবীর সর্বপ্রধম উপন্যাস বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বেচারা মুরাশাকির কথা তেমন করে কেউ জানেন না, কেবল জানেন বাবা কোনো এক প্রদেশের গভর্নর। এই তো ছিল মেয়েদের জীবন। নিজস্ব পরিচয় কি আজো আছে? মিসেস রহিম, মিসেস খায়ের আর মিসেস মিয়ার ভেতর থেকে এখনো কি আমরা আসল মানুষটিকে খুঁজে বের করি না।

জীবনে একবার তাঁর কাজিনকে বিয়ে করেছিলেন। সেই কাজিন খুব তাড়াতাড়ি মারা যায়। মুরাশাকি একাই জীবন কাটান। লেখালেখি নিয়ে মগ্ন থাকেন। একসময় রাজদরবার থেকে রিটায়ার করেছিলেন। তারপর কি করছিলেন কে তার খোঁজ রাখেন। কেবল তাঁর বাবা নয় তাঁর দাদাও তাঁকে উৎসাহ দিয়েছিলেন। বাবার দুঃখ কেবল এই- আহা কেন ও ছেলে হলো না। ভাগ্যিস, ও খনার ভাগ্য পায়নি। তাহলে লেখার অপরাধে হাত কেটে ফেলতে হতো। না হলে বুড়ো আঙুল আর কড় আঙুল।

এই গেঞ্জির গল্প তিনি নাকি রাজদরবারে অভিনয় হবার জন্য লিখেছিলেন। কিছু কিছু অংশ দেখানো হয়েছিল এবং সমাদৃতও হয়েছিল। তাঁর রাজদরবারের চাকরির ভেতর এই সব লিখে স্টেজ করাও একটি কাজ ছিল তাঁর। সেইসময় তিনি পরিচিত ছিলেন লেডি মুরাশাকি বলে। তবে কেউ কেউ মনে করত তাঁর ডায়েরিতে ফুজি বলে যে বেগুনি ফুলের নাম আছে, সে নাম তার। এছাড়া রাজপরিবারে কে কখন জন্মগ্রহণ করেছিল সেসবও তাঁকে লিখে রাখতে হয়েছিল যত্ন করে, তাঁর নিজের নামটি কেউ লিখে রাখেনি।

মুরাশাকি সেই কালের আরো যারা সাহিত্যচর্চা করে বলে জানতেন তাদের ঠিক চিনতেন না। নিজের জগতে একা। লিখে চলেছেন। বাইরের জগতে কে কি করছে সে সব খবর সবটুকু না পেয়েও তিনি ঠিক পথেই চলেছেন।

গেঞ্জি ছিল এক রাজপুত্রের অবৈধ সন্তান। হিকাকোরা গেঞ্জি ছিল তার পুরোনাম। এরপর ওর জীবন নানা ঘাত- প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে শুরু হয়। গেঞ্জির প্রিয়তমা স্ত্রীর একটি অবৈধ সন্তানের জন্ম হয় ঠিক তারই জন্মের মতো। এরপর যে স্ত্রীকে তিনি খুব ভালোবাসতেন, সে স্ত্রী মারা যান। এই মুত্যু গেঞ্জিকে খুব কষ্ট দেয়। এরপর সব ফেলে হিকাকোরা গেঞ্জির পর্বতের কুটিরে গিয়ে বসবাস করেন। এই গ্রন্থে আছে তিনটি বড় বিভাগ। তার নিচে আছে ৫৪টি পর্ব। এরপর চারপাশের ঘটনাগুলো বইটাতে অবলীলা ক্রমে চলে এসেছে। দীর্ঘদিন এই বইয়ের কথা কেউ জানতে পারেননি। খণ্ড খণ্ড নাটক নয়, পুরো একটা বই যে তিনি লিখেছেন, সে-কথা জানতে সকলের অনেকদিন লেগেছিল। যদিও তিনি কবি, তবে বইটি লিখেছিলেন খাঁটি গদ্যে। এখন যে বইটি সকলে দেখেন নানা শিল্পীর ছবিতে তা একটি নতুন চেহারার বই হয়ে গেছে। তবে ভেতরের গল্প ঠিকই আছে। অনেকে কল্পনায় মুরাশাকি শিকিবুর ছবি এঁকেছেন। একজন কবি চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছেন কখনো তিনি লিখছেন। ছবি কতটা সত্যি কে বলবে। তবে বইটি সত্যি। এবং সারা পৃথিবী স্বীকার করেছে এইটি পৃথিবীর সর্বপ্রথম উপন্যাস এবং গদ্যে লেখা।

অতএব যে নামেই তাকে ডাকা হোক, তিনি আমাদের অগ্রবর্তী একজন সাহসী নারী।