শনিবার,২০ অক্টোবর ২০১৮
হোম / স্বাস্থ্য-ফিটনেস / গর্ভাবস্থায় বিপদসংকেত ও সাবধানতা
০৮/১১/২০১৮

গর্ভাবস্থায় বিপদসংকেত ও সাবধানতা

-

মাতৃত্বের স্বাদ একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান আর আরাধ্য বিষয়। কিন্তু সন্তানধারণ আর জন্মদান একটি জটিল প্রক্রিয়া। আর বাংলাদেশে গর্ভকালীন মা আর শিশু মৃত্যুহারও আশঙ্কাজনক পর্যায়ের। গর্ভাবস্থায় একই দেহে দুই প্রাণের অস্তিত্ব থাকে। তাই সর্বোচ্চ সতর্কতা আর যত্নের প্রয়োজন। গর্ভকালীন কিছু বিপদ চিহ্নের থেকে সবসময় সাবধান থাকতে হয়, সঠিক তথ্য আর তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা পারে মূল্যবান জীবন বাঁচাতে।

রক্তপাতজনিত সমস্যা
গর্ভাবস্থায় সামান্য রক্তপাত হওয়া স্বাভাবিক একটি ঘটনা। তবে অতিরিক্ত রক্তপাত একটি চিন্তার বিষয়। গর্ভকালীন রক্তপাতের নানারকম কারণ থাকতে পারে। তবে তলপেটে ব্যথাসহ রক্তপাত ‘এক্টোপিক প্রেগনেন্সি’র কারণ। ভ্রূণ যখন জরায়ুর বাইরের দিকে অবস্থান করে তখন এই সমস্যা দেখা দেয়। তাই এটি হেলাফেলার বিষয় নয়। এমন আরও বেশ কিছু কারণে অতিরিক্ত রক্তপাত হতে পারে, দ্রুততার সাথে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।

নিয়মিত কনট্র্যাকশন হলে
গর্ভকালীন সময়ে একটি নিয়মিত আর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো কনট্র্যাকশন। প্রত্যেক নারীই ভিন্নভাবে এটি এক্সপেরিয়েন্স করে থাকেন। ডেলিভারির দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথেই এর মাত্রা বাড়তে থাকে। কনট্র্যাকশন কিছু উপসর্গ আছে।
- প্রাইমারি স্টেজের কনট্র্যাকশনগুলো খুবই মৃদু আর অনিয়মিত, সামান্য ব্যাকপেইনের মতো হয়ে থাকে।
- কনট্র্যাকশন কোমরের পিছন দিক থেকে শুরু হয়ে তলপেট আর পরে উরুতে ছড়িয়ে পড়ে, সামান্য ব্যথা হতে পারে।

সাধারণত তিন প্রকারের কনট্র্যাকশন আছে, প্র্যাকটিস, ফলস ও অ্যাকচুয়াল। প্র্যাকটিস কনট্র্যাকশন প্রেগন্যান্সির পুরো সময়জুড়েই অনিয়মিত ভাবে হয়ে থাকে, যা মৃদু। অ্যাকচুয়াল কনট্র্যাকশন হলো ওয়ার্নিং সাইন, যা ডেলিভারি ডেট ঘনিয়ে আসা ইঙ্গিত করে। এই কনট্র্যাকশনে ব্যথা তীব্র আর স্থায়ী হয়, যা সামান্য নড়াচড়া করলেও দূর হওয়ার নয়। এর মাত্রা আর তীব্রতা সময়ের সাথে না কমে বরং বাড়তে থাকে। এর সাথে ডায়রিয়া আর কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা যুক্ত হতে পারে। কোমর, তলপেট আর উরুতে তীব্র ব্যথা হলেই বুঝতে হবে এসব অ্যাকচুয়াল কনট্র্যাকশন উপসর্গ। ৫-১০ মিনিট স্থায়ী হলেই ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ আবশ্যক।

অতিরিক্ত বমি ভাব এবং বমি হওয়া
গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন হরমোনের নিঃসরণ বমির কারণ হয়ে থাকে। প্রথম তিন মাস এটি বেশি হয়, যা একটি স্বাভাবিক ঘটনা। তবে অতিরিক্ত বমি ভাব আর বমি হওয়া গুরুতর সমস্যা ইঙ্গিত করে। পানিশূন্যতার কারণেও বমি হতে পারে। অতিরিক্ত বমির সমস্যায় দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিলে আরোগ্য লাভ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।

খিঁচুনি হলে
একলামসিয়ার প্রধান লক্ষণ খিচুনি। যার ফলে মা ও শিশু দুজনেরই ক্ষতি এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। গর্ভাবস্থায়, প্রসবের সময় বা পরে, যখনই খিঁচুনি হোক মাকে সাথে সাথেই বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।

বাচ্চার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেলে
প্রেগনেন্সির ২৮ সপ্তাহের পর থেকে বাচ্চার নড়াচড়া করা খুবই রেগুলার হয়ে থাকে। মা সহজেই তা অনুভব করতে পারবেন। যদি বাচ্চা নড়াচড়া করা বন্ধ করে দেয় বা স্বাভাবিকভাবে না নড়ে তবে সাথে সাথেই ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।

ভীষণ জ্বর হলে
গর্ভাবস্থায় বা প্রসবের পরে তিনদিন টানা জ্বর প্রধান বিপদ চিহ্নগুলোর একটি। এর সাথে দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাবের সমস্যাও হতে পারে। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা আর সাথে প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া হল ইনফেকশনের লক্ষণ। এক্ষেত্রে প্রায়শই হেলাফেলা করা হয়, যাতে সমস্যা আরও প্রকট হয়ে পড়ে। দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণে এই সমস্যা থেকে মুক্তি সম্ভব।

অসময়ে পানি ভেঙে যাওয়া
এমনিওটিক ফ্লুইড, যাতে বাচ্চা আবৃত আর সুরক্ষিত থাকে তা সঠিক সময়ের আগে ভেঙে যাওয়া বিপদের লক্ষণ। ফুল টার্ম হওয়ার আগেই এই ঘটনা ঘটলে সাথে সাথে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। প্রসবের নির্ধারিত তারিখের অনেক আগেই এমনিওটিক ফ্লুইডের ভেঙে যাওয়া মা ও বাচ্চা উভয়ের জন্য বিপজ্জনক। মায়ের ইনফেকশন আর বাচ্চার অপরিণত জন্ম এমনকি উভয়ের মৃত্যুও হতে পারে। এছাড়া বাচ্চা অপরিপক্ব হতে পারে।

এই বিপদ চিহ্নগুলো ছাড়াও মায়ের পরিচর্যায় যারা থাকবেন তাদের আরও কিছু দিকে খেয়াল রাখতে হবে, সাথে সাথে মাকেও সাবধান হতে হবে। এমন কিছু বিষয় হলোঃ
* গর্ভকালীন সময়ে উচ্চরক্তচাপ নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। যাদের এই সমস্যা আছে তাদের এ সময়ে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
* তলপেটে ব্যথা হলে অবহেলা না করে তাৎক্ষণিকভাবে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।
* অনেকের এ সময়গুলোতে ডায়বেটিসে ভুগতে হয়, প্রেগন্যান্সির সময় ডায়াবেটিসের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে।
* চোখে ঝাপসা দেখা আর তীব্র মাথা ব্যথা হওয়া একটি বিপদচিহ্ন। এসব সমস্যায় দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

- তানভীর ইসলাম
ছবিঃ শুহরাত শাকিল চৌধুরী