সোমবার,১৯ নভেম্বর ২০১৮
হোম / ফিচার / হালিমা খাতুনঃ এক ভাষা সৈনিকের কথা
০৭/৩০/২০১৮

হালিমা খাতুনঃ এক ভাষা সৈনিকের কথা

-

বিদ্রোহ আর সাহিত্যের আরাধনা- দুটো ভিন্ন জিনিস। কিন্তু তা একই জীবনে নিয়ে আসা হলো সাধনা। এমনই একজন নিভৃত সাধক হালিমা খাতুন, আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন ৩ জুলাই। রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।

একাধারে একজন ভাষাসৈনিক, শিক্ষক, সাহিত্যিক আর রাজনীতি সচেতন এই নারী তার পুরোটা জীবন আড়ালেই কাটিয়ে দিয়েছেন। পর্দার ওপারে থাকতে ভালোবাসা এই সংগ্রামী মানুষের জীবনকে শ্রদ্ধা জানিয়েই আজকের এই লেখা।

১৯৩৩ সালের ২৫শে আগস্ট বাগেরহাট জেলার বাদেকাড়াপাড়া গ্রামের মৌলবি আব্দুর রহিম শেখ আর দৌলতুন নেসার ঘর আলো করে জন্ম নেন হালিমা খাতুন। বাদেকাড়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে মনমোহিনী গার্লস স্কুল আর বাগেরহাট প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজের পাঠ শেষ করে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে ইংরেজিতে এম এ পাস করে পরবর্তীসময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম এ করেন।

বর্ণাঢ্য এই শিক্ষাজীবনে সাফল্যের মুকুট পরেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নর্দার্ন কলোরাডো থেকে পিএইচডি করে। ক্যারিয়ার শুরু করেন ১৯৫৩ সালে, খুলনা করোনেশন স্কুল এবং আর কে গার্লস কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে যোগ দেন আর ১৯৯৭ সালে এখান থেকেই অবসরে যান তিনি।

শিক্ষা আর কর্মজীবনে সফল এই মানুষটি বাঙালির প্রাণের আন্দোলন, ভাষা সংগ্রামের এক অগ্রসৈনিক ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সামনে থেকে যে কয়জন হাতে গোনা মানুষ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, হালিমা খাতুন তাদের অন্যতম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই তিনি ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের আমতলার সমাবেশে মুসলিম গার্লস স্কুল এবং বাংলা বাজার গার্লস স্কুলের মেয়েদের নিয়ে তিনি উপস্থিত হন। ৪৪ ধারা ভেঙে মেয়েদের যে মিছিল বের হয়েছিল তাতে হালিমা খাতুন জুলেখা, রওশন আরা বাচ্চু, নূরী আর সেতারার সাথে প্রথম সারিতে ছিলেন। মিছিলে গুলি চালানোর ছবি হালিমা খাতুনরাই পত্রিকা অফিসে সরবরাহ করেছিলেন। অর্থ সংগ্রহ আর কর্মী সংগঠন দুই ভূমিকাই পালন করে ভাষা আন্দোলনের সাফল্য এনে দিতে কঠিন পরিশ্রম করেন এই মহীয়সী নারী।

বিদ্রোহে আর সংগ্রামে অনন্য এই নারী সাহিত্যাঙ্গনেও নিজের কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। রচনা করেছেন অসংখ্য শিশুতোষ রচনা। প্রজ্ঞা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত তার শিশুতোষ বইগুলো তিনি সারাদেশের শিশুদের মাঝে বিলিয়েছেন জীবনের পুরোটা সময়।

হালিমা খাতুনের একমাত্র সন্তান জনপ্রিয় আবৃত্তিশিল্পী প্রজ্ঞা লাবণী তার মায়ের রচনাগুলো শিশুদের পাঠ্যক্রমে সংযুক্ত করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।

ভাষা আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা রাখায় শিল্পকলা একাডেমী তাকে ‘ভাষাসৈনিক’ সম্মাননা দেয়। তবে তার অবদানের জন্য একুশে পদক আর স্বাধীনতা পদক না পাওয়াটা অনেকেরই আক্ষেপের কারণ। হালিমা খাতুনের প্রয়াণে আমতলায় অনুষ্ঠিত শ্রদ্ধাজ্ঞাপন সভায় বক্তারা এই নিভৃতচারী মানুষটির জীবনভর কাজের সঠিক মূল্যায়নের দাবী জানান অকুন্ঠচিত্তে।

ন্যায়ের পক্ষে সাহসী লড়াই করা, সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন আর সর্বক্ষেত্রে সফল হয়েও সর্বদা পাদপ্রদীপের আলো থেকে দূরে ছিলেন এই নারী। নিভৃতে থেকে মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন এই মানুষটি। বিদ্রোহের বার্তা আর মননের উত্তরণে লেখনীর জন্য মানুষ হালিমা খাতুনকে স্মরণ রাখবে চিরকাল, যুগ থেকে যুগান্তরে।

- তানভীর জাহান