শনিবার,২০ অক্টোবর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / আংকল টমস কেবিন-এর লেখক হ্যারিয়েট বিচার স্টোয়া
০৭/০৮/২০১৮

আংকল টমস কেবিন-এর লেখক হ্যারিয়েট বিচার স্টোয়া

- সালেহা চৌধুরী

সমালোচক আংকলস টমস কেবিনকে সমালোচনা করতে ছাড়েন নি। বলেছিলেন বইটি - প্রপাগান্ডা সর্বস্ব, মেলোড্রামায় পরিপূর্ন, সাদা মানুষের কলংক গাঁথা, অতিরঞ্জন। যদিও টমের তিনজন প্রভুর মধ্যে দুইজনই ভালমানুষ তবু এমন সমালোচনা শুনতে হয়েছিল হ্যারিয়েট বিচার স্টোয়াকে। আবার কেউ কেউ বলেছিলেন - ওর লেখার কলম নিয়ে এসব বাড়াবাড়ির প্রতিবাদ না করলে একদিন বেয়োনেট নিয়ে কিছু উচ্ছঙ্খল মানুষের ক্রোধ সামলাতে হবে। এর চেয়েও বড় কথা হ্যারিয়েট বিচার স্টোয়া একজন নারী হয়ে এমন সব কথাবার্তা লিখতে যাবে কেন। বলতে হয় হ্যারিয়েট ভ্যাগ্যবতী। স্বামীই তাকে বার বার লেখায় উৎসাহিত করেছিলেন। তাঁর জীবনীকার তাঁর জীবনী গ্রন্থের নাম দিয়েছিলেন - রানওয়ে টু হেভেন। যেখানে জোহানা জনসনের একটা কবিতার চরণ তুলে বলেছেন - To her who in our evil time/ Dragged into light the nation's crime/ With strength beyond the strength of men/ And mightier than the sword, her pen.

আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন - একটা ছোটখাটো মানুষ ঘটিয়েছিলেন একটা বড় যুদ্ধ।

কনেকটিকাটের লিচফিল্ডে তাঁর জন্ম। ১৮১১ সালে জুনমাসের ১৪ তারিখে। বাবার নাম ছিল লাইমান বিচার। হ্যারিয়েট বাবার নয়জন সন্তানের ভেতর সপ্তম। মা মারা যাবার পর বাবা আবার বিয়ে করেন। সেখানে তার আরো চারটি সন্তান জন্ম গ্রহণ করে। কালভিনিস্ট বাবার সংসারে ভালমন্দ, ন্যায় অন্যায়ের জ্ঞান ছোট বেলা থেকেই ভালমত জেনেছিলেন হ্যারিয়েট। মানবতার উন্নতির কথা বাড়ির আর সব ছেলেমেয়েও ভাবতো গভীরভাবে।

১৮৩২ সালে কাজের জন্য বাবা আসেন সিনসিনাটি। এখানেই প্রথম হ্যারিয়েট দাস স্টেট কেনটাকির দাসেদের জীবনের বিবিধ করুণ ও অমানবিক ঘটনার সঙ্গে পরিচিত হন। তার ভাইয়েরা এই দাসপ্রথার বিরুদ্ধিতা করেছে। নানা ভাবে এসব ভয়ানক জীবনের মুক্তির কথা ভেবেছে। হ্যারিয়েট শোনেন আর ভাবেন। তখনো লিখতে শুরু করেননি।

১৮৩৬ সালে ওর বিয়ে হয় কালভিন স্টোয়া, যিনি ধার্মিক, বাইবেল পড়ান, সৎ ও মানবিক জীবনের প্রতি তাঁর সমর্থন চিরকাল। হ্যারিয়েট প্রথমে ম্যাগাজিনে একটু একটু করে লিখতে শুরু করেন। ওয়েস্টার্ন মাসিক পত্রিকা, দি নিউইয়র্ক এভানজেলিস্ট। তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম ‘দি মে ফ্লাওয়ারঃ স্কেচেস এ্যান্ড সিনস এ্যান্ড ক্যারেকটরস আমোং দ্য ডিসিডান্টস অফ দ্য পিউরিটানস’।

১৮৫০ সালে ছয় জন ছেলেমেয়ে নিয়ে স্বামীর কাজের কারণে তাদের মেইনসএ আসতে হয়। এই বছর ‘ফিউজিটিভ সেভ এ্যাক্ট’ প্রচলিত হয়। যদি কোন ক্রিতদাস কোনমতে পালিয়ে উত্তরে চলে যায় তাদের জোর করে ফিরিয়ে আনার আইন। উত্তরে দাসপ্রথা তখন আর ছিল না। এই আইনের ভয়াবহতা কি হতে পারে সেটা জেনে হ্যারিয়েটকে এইসব নিয়ে লিখতে নিজেকে বাধ্য করায়। তখন আর চুপ করে ছয়জন ছেলেমেয়ে ও স্বামী ও সংসার নিয়ে মেতে থাকা সমীচিন মনে হয় না তার। যারা দাস প্রথা পছন্দ করতেন না সেই ‘এ্যাবোলোসনিস্টের’ একটা পত্রিকা ছিল, নাম তার - ‘দি নেশনাল এরা’। এখানেই লিখতে শুরু করেন। নাম দিয়েছিলেন - ‘আংকল টমস কেবিন অর দি লাইফ আমোং দ্য লো লি’। তিনি টমের মৃত্যু এবং আর দুজন পলাতক ক্রিতদাসের লুকিয়ে থাকা নিয়ে লেখা শুরু করেন। টম বলেনি সেই গোপন জায়গার কথা যেখানে পলাতক ক্রিতদাস লুকিয়ে থাকে। ফলে তাকে মারতে মারতে মেরে ফেলা হয়। বলেন হ্যারিয়েট - এটা আমার ভোকেশন বা ভেতরের ডাক, আমি লিখছি না আমি ছবি আঁকছি। ঈশ্বর আমাকে দিয়ে এমন একটা কাজ করাবেন বলে ঠিক করেছেন। আমি কেবল তাঁর হাতের অস্ত্র। সেটা যাই হোক তিনি যে সমস্ত আমেরিকায় তোলপাড় এনেছিলেন, বিবেকের সমস্ত কলকবজাকে সজোরে নাড়া দিয়েছিলেন, রীতিমত হৈ চৈ পড়ে গিয়েছিল এই একটি বইতে সে বিষয়ে কোন প্রকার সন্দেহ নেই। তিনি সেই মহৎ নারী লেখক যিনি ভালর সঙ্গে মন্দও লেখেন। কাজেই টমের আগের দুই প্রভু শেলবিরা। যারা তাকে ভালমত দেখাশোনা করেছে। কিন্তু মারা যাবার পর গরু ছাগলের মত বিক্রি হয়ে যায় টম। ঘটনাক্রমে সেন্টক্লেয়ার নামের আর একজন ভালমানুষ তাকে ক্রিতদাস হিসাবে গ্রহণ করে। এদের মেয়ে ইভার প্রাণ বাঁচিয়েছিল টম। এরপর যখন সেন্টক্লেয়ার মারা যায় আবার সে বিক্রি হয়ে যায় আর একজন ক্রিতদাসের মালিকের কাছে। যার নাম সাইমন লেগরি। এ ছিল ভয়ানক শয়তান, একেবারে বদমায়েশের চুড়ান্ত। ক্রিতদাসকি মানুষ হয় নাকি? একটা জন্তু বৈত নয়? তার জন্য আবার এত ভাবতে হবে। ক্রিতদাস পালাবে কেন? যদি পালায় তাদের ধর, বেত মার, আগুনে পোড়াও, কড়াইতে ঝলসাও। এমনি নানা সাধারণ ঘটনা। সাইমন লেগরির অত্যাচারের রক্তস্রোত বেয়ে একদিন মুক্তি পায় ক্রিতদাস। আর আমি যদি বলি এই মুক্তির প্রফেট এলিজাবেথ বিচার স্টোয়া নামের একজন ছোটখাটো নারী যার গ্রন্থ কেউ কেউ বলেন প্রচার পুস্তিকা তাহলে বোধকরি বেশি বলা হবে না।

ভেবেছিলেন দু একখানা বই বিক্রি হলেও হতে পারে। না হলে লোক ধরে ধরে বিনাপয়সায় দান করতে হবে। কিন্তু এই বইকে বলা হয় ‘পাবলিশিং ফেনোমেনান’। দুইদিনে বিক্রি হয় পাঁচহাজার। তিন সপ্তাহের মধ্যে বিক্রি হয় কুড়ি হাজারের মত। এরপরের হিসাব এমন কেবল আমেরিকাতেই তিন মিলিয়নের বেশি বই বিক্রি হয়ে যায়। এখনো বিক্রি হচ্ছে। চল্লিশটিরও বেশি সংস্করণ হয় তখন। হটকেকের মত বিক্রি। পৃথিবীর যে কোন সভ্যভাষাতেই এই বইএর অনুবাদ হয়েছে। লংফেলো নামের কবি বিস্ময়ে লেখেন - How she is shaking the world with Uncle Tom's Cabin. Never was there such a literary coup-de-main as this. এটাই সত্য এমনটি আর আগে হয়নি।

টলস্টয় বলেন এতবড় কাজ সাহিত্য আর শিল্পের জগতে আগে ঘটতে দেখা যায়নি। ‘লা মিজারেবল’ বা ‘টেল অব টু সিটিসের’ সাফল্যের সঙ্গে তুলনা করেন তিনি। নানা জায়গায় নাটক হতে থাকে এই বই নিয়ে। তখনই শুরু হয় কিছু বিরোধী কথাবার্তা। এটি সাদাদের ছোট করছে। এমনি নানা কথা। কিন্তু বিরূপ সমালোচনা তৃণখন্ডের মত ভেসে যায় জনপ্রিয়তার কাছে। এরপর আংকল টম ক্রিতদাসের নাম এমন একটা নাম হয়ে যায় যার মুক্তি সকলেই চায় কেবল এই চরিত্রের কারণে। একটা অসাধারণ কিংবদন্তির জন্ম হয়। যখনই সমালোচনা কিছু বলতেন, উত্তরে বলতেন তিনি - ঈশ্বর যেখানে এসব চান না তখন মানুষ কি করে এসব ধরে রাখতে পারে। একে তিনি তার আত্মার চিৎকার বলে উল্লে¬খ করেন।

এরপর আরে নানা তৎকালীন সংস্কারমূলক কাজে যোগ দেন তিনি। নারীর ভোটাধিকার তার মধ্যে একটি। এরপর ক্রিতদাস নিয়ে আর একটি বই লেখেন ‘ড্রেডঃ এ টেল অব দ্য গ্রিট ডিসমেল সোয়াম্প’। কিন্তু আংকল টমের মত জনপ্রিয় আর কোনটি নয়। কিন্তু অন্যের সমালোচনায় কলম বাক্সে তুলে রেখে রান্নাবান্না করবেন? না। সেটা বোঝাতেই পরের বইটি লেখেন তিনি। যেখানকার বিষয়বস্তু দাসপ্রথা। এ ছাড়াও ছেলেবেলার গল্প, কবিতা, স্মৃতিচারণ, ভ্রমন নিয়েও কিছু লেখেন। কিন্তু আর কিছু না লিখলেও ক্ষতি ছিল না। ১৮৫৯ সালে প্রকাশ করেন ‘দি মিনিসট্রি ওুয়িং’, ১৮৬২ সালে ‘দি পার্ল অব অরস আইল্যান্ড’, ১৮৬৯ সালে ‘ওল্ড টাউন ফোকস’। এ ছাড়া লিখে চলেন পত্র পত্রিকায়। মাঝে মাঝে চার্লস ডিকেন্সের মত পড়ে শোনাতেন বিভিন্ন সভাসমিতিতে। কাজ হতো অনেক। লোকজন চেতনায় উদ্দীপ্ত হতেন, বিবেকের মরচে ঘসে ঘসে উজ্জ্বল করতেন। ১৮৮০ থেকে ৯০ সালের ভেতরে তাঁর ছোটখাটো শরীরটা খারাপ হয়ে যায়। আংকল টম বিক্রি করে যে টাকা পেয়েছিলেন তা দিয়ে একটা বাড়ি বানিয়েছিলেন। জীবনের শেষ কটা দিন সেখানেই বাস করতেন।

তার বইটা ছিল সাহিত্যের এমন এক স্তম্ভ যার উপরে সমস্ত মানব সভ্যতা দাঁড়িয়ে থাকে। নিজে বলেন - Despairing appeal to a civilized humanity. দাসপ্রথা নিয়ে আরো বেশ কিছু গ্রন্থ রচিত হয়েছে কিন্তু এইবইএর মত আর একটিও নয়। এইভাবে সাড়া জাগায়নি আর কোন বই।
১৮৯৬ সালে এই অসাধারণ নারী মারা যান। রেখে যান ক্রিতদাসমুক্তির বাইবেল। বা বলা যায় মানবমুক্তির বাইবেল।

ভাবতে ভালো লাগে হ্যারিয়েট বিচার স্টোয়া একজন নারী। জয়হোক সকল নারী লেখকের।