শনিবার,২৩ Jun ২০১৮
হোম / ফিচার / আর কত আসিফা-জয়নব হবে নরপশুদের শিকার?
০৫/২০/২০১৮

আর কত আসিফা-জয়নব হবে নরপশুদের শিকার?

-

ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীমের শহর কাঠুয়ায় মাত্র ৮ বছর বয়সি শিশু আসিফা বানুর উপর চালানো অত্যাচারের কথা এখন সকলেই জানেন। ধর্ষণ এবং এরপর হত্যার শিকার এই শিশুর উপর চালানো হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে ভারতসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ এখন বেশ সরব। তবে বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে শিশু ধর্ষণের চিত্র নতুন কিছু নয়, স্থানভেদে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও শিশু ধর্ষণ এসব সমাজের মর্মান্তিক দিকগুলোর একটি। আধুনিক যুগের মানুষদের এই বর্বর আচরণ তাই বারবার মানবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, এই অনাচারের শেষ কোথায়? পুরুষতান্ত্রিক সমাজের হিংস্রতা থেকে শিশুরাও কেন মুক্ত নয়!

কাশ্মীরের শিশুকন্যা আসিফা ঘোড়া চরাতে গিয়ে নিঁখোজ হয়। পরবর্তীসময় বাড়ির পাশ থেকে আসিফার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের তদন্ত থেকে বের হয়ে আসে ধর্ষণ এবং হত্যাকান্ডের বিবরণ। মাত্র আট বছর বয়সি আসিফাকে মন্দিরে আটকে রেখে ধর্ষণ করা হয় বারবার। এ-সময় তাকে না খাইয়ে রাখা হয়েছিল। মাথায় পাথরের আঘাতও করা হয়েছে বেশ কয়েকবার এবং সর্বশেষে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। জানুয়ারির এই ঘটনার তিন মাস পর গত ১০ এপ্রিল অভিযোগপত্র জনসম্মুখে প্রকাশ করা হলে অভিযুক্তদের যথাযথ শাস্তির জোর দাবি জানায় ভারতের নানাপ্রান্তের মানুষ। অথচ প্রধান অভিযুক্ত সাঞ্জি রামসহ সব আসামিদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের প্রচারণাও চালাতে দেখা গেছে এর আগে।

সুদূর কাশ্মীরে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মোটেও অপ্রাসঙ্গিক কিছু নয়। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্যমতে ২০১৬ সালে বাংলাদেশে মোট ৭২৪টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে যার ৩০৮টি হলো শিশু ধর্ষণ। এর মধ্যে ১৫৭টি শিশুর বয়স ছিল ১২ বছরের কম এবং ৪৬ জনের বয়স ৬ বছরের নিচে। এর আগে ২০১৫ সালেও শিশু ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৫২১টি। এসবের সঙ্গে ধর্ষণের পর হত্যা এবং ভিক্টিমের আত্মহত্যা করার ঘটনা রয়েছে অহরহ। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান মোদ্দাকথা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এটি বেশ নিয়মিত এক চিত্র। তবে এর নেপথ্যের কারণ কী? প্রতিকারই বা কী? সম্প্রতি দৈনিক কাশ্মীর অবজারভারের অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত লেখক আশরাফ লোনের বিশ্লেষণধর্মী লেখার গুরুত্বপূর্ণ অংশের অনুলিপির মাধ্যমে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক।

বর্তমানে অন্ধকার সময় পার করছি আমরা, যা দিনে দিনে আরো অন্ধকার হচ্ছে। কাশ্মীর, ফিলিস্তিন, সিরিয়া এবং আফগানিস্তানের মতো বিরোধপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে শিশুহত্যা নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সহিংসতার কারণে হত্যার পাশপাশি যৌননির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হচ্ছে একের পর এক নিষ্পাপ শিশু। বস্তুগতভাবে আমাদের যতটা উন্নতি হয়েছে, মানবিকতার দিক থেকে আমরা যেন ততটাই নিচে নেমে গিয়েছি।

২০১৮ সালের শুরুটা হয়েছিল পাকিস্তানের কসুর অঞ্চলের ৭ বছর বয়সি শিশুকন্যা জয়নবের ধর্ষণ এবং হত্যাকান্ড দিয়ে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী জয়নব তখন শিক্ষার স্কুলের পথে ছিল এবং সেখান থেকেই তাকে অপহরন করে ধর্ষণ এবং পরে হত্যা করা হয়। ইউএসএ টুডে’র রিপোর্ট অনুযায়ী পাকিস্তানে এমন ঘটনা নিয়মিত ঘটে এবং অনেক সময় তার হদিস পর্যন্ত পাওয়া যায় না। ঐ রিপোর্ট অনুযায়ী সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াজুড়েও শিশুধর্ষণ এবং হত্যাকান্ডের ঘটনা অহরহ ঘটছে এবং অনেক সময়ই তা কারো নজরেই আসে না। এই জঘন্য অপরাধের বিচার দূরে থাক, তা নিয়ে আরো উন্মত্ত বর্বরতা এসব অঞ্চলে দেখা যায়। ইউএসএ রিপোর্টে বলা হয়েছে, “শিশুদের নিয়ে করা পর্নোগ্রাফী এসব অঞ্চলের সিডি শপগুলোতে অহরহ পাওয়া যায়।” অনেক সময় অভিভাবকদের জানা থাকলেও প্রাণের ভয়ে ক্ষমতাশীলদের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কিছুই করার থাকে না।

জয়নবের প্রতি চালানো অত্যাচারের শোক কাটতে না কাটতেই জম্মু ও কাশ্মীরের কাঠুয়া অঞ্চলের শিশুকন্যা আসিফার মর্মান্তিক ঘটনা সবার সামনে এসেছে। আসিফার ক্ষেত্রে ঘটনাটি জানুয়ারিতে ঘটলেও প্রায় তিন মাস পরে তা সবার সামনে এসেছে। সোশ্যাল মিডিয়াতেও এর প্রতিক্রিয়া এসেছে অনেক দেরিতে কারণ পুরো ঘটনা সম্পর্কে যথাসময়ে রিপোর্ট করতে পারেনি গণমাধ্যমগুলো। এর মাধ্যমে এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে গুজ্জার এবং বাকারওয়াল-এর মতো ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের জীবন কখনোই লাইমলাইটে আসে না। তারা এর আগেও সবদিক থেকে বঞ্চিত ছিল, এখনো রয়েছে। আসিফার ঘটনাটি একই সাথে এসব অঞ্চলে রক্ষণশীলতা এবং বর্ণপ্রথার কালো থাবায় আক্রান্ত দৈন্য একটি সমাজের চিত্রও বটে। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে যেমন হিন্দু সমাজের ক্ষমতাবানদের নানা উদ্যোগ দেখা গিয়েছে, ঠিক একইভাবে তুলনামূলক নিচু গোত্রের বাকারওয়াল অঞ্চলের এমন দুর্দশার কাহিনী সামনে আনতে চরম অনিচ্ছা দেখিয়েছে অন্যান্য তথাকথিত উচ্চশ্রেণির মুসলিম সমাজ। এসব অঞ্চলে বসবাস করা মানুষজন একজন সেলিব্রেটির সাধারণ ঘটনা নিয়ে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন, তাদের বাচ্চা-কাচ্চাদের নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করে দিন কাটান কিন্তু সমাজে ‘নিচু’ শ্রেণি হিসেবে চিহিত জনগোষ্ঠীতে আসিফার মতো নিষ্পাপ কারো এমন বর্বর অত্যাচারের শিকার হলে তাঁর বিরুদ্ধে কিছু বলতে যান না। দক্ষিণ এশিয়ায় এসব মানুষদের ন্যায়বিচারের আশ্বাস কেউ দেয় না এবং তারা ন্যায়বিচার পায়ও না।

এ-ঘটনার পর তিন মাস ধরে তথাকথিত বুদ্ধিজীবী এবং ফেমিনিস্টদের নীরব ভূমিকা তাদের ভন্ডামি আরো একবার প্রকাশ করছে। ঘটনাটিকে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ধামাচাপা দিতে চেয়েছিলেন এবং এসব বুদ্ধিজীবী এবং তথাকথিত ফেমিনিস্টরা ভয়ে নীরব থেকে তাতে সম্মতিও দিয়েছেন। সমাজের উঁচু এবং নিচু শ্রেণির অস্তিত্ব এখানে আরো একবার দৃশ্যমান হয়েছে। এই চিরায়ত শ্রেণিবৈষম্য গোটা দক্ষিণ এশিয়ার সমাজব্যবস্থার দৈন্যের পরিচায়ক।

তবে বেশ পরে হলেও নানা শ্রেণির মানুষদের প্রতিবাদে আসিফা হত্যাকান্ডের নেপথ্যের কুলাঙ্গারদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে যার মধ্যে একজন পুলিশ অফিসারও আছেন। আইনশৃংখলা বাহিনীতে থেকে এমন বেআইনি এবং নির্দয় কাজ করা মানুষটার বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয় তাই এখন দেখার বিষয়। একই সাথে জয়নব হত্যাকান্ডের অপরাধীরাও ধরা পড়েছে। এ অঞ্চলগুলোর বিচারব্যবস্থা অপরাধীদের কী সাজা দেবে তার উপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতে এমন অনাচার আদৌ বন্ধ হবে কিনা। একই সাথে শিশুদের নিয়ে পর্নোগ্রাফিক চলচ্চিত্রসহ সকল প্রকার নির্যাতন বন্ধে এসব দেশের সরকারগুলো কেমন পদক্ষেপ গ্রহণ করবে তাও এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ছোট্ট জয়নব এবং আসিফারা ন্যায়বিচার পাক, মৃত্যুর পর অন্তত এতটুকু শান্তি পাক।

কখনো ধর্মীয় প্রলেপ, কখনোবা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বছরের পর বছর নিস্তার পেয়েছে অসংখ্য ধর্ষক এবং হত্যাকারী। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে ভারতে ১২ বছরের কম বয়সি শিশুধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ড প্রদানের জন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় এ-সংক্রান্ত জরুরি নির্বাহী আদেশ সই হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না আমাদের দেশেও এ ধরনের আইন জারি করার সময় এসেছে, যাতে করে শিশুধর্ষণের ঘটনা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।

- নাসিফ রাফসান