সোমবার,১৯ নভেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / ইলিশ মাছের মেজাজ
০৫/০৩/২০১৮

ইলিশ মাছের মেজাজ

- হামীম কামরুল হক

‘ইলিশ মাছে’- শুনেই বহুদিন পর সফরের কানে বেজে ওঠে কথাটা। সে ফিক করে একটু হেসেও ওঠে। সত্যি বলতে কি হাসির কারণটা সবখানে বলাও যায় না। অমন ফিক করে হেসে ওঠা যায় শুধু। সেই সময়ে মহাপরাক্রমশালী দারোগাকে কত সহজে তার বাপ কথাটা বলেছিল! আলাভোলা বলেই বলতে পেরেছিল। তার বাপের বলা সেই কথা সারা এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল। লোকে লোকে রটে গিয়েছিল। রটবেবাই না কেন? দারোগা তার বাপকে যে দৌড়ানি দিয়ে ছিল। সারা এলাকার লোক দেখেছিল সেই ধাওয়া। পেটমোটা দারাগো হেড়ো পাতলা সফরের বাপের সঙ্গে অবশ্য দৌড়ে পারেনি। সেদিন তো ধরতেই পারেনি, তার বদলে সারা এলাকায় রটে গিয়েছিল ওই গল্প। দবির দারোগাকে কী অবলীলায় শান্তভাবেই না কথাটা বলেছি তার বাপ! ওই যে বিখ্যাত কেচ্ছায় আছে না, রাজাকে এক বাচ্চা ছেলে বলেছি, ‘ও মা সে কী! রাজামশায়, আপনার গায়ে জামা নেই কেন?’ অনেকটা সেই রকম করেই কথাটা বলেছিল। আসলে জানতই না কে দবিরউদ্দিন, কীইবা তার ক্ষমতা বা দাপট।

চুপচাপ গাড়ি চালাচ্ছে সফর। মাঝে মাঝে কানে আসছিল তানহা-তাবিবের কথাগুলি। এখন তাবিব বলছে তানহা চুপচাপ শুনছে। তাবিব বলছিল, ‘কখন কোথায় কীভাবে জাল ছুঁড়তে হয়, জানা লাগে। নইলে ওই জাল ফেলাই সার। বুঝলে? কী বুঝলে?’ তানহা জানালা দিয়ে বাইরের মাঠ দেখছে। কতদিন পর দেশে এসেছে তাবিব। তাও গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। তানহা ধরে নিয়ে এসেছে। কথা উঠিয়েছিল তানহা। বিষয়টা ছিল যে, সবাই সব কিছু পারে না, আর কিছু কিছু লোক অবস্থা মতো ব্যবস্থা নিতে ওস্তাদ।

তাবিব বলছিল, এক বিলাসবহুল জাহাজের, মানে প্রমোদতরীর, ইঞ্জিন থেমে গেলে, কেউ যখন সেটা আর চালু করতে পারছিল না, তখন এক বুড়ো মতো লোক এগিয়ে এল। সে ইঞ্জিনরুমে গেল। তারপর দেখেটেখে বলল, তাকে একটা হাতুড়ি দিতে। সে হাতুড়ি নিয়ে মাত্র দুটো বাড়ি দিতেই ইঞ্জিন আবার চালু হয়ে গেল। কেলেংকারির হাত থেকে বাঁচাল কোম্পানিটি। মহাখুশি হয়ে ক্যাপ্টেন সেই লোকটিকে বলল যে, লন্ডনে গিয়ে যেন বিলটা পাঠিয়ে দেয়। সে বিল পাঠাল। আর ক্যাপ্টেন দেখল, বিল হয়েছে দু-হাজার পাউন্ড। সে তো রেগেমেগে আগুন। কী! মাত্র দুটো বাড়ি দেওয়ার জন্য দুহাজার পাউন্ড! খুব বেশি হলে দু-পাউন্ড নিতে পারে সে। লোকটিকে তলব করা হয়, সে বলে, স্যার দুটি বাড়ি দেওয়ার জন্য অবশ্যই বিল দু-পাউন্ড। কিন্তু কোথায় বাড়িটা দিতে হবে, তার জন্য বাকি এক হাজার নশো আটানব্বই পাউন্ড। তো বুঝছ তানহা ডারলিং, বেশির ভাগ লোকই জানে না কোথায় বাড়ি দিতে হবে।

তাবিবের ফুপাত বোন। এখন পরেছে ফতুয়া আর জিনস। ওড়না নেই। তানহার জন্মের সময় তাবিব ক্লাস এইটে পড়ে। ছোটবেলায় গুটলুপুটলু ছিল মেয়েটা। এখন ছিপছিপে লম্বা তানহা রীতিমতো তন্বী তরুলতা বহ্নি আঁখি। আহা আগে কী সব গান ছিল! জীবনের কত কিছুর সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া যেত। আর এখন এই এল, তো মুছে গেল।

তানহা বলে, সারফেস লেবেলের জিনিস মুছে যেতেই আসে, বা তৈরি হয়। চট করে এই ভাঙে তো ওই গড়ে। যা কিছু গভীর তা তো খনির মতো। অনেক পরে খুঁজে পায় লোকে। আর ওপরের যা কিছু সময়ের ফেরে আর দরকারে সেখানে ঘাট হয় অঘাট, আর অঘাট হয় ঘাট। ঢাকার হাতির ঝিল এলাকাটা কী ছিল, আর কী হলো ভাবা যায়!

তাবিবকে তানহা ধরে নিয়ে যাচ্ছে চাঁদপুর। ওদের গ্রামের পাশে একটা খাল। বিষ্ণুদী খাল। এখন গরমকালে শুকিয়ে থাকে। মেঘনা নদী থেকে আসা এই খালে এককালে ধুমছে ইলিশ পাওয়া যেত। এবারের বর্ষায় নাকি কানায় কানায় ভরেছে খালটা।

বাড়ি যাবে। ধুমসে হৈচৈ করবে, আর ইলিশ মাছ দিয়ে কত রকমের খাবার তার খালা করতে পারে, সেসব দেখানোর ও চাখানোর জন্যই তাবিবকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে চাঁদপুর।

- আগে শহরের এক বাড়িতে ইলিশ ভাজলে সারা পাড়া ম ম করত ইলিশের গন্ধে। এখন ইলিশ মাছে কোথায় সেই স্বাদ-বাস? তাবিব বলছিল, কী, সফর, তাই না?

- জ্বী স্যার।

সফরের কানে যত বার ‘ইলিশ’, ‘ইলিশ মাছে’ শব্দটা আসছিল তত বারই তার বাপের বলা কথাটা বেজে উঠছিল। বড় হয়ে দবিরউদ্দিন দারাগোর অনেক গল্প শুনেছিল। লোক বলত, তার ভয় বাঘে-হরিণে এক ঘাটে জল না খেলেও অনেকেরই জায়গামতো জল শুকিয়ে যেত। বা আটকে যেত।

সেসময় এলাকায় দোতলা বাড়ি খুব বেশি ছিল না। দবিরউদ্দিন তার একটাতে থাকত। দোতলা বাড়ির পেছন দিকটায় গ্রামের এলাকা শুরু। একটু দূরেই সেই বিষ্ণুদী খাল। দরিবউদ্দিন রাস্তায় নামা মানে আসেপাশে লোকজনের সুড়সুড় করে সটকে পড়া। এলাকায় দবিরউদ্দিন ছিল ওই নেকেড়ে ও ভেড়ার বাচ্চার গল্পের নেকাড়ের মতোঃ এই জল তুই ঘোলা করেছিস। না আমি করিনি তো। তাহলে তোর বাপ করেছে। না আমার বাপত অনেক আগেই মরে গেছে। তাহলে তোর দাদা করেছে। তারপর ভেড়ার বাচ্চা ঘাড় মটকে দেয় নেকড়েটা। দবিরউদ্দিনের কাছে আশেপাশের সব রকমের অচেনা মানুষ মানেই চোরজোচ্চার, নয়ত কোনো না কোনো দোষে দোষী, অপরাধে অপরাধী। সে তার চারাপাশের দুনিয়ায় কোনো ভালো মানুষের টিকিটাও দেখতে পেত না। প্রত্যেকটা মানুষ হয় শয়তান, নয়ত একটাও পাওয়া যাবে না যার ওপর শয়তান আছর করেনি। সেই যে খেতাব আলি লোকটা। বেচারা কেবল দবিরউদ্দিনের বাড়ির পেছনের দিকে একটা ঝোঁপে মুততে বসেছিল। তখন ঠিক দোতলার বারান্দায় হাজির দবিরউদ্দিন। খেতাবকে দেখেই যে হাঁক দিয়েছিল, অ্যাই!-ওই এক ‘অ্যাই!’তেই খেতাবের মুত নাকি তিনদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। খেতাব সেদিন লুঙ্গি তুলে সেই যে-দৌড় দিয়েছিল, সেও ছিল এক দেখবার মতো দৃশ্য।

টিভিতে জোকসের একটি অনুষ্ঠান দেখতেই ইলিশ মাছ ভাজা খাচ্ছিল সবাই। তাবিব একদিন বলছিল, বাঙালির যত রকমের কৌতুক, মানে জোকস আছে কোনোটাই পেটের ওপরে ওঠে না। কোনো বুদ্ধির রঙ্গরসিকতা নেই। একে তো হাগামোতাপাদার গল্প ছাড়া কোনো জোকসই নেই। হয় খাওয়া, নয় বিয়ে, সেও তো আসলে পেটের নিচের ব্যাপার।

তাবিব সঙ্গে যোগ করে, এক জসীম উদ্দীনের ওই বইটা ছাড়া।

গাড়িটা তখন দাঁড়িয়ে। রেলের সিগন্যাল পড়েছে। তানহা-তাবিবের কথা তখন মন দিয়ে শুনছিল। তাবিব ঢাকা আসার পরই থেকে যত জায়গা তাকে নিয়ে যেতে হয়েছে সঙ্গে আরো একজন দুজন বন্ধু ছিল। সবাই তাবিবকে পণ্ডিত নয়, জ্ঞানী, কেউ কেউ বুজুর্গও বলছিল। তাবিবের মনে হচ্ছিল দেশের সব লোকই হাসি-মস্করা ছাড়া কোনো কথা বলছে না। এতদিনে অন্যরাও তার থিওরি, ‘দুনিয়াটা কৌতুকময়’ এই তত্ত্বে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। সবারই বেশ অবস্থা ফিরেছে। বাসাবাড়িতে কাজের লোক পাওয়া যায় না। ফ্যা ফ্যা করে কেউ ঘুরে বেড়ায় না। সবাই কিছু না কিছু করছে।

গত কয়েক দিনে সফর যা যা শুনেছে, এত কথা তানহাদের গাড়ি চালানো শুরু করার পর আজ অব্দি শোনেনি।

তাবিবের প্রথম বিয়ের সময় সে ছিল পাক্কা বেকার। তখন দুম করে মহুয়াকে সে বিয়ে করে। প্রেমের বিয়ে। তবে দুই পরিবারের সবাই কেন যে তাদের বিয়েটা এত ধুমধাম করে দিয়েছিল সেটা এখনও রহস্য। মহুয়ার মামা-নানারা বাপ মরা সবার বড় মেয়েটাকে এমন বেকার ছেলে কাছে বিয়ে দিয়ে দিল! একটা কারণ অবশ্য মহুয়া বলেছিল, ধানমন্ডির মতো জায়গায় বাড়ি। তুমি দুই বোনের একটা মাত্র ভাই। দুবোনই বিয়ে হয়ে বিদেশে। তুমি তো আর গঙ্গারাম নও! বলে মহুয়া তার মুখ টিপে অতুলনীয় হাসিটি হেসেছিল।

তাবিব বলেছিল, তুমিও বাবা সুকুমার রায় পড়া মেয়ে।

মহুয়া বলে, সত্যজিৎ রায় যার গুরু তার সঙ্গে তো সুকুমার রায় না পড়লে কি মেশা যেত?

-ইস!

গায়ে হলুদের দিন মহুয়াকে দেখেই তাবিবর আরেক গুরু তার ভার্সিটি জীবনের শিক্ষক, মাহিদউদ্দিন স্যার বলে, ওরে বাবা, তুমি দেখি এক মহাসুন্দরী মেয়ে বিয়ের জন্য বেছে নিয়েছ!

মাহিদ স্যার সাধারণত কোথাও যান না। ছাত্রপড়ানো, বইপত্র আর লেখাপড়া ছাড়া আর কোনো কিছুতে তার কোনো আগ্রহ নেই। তবে হাসিঠাট্টাতে ওস্তাদ। বলতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারি করার দিন থেকে ঠিক করে নিয়েছি, আমার জীবন হবে ফোর ডাইমেনশনাল- পড়ব, পড়াব, লিখব, লেখব। সত্যি বলতে কি ছাত্রছাত্রীরা ছিল তার জীবন। নিজে নিঃসন্তান ছিলেন। সেজন্য ওই ব্যাপারটা আরো জেঁকে বসেছিল।

সে মনে করেছিল অনেক করে অনুরোধ না করলে তিনি আসবেনই না বিয়েতে। কিন্তু বিয়ে দাওয়াতের ছাপানো কার্ডটা হাতে পেয়ে বলেছিলেন, একমাত্র ভূমিকম্প না হলে যাবো। চিন্তা করো না।

বিয়ের আসরে আরো একটা কথা বলেছিলেন মাহিদ স্যার। তার বন্ধুদের উদ্দেশে বললেন, দ্যাখো, তাবিব প্রমাণ করে দিয়েছে যে সে হচ্ছে গভীর জলের মাছ। আর তোমরা সবাই পুঁটি মাছ।

শুনে সবাই হো হো করে হাসল।

- গভীর জলের কোন মাছ স্যার?

-ইলিশ মাছ। তবে আমি কিন্তু ওকে ধুরন্দর হিসেবে বলিনি। ও অনেক গভীর করে ভাবতে পারে। সেজন্যই বলছি, যেটা বাইরে থেকে ওকে দেখে কিছুই বোঝা যায় না।

- তাবিবের উপমা তাহলে ইলিশ মাছ! আওয়ার ন্যাশানাল ফিস! চালু মাল!-তাবিবের পিঠ চাপড়ে দিয়েছিল আহানাফ।

আসলে কি সে ততটা গভীর জলের মাছ ছিল? অনেক বুঝতে পারত সব কিছু? অনেক চালাক ও ধুরন্দর ছিল কি সে? আসলেই সে অনেক গভীর করে ভাবতে পারত? তাই যদি পারত তাহলে মহুয়া চলে গিয়েছিল কেন তাকে ছেড়ে? বলতে গেলে তেমন কোনো কারণ ছাড়াই চলে গিয়েছিল। নাকি তার সঙ্গে বিদেশে যেতে চায়নি বলেই আগেভাগে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল? গ্রাম থেকে নিজের পরিবারকে ঢাকায় থিতু করিয়েছিল। নিজে ভালো চাকরি করত। দুটো ভাই আর একটা বোন আর বিধবা মাকে দাঁড়া করিয়ে দিতে জান দিয়ে চেষ্টা করেছিল মহুয়া। সেই আবদুল্লাহপুরে জমি কেনা থেকে শুরু করে সেখানে বাড়ি করে দিয়েছিল মহুয়া। তার বদলে কী হলো? ভাই দুজনই মহুয়াকে ঠকালো। তারপর ‘ওয়ান ফাইন মর্নিং’ মহুয়াকে আর পাওয়া গেল না। অনেক চেষ্টা করেও তার কোনো খোঁজ মিলল না। ততদিনে তাবিব বিদেশে গিয়েছে। জুলিয়া এন্ডারসনের সঙ্গে বিয়ে হয়ে বাচ্চাকাচ্চা হয়ে গেছে। পারতপক্ষে সে আর দেশে আসতে চায়নি। এবার কেন যেন বহুদিন পর দেশে ফিরতে মনে টান পড়ল। আর এখন যাচ্ছে চাঁদপুর, তাও তানহার সঙ্গে।

তাবিব মাঝে মাঝে খেয়াল করছে সারাক্ষণ সফর মুখে কেমন একটা হাসি ধরে রেখেছে। যদিও সারাক্ষণ হাসার মতো আজকে কোনো কথা হয়নি। তানহা সিরিয়াস ধাঁচের মেয়ে। তবে মজাও করতে পারে, যদিও সেসব মজা অত্যন্ত উচ্চমার্গীয়। যখন কথা বলে তো বলতেই থাকে। একটানা অনেকক্ষণ কথা বলতে বলতে তানহার হঠাৎ করে সে আবার অনেক ক্ষণের জন্য চুপ হয়ে যায়। বিশেষ করে যখন মোবাইল ফোনে কোনো এসএমএস আসে। বা কোনো কারণ ছাড়াই সে ব্রাউজ করতে শুরু করে দেয়। তানহার আজকে কথা বলবার ভাব আসেনি মনে হয়।

সফরের মুখে ওমন মুখ টেপা হাসি দেখে তাবিব বলে, সফর তুমি কী নিয়ে সারাক্ষণ এত হাসছ বলোতো?

- কই স্যার! নাতো স্যার। তেমন কিছু না।

- গাড়িতে তো আজকে ইলিশমাছের গল্প ছাড়া কোনো গল্প হয়নি।

- আমারও একটা গল্প মনে পড়ছিল স্যার। সেটা মনে করেই হাসছিলাম।

-তাই! তো কীরকম গল্প?

তখন সফর গল্পটা বলেঃ আমাদের ছোটবেলায় এলাকায় এক দারোগা আসল। তার সেই রকমের তেজ। তার দাপটে এলাকার গুন্ডাবদমাশ সব অন্য এলাকায় চম্পট দিল। সে মনে করত জগতে পারে না এমন কাজ নাই। তো সে তো এসেছিল আপনাদের ওই চাঁদপুর এলাকা। বিষ্ণুদী নামে একটা খাল আছে তার কাছাকাছি একটা দোতলাবাড়িতে থাকত। তো বর্ষার সময় তো ইলিশের মৌসুম। সেই বর্ষায় তার ইচ্ছা হলো সে নিজের হাতে ইলিশ ধরবে। তো যেই ভাবা সেই কাজ। গেল সে ইলিশ ধরতে। সারাদিন চেষ্টা করল। জাল ছুঁড়ে, ছিপ ফেলেÑ কোঁচ দিয়ে ঘাই দিয়েÑ কোনোভাবেই সে একটা ইলিশ ধরতে পারল না। তো তখন তার মেজাজ খুব চড়ে গেল। নিজে ওই খালের এক ধারে বসে যা মনে আসে গালাগালি দিতে শুরু করল। যেমন সে বলছিল, আমি দবিরউদ্দিন, পুলিশের মধ্যে পুলিশ। আমি দবিরউদ্দিন দারোগা, আমার হাত থেকে কেউ ছাড়া পায় না। আর তোরা ইলিশ সব পার পেয়ে গেলি। দাঁড়া! আজ নয় পেলি। আরেক দিন ঠিক দেখে নেব। সেদিন হবে তোদের একদিন কি আমাদের একদিন।Ñ এটা স্যার একটু ভদ্রভাষায় বললাম। তো তার হম্বিতম্বি দেখে, এক লোক, সে ওই এলাকায় মিস্তরির কাজে এসেছিল। দাবির দারাগোকে চেনে না। দবিরের অকথ্য অশ্লীল সব কথা শুনে তার মনে হলো লোকটাকে থামানো দরকার। তখন সে দারোগার কাছে এসে বলল, স্যারের কী হইছে স্যার? দবির দারোগা তখন ছেলেমানুষের মতো করছিল। নিজের মনেই ছিল। আশেপাশের কোনো কিছু নিয়ে তার হুশ ছিল না। লোকটাকে সে বলে, শালা ইলিশ আমার হাতে ধরা পড়ল না। শালারা আমাকে চেনে না! আমি পুলিশের মধ্যে পুলিশ! আমি দবিরউদ্দিন দারোগা। তখন ওই লোক দবিরউদ্দিনকে বলল, স্যার ইলিশ মাছে কি আর পুলিশ চেনে!

- এটুকু বলে, সফর আবার মুখ টিপে হেসে উঠল। তারপর বলল, এই হলো স্যার গল্প। কিন্তু তাবিব ততক্ষণে গল্পটা যে আগে শুনেছে আর যেভাবে শুনেছে সেটা মনে পড়ে গেল তারও। আসল কথাটা ওই লোকটা দারোগাকে বলেছিল, এজন্য স্যার এত চেইতে আছেন স্যার! চেতার তো কিছু নাই স্যার। কিছু মনে করবেন স্যার। একটা কথা বলি যদি বেয়াদবি না নেন!

- বলো!

সফরের বাপ ইয়াজ আলি দবিরের কানের কাছে এসে গলা নিচু করে বলে, স্যার, আসলে কথা কি স্যার, ইলিশ মাছে পুলিশ চোদে না।- এই কথাটা সফর আড়ালে করলেও তাবিবের সেই ভার্সিটি জীবনে শোনা গল্পটা মনে পড়ে যায়। তার খুলনার এক বন্ধুর কাছে এই চুটকিটা শোনা। আর সে সফরের ভদ্রভাষায় বলা গল্পটা শুনেই হো হো করে হাসতে থাকে। তানহা এতক্ষণ মোবাইল ব্রাউজ করছিল। সে তাবিব হো হো করে হাসিতে মুখ তুলে তাকিয়ে বলে, কী হলো তাবিব ভাই? এত্ত হাসির কী হলো?

অন্যদিকে, সফরও বুঝতে পার না, সে যেভাবে গল্পটা বলেছে, তাতে তো হাসির কিছু ছিল না। তাহলে কি স্যারও আসল কথাটা জানে!