বুধবার,২৫ এপ্রিল ২০১৮
হোম / ফিচার / একাত্তর এবং স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র
০৩/২৫/২০১৮

একাত্তর এবং স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র

-

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। একটি নাম। একটি প্রতিষ্ঠান। একটি ইতিহাস।

শোষণ, নিপীড়ন আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংঘটিত একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে এ নাম, এ প্রতিষ্ঠান ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রেরণার বাতিঘর।

যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল চাঙা করা এবং যুদ্ধপরিস্থিতি নিয়ে তাদেরকে যাবতীয় তথ্য দিয়ে সাহায্য করাই ছিল এ প্রতিষ্ঠানের প্রধানতম কাজ। এখান থেকে প্রচারিত প্রেরণামূলক গান আর তেজোদ্দীপক স্লোগান শুনেই তো গাঁয়ের শান্ত-সুবোধ কিশোরটির রক্তও চনমনিয়ে উঠেছিল, যে কিশোর স্টেনগান হাতে দেশমাতৃকার পতাকা ওড়াতে গিয়ে আর ঘরে ফেরেনি।

প্রতিষ্ঠা
২৫শে মার্চের কালরাতে হানাদাররা নিরস্ত্র বাঙালিকে শেষ করতে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ তো চালিয়েছিলই, সাথে বাঙালির প্রাণের নেতা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে। গ্রেফতারের আগে বঙ্গবন্ধু একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা প্রদান করে যান। সেদিন রাতেই বার্তাটি পৌঁছানো হয়েছিল চট্টগ্রামে। রাতেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় মাইকে বার্তাটি প্রচারিত হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে সেটি পঠিত হয় পরদিন অর্থাৎ ২৬ মার্চ। ঐদিন দুপুরে কালুরঘাট ট্রান্সমিশান কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর বার্তাটি পাঠ করেন চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান।

সেদিনই চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের কয়েকজন কর্মী বেতারে পূর্ব-পাকিস্তানের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের নতুন নাম হয় ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’ (বিপ্লবী শব্দটি পরে বাদ দেয়া হয়)। তবে সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে বেতারকর্মীরা চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রকে ব্যবহার না করে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রকেই ব্যবহার করেন। ঐদিন সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে সেখান থেকে প্রচারিত হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রথম অনুষ্ঠান ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বলছি’। এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয় মুক্তিসংগ্রামে অনন্য অবদান রাখা এ প্রতিষ্ঠানের।

এগিয়ে চলা
১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার। মে মাসে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রকে ট্রান্সমিটার দেয়ার আবেদন করা হয় ভারত সরকারের কাছে। ভারত সরকারের কাছ থেকে ৫০ কিলোওয়াট মিডিয়াম ওয়েভের একটি ট্রান্সমিটার পাওয়ার পর স্বাধীন বাংলা বেতারের প্রথম আনুষ্ঠানিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় ২৫ শে মে। কলকাতায় অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি ও অন্যান্য মন্ত্রীদের প্রাথমিক আবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ৫৭/৮নং দোতলা বাড়িটিতে। সেই বাড়িটিকেই ব্যবহার করা হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কার্যালয় হিসেবে। এখান থেকেই সব অনুষ্ঠান নিয়মিতভাবে সম্প্রচারিত হতে থাকে।

কর্মী ছিলেন যাঁরা
বর্তমানে স্ব-ক্ষেত্রে বিখ্যাত এমন অনেক ব্যক্তিত্ব যেমন আলী যাকের, কামাল লোহানী এবং সৈয়দ হাসান ইমাম ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ এবং কলা-কুশলীদের অন্তর্ভুক্ত। কবি আসাদ চৌধুরী, আবদুল গাফফার চৌধুরী, কবি নির্মলেন্দু গুণ প্রমুখ নিয়োজিত ছিলেন গীতিকার হিসেবে। আর যাদের কণ্ঠের গান শুনে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ত টগবগ করে ফুটত তাদের মধ্যে ছিলেন সমর দাস, আবদুল জব্বার, আপেল মাহমুদ, লাকি আখন্দ এবং ফকির আলমগীরের মতো মানুষ।

প্রচারিত অনুষ্ঠানমালা
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত অনুষ্ঠান চরমপত্রের কথা কে না জানে! আব্দুল মান্নানের পরিকল্পনায় এবং এম আর আখতার মুকুলের হাস্যরসাত্মক ভাষা ও ভঙ্গিতে উপস্থাপিত সেই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হানাদারদের হেনস্তা হওয়ার কথা শুনে মুক্তিযোদ্ধারা পেত সাহস ও প্রেরণা আর সাধারণ মানুষ পেত আশা। একাত্তরের সেই ভয়াল দিনগুলোতেও মানুষকে আমোদিত করত এই অনুষ্ঠান। নিয়মিত অন্যান্য অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিল কুরআনের বাণী, ইসলামের দৃষ্টিতে, জল্লাদের দরবার (নাটিকা), বজ্রকণ্ঠ (বঙ্গবন্ধুর ভাষণ), দৃষ্টিপাত, বিশ্বজনমত, বাংলার মুখ, প্রতিনিধির কণ্ঠ, পিন্ডির প্রলাপ (রম্য কথিকা), দর্পণ কথিকা, প্রতিধ্বনি, কাঠগড়ার আসামি ইত্যাদি।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র মূলত বিখ্যাত হয়ে আছে কালজয়ী সব গানের জন্য। সেসব গান মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছিল মুক্তির বাণী। করেছিল সংগ্রামে উদ্দীপ্ত। ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে’, ‘আমার সোনার বাংলা’, ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে’, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’ গানগুলোর তালে তালে মুক্তিযোদ্ধারা হতেন আরো তেজোদ্দীপ্ত, আরো সাহসী। এই গানগুলোই তাদের স্বপ্ন আর বিশ্বাসকে দিয়েছে শক্তি।

বিখ্যাত স্লোগান
‘সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়’, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের এই বিখ্যাত লাইনটি ছিল একাত্তরের অন্যতম স্লোগান। এছাড়াও ‘বাংলার প্রতিটি ঘর আজ রণাঙ্গন-প্রতিটি মানুষ সংগ্রামী মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিটি মানুষ স্বাধীনতার জ্বলন্ত ইতিহাস’, ‘হানাদার পশুরা বাংলাদেশের মানুষ হত্যা করেছে- আসুন, আমরা পশু হত্যা করি’, ‘প্রতিটি আক্রমণের হিংসাত্মক বদলা নিন। সংগ্রামকে ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে দিন’, ‘গ্রেনেড গ্রেনেড গ্রেনেড-শত্রুর প্রচন্ড গ্রেনেড হয়ে ফেটে পড়েছে মুক্তিযোদ্ধারা’ স্লোগানগুলো মুক্তিবাহিনীর প্রত্যয়কে করেছে শাণিত, প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধাকে করেছে আরো ক্ষীপ্র।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে এক অসম লড়াইয়ে বাংলার মানুষকে যে সাহস এবং উদ্দীপনা জুগিয়েছে তা হয়তো অন্য কোনোভাবে পাওয়া সম্ভব হতো না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সাথে তাই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নামটি জড়িয়ে আছে, থাকবে চিরদিন।

- সাজ্জাদুর রহমান
অলঙ্করণঃ রকিবুল হাসান