সোমবার,২৩ Jul ২০১৮
হোম / ফিচার / প্রথমা রূপানন্দা
০৩/০৮/২০১৮

প্রথমা রূপানন্দা

প্রথম বাংলাদেশি আদিবাসী নারীর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন

-

তার নাম রূপানন্দা। পার্বত্য জেলা রাঙামাটির রাজবাড়ি এলাকায় জন্মেছেন। বড়ও হয়েছেন সবুজ পাহাড়ের স্নিগ্ধ হাওয়া আর রাঙামাটি গায়ে মেখে। এক সময় রাজধানী শহর ঢাকায় চলে আসতে হলো তাকে। সরকারি পেশাজীবী পিতার কর্মসূত্রেই এলেন ঢাকায়। মাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করলেন এখানেই। ভর্তি হবার সুযোগ পেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। তখন ২০০৭ সাল।

সমাজবিজ্ঞান দ্বিতীয় বর্ষে থাকাকালীনই রূপানন্দা অস্ট্রেলিয়া সরকারের বৃত্তি পান ২০০৯ সালে। ইউনিভার্সিটি অফ অ্যাডিলেডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়ে কে হারাতে চায়! রূপানন্দাও চাইলেন না। ঢাকা থেকে পাড়ি জমালেন সুদূর অস্ট্রেলিয়ায়।

সেখানে গিয়ে স্নাতক শেষ করলেন ২০১২ সালে। তাও আবার প্রথম শ্রেণি বৃত্তি পেয়ে। ভাবলেন, স্নাতকে যখন এত ভালো রেজাল্ট তখন গবেষণায় কেন নামবেন না! তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তো মেধাবী শিক্ষার্থীদের শতভাগ সুযোগ দিতে প্রস্তুত আছেই। যেই ভাবা সেই কাজ। ‘বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিক-সংক্রান্ত নীতিমালার মূল্যায়ন’ শিরোনামে গবেষণাপত্র লেখার কাজে মন দিলেন। তিন-চার বছর খেটেখুটে তৈরি করা গবেষণাকর্ম জমা দিলেন ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। বিশ্ববিদ্যালয় তাকে তার কর্মের স্বীকৃতি দিল গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর সমাবর্তনে ডিগ্রি দেয়ার মাধ্যমে।

সফল এই নারীর কাছে প্রশ্ন ছিল, এত বিষয় থাকতে পিএইচডির জন্য প্রবাসী-শ্রমিক সংক্রান্ত বিষয়টিকেই কেন বেছে নেয়া? রূপানন্দার সুন্দর জবাব, ‘বিমানবন্দরে দেখেছি দেশের জন্য রক্ত পানি করে রেমিট্যান্স আয় করা মানুষগুলোর দীর্ঘ সারি। আমরা স্বচ্ছন্দে পেরিয়ে যাই ইমিগ্রেশনের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু ইমিগ্রেশনে ওই মানুষগুলোর অপেক্ষা যেন ফুরোয় না। প্রিয়জনের কাছে যেতে তাদের কত অপেক্ষা। এই দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি এদের জন্য কখনো কিছু করার সুযোগ এলে ছাড়ব না।’

কথা রেখেছেন রূপানন্দা। এই ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে তিনি সৃষ্টি করলেন ইতিহাস। প্রথম কোনো বাংলাদেশি আদিবাসী নারী হিসেবে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করলেন। তার আগে বাংলাদেশের ৫০টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার কোনো নারী এই অর্জন ছুঁতে পারেনি। তাঁর করা গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই হয়তো একদিন বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের দুর্দশা দূর করতে এগিয়ে আসবে সরকার।

রূপানন্দার অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী বাবার নাম বিক্রম রায়। আর মা বিপাশা রায়। এই দম্পতির ছোট সন্তান রূপানন্দা। রূপানন্দা নিজেও বিয়ে-থা করে সংসার গুছিয়েছেন। চিকিৎসক স্বামী রিপন তঞ্চঙ্গ্যা আর ১০ মাস বয়সী মেয়ে পার্নিতাকে নিয়ে তার ছোট্ট সাজানো সংসার।

রূপানন্দা রূপকথার মতোই সাফল্যের মঞ্চে উঠে গেলেন তরতর করে। তবে তিনি সাফল্যের সবটুকু কৃতিত্ব নিজের করে নিলেন না। বরং জানালেন, এই পথে তার সাথে ছিল তার বাবা-মা, স্বামী আর শ্বশুরবাড়ির সবার অকুণ্ঠ সমর্থন আর সহযোগিতা। রূপানন্দা কৃতিত্বের ভাগ দিলেন অস্ট্রেলিয়া সরকারকেও। তাদের দেয়া বৃত্তি পেয়েই যে তিনি এতদূর আসার প্রথম পদক্ষেপটি নিতে পেরেছেন।

প্রথম আদিবাসী নারী হিসেবে পিএইচডি নিয়েও রূপানন্দা পুরোপুরি আনন্দে ভেসে যেতে পারেননি। কেননা, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পিছিয়ে পড়া মানুষদের কথা তার মনে পড়েছে বারবার। তারা এখনো এতটাই পিছিয়ে আছে যে প্রথম কোনো নারীর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করতে এতদিন লাগল।

পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী মানুষগুলোর জীবনাচরণ কল্পনা করতে গেলেই ভেসে ওঠে কষ্ট জর্জরিত সংগ্রামী এক জীবন। এখনো বান্দরবান, রাঙামাটি কিংবা খাগড়াছড়ির পাহাড়ে গেলে দেখা মেলে মাথার সাথে কায়দা করে পিঠের ওপর ঝুলিয়ে নেয়া ঝোলাতে কাঠের বোঝা নিয়ে পাহাড়ি পথে হেঁটে চলা কিশোরি বা বৃদ্ধাদের। তবে রূপানন্দার মতো মেয়েরা যখন এগিয়ে যাচ্ছে সামনে থেকে আরো সামনে; তখন আশা করাই যায় একদিন পাহাড়ের কষ্টসহিষ্ণু এই মানুষদের জীবনেও আসবে স্বাচ্ছন্দ্য আর সুখ। তারাও সমানতালে এগিয়ে চলবে সমতলের মানুষদের সাথে পাল্লা দিয়ে।

দিনে দিনে রূপানন্দাদের সংখ্যা বাড়বে সেই স্বপ্ন দেখাটা বাহুল্য নয় নিশ্চয়ই।

- সাজ্জাদুর রহমান