সোমবার,১৯ নভেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / বিশ্বসাহিত্যে স্মরণীয় ঘটনা-২০১৭
০১/০৮/২০১৮

বিশ্বসাহিত্যে স্মরণীয় ঘটনা-২০১৭

-

শেষ হলো ২০১৭। সাহিত্যাঙ্গনে বেশ কিছু স্মরণীয় ও উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে বিদায়ী এই বছরটিতে। বিশ্বের সাহিত্যাঙ্গনে নানাকারণে আলোচিত ঘটনা নিয়ে লিখেছেন মুহাম্মদ মেহেদী হাসান

সাহিত্য পুরস্কার
যথারীতি ২০১৭ সালেও একটা চমক দেখাল নোবেল সাহিত্য কমিটি। তবে ইতিবাচক চমক বটে। বাজিকর ও নামিদামি পত্রিকা থেকে যে সংক্ষিপ্ত তালিকা ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বমিডিয়া এবং সাহিত্যের পাঠক ও লেখকদের মুখে মুখে, সে-তালিকার প্রায় বাইরে থেকে সাহিত্যে নোবেল পেলেন জাপানি ব্রিটিশ লেখক কাজুও ইশিগুরো (জন্ম ১৯৫৪)। তবে গত বছর নোবেল সাহিত্য কমিটি সংগীতের মানুষ বব ডিলানকে এবং তার আগের বছর বেলারুশীয় সাংবাদিক-লেখক সভেতলানা আলেক্সিয়েভিচকে সাহিত্যে নোবেল প্রদানের পর এবার অন্তত ততবড়ো ‘বিস্ময়কর’ কোনো সিদ্ধান্ত যে তাঁরা নেননি, সেটা বলা চলে। কাজুও ইশিগুরো বাংলাদেশে তত পরিচিত ও পঠিত লেখক নন বটে, তবে পশ্চিমা সাহিত্যবিশ্বে সাম্প্রতিক আলোচিত সিরিয়াস ধারার লেখকদের ভেতর তিনি অন্যতম। ইশিগুরো একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, চিত্রনাট্যকার, গীতিকার ও কলাম লেখক। ২০০৫ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাঁর নেভার লেট মি গো উপন্যাসকে শ্রেষ্ঠ একশ ইংরেজি উপন্যাসের তালিকায় ঠাঁই দিয়েছে। ২০০৮ সালে দ্য টাইমস ম্যাগাজিন তাঁকে ব্রিটেনের সেরা ৫০ লেখকের তালিকায় রেখেছে।

নোবেলের পরেই সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার হলো ম্যান বুকার। প্রথম উপন্যাস ‘লিংকন ইন দ্য বার্ডো’র জন্য ম্যান বুকার-২০১৭ পেলেন মার্কিন কথাসাহিত্যিক জর্জ সন্ডার্স (জ. ১৯৫৮)। তিনি মূলত গল্পকার। চারটি ছোটগল্পের ও দুটি বড়োগল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। এর বাইরে তিনি প্রবন্ধ, স্মৃতিকথামূলক ও শিশুতোষ গ্রন্থ লিখেছেন। ইতোপূর্বে ছোটগল্পের জন্য ন্যাশনাল ম্যাগাজিন অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন চারবার, ও’ হেনরি অ্যাওয়ার্ড, পেন/হেমিংওয়ে অ্যাওয়ার্ড, ওয়ার্ল্ড ফ্যান্টাসি অ্যাওয়ার্ড প্রভৃতি অর্জন করেছেন। সন্ডার্সের সাহিত্যে বাস্তবতা, পরাবাস্তবতা ও হাস্যরসাত্মক পরিস্থিতি মিলেমিশে পরিমিত গদ্যে প্রকাশিত হয়।

অন্যান্য বছরের মতো এবারও সাংবাদিকতার বিভিন্ন শাখার সঙ্গে পুলিৎজার পুরস্কার দেয়া হয় কবিতা, নাটক ও কথাসাহিত্যে। মার্কিন কবি তায়েহিমবা জেসের এ বছর পুলিৎজার পুরস্কার পেলেন তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ওলাইও’র জন্য। আমেরিকার গৃহযুদ্ধ আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়ের আফ্রিকান-আমেরিকান শিল্পীদের সম্পর্কে লেখা। নাট্যকার লিন নোটেজ পেয়েছেন নাটকের পুলিৎজার। এবার তিনি দ্বিতীয়বারের মতো পেলেন এ পুরস্কার। এবারের পুলিৎজার পাওয়া নাটকটির নাম ‘সোয়েট’। কথাসাহিত্যে পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছেন কোলসন হোয়াইটহেড। তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাসের নাম ‘দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেইলরড’।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত ছোটগল্পকার ও’ হেনরির নামে প্রবর্তিত ‘ও’ হেনরি সাহিত্য পুরস্কার’ পান বাংলাদেশি লেখক তাহমিমা আনাম। ১৯১৮ সাল থেকে ছোটগল্পের জন্য ও’ হেনরি সাহিত্য পুরস্কার দেয়া হয়। তাহমিমা আনাম ৯৯ তম পুরস্কার পেলেন। তিনি ‘গার্মেন্টস’ গল্পের জন্য এই পুরস্কার পেয়েছেন।

দেশের সাহিত্যাঙ্গনও মুখর ছিল বেশ কয়েকটি সাহিত্য পুরস্কারে। বছরের শুরুতেই বাংলা একাডেমি পুরস্কার-২০১৬ পান- কবিতায় আবু হাসান শাহরিয়ার, কথাসাহিত্যে শাহাদুজ্জামান, প্রবন্ধ ও গবেষণায় মোরশেদ শফিউল হাসান, অনুবাদে নিয়াজ জামান, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে এম এ হাসান, স্মৃতিকথায় নূরজাহান বোস, যিনি ইতোপূর্বে অনন্যা সাহিত্য পুরস্কারও পেয়েছেন, এবং শিশুসাহিত্যে রাশেদ রউফ। এরপর বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার’ পান- কবিতায় নওশাদ জামিল, ‘ঢেউয়ের ভেতর দাবানল’ কাব্যগ্রন্থের জন্য; কথাসাহিত্যে ‘ফুলবানু ও অন্যান্য গল্প’ গ্রন্থের জন্য রফিক হারিরি, প্রবন্ধ-গবেষণা-নাটকে ‘কুঠুরির স্বর’ গ্রন্থের জন্য তুষার কবির, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা ও প্রবন্ধে ‘ভাটকবিতায় মুক্তিযুদ্ধ’র জন্য হাসান ইকবাল এবং শিশু-কিশোর সাহিত্যে ‘অদ্ভুতুরে বইঘর’ গ্রন্থের জন্য শরীফুল হাসান। ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার-১৪২২’ পান মননশীল শাখায় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা’ গবেষণাগ্রন্থের জন্য সৈয়দ আবুল মকসুদ আর সৃজনশীল শাখায় ‘খোয়াজ খিজিরের সিন্দুক’ গল্পসংকলনের জন্য ফয়জুল ইসলাম।

ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার-২০১৬ পান ভাষাসংগ্রামী ও প্রাবন্ধিক আহমদ রফিক, কথাসাহিত্যিক জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ও তরুণ লেখক মাজহার সরকার। আহমদ রফিক ‘একুশের দিনলিপি’ প্রবন্ধগ্রন্থের জন্য ‘প্রবন্ধ, আত্মজীবনী, ভ্রমণ ও অনুবাদ’ শ্রেণিতে এবং জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ‘স্বপ্নের সীমানায় পারাপার’ গ্রন্থের জন্য ‘কবিতা ও কথাসাহিত্য’ বিভাগে পুরস্কৃত হন। আর মাজহার সরকার ‘রাজনীতি’ উপন্যাসের জন্য ‘হুমায়ূন আহমেদ তরুণ সাহিত্যিক পুরস্কার’ ক্যাটাগরিতে বিজয়ী হন।

বছরের শেষ দিকে এসে ‘এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিন হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার ২০১৭’ পেলেন সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত এবং ‘অতীত একটা ভিনদেশ’ গল্পগ্রন্থের জন্য তরুণ সাহিত্য শাখায় মোজাফ্ফর হোসেন। ১২তম জেমকন সাহিত্য পুরস্কার পেলেন প্রবীণ কথাসাহিত্যিক মোহাম্মদ রফিক, তাঁর ‘দু’টি গাথাকাব্য’ গ্রন্থের জন্য। তরুণ কথাসাহিত্যিক আশরাফ জুয়েল এবং মামুন অর রশিদ যৌথভাবে পেলেন জেমকন তরুণ সাহিত্য পুরস্কার-২০১৭। জেমকন তরুণ কবিতা পুরস্কার পেলেন নুসরাত নুসিন। বিদায়ী বছরে শ্রীপুর সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার প্রাপ্তরা হলেন- গবেষণায় ড. জাহিদ হাসান তাপস, শিশুসাহিত্যে রহীম শাহ, কবিতায় তপন বাগচী, কথাসাহিত্যে প্রশান্ত মৃধা, সংগীতে অণিমা মুক্তি গমেজ।

গতবছর অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার-১৪২৪ পেলেন মুক্তিযোদ্ধা লেখক বেগম মুশতারী শফী। চট্টগ্রামের টিআইসি মিলনায়তনে ২ ডিসেম্বর তাঁর হাতে এই পুরস্কার তুলে দেয়া হয়। এছাড়াও বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সাহিত্য পুরস্কার ২০১৬’ পান শামীম আজাদ ও নাজমুন নেসা এবং সমকালীন সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য সাহিত্যবিষয়ক লিটল ম্যাগাজিন ‘লোক’ প্রবর্তিত ‘লোকসাহিত্য পুরস্কার’ পান আহমেদ স্বপন মাহমুদ ও মোস্তাক আহমাদ দীন।

সাহিত্য উৎসব
বছরটি কেটে ছোটোবড়ো বেশ কিছু সাহিত্য উৎসবের ভেতর দিয়ে। অক্টোবর মাসে কুবিকুঞ্জের দুদিনব্যাপী জীবনানন্দ কবিতা মেলা বসেছিল রাজশাহী শহরে। কবিতায় অনন্য অবদানের জন্য এবার কবিকুঞ্জ পদক-২০১৭ পেলেন কবি জুলফিকার মতিন ও ছোটকাগজ সম্মাননা পেলেন অলোক বিশ্বাস সম্পাদিত ‘কবিতা ক্যাম্পাস’ পত্রিকাটি।

সাহিত্য সংগঠন বগুড়া লেখক চক্রের ২৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নবমবারের মতো ‘কবি সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হলো অক্টোবরে। এ বছর ৪টি বিষয়ে বগুড়া লেখকচক্র পুরস্কার পান- কবিতায় জাকির জাফরান, কথাসাহিত্যে সালেহা চৌধুরী, লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনায় ‘দূর্বা’ সম্পাদক গাজী লতিফ এবং সাংবাদিকতায় আমাদের সময় বগুড়ার নিজস্ব প্রতিবেদক প্রদীপ মোহন্ত।

এভাবেই দেশের নানাপ্রান্তে বছরজুড়ে সাহিত্য অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। বছরের শেষদিকে অনুষ্ঠিত সবচেয়ে বড় সাহিত্য অনুষ্ঠানটি হলো ঢাকা লিট ফেস্ট। ১৬ নভেম্বর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ঢাকা লিট ফেস্টের সূচনা হয়। এই আয়োজনের প্রধান অতিথি এবং এই আসরের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন সিরিয়ান বংশোদ্ভূত বিশ্বখ্যাত কবি আদোনিস। সেই সঙ্গে নাইজেরিয়ার কবি-কথাশিল্পী বেন ওকরিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কবি-লেখক-নাট্যকার-নির্মাতা-সাংবাদিক অংশগ্রহণ করেন।

চলে গেলেন যাঁরা
বিদায়ী বছরে দেশ-বিদেশের বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা লেখককে হারাতে হয়েছে। ১৯৯২ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী ক্যারিবীয় কবি, নাট্যকার ডেরেক ওয়ালকটের বর্ণিল জীবনের অবসান ঘটে ১৭ মার্চ, ২০১৭। ১৯৩০ সালের ২৩ জানুয়ারি সেন্ট লুসিয়ায় এক শিল্পী পরিবারে জন্ম তাঁর। বাবা ছিলেন কবি ও চিত্রশিল্পী। ওয়ালকট চিত্রশিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রশিক্ষিত করে তুললেন বটে কিন্তু প্রতিষ্ঠা ও যশ পেলেন লেখক হিসেবে। সাহিত্যের অন্যতম প্রধান তিন শাখায়- কবিতা, নাটক ও প্রবন্ধে- তিনি তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।

প্রখ্যাত নারীবাদী লেখিকা ও মার্কিন শিল্পী কেট মিলেট ৮২ বছর বয়সে চলে যান। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত ‘সেক্সুয়াল পলিটিক্স’ তাঁর বিখ্যাত নারীবাদী গ্রন্থ। ১৯৭৯ সালে ইরানে প্রথমবার আন্তর্জাতিক নারীদিবস পালন করতে গিয়েছিলেন কেট। আয়াতুল্লাহ খোমেনির সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়। ‘সেক্সুয়াল পলিটিক্স’ বইটি ১৫ দিনে দশ হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল। কোনো অ্যাকাডেমিক গবেষণাপত্রের এ রকম জনপ্রিয়তা বিশেষ দেখা যায় না।

দেশে গতবছর আমরা হারিয়েছি একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখক কথাসাহিত্যিক জুবাইদা গুলশান আরা। উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, শিশুতোষ ছড়া মিলিয়ে জুবাইদা গুলশান আরার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৫০টির বেশি। প্রাণ ও প্রকৃতির মায়া কাটিয়ে চিরবিদায় নেন ‘নিসর্গসখা’খ্যাত লেখক-অনুবাদক দ্বিজেন শর্মা। বাংলা একাডেমি, একুশে পদকসহ বিভিন্ন জাতীয় সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি। রাজধানীর অসংখ্য জায়গায় গাছ লাগিয়েছেন নিজ হাতে। তৈরি করেছেন উদ্যান ও বাগান। চলে গেলেন কবি-সাংবাদিক সাযযাদ কাদির। একাধারে তিনি বাংলা সাহিত্যের ষাটের দশকের অন্যতম কবি, গবেষক ও প্রাবন্ধিক হিসেবে পরিচিত। আমরা আরো হারাই স্বনামধন্য কবি খালেদ মতিনকে। বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট লেখক ও কথাসাহিত্যিক শান্তনু কায়সারও চলে যান বিদায়ী বছরে। সংগীত-গবেষক ও প্রাবন্ধিক করুণাময় গোস্বামীকেও হারাতে হয়েছে। চলে গেছেন শিশুসাহিত্যিক ও গবেষক শামসুল হক এবং প্রাবন্ধিক-গবেষক আজহার ইসলাম-সহ দেশের সাহিত্যাঙ্গনের বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা লেখক।