শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭
হোম / বিনোদন / ট্যাবু ভাঙার দুঃসাহসী ছবি
১১/০৫/২০১৭

ট্যাবু ভাঙার দুঃসাহসী ছবি

-

ছবি মুক্তির আগে থেকেই প্রবল বিতর্কের মুখে পড়েছিল ‘লিপস্টিক আন্ডার মাই বুরখা।’ স্বল্পবাজেটের বলিউডের এই সাহসী ছবি এতটাই বিতর্কিত ও প্রশংসিত হয় যে, ভারতের সেন্সর বোর্ড নানাভাবে আটকে রাখার চেষ্টা করেও ছাড়পত্র দিতে বাধ্য হয়। নারীকেন্দ্রিক এই ছবির মূল কাহিনি আবর্তিত হয়েছে চার নারীর গল্প নিয়ে, যাঁরা পুরুষতন্ত্রের বেড়াজাল ছিন্ন করার নতুন স্বপ্ন দেখেন, দেখান।

এ ছবির গল্প চিত্রায়িত হয়েছে ভোপাল শহরের পটভূমিতে। ছবির চারটি মূল নারী চরিত্রের একজন হলেন কলেজপড়ুয়া। একজন অরক্ষণীয়া, বিয়ে করতে চান নিজের পছন্দে। একজন বিবাহিতা, তিন সন্তানের জননী। চতুর্থ জন বছর পঞ্চাশোর্ধ নারী। কলেজপড়ুয়া রেহানা (প্লাবিতা) একজন স্বাধীনচেতা মানুষ। বোরখার বেড়াজাল ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইলেও সমাজের রাঙা চোখের চাহনিতে সেই আশা আর পূরণ হতে পারে না। পছন্দ করেন রিপড জিনস, ব্যাড বয়জ, মিলি সাইরাসের ব্রান্ডের গান শুনতে। প্রতিদিন একটু একটু করে স্বপ্ন দেখেন গায়িকা মিলি সাইরাস হওয়ার। তবে তাঁর সেই স্বপ্ন কালোছায়ার আড়ালে চলে যায় যখন-তখন। স্বপ্নের এই লুকোচুরি অনেকটা বোরখার আড়ালে চলে যাওয়া তাঁর মুখের লুকোচুরির মতোই-যে মুখ বোরখা থেকে বেরিয়ে দুচোখে শুষে নেয় গোটা দুনিয়া। আবার পরক্ষণেই চলে যায় আড়ালে।

অন্যদিকে, শিরিন (কঙ্কনা সেন শর্মা) নিজের স্বামীকে নিয়ে ভীষণভাবে অখুশি। কারণ তাঁর স্বামীর কাছে সে একটা যৌনসুখের মাংসল বস্তু ছাড়া কিছুই নয়। তবে এত কিছু মাঝেও নিজের কাজের মধ্যেই মুক্তি খুঁজে পান এই মুসলিম ঘরোয়া নারী। এদিকে নিজের যাবতীয় মুক্তিভাবনা নিয়ে বাঁচেন ৫৫ বছরের উষা পরমার (রত্না পাঠক শাহ)। বয়সের ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু মনে এখনো বসন্ত। ভরপুর সংসারেও মন বসে না ঊষার। ফোনে কিংবা হোটেলের সুইমিং পুলে নিজেকে ধরা দেন নতুন প্রেমিকার মতোই। শুধু ঊষার জীবনই নয়, ক্লাইম্যাক্স শুরু হয় সিনেমার চার নারীর জীবনেও। আর এখান থেকেই ছবির গল্প শুরু। লীলা নামের আরেক চরিত্রও ডানা মেলতে চায় নিজের বহু দমিয়ে রাখা কামনা বাসনার দুনিয়ায়। তবে তা সবই এসে আটকে যায় কোথাও একটা। আর সেই জয়গা থেকেই এই চার চরিত্রের লড়াই।

ছবিটা এতোটাই মেয়েদের নিজস্ব গল্পকথন যে তাঁরা সম্ভবত খুব সাবলীলভাবে স্ক্রিপ্টের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছেন। আর ছবি পৌঁছে গিয়েছে অন্য মাত্রায়। বিবাহিতা নারী যে সেক্স পাচ্ছেন, তা যেন যান্ত্রিক। শৃঙ্গার নেই, চুম্বন নেই। কলেজছাত্রী চাইছেন টিন-এজ ভালোবাসা। কাফ-লাভ। গান-কবিতা বিনিময়। একটু নেশা করে বসে থাকা। গায়ে গা এলিয়ে থাকা। অরক্ষণীয়া ঘন ঘন শরীর বিনিময় করেন। কিন্তু তাতে তাঁর ইচ্ছা গুরুত্ব পায় নাকি পুরুষটি যতক্ষণ চায়, ততক্ষণই? আর কল্পনায় নগ্ন পুরুষদেহ ছুঁয়ে ফেলতে চান প্রবীণা। টেলিফোন-সেক্স করেন সুইমিং কোচ নবযুবকের সঙ্গে!
নারীমনের এই যে আবছায়া ঘেরা সুড়ঙ্গ, চাহিদা আর বাস্তবের দ্বন্দ্বময় অলিগলি, সেখানেই ঘুরে বেরিয়েছে এ ছবি। তাই এই ছবিকে অন্য কোনো ছবির সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। বিষয় থেকে শুরু করে চলন সবটাই অভিনব। এই চরিত্রগুলোর সমস্যার সমাধান কিন্তু ছবিটার উদ্দেশ্য নয়। ‘আপনি বুঝবেন না’-এর কিছুটাও কি বুঝতে পারা যায়? সেই খোঁজটাই এখানে আসল। বোরখার ভেতরে লুকিয়ে থাকা লিপস্টিক, সুইম স্যুট, ওয়াক্সিং, ব্রেসিয়ারের ছোট ছোট গল্প।

ধারাবাহিকভাবে যৌনদৃশ্য, আপত্তিকর শব্দ, অডিও পর্নোগ্রাফি ব্যবহার এবং কিছু দৃশ্য সমাজের বিশেষ একটি অংশের জন্য স্পর্শকাতর-এমনতর অভিযোগে সিনেমাটি নিষিদ্ধ করেছিল ভারতীয় সেন্সর বোর্ড। তবে মুক্তির লড়াই থামিয়ে দেননি পরিচালক অলঙ্কৃতা শ্রীবাস্তব। ভারতীয় সেন্সর বোর্ডের কাঁচির কোপে বাদ দিতে হয়েছে ছবির ২৭টি দৃশ্য, যা প্রেক্ষাগৃহের দর্শকরা অন্তত দেখতে পারেননি। কোন কোন দৃশ্য বাদ দিতে হবে, রীতিমতো একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছিল তার। ছবি মুক্তির পরই তা প্রকাশ্যে এসেছে। বাদ গেছে চুম্বনের দৃশ্য, গালিগালাজের কিছু সংলাপ, ব্লাউজের বোতাম খোলার দৃশ্য ও নারীর নগ্ন পিঠের দৃশ্য গুলি। তবে চলচ্চিত্রবোদ্ধারা প্রশ্ন তুলেছেন এই কাঁচি চালানো নিয়ে। ছবি তো নির্দিষ্ট কিছু দর্শকদের জন্যই ছিল, তাহলে সত্যিই কি এমন দৃশ্য বাদ দেওয়া যুক্তিযুক্ত? এমন দৃশ্য কি বাস্তবের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত নয়?

তবে সমস্ত কিছুকে নিজের মতো করে সামলেছেন পরিচালক অলঙ্কৃতা শ্রীবাস্তব। চিরাচরিত পুরুষ মনস্তত্ত্বধর্মী সমাজে প্রতিনিয়ত নারীদের লড়াইয়ের গল্প সোজাসাপটা ভাবেই বলেছেন তিনি। যে সিনেমায় রত্না পাঠক শাহের সঙ্গে কঙ্কনা সেন শর্মার মতো অভিনেত্রী রয়েছেন, সে ছবির ‘অভিনয়’ বিভাগই বিশেষ আকর্ষণ হয়ে ওঠে।

দর্শকের মনে হতেই পারে, গল্পটা যখন চার নারীদের নিয়ে, সেখানে লাল রঙের লিপস্টিকের গল্পটা আসছে কোথা থেকে। উত্তরটা খুব সহজ। নারীর প্রতীককেই বারবার খোঁচা দিয়েছে এ সমাজে। প্লাবিতা ও অহনা যদিওবা ঠোঁট রাঙা করে নিজেদের গণ্ডি পেরেয়ে আসতে পেরেছেন, সেখানে কঙ্কনা একেবারেই ঘরোয়া এক নারী। তাই তাঁর চরিত্রের সঙ্গে মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা নিজেদের মেলাতে পারবেন অনায়াসে।

পরিচালক ও সিনেমার কলাকুশলীদের ছাড়াও সিনেমাটোগ্রাফার অক্ষয় সিং-এর প্রসঙ্গও আনতে হয়। মানসিক অবসাদ, জীবনের লড়াইয়ে বেঁধে দেওয়া শিকল ছাড়ার আপ্রাণ চেষ্টার মুহূর্তগুলিকে দারুণভাবে ক্যামেরাবন্দি করেছেন তিনি। এ ছাড়া জেবুননেসা বাংগাস ও অনভিতা দত্তের কণ্ঠে লে লি জান গানটিও চমৎকার।

নারীদের সুপ্ত আকাঙ্খা, তাঁদের স্বাধীনতা-সবকিছুর কথাই বলেছে অলঙ্কৃতা শ্রীবাস্তবের ছবি লিপস্টিক আন্ডার মাই বুরখা। পরিচালক মনে করেন, যৌনতা নারীদেরও প্রয়োজন, সুতরাং তা নির্দ্বিধায় জোরগলায় বলা উচিত। চারজন নারীর জীবনের মধ্যে দিয়ে এই বার্তা পৌছে দিয়েছেন তিনি। নারীদের শারীরিক সমস্যা সমাজের হাসির কারণ, তা নিজেদেরই বন্ধ করা উচিত। স্যানিটরি ন্যাপকিন নিয়ে ট্যাবু দূর করতে হবে, স্পষ্ট করে বলেছেন কঙ্কনা।

নারীকেন্দ্রিক ছবি অনেক হয়েছে, তবে এই ছবি নারীদের নতুন দিশা দেখাবে, সমাজকে নতুনভাবে ভাবতে শেখাবে, এমনটাই মনে করেছেন ছবির পরিবেশক একতা কাপুর। গত ২১ জুলাই ভারতে একযোগে ৪০০ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় এই সিনেমা। এটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৪ কোটি রুপি। সাফল্য এনেছে বক্সঅফিসেও। বিশ্বজুড়ে নানা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কার প্রাপ্তির তালিকাও কম সমৃদ্ধ নয় এ ছবির। গ্লাসগো ফিল্ম ফেস্টিভাল থেকে লন্ডন ফিল্ম ফেস্টিভাল-একের পর এক পুরস্কার জিতেছে এই ভারতীয় ছবি।

- অদ্বয় দত্ত