শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭
হোম / ফিচার / চল্লিশে জীবন শুধু যাপন নয়, হোক উদযাপন!
১০/২৩/২০১৭

চল্লিশে জীবন শুধু যাপন নয়, হোক উদযাপন!

-

খালা আমার নতুন সাপোর্ট স্টাফ। কাজ-কর্মের ফাঁকে দেখি গুনগুন করে গান গায়। শুনে আমি বললাম, খালা, তুমি কাজ করার সময় গুনগুন করে কী গাও? তোমার মনে তো দেখি অনেক সুখ খালা! আমাকেও শুনাও একটু।

ও মা! সে দেখি চোখ মুছতে মুছতে বলে,

‘জালালি’ এই গান নাকি তার ‘দুক্কের’ গান!

সাত সাতটা ছেলেমেয়েসহ তাকে ফেলে রেখে স্বামী পালিয়েছে বহুদিন। সেই দুঃখে সে জালালি গান গেয়ে বেড়ায় সারাদিন।

আমি বলি, এত সুন্দর বউ রেখে যে ব্যাটা পালায় সে তো একটা আস্ত বদলোক!

খালা চোখ মুেছ বলে, ‘সাত বাইচ্চার মা হইসি, অহন কী আর আমারে তার সুন্দর লাগবো?’

কিছুদিন হলো ফেইসবুকে একটা বিদেশি পেইজ ফলো করছি। এই গ্রুপে বিভিন্ন দেশের মেয়েরা তাদের Domestic violence, Narcissist পুরুষ বন্ধু বা সঙ্গী দ্বারা নির্যাতিত হবার, আবার কখনোবা তা থেকে মুক্ত হবার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে থাকে। কেউ কেউ নির্যাতনের চিহ্নসহ ছবি তুলে পোস্ট করে। ইউরোপ-আমেরিকার মতো দেশেও দেখি মেয়েদের ওপরে অহরহই এসব মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। অবাক হয়েছি, বেশিরভাগ মেয়েই বিচ্ছেদ বা ছাড়াছাড়ি হবার পর নিজের ওজন কমিয়ে, সেজেগুজে তোলা ছবি পোস্ট করে জানতে চায়, তাকে আসলেই কেমন লাগছে! কারণ প্রায় সব প্রাক্তন সঙ্গীই নাকি একটা সময় মেয়েদের চেহারা ও শারীরিক গঠনকে কটাক্ষ করে বলা আরম্ভ করে- ‘তুমি এত বাজে, এত কুৎসিত যে তোমার দিকে কেউ, কোনোদিন ফিরেও তাকাবে না।’ সেই সঙ্গে এও বুঝিয়ে দেয় যে, ‘আমি ছাড়া তোমার গতি নেই!’ অনেক মেয়ে অত্যাচারের ভয়ে নিজের সন্তানধারণের সংবাদ পর্যন্ত গোপন রাখতে বাধ্য হয়। কারো বয়ফ্রেন্ড এত সন্দেহপ্রবণ যে বান্ধবীর সাজপোশাক, হাসির ফোয়ারা দেখলে তার পিত্তি জ্বলতে শুরু করে। এছাড়া বিচ্ছেদের পরেও খুদে বার্তায়, অনলাইনে হুমকি-ধামকি তো আছেই। অর্থাৎ, মেয়েটি কেন সেই নির্যাতক পুরুষকে ছাড়াই দিব্যি ভালো আছে, নিজের জীবন উপভোগ করছে, তা তার সহ্য হচ্ছে না।

এ গল্প তো নতুন কিছু না! পৃথিবীর আনাচেকানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সব আমাদেরই রোজকার গল্প।

তাই আমার দেশের অজপাড়াগাঁয়ের বাচ্চার মা-জালালি গান গাওয়া সেই খালা আর ডিভোর্সের পর সুইম স্যুট পরে ছবি তুলে তাকে আকর্ষণীয় দেখাচ্ছে কিনা জানতে চাওয়া তিন বাচ্চার মা আমেরিকান মেয়েটির মধ্যে কী অদ্ভুত মিল খুঁজে ফিরি আমি!

হলিউড হার্ট থ্রব ক্যামেরন ডায়াসের একটি সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম। চল্লিশের পর নিজেকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ভাবেন এই অভিনেতা। কারণ, এই বয়সে মন থেকে ভয়-ডর দূর হয়ে যায়। আর পুরুষ কী ভাবলো তা নিয়ে উদ্বিগ্ন না হলেও চলে- এই উপলব্ধিটাও বেশ ভালোভাবেই আসে। তাই চল্লিশ অনেক বেশি স্বাধীন, স্বচ্ছন্দ।

অথচ সেই আদ্যিকাল থেকে শুনে আসা ‘কুড়িতেই বুড়ি’ থিওরি থেকে পুরুষেরা বেরোতে পারেনি আজো পর্যন্ত। আমাদের এখানে তো অভিনেতা থেকে শুরু করে একটা সাধারণ মেয়েকেও তাই তিরিশ পেরোতে না পেরোতেই ‘বুড়ি-ধুড়ি-বাতিল’ জাতীয় নানা খেতাবে ভূষিত হতে হয়।

আদতে মেয়েদের জীবনে চল্লিশ বছর একটি টার্নিং পয়েন্ট বলে আমার মনে হয়। জীবনের যে পর্যায়ে পৌঁছে একজন নারী নিজেকে আবিষ্কার করতে শুরু করে। চল্লিশের নারীকে পুরুষতন্ত্র ভয় পায়, এড়িয়ে চলতে চায়। কারণ, নারীর এই মানসিক পরিপক্কতা, সচেতনতার কাছে পুরুষতান্ত্রিক দমন-পীড়ন, প্রতারণা, জারিজুরি সুবিধা করে উঠতে পারে না।

চল্লিশের নারীকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়, তার সুখের ঘরের চাবি কব্জা করা কঠিন। তাই তো সে বুড়ি, ধুড়ি, বাতিল, পাগল আরো কত কী?

আসলে বিশ তিরিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ-বিষয় না। এগুলো মনোবল ভেঙে দেবার পুরুষাতন্ত্রিক চক্রান্ত বৈ কিছু নয়।

শৈশব, কৈশোর পার হয়ে দ্বিধাগ্রস্ত বয়ঃসন্ধিকাল, দেখতে না দেখতেই স্বপ্নাতুর তারুণ্য- তারপর সময়ের চোরাস্রোতে হঠাৎ একদিন তিরিশের চৌকাঠ পেরিয়ে চল্লিশের দুয়ারে কড়া নাড়া। জীবনের পথ বেয়ে হেঁটে আসার এই পথটুকু কোনো মেয়ের জন্যই মসৃণ নয়। শারীরিক গঠনে পরিবর্তন আসা, পিরিয়ড হওয়া, সন্তানধারণ, সন্তান প্রসব, বাচ্চাকে ব্রেস্টফিড করানো থেকে মেনোপজ-প্রতিটি ধাপেই নারী শারীরিক-মানসিক এক নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে চলে। সেই সাথে সমাজ-সংসার-কর্মক্ষেত্রের চাপ তো আছেই।

একটি মেয়ে তার চলার পথে এই ধাপগুলোতে পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী, হাতে হাত রেখে একসঙ্গে জীবন পাড়ি দেবার শপথ নেয়া এক সময়ের ‘প্রেমিক পুরুষ’ বা ‘স্বামী মহোদয়ের’ কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহমর্মিতাটুকু কী ঠিকঠাক পায় আদৌ? আমার মনে হয় না খুব জোর গলায় এর জবাবে ‘হ্যাঁ’ বলা যায়।

বরং বিভিন্ন বয়সে স্তনের আকৃতি ও তার পরিবর্তন নিয়ে হাস্যরস, পিরিয়ড নিয়ে মশকরা, সন্তান ধারণ ও প্রসবের সময় স্বামী-শ্বশুরগৃহ-কর্মক্ষেত্র থেকে অসহযোগিতা, শ্বশুরবাড়ি থেকে পুত্র সন্তান, কন্যা সন্তান নিয়ে তীব্র মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন, সদ্য মা হবার পর ‘বেবি ব্লুজ’-এর মতো মানসিক অবস্থায়- যে সময় অনেক মায়েরাই হতাশা বা ডিপ্রেশনে ভোগেন- তাদের পাশে না দাঁড়িয়ে তাদেরকে ‘খিটখিটে হয়ে গেছে’ বলে দোষারোপ করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে তাকে ‘মেন্টালি সিক’ বলে দমন করা, নারীসঙ্গীর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বয়স আর শারীরিক গঠন নিয়ে পুরুষের ক্রমাগত কটাক্ষ ও অবজ্ঞা, মেনোপজের দিনগুলোতে কোণঠাসা করা- এমন অগণিত অপমানজনক কথায়, কাজে একজন নারী সর্বোপরি একজন মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তোলা হয়। বড় অমানবিক এই সিস্টেম।

এই ঊনচল্লিশে এসে, চল্লিশের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বলতে পারি, নারীর স্বাধীন চিন্তায় চল্লিশ এক চমৎকার, সুদৃশ্য পালক। সেই পালকে ভর দিয়ে পেছনে ফেলে আসা জীবনের সব অপূর্ণতাকে অগ্রাহ্য করে শূন্যে ভেসে থাকা যায়। কারো জন্য থেমে থাকা নয়। চল্লিশ পেরোলেই চালশে নয় বরং Life begins at forty.

- ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী