শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭
হোম / ফিচার / বিয়ের বাজারে দাম বাড়ানোর জন্য পড়াশোনা না করে শিক্ষাটাকে কাজে লাগাতে হবে
০৯/২৭/২০১৭

বিয়ের বাজারে দাম বাড়ানোর জন্য পড়াশোনা না করে শিক্ষাটাকে কাজে লাগাতে হবে

- ড. পারভীন হাসান, উপাচার্য, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি

-

ছয় বছর আগে মাত্র চারজন মেয়েকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি। এখন ছাত্রী সংখ্যা ৪১৪। এই সময় পরিসরে ৭০/৮০ জন পাস করে বেরিয়েছে। ভালো চাকরি পেয়েছে। তাদের প্রায় সবাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নারীর উচ্চশিক্ষা প্রসারের ব্যাপারে আমি খুবই আশাবাদী। নাহলে শিক্ষকতায় থাকতাম না। শিক্ষক হতে পেরে আমি তৃপ্ত। কোথাও গেলে প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা যে আন্তরিক সম্মান দেয়, তাতে মুগ্ধ অভিভূত হতে হয়।

কথাগুলো বললেন পুরনো ঢাকায় স্বাতন্ত্র্যমিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. পারভীন হাসান। দীর্ঘ ৫১ বছর ধরে শিক্ষকতায় নিয়োজিত বলে গত ৫ এপ্রিল তাঁর অফিসে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান। ১৯৬৬ সালে প্রথম এম.এ পরীক্ষার ফল বেরোবার আগেই শুরু করেন শিক্ষাদানের কাজ। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইংরেজি, রিজিওনাল স্টাডিজ ছিল তাঁর অধ্যয়নের বিষয়। পিএইচডি করেছেন ইসলামি স্থাপত্যকলার ওপর। দেশ-বিদেশে অজস্র গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর। বহির্বিশ্ব অনেক সেমিনারে তিনি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেছেন। ইংরেজি এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তরাষ্ট্রের ওবারলিন কলেজ। ২০১২ সাল থেকে সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটির উপাচার্য হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।

ঐতিহ্যসন্ধানী এই গবেষকের প্রাপ্ত পুরস্কার ও সম্মাননার মধ্যে রয়েছেঃ শ্রেষ্ঠ সৃজনশীল শিক্ষক হিসেবে ISESCO পুরস্কার, বিচারপতি মোহাম্মদ ইব্রাহিম স্বর্ণপদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডীনস অ্যাওয়ার্ড ইত্যাদি। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ, মুজিবুর রহমান ট্রাস্ট, বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন, উৎস বাংলাদেশ, টিআইবিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে তিনি যুক্ত।

সাক্ষাৎকারে নারীশিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও গবেষণার সামগ্রিক মান ইত্যাদি নানা বিষয়ে আমাদের কথা হয়। নিজের প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে তিনি বলেন, এখানে শুধু মেয়েদেরই পড়াশোনা করার সুযোগ রয়েছে। ছাত্র ভর্তি করলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বাড়ানো যেত। তেমন কোনো পরিকল্পনা
আমাদের নেই। বর্তমানে ছয়টি বিভাগ আছে। আরো অনেক বিভাগ খোলার অনুমোদন অবশ্য নেয়া হয়েছিল। আগামী বছরের জানুয়ারিতে সমাবর্তন আয়োজনের কথা আমরা চিন্তাভাবনা করছি।

এক প্রশ্নের উত্তরে ড. পারভীন হাসান বলেন, মেয়েদের কথা আলাদা করে কী আর বলব? ছেলে-মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই শিক্ষার মান সামগ্রিকভাবে নেমে গেছে। ইংরেজিতে প্রায় সবাই এত বেশি দুর্বল যে, চিন্তাই করা যায় না।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় হলো যে, নিম্ন পর্যায় থেকে ভিত মজবুত করতে হবে। ভিত্তি দুর্বল থাকলে আপনি ভালো কিছু আশা করতে পারেন না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা ইংরেজি ভাষার ফাউন্ডেশন কোর্স করাই। এটা সকল বিভাগের জন্যই প্রযোজ্য। ইংরেজির বুনিয়াদ পাকাপোক্ত না হলে ভালো চাকরি মিলবে না। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠ্যতালিকার বাইরে সাংস্কৃতিক সৃজনশীল চর্চার সুযোগ রয়েছে। অভিভাবকদের মধ্যে একটা প্রবণতা দেখি যে তারা মনে করেন মেয়ের একটা সার্টিফিকেট হলেই হলো। ছেলেদের পড়াশোনায় টাকা খরচ করতে কোনো কার্পণ্য নেই তাদের। মেয়েদের বেলায় সেই উদারতা দেখা যায় না। অনেক গার্জিয়ান বলেন, এত ক্লাস করান কেন? প্রতিদিন ক্লাস না করলে কী চলে না? ড. পারভীন বলেন, এই যে মাইন্ডসেট, এর পরিবর্তন ঘটাতে হবে। আমরা বলি ক্লাস শেষ হওয়া মাত্রই মেয়েকে ছোঁ মেরে বাসায় নিয়ে যেতে হবে কেন? বাসায় নিয়ে তো সেই সিরিয়াল দেখা। ক্লাসের পর কম্পিউটার ল্যাবে কাজ পারে। অন্যের সঙ্গে মেলামেশা করলেও মনের দিগন্ত প্রসারিত হয়।

নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. পারভীন হাসান বলেন, এক্ষেত্রে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। আগে তো মেয়েদের চাকরির ক্ষেত্র ছিল সীমিত। মাত্র অল্প কয়েকটা পেশায় দেখা যেত তাদের। যেমন শিক্ষকতা, ব্যংঙ্কিং, চিকিৎসা সেবা। এখনকার নারীরা অনেকটাই অগ্রসর। বিভিন্ন জটিল কাজে নিজেদের যোগ্যতা ও সামর্থ প্রমাণে সক্ষম হয়েছে তারা। এখন পুলিশ, সামরিক বাহিনী, বিমানচালনাসহ চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীরা ভালো করছেন। তা সত্ত্বেও সমাজের মাইন্ডসেটে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আমরা লক্ষ করছি না। ছেলে-মেয়ের মধ্যে প্রভেদ করা হবে কেন? সব ক্ষেত্রে সমতা নিশ্চিত করতে হবে।

নারীর প্রতি সহিংসতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নারীর প্রতি ভায়োলেন্স দিনকে দিন বাড়ছে। এই পরিস্থিতি মারাত্মক। গভীর উৎকণ্ঠার বিষয়। বিশেষত টিন এজার মেয়েদের উপর যে সহিংসতা চলছে তা আমার কাছে খুবই ভীতিপ্রদ মনে হয়। এই যে অবক্ষয়, সামাজিক অস্থিরতা- এ থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হবে। ছেলে-মেয়েরা কেন সন্ত্রাসী হবে? আমাদের আরো বেশি মানবিক, আরো সহিষ্ণু হওয়া প্রয়োজন। নীতিশিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। তথ্য প্রযুক্তির প্রসারের এই সময়ে বাবা-মা, অভিভাবককে আরো বেশি সচেতন, দায়িত্বশীল ও সতর্ক হতে হবে। তাহলে হয়তো বিপথগামিতা থেকে ফেরানো সম্ভবপর হবে তরুণ প্রজন্মকে। ইন্টারনেট আমরা বন্ধ করতে পারব না। তবে ছেলে-মেয়েরা বাবা-মায়ের খেয়াল রাখতে হবে। গাইডেন্স থাকতে হবে।

আজীবন শিক্ষাব্রতী ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক ড. পারভীন হাসান আরো জানালেন, তাদের ইউনিভার্সিটিতে নতুন বিভাগ আরো খোলা হবে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে গ্রাফিক ডিজাইন। এই বিভাগটির চাহিদা আছে। আমাদের ক্যাম্পাসটি বিশেষ বড় নয়। খেলাধুলায় জায়গা নেই। শিগগিরই মেয়েদের জিম একটা করে দেব আমরা। প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমি সব সময় ছাত্রীদের বলি, বিয়ের বাজারে নিজের দাম বাড়ানোর জন্য পড়াশোনা করে কোনো লাভ নেই। যে সাবজেক্টেই পড়ো না কেন, তোমাকে প্রফেশনাল হতে হবে। কাজে লাগাতে হবে শিক্ষাটাকে। সেন্ট্রাল ইউমেন্স ইউনিভার্সিটিতে বর্তমান শিক্ষক রয়েছেন ৩৩ জন। তার মধ্যে ২২ জনই নারী।

ড. পারভীন হাসানের গবেষণা কর্মের অনেকগুলোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য দেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছেঃ দি প্রেঞ্জেস অব দি পাস্টঃ ট্র্যাডিশন, ক্রিয়েটিভিটি অ্যান্ড আইডেনন্টিটি ইন দি আর্কিটেকচার অব মেডিইভল বেঙ্গল, সুলতানস অ্যান্ড মস্কস, সাউথ এশিয়ান কালচার অ্যান্ড ইসলাম, কলোনিয়াল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মস্ক আর্কিটেকচার অব দি সুলতানাত পিরিয়ড, দি ফুটপ্রিন্ট অব দি প্রফেট, শিহরাবস ইন বেঙ্গলি মস্কস ইত্যাদি।

সাক্ষাৎকারঃ হাসান হাফিজ