শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭
হোম / ফিচার / বাতিল তিন তালাক প্রথা ও মানবাধিকার
০৯/২৮/২০১৭

বাতিল তিন তালাক প্রথা ও মানবাধিকার

-

তিন তালাকপ্রথা বাতিল হলেও এর কারণে এত বছর ধরে লিঙ্গবৈষম্যের শিকার হওয়া নারীদের সংগ্রামের স্বীকৃতি কতটুকু মিলেছে? এমন অনেক প্রশ্নের জবাব পাওয়া গিয়েছে সম্প্রতি হাফিংটন পোস্টে প্রকাশিত হওয়া কৌসুলী ইন্দিরা জয়সিং-এর ইন্টারভিউতে।

সম্প্রতি ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে দেশটিতে তিন তালাকপ্রথা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না অসংখ্য নিপীড়িত নারীর দাবির প্রেক্ষিতে কার্যকর হওয়া এই রায় ভারতের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক সিদ্ধান্ত। তবে এই রায়ের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থেই কী নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?

২০১৪ সালে এমবিএ পাস করে সদ্য চাকরিতে যোগ দেওয়া আফরিন রহমানের বিয়ে হয় বেশ ধুমধাম করেই। সংসারের দিকে চেয়ে বিয়ের পর তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। কিন্তু স্বামীর পরিবার থেকে দাবি করা যৌতুকের টাকা দিতে না পারায়, বিয়ের এক বছরের মাথায়, বাপের বাড়ি ফিরে আসতে হয় আফরিনকে। তার কিছুদিন পর স্বামীর কাছ থেকে একটা চিঠি পান তিনি, যাতে লেখা ছিল- ‘তালাক, তালাক, তালাক’। হতবাক আফরিনের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে অনেকদিন সময় লেগেছিল। তারপর ন্যায়বিচার পেতে সুপ্রিম কোর্টে হাজির হয়েছিলেন তিনি। ঠিক একই ধরনের দাবি নিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ আদালতে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এসেছিলেন সায়রা বানো, গুলশান পারভিন, আতিয়া সাবরিদের মতো অনেকেই। তার ফলাফলস্বরূপ এই প্রথা বাতিল করা হয়েছে। তবে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে এই বিষয় নিয়ে যুক্তি উপস্থাপন করা একমাত্র নারী ইন্দিরা জয়সিং-এর মতে এই রায়ে আফরিনদের কষ্টের কথা নেই। বলা হয়নি এই প্রথা কীভাবে যুগ যুগ ধরে ভারতবর্ষে লিঙ্গবৈষম্যে ইন্ধন যুগিয়েছে। যদিও বিচারকদের রায়ে তিন তালাক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে যারা এতদিন এই প্রথার শিকার হয়ে অত্যাচারিত হয়েছেন, তারা আদৌ ন্যায়বিচার পেয়েছেন কিনা, সেদিকটা খতিয়ে দেখা হয়নি। লিঙ্গসমতার বিষয়টাও তাই আলোচনার বাইরে চলে গিয়েছে। তার মতে, ‘এই রায়ে মানবাধিকারের বিষয়টি অনুপস্থিত।’

মুসলিম আইন অনুযায়ী তিন তালাক কারো মৌলিক অধিকার ভঙ্গ করে না বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের প্রধান বিচারপতি জে এস খেহর এবং বিচারপতি আব্দুল নাজির। এতে বিতর্কের জন্ম হয়েছে। তাদের এই মন্তব্যকে লিঙ্গসমতার পরিপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত করে দেশটির সাবেক সলিসিটর জেনারেল ইন্দিরা জয়সিং বলেন, এতেই বোঝা যায়, এই রায়ে নারীর মৌলিক অধিকারের বিষয়টি অস্পষ্ট এবং তা সমাজ থেকে পুরোপুরিভাবে তিন তালাক বা এ ধরনের সংস্কার নিশ্চিহ্ন করার পথে বাধা সৃষ্টি করবে।

তবে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই রায়ের পর তিন তালাক নিয়ে সমাজে সামগ্রিক অবস্থাটা কেমন দাঁড়াবে। ইন্দিরার মতে বিষয়টি নিয়ে সুস্পষ্ট আইন পাস হওয়ার পথে এখনো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। যদিও অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, তিন তালাক আইনত অবৈধ এবং এ নিয়ে শীঘ্রই একটি আইন পাস হবে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এ নিয়ে কোনো আইন পাসের ব্যাপারে উদ্যোগের কথা বলা হয়নি। এছাড়া এই রায়ে একবারে তিন তালাক উচ্চারণ করে বিচ্ছেদ অবৈধ ঘোষণার কথা বলা হয়েছে; কিন্তু একই জিনিস যদি একবারে উচ্চারণ না করে তিন মাস সময় নিয়ে করা হয়, তবে সেই স্বামী দাবি করতে পারবেন তিনি একবারে তিন তালাক দেননি, 'তালাকে আহসান' দিয়েছেন, যেটা আদালতে বৈধ বলেই গণ্য হবে। সেক্ষেত্রে এই রায় আসলে নারীটির তেমন কোনো কাজে আসবে না। ইন্দিরার ভাষ্যমতে, তিন তালাক ছাড়াও অন্যান্য যে পদ্ধতিতে তালাক দেয়া যায়, কিছু পুরুষ সেই সুযোগ নেবেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যার সমাধান হবে না।

তবে নারীর স্বাধীনতা কিংবা মানবাধিকারের প্রশ্নে এই রায় যে একেবারে মূল্যহীন তাও নয়। ইন্দিরার মতে, এই রায় ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পথ করে দিতে পারে। এ-সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এই রায়ের মাধ্যমে ২৫ বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে কাজ করা মুসলিম নারীদের শক্তির প্রকাশ ঘটেছে।’ তাই ভবিষ্যতে অত্যাচারের শিকার হওয়া নারীদের প্রতিবাদ করার সাহস জোগাবে এই রায়।

সব মিলিয়ে তিন তালাক বাতিলের এই রায় নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইন্দিরা জয়সিংসহ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা। নিকট ভবিষ্যতে এই রায় নারীর অধিকার সংরক্ষণে কতটা কাজে দেয়, তাই এখন দেখার বিষয়।

- শাহরিয়ার মাহী