শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / মেঘঅলা একজন
০৯/১৬/২০১৭

মেঘঅলা একজন

- ধ্রুব এষ

আমি একজন মানুষ দেখেছিলাম।
মেঘ আঁকতে পারে।
আকাশের মেঘ।
ড্রয়িং খাতায় না, আকাশে আকাশে।
তার আঁকা মেঘ উড়ে যায়, দূরে যায়।
কোন ছোটবেলায় অত মনে নেই, আমি মানুষটাকে দেখেছিলাম পাহাড়ে। পাহাড়ে আমার বাবার বন্ধু হারুন চাচামিয়া থাকেন। কাঠের বানানো একটা মস্ত বাংলোতে। সেই বাংলোতে ফায়ার প্লেস ছিল। হারুন চাচামিয়া ছিলেন ফরেস্টের রেঞ্জার।
আমাদের শহর থেকে পাহাড় দেখা যায়। নীল রঙের। দূরে বলে। কাছে যেতে যেতে পাহাড় সবুজ হয়ে যায়। কী করে কখন যে সবুজ হয়ে যায়, সে এক ভোজ রাজার বাজি। হারুন চাচামিয়ার বাংলো সেই পাহাড়ে। আমরা গিয়েছিলাম এক শীতের ছুটিতে। শীত আমাদের শহরেও পড়ে। বেজায় শীত পড়ে। কিম্বা পাহাড়ের শীত, বাপরে! হাড় কনকনে। বাংলোর ফায়ার প্লেস দুপুরের কিছুপর থেকে জ্বলে। সন্ধ্যায় ফায়ারপ্লেসের ধারে বসে হারুন চাচামিয়া পাহাড়ের বাঘ, হরিণ, বনমোরগ, ভাল্লুকের গল্প শোনান। নিজে কিছু দেখেছেন, কিছু এর ওর কাছে শুনেছেন।
অদ্ভুত ছিল সেসব শীতকালের সন্ধ্যা।

গত ফেব্রুয়ারি বইমেলায় একটা বই প্রকাশিত হয়েছে। ‘পাহাড়ি দিন, পাহাড়ি রাত্রি’। বইয়ের লেখক হারুন-অর-রশীদ। এই হারুন-অর-রশীদই হলেন আমার হারুন চাচামিয়া। তার বইটা আমি পড়েছি। অদ্ভুত লিখেছেন। মা, বাবা এবং আমার কথাও আছে। পড়ে তাজ্জব হয়ে গেছি। সব মনে আছে হারুন চাচামিয়ার। বইয়ের দুইশ তেতাল্লিশ পৃষ্ঠায় লিখেছেন,
ফায়ার প্লেসের ধারে বসে এক ঠান্ডা সন্ধ্যায় আমি জলপাইডিহির পাগলা ভাল্লুকের গল্প বলছিলাম, ছোট্ট অমু বলল, ‘হারুন চাচামিয়া?’
‘কি রে ব্যাটা?’
‘তোমার জঙ্গলে ভূত আছে?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ-এ-এ, আছে। একটা ভূত থাকে কাঠের বাংলোতে। শীতকালের সন্ধ্যায় ফায়ার প্লেসের ধারে বসে থাকে সে। গল্প শোনায় এক বাচ্চা ভূতকে। বাচ্চা ভূতটার চোখ কালোজামের মতো। ফল না, মিষ্টি কালোজাম। চোখ বড় করে গল্প শোনে সে। একদিন বলল, ‘চারুতা হান মিয়া, তোমার জঙ্গলে মানুষ আছে?’ হারুন চাচামিয়া বলতে গিয়ে চারুতা হান মিয়া বলে ফেলেছে। ছোট মানুষ ভূত তো।’
ছোট্ট অমু বলল, ‘ইস্স্!’

‘পাহাড়ি দিন পাহাড়ি রাত্রি’ বইয়ের ছোট্ট সে অমু হলাম আমি। এত মনে আছে হারুন চাচামিয়ার! আমরা তো মোটে কিছুদিন ছিলাম, হারুণ চাচামিয়ার বই পড়ে তাও কত কী মনে পড়ল আমার। পাহাড়ের গাছ, পাখি, ঘরদোর, মানুষজন। মনে পড়ল সেই মেঘ আর্টিস্টকেও। হারুন চাচামিয়ার কি তার কথা মনে নেই? তার কথা বইয়ের কোথাও লেখেননি। কেন?

সেটা ছিল এক কনকনে দুপুর। হারুন চাচামিয়ার বাংলো থেকে বেরিয়ে আমি ঠান্ডা পাহাড়ে একা হাঁটছিলাম। হাফ সোয়েটার, ফুল সোয়েটার, হুডঅলা জ্যাকেট পরেছি। হাফ প্যান্ট, ফুল প্যান্ট। এডিডাসের জুতো। এই দেখে হারুন চাচামিয়া আমাকে অদ্ভুত একটা নামে ডেকেছেন, ‘নানুক অব দ্য নর্থ।’ নর্থ, উত্তর। নানুক কী? উত্তরের নানুক? সন্ধ্যায় জিজ্ঞেস করতে হবে হারুণ চাচামিয়াকে।
খুব নিচু দিয়ে চিঁউ চিঁউ করতে করতে একঝাঁক শীতকালের পাখি উড়ে গেল। ঘুরে তাকিয়ে হারুন চাচামিয়ার বাংলো দেখলাম না। অদৃশ্য হয়ে যায়নি। গাছ-গাছালির জন্য দেখা যাচ্ছে না। তিনটা বাজল মিশনের গীর্জার পেটা ঘড়িতে। মস্ত একটা গাছের শিকড়-বাকড় পার হয়ে মাঠের মতো একটু সমতল। গাঢ় সবুজ ঘাস, ভিজে আছে কুয়াশায়। ভিজে আছে আশ্চর্য কমলা ঘাসফুল। আরে! এটা কে? সমতলে মানুষটাকে দেখলাম। লম্বা, সিড়িঙ্গে। কোথায় ছিল সে? এক সেকেন্ড আগেও দেখিনি। এখানে কী করছে মানুষটা? অ! মস্ত একটা রঙের পেলেট তার এক হাতে, নীল, সাদা, কালো, ধূসর রং পেলেটে, ব্রাশ চুবিয়ে সেই সব রং নিচ্ছে সে, আর... মেঘ আঁকছে শূন্যে। নীল রঙের মেঘ, সাদা রঙের মেঘ, কালো রঙের মেঘ, ধূসর রঙের মেঘ। আঁকা হচ্ছে আর আকাশে উড়ে যাচ্ছে মেঘরা।
আঁকতে আঁকতে আমাকে দেখল মানুষটা। হাসল। আর বলল, ‘কী হে, দুঃখীরাম?’
দুঃখীরাম! দুঃখীরাম কে আবার?
আমি বললাম, ‘আমি অমু।’
‘ওই। যাহা অমু তাহাই দুঃখীরাম।’
‘ইহ্!’
‘হ্যাঁ-এ-এ তো। আচ্ছা, ওয়ান টু থ্রি ফোর ফাইভ সিক্স সেভেন এইট নাইন টেন। বলো দেখি বাবা হারানিধি, সিক্স সেভেনকে ভয় পাচ্ছে কেন?’
বাবা হারানিধি! কী বিচ্ছিরি! সিক্স সেভেনকে ভয় পাচ্ছে কেন এটা আমি জানি। বললাম, ‘সেভেন এইট নাইন বলে, ইয়ে, সেভেন নয়কে খেয়ে ফেলেছে বলে।’
‘ভেরি গুড! ভেরি গুড! এই এইট ই আর জি এইচ টি নয় রে, হতচ্ছাড়ি! এই এইট হলো এ টি ই। ই এ টি ইট থেকে এইট। তুই তো বোকা, বলতে পারলি না। আচ্ছা, যা তুই।’
কাকে কী বলছে মানুষটা?
কোনো একটা মেঘকে?
পাগল?
আমি পাগল ভয় পাই না। আমাদের শহরের তারু পাগল আছে, কাউকে কামড়ায় না, একা একা কথা বলে শুধু। এই মানুষটাও সেরকম নাকি? না। তারু পাগল এই মানুষটার মতো মেঘ এঁকে উড়িয়ে দিতে পারে না।
হতচ্ছাড়ি কোনো মেঘ না, মানুষটা কটমট একবার আমার দিকে তাকিয়ে পরমুহূর্তে হেসে দিয়ে বলল, ‘ওহে হর্ষবর্ধন, জিলাপির প্যাঁচ বলে, জিলাপির প্যাঁচ কটা, বলো দেখি।’
‘আড়াই প্যাঁচ।’
‘ভেরি গুড! ভেরি গুড!’
বলে আবার মেঘ আঁকতে থাকল মানুষটা। একটা মেঘ আঁকল, দুটো মেঘ আঁকল, তিনটা মেঘ আঁকল, অনেক মেঘ আঁকল। আমার দিকে আর তাকায়ই না। আমি বললাম, ‘আমি যাই।’
জবাবই দিল না।
এ কেমন মানুষরে বাবা!
‘আমি যাই।’
আবার বললাম।
এবার জবাব দিল, ‘সকলেই যায়। মেঘরাও যায়।’
মানে কি একথার?
‘অমু বাবু! অমু বাবু!’
গফুর আলী চাচার গলা না?
হ্যাঁ।
হারুন চাচামিয়ার আরদালী। মস্ত গাছের শিকড়-বাকড় থেকে বের হয়ে এল, ‘এই যে! ওরে আমার খোদা! আপনি এখানে কী করেন, অমু বাবু?’
বললাম, ‘মেঘ আঁকা দেখি, গফুর চাচা।’
‘মেঘ আঁকা দেখেন? ওরে আমার খোদা! কে মেঘ আঁকে?’
‘এই যে।’
বলে তাকিয়ে দেখি, কোথায় কী? মানুষটা তো নেই কোথাও।
গফুর আলী চাচা বলল, ‘বুঝেছি। চলেন বাংলোয়।’
‘সত্যি মেঘ আঁকছিল একজন, গফুর চাচা।’
‘আঁকছিল। চলে গেছে। আঁকা শেষ তো তাই চলে গেছে সে। আপনিও চলেন। বাংলোয় চলেন। ওরে আমার খোদা! আপনার মা জননী তো মনে করেছেন, আপনি হারিয়ে গেছেন পাহাড়ে। কান্নাকাটি করতে লেগেছেন।’
গফুর আলী চাচার সঙ্গে ফিরলাম বাংলোয়।
মা তো সত্যিই কাঁদছিলেন দেখি।
বাবা একটু বকলেন, ‘না বলে এভাবে আর কখনো কোথাও যেও না।’
‘আচ্ছা, যাবো না।’
সন্ধ্যায় ফায়ার প্লেসের ধারে বসে হারুন চাচামিয়াকে বললাম মানুষটার কথা। হারুন চাচামিয়াও বললেন, ‘বুঝেছি। মেঘঅলা ও।’
‘মেঘঅলা! মেঘঅলা কী?’
‘সে একজন।’ বলে হারুন চাচামিয়া কাপাশটিলা পাহাড়ের বনমোরগের গল্প শুরু করে দিলেন। আর মনে থাকে মেঘঅলার কথা?

হারুন চাচামিয়া তার বইতে কেন মেঘঅলার কথা লেখেননি?
অবশ্য সেই মেঘঅলা কীবা কে?
মেঘ আঁকে যে?
আমি জানি না। এখনও জানি না। তবে এখন আমার মনে হয় কি, আমি সেদিন যাকে দেখেছিলাম, হয়তো মানুষ ছিল না সে। তবে কী ছিল?
বলতে পারব না।
আচ্ছা, আমি এখন রবার্ট ফ্ল্যাহার্টির ‘নানুক অব দ্য নর্থ’ ছবিটা দেখব।