বৃহস্পতিবার,২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭
হোম / বিবিধ / বিদায় গনিতবিদ মারিয়াম মির্জাখানি
০৮/১৭/২০১৭

বিদায় গনিতবিদ মারিয়াম মির্জাখানি

-

গণিতে সর্বোচ্চ পুরস্কার তাও আবার একজন মেয়ে! আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি সত্যিই একটি অবাক করার মতো ঘটনা। আর সে নারী যদি হন ইরানের মতো একটি রক্ষণশীল দেশের নাগরিক তবে সেটি আসলেই বিস্ময়ের।

বলছি প্রফেসর মারিয়াম মির্জাখানির কথা, যিনি গণিতের জন্য সবচেয়ে বড় সম্মাননা পুরস্কার ফিল্ডস মেডেল পান। প্রতি চার বছর পর পর গণিতবিদদের বিশ্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে মারিয়াম মির্জাখানিসহ আরও ৩ জনকে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই নারী ১৯৭৭ সালে ইরানের তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু ২০১৩ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তার স্তন ক্যানসার ধরা পড়ে এবং ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করে ১৪ই জুলাই মারিয়াম মাত্র ৪০ বছর বয়সে মারা যান। বিশ্ব হারায় একজন অসাধারন মেধাস¤পন্ন গনিতবিদকে।

শৈশব থেকেই মারিয়াম ছিলেন তীক্ষè মেধার অধিকারী। ১৯৯৪-৯৫ সালে টানা দুবার আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে স্বর্ণপদক লাভ করেন তিনি। ইরানের শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে গণিতে ১৯৯৯ সালে বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০৪ সালে আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

শৈশবে তিনি সাহিত্যিক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। ছোটবেলা থেকেই বইপড়ার প্রতি তার ব্যাপক আগ্রহ ছিল। নতুন কোনো বই পেলে তিনি তা শেষ না করা পর্যন্ত ছাড়তেন না। তিনি গণিতবিদ হওয়ার কথা কখনো ভাবেনইনি, এটিই সবচেয়ে মজার ব্যাপার। কারণ গণিতের প্রতি তার বিশেষ কোনো আগ্রহ ছিল না।

বড় ভাইয়ের উৎসাহে বিজ্ঞান এবং গণিতের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। গণিতশাস্ত্রে একের পর এক জয় ছিনিয়ে আনতে থাকেন এর পর থেকে। গণিতে জটিল সমস্যা নিমিষেই সমাধানের মাধ্যমে তিনি অল্পদিনেই সুখ্যাতি অর্জন করেন। পরে মারিয়ম বিশুদ্ধ গণিতে ‘ব্লুমেনথাল অ্যাওয়ার্ড ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অব রিসার্চ’ এবং আমেরিকার গণিত সোসাইটির দেয়া স্যাটের পুরস্কারও অর্জন করেন।

জ্যামিতি শাস্ত্রের জটিল বিষয়ে অবদানের জন্য অধ্যাপক মির্জাখানিকে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ফিল্ডস মেডেল পুরস্কার দেয়া হয়। ফিল্ডস মেডেলের অর্থমান হচ্ছে ৮ হাজার ইউরো। ইন্টারন্যাশনাল ম্যাথমেটিক্যাল ইউনিয়নের (আইএমইউ) দেয়া গণিতের এটিই সর্বোচ্চ পুরস্কার। পদকের পাশাপাশি পুরস্কার বিজয়ীদের ১৫ হাজার কানাডিয়ান ডলার প্রদান করা হয়। ১৯৩৬ সাল থেকে শুরু হওয়া এ পুরস্কার এ পর্যন্ত জিতেছেন ৫৬জন গণিতবিদ। তাদের মধ্যে প্রথম নারী মারিয়ম মির্জাখানি। ব্যক্তিজীবনে তিনি এক কন্যাসন্তানের মা। তার স্বামী জন ভনডার্ক একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী।

ক্যালিফোর্নিয়ার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় মারিয়মের। তার মৃত্যুর খবর প্রকাশ করে ইরানের সবগুলো দৈনিক পত্রিকা। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি পত্রিকা ইরানের হিজাব প্রথা ভেঙে মারিয়মের ছবি প্রকাশ করে। ইরানের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, কোনো নারীর ছবি প্রকাশ করা হলে অবশ্যই হিজাব পরিহিত হতে হবে। কিন্তু মারিয়মের মৃত্যুর পর তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হিজাব ছাড়াই ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। ইরানের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। ২০১৪ সালে ফিল্ডস পদক পাওয়ার পর মারিয়মের ছবিতে হিজাব পরিয়ে প্রকাশ করেছিল ইরানের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত একটি সংবাদপত্র। অন্যরা শুধু তার মুখের একটি স্কেচ প্রকাশ করেছিল।

ইরানি সংবাদপত্রের মধ্যে এব্যাপারে সবচেয়ে জোরালো অবস্থান নিয়েছে হামশাহরি। এই দৈনিক পত্রিকাটির প্রথম পাতায় ছবি ছেপে শিরোনাম দেওয়া হয়েছে। আরেকটি পত্রিকা দনইয়া-ইয়ে-এহতেসাদ শিরোনাম করেছে, 'গণিতের রানির চিরবিদায়'।

রাজিয়া সুলতানা