বৃহস্পতিবার,২৪ অগাস্ট ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে শিল্পগাথা
০৮/০৯/২০১৭

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে শিল্পগাথা

-

গত ৯ জুলাই, ২০১৭ তারিখে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে প্রদর্শিত হলো নাট্যপুরাণের সাম্প্রতিক প্রযোজনা ‘অমাবস্যা’। নাটকে ‘অমাবস্যা’ একটি প্রতীকী শব্দ। নাট্যকার প্রতীকী ব্যঞ্জনায় সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে কোমলমতি হৃদয়ের রক্তক্ষরণে জীবন ও সমাজের অন্ধকারাচ্ছন্নতাই চিত্রিত করেছেন। নাট্যকার অসাম্প্রদায়িক আলোয় আলোকিত করতে চান জীবন-সমাজকে। নাটকটি রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন এ-সময়ের তরুণ প্রতিভাবান নাট্যপরিচালক প্রবীর দত্ত। দীর্ঘদিনের নাট্যকর্মী প্রবীর দত্ত ‘অমাবস্যা’ নাটকে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক জাত-পাত মূল্যবোধের বিরুদ্ধে মানবিকতাকেই প্রতিস্থাপন করতে প্রয়াসী হয়ে উঠেছেন। তার নির্দেশিত বাংলাদেশের প্রথিতযশা শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর জীবন ও কর্ম নিয়ে নাটক সম্প্রতি ঢাকার মঞ্চে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

‘অমাবস্যা’ নাটকের কাহিনি গড়ে উঠেছে দুই ধর্মের নারীপুরুষের অসম প্রেমকে কেন্দ্র করে। কাহিনিতে দেখা যায়- বৃন্দাসাঁই গ্রামে নিঃসন্তান এক দম্পত্তি কুড়িয়ে পাওয়া একটি কন্যাশিশুকে নিজ সন্তান স্নেহে লালন-পালন করে বড় করে তোলেন। নাম রাখেন মালতী। সনাতন পরিবারে তার বেড়ে উঠা। মালতী যখন সদ্যযৌবনা তখনই বাণিজ্যে আসা ভিনদেশি এক যুবকের প্রেমে পড়েন। যুবক সেলিমও মালতীর প্রেমে বিগলিত হয়ে পড়েন। অজানা দুটো সুর যেন অলক্ষে একসুরে রূপান্তরিত হয়ে ওঠে। মালতীর কাছে ভিন্নদেশি যুবকের মুসলিম ধর্ম পরিচয় প্রকাশ পেলেও দুজনই ভালোবাসার কাছে নিজেদেরকে সমর্পণ করেন। কিন্তু এ-সম্পর্কের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায় সমাজের রীতি-নীতি আর ধর্ম। সমাজের রক্তশাসন ও কলঙ্কের ভয়ে মালতীকে অন্যত্র বিয়ে দেওয়া হয়। কূটকৗশলের কাছে পরাভূত হয়ে যায় তারা। কিন্তু মালতীর আত্মা পড়ে থাকে ভিনদেশি সেলিমের কাছে। সেলিমও মালতীর আত্মার অভেদরূপ হয়ে দাঁড়ায়। রাধা-কৃষ্ণ, লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদের মতো তাদের প্রেমও হয়ে ওঠে আত্মা-পরমাত্মার যুগল সম্মিলনে। দেহজ মৃত্যুর মধ্যদিয়ে তারা যেন লীন হয়ে যান বৈষ্ণব কিংবা সুফিবাদী ঘরানার মতো পরমাত্মার সঙ্গে। এভাবেই গল্পের পরিসমাপ্তি ঘটে।

নাটকটির উপস্থাপনে পদাবলি কীর্তনের ধারাকে প্রধান অনুষঙ্গ করেছেন নির্দেশক। বৈষ্ণব-সুফিবাদী ভাববাদী ঢঙে প্রেম-ভক্তির এক অরূপ মার্গ তৈরি হয়েছে নাটকটিতে। বাঙলার হাজার বছরের উপস্থাপনারীতির পরম্পরায় চারদিকে দর্শকবেষ্টিত মধ্যমঞ্চে উপস্থাপিত হয়েছে নাটকটি। নাটকটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নৃত্য, গীত ও অভিনয়ের এক দ্বৈতনিক মিলবন্ধনে ঘটনা উপস্থাপিত। শুরুতেই দেখা যায়- চারদিকে প্রদীপ হাতে কুশলীগণ অপেক্ষমাণ। দর্শকবেষ্টিত নিরাবরণ মঞ্চমধ্যে কয়েকটি টুল রাখা যা নাটকের গল্পকথনে নানা সাজেশন নানা দৃশ্যভাবনা তৈরি করেছে। নাটকটি শুরু হয় বন্দনার মধ্যদিয়ে। অপূর্ব সংগীতানুষঙ্গে বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে অভিনয়ের মিলবন্ধন ও কোরিওগ্রাফির সাহায্যে ঘটনার উপস্থাপন হতে থাকে। নির্দেশক বিভিন্ন অনুভূতি ও ভাবপ্রকাশে নিজস্ব নাট্যভাষা তৈরি করেছেন। নানা আচরণ, ইমেজ ও কোরিওগ্রাফির মাধ্যমেই জীবাত্মা-পরমাত্মার লীলাই যেন গেয়েছেন নির্দেশক। কোরিগ্রাফির নানা চলনে নানা শৈল্পিক মুহূর্ত তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতীকী ভাবব্যঞ্জনা প্রকাশে অনবদ্য হয়ে উঠেছে প্রযোজনাটি। আত্মিক প্রেমের অনবদ্য উপস্থাপনে নির্দেশকের কৌশল অত্যন্ত শিল্পমার্গতার পরিচয় দিয়েছেন। নির্দেশক প্রেমের মধ্যদিয়ে জাত-পাত সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত হওয়া যায় এবং স্রষ্টাকেও পাওয়া যায় এমন দার্শনিক ভাষ্যেই উপনীত হয়েছেন নাটকের শেষে।

নৃত্য-গীত ও কোরিওগ্রাফি অভিনয় মিলে হাজার বছরের বাংলার সংস্কৃতিই অনবদ্যরূপে প্রতীয়মান হয়ে উঠেছে। যদিও গানের সুরগুলো অরূপ আবেগে ভাষায় তবু সংগীতে আরও প্রচুর উপাদান ও সমন্বয় দরকার। বৈরাগ্যবাদী গায়েনের মতো হলুদ রঙের একই পোশাক ব্যবহৃত হয়েছে প্রতিটি চরিত্রে। বর্ণনাত্মক অভিনয়রীতির সঙ্গে কিছুটা চরিত্রাভিনয়রীতির মিশেল ঘটেছে। নৃত্য-গীত ও কোরিওগ্রাফিতে প্রাণবন্ত প্রযোজনা ‘অমাবস্যা’। তবে দলগত কাজে তাল-ছন্দের মিল হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। অভিনয়ে আরও প্রচুর কাজ করার আছে। কৃত্রিমতাবর্জিত অভিনয়ে শুদ্ধ পালা উপস্থাপন জরুরি। এটি দলগত কাজ। তাই দলগত সুসমন্বয় যত বেশি হবে নাটক তত সর্বাঙ্গসুন্দর হয়ে উঠবে।

‘অমাবস্যা’ নাটকটি নাট্যপুরাণের ২য় প্রযোজনা। এ নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন-আকেফা আলম, রিমি আক্তার, ইলোরা, মিলি, মুনিয়া, নূর-ই-আলম সুমন, তুষার রায়, কাজী জিলানী, সারওয়ার হোসেন, শামীম, বিপ্লব, মেহেরাব, শাকিল, রিয়াজ, নয়ন, পাপেল, অমিত আচার্য হিমেল, খন্দকার হুমায়ুন, শংকর সরকার, মাহফুজ প্রমুখ। নাটকটির প্রচার রিহার্সেল দাবি করে। দলগত প্রচেষ্টা ভালো থাকলে নাটকটি যে কোনো দর্শককেই বিনোদনের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক চিন্তার মার্গে নিতে সক্ষম বলেই মনে হয়েছে। আমরা নাটকটির উত্তরোত্তর মঞ্চসাফল্য কামনা করি।

- আবু সাঈদ তুলু