শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭
হোম / ফিচার / বর্ষা-সজল গ্রামবাংলা
০৭/১৭/২০১৭

বর্ষা-সজল গ্রামবাংলা

-

গণনা হিসেবে আষাঢ়-শ্রাবণ দুই মাস বর্ষাকাল। কিন্তু বর্ষার বৃষ্টি শুরু হয় বৈশাখ মাস থেকে, চলে ভাদ্র-আশ্বিন মাস পর্যন্ত। সেই হিসাবে বর্ষা বাংলাদেশের দীর্ঘতম ঋতুও বটে। অনেক সময় দেখা যায় শরৎকালকে স্পর্শ করেও বৃষ্টির কোনো বিরাম নেই। আর এই বর্ষার প্রকৃত রূপের দেখা পাওয়া যায় মূলত গ্রাম-বাংলায়।

বর্ষাকালও যে কবির কবিতার মতো সুন্দর হতে পারে তা দেখতে চাইলে শহরের অট্টালিকা ছেড়ে যেতে হবে গ্রাম-বাংলায়। গ্রামের প্রকৃতির সবুজ রঙটা যেন আরও একটু বেশি সবুজ হয়ে যায়। মৃদুমন্দ বাতাসে সিক্ত মাটির গন্ধ প্রাণ জুড়িয়ে দেয়। একপশলা বৃষ্টির পর পানি কণায় সৃষ্টি হওয়া ধূসর বরণ কুয়াশা সত্যিই যেন এক নৈসর্গিক দৃশ্যের সৃষ্টি করে। নদীর পারের গ্রামগুলো বর্ষা মৌসুমে যেন এক একটা ছোট দ্বীপে পরিণত হয়।

পল্লীর মাঠঘাট পানিতে থইথই করে, আকাশে সর্বক্ষণ চলে মেঘ-বিদ্যুতের খেলা। তাই দেখেই তো কবি লিখেছেন-
বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর, আউশের ক্ষেত জলে ভর ভর
কালি মাখা মেঘ ওপারে আধার ঘনিয়াছে দেখ চাহিরে
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।

কবির এই আকুল মিনতি কিন্তু শোনার সময় নেই কৃষকদের। বর্ষাকালে কোনো কৃষক বাড়ির পুরুষ মানুষদের বাসায় পাওয়া যাবে না। কেউবা জমিতে লাঙল দেয়, কেউবা সার। আবার কাউকে দেখা যায় জমিতে রোপণ করছে কচি সবুজ ধানের চারা। যাদের ধান গাছগুলো একটু বড় হয়েছে তারা ব্যস্ত থাকেন বাড়ির পাশের ছোট সবজি বাগানে। কেউ কেউ তাদের পাট কাটা শেষ করে তলিয়ে দেয় পানিতে।

মহিলারাও কেউ বসে সময় কাটান না। তারাও চলে যান মাঠে, ব্যস্ত হয়ে পড়েন চাষাবাদের কাজে। কাউকে বা দেখা যায় ঝুম বর্ষার অলস বিকালে দোরগোড়ায় বসে সেলাই করছেন নকশিকাঁথা। প্রতিটি নকশিকাঁথার হাজারো সেলাইয়ে না জানি লুকিয়ে আছে কত আনন্দ-বেদনা ও না-বলা কথা।

শিশু-কিশোরদের দেখা যায় বৃষ্টিতে কচুপাতা মাথায় ঘুরে বেড়াতে। আবার তারাই কিছু সময় পর বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে হৈ-হুল্লোড় করে। এদের মধ্যে যারা একটু বেশি চঞ্চল তাদের দেখা যায় বৃষ্টিতে উঁচু সাঁকো কিংবা গাছ থেকে পুকুরের পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে। আর দায়িত্ববান ছেলেমেয়েগুলো বৃষ্টিতে ছাতা মাথায় মাঠে দাঁড়িয়ে দেখাশোনা করে গরু-ছাগলের পাল।

সন্ধ্যের আঁধার যেন বর্ষাকালে দ্রুতই নামে পল্লি-গ্রামগুলোতে। ঘরে ঘরে রমণীরা জ্বালিয়ে দেন কুপি কিংবা হ্যারিকেন। আবহাওয়া কিছুটা নমনীয় থাকলে পুরুষরা চলে যান আড়তে, জমে ওঠেন আড্ডা ও গল্পগুজবে। কিন্তু হাত থেমে থাকে না কারোরই, কেউ বানান বাঁশের চাটাই, কেউ পাকান রশি, কেউবা কৃষি হাতিয়ারে ধার দিতে ব্যস্ত থাকেন।

যেদিন বৃষ্টি থাকে না সেদিন যেন গ্রামের মানুষগুলোর ব্যস্ততা আরও বেড়ে যায়। হাট বাজারগুলোতে মানুষের ঢল নামে, নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় যেন সেগুলো। ছেলেমেয়েগুলো স্কুলে যায়। কাদামাখা পথগুলো মানুষের পদচারণায় ভরে ওঠে। হঠাৎ বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিতে থাকে পথচারী মানুষদের। তখন সবাই দৌড়ে গিয়ে আশ্রয় নেন কোনো দোকান ঘরের টিনের চালের নিচে। যাদের সেই সৌভাগ্য হয় না তারা গিয়ে দাঁড়ান হয় বড় কোনো গাছের নিচে। কেউ কেউ রাস্তার পাশের মান কচুর বড় পাতা ছিঁড়ে নিয়ে বৃষ্টিতেই হাঁটা দেয়। এমন দৃশগুলো কেবল পাড়া-গাঁয়েই চোখে পড়ে।

তবে বর্তমান সময়ে পল্লী গ্রামগুলোর আগেকার সেই প্রাকৃতিক দৃশ্য আর সেভাবে চোখে পরে না। কাঁচা মাটির জায়গায় এখন রয়েছে পাকা কিংবা আধা পাকা রাস্তা, চলাচল করে ছোট বড় যানবাহন। ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ সুবিধা, এখন আর কুপির আলো চোখে পড়ে না।

- রুবায়েত মহিউদ্দিন