শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭
হোম / ফিচার / বাঙালির খাওয়াদাওয়া
০৬/২২/২০১৭

বাঙালির খাওয়াদাওয়া

- মাহবুব আলম

বাঙালির চিরকেলে পরিচয় ‘ভেতো’ বাঙালি। অর্থাৎ যার প্রধান খাদ্য ভাত। এই অভ্যাসের উৎস আদি অস্ট্রেলিয় জনগোষ্ঠী থেকে, প্রশান্ত মহাসাগরের প্রান্তে অবস্থিত বাংলাদেশে প্রশান্ত মহাসাগরীয় খাদ্যাভাসের প্রভাব থাকাই স্বাভাবিক। প্রাচীনকালে গরিব বাঙালির যুগে শোনা যেত দুঃখের কাঁদুনি ‘হাঁড়িত ভাত নাহি নিতি আবেশি ঘরে ভাত নেই তবু অতিথির আসা-যাওয়ার কমতি নেই। (চর্যাপদ) তবে ধনী-নির্ধন সব বাঙালির প্রিয় খাদ্য গরম ভাতে গাওয়া ঘি। যারা দিন আনে দিন খায়, তাদের চরম প্রাপ্তি হলো পান্তা ভাতে বাইগন পোড়া।’ পণ্ডিতরা বলেন, প্রাকৃত বাঙালির মনমতো খাবার হলো কলাপাতায় ‘ওগগরা ভতা গাইক ঘিত্ত।’ অর্থাৎ গাওয়া ঘি আর ফেনা ভাত দুধ আর সরুচাল মিশিয়ে পায়েস বড় মানুষের প্রিয় খাদ্য।

নৈষধী চরিত-এর রচয়িতা শ্রীহর্ষ দ্বাদশ শতকের কবি। (অনুবাদক ড. করুণা সিন্ধু দাস, কলকাতা, ১৯৮২) এই কাব্যকথায় খাদ্যের বৈচিত্র্য এবং রন্ধনশিল্পীদের নৈপুণ্যের অনেক তথ্য রয়েছে। তবে শ্রীহর্ষের দেয়া ভাতের বর্ণনাটিও উপভোগ করার মতো লোকেরা সাগ্রহে ভাত খেলেন। তাতে ধোয়া উঠছিল ভাত মোটেই ভাঙা নয়, গোটা পরস্পর আলাদা, কোমল ভাব হারায়নি সুস্বাদু, সাদা, সরু সুগন্ধ যুক্ত। এরকম ভাত রাঁধাতে এলম দরকার- যে ভাত রান্না এখনও বাঙালি গৃহিণীদের নৈপুণ্যের পরীক্ষাস্বরূপ এবং এই পরীক্ষায় সাফল্য লাভ হলে ভোজনরসিকেরা বাহবা মেনে পরীক্ষার্থীর শ্রীহর্ষের উপমা ক্ষমতা প্রশংসনীয়। বাঙালি জেনে খুশি হবেন যে, তাদের আর একটি প্রিয় খাবার দইকে বলা হয়েছে ‘অমৃতের হৃদ থেকে তুলে পাঁকের মতো’...।

আবার আগের প্রসঙ্গে ফিরে যাই- ভাত খাওয়া হতো কি দিয়ে? খাওয়া হতো শাক এবং অন্যান্য ব্যঞ্জন দিয়ে। দরিদ্র ও পল্লি অঞ্চলের মানুষের প্রধান খাদ্যই ছিল শাক-ভাত। নালিতা বা পাটশাকের উল্লেখ আছে প্রাকৃত পৈঙ্গলে। মইলি বা মৌরলা মাছ বাঙালির প্রিয় খাদ্য।

তবে শাকছাড়াও অন্য ব্যঞ্জনের কমতি ছিল না মোটেই- বিশেষ করে বিয়ে বাড়ির ভোজে এত রকম তরকারি দেয়া হতো যে সবগুলো চেখে দেখা সম্ভব হতো না। এটা নাকি সে যুগের কন্যাপক্ষের চালাকি। তরকারি খেয়ে পেট ভরিয়ে ফেললে মাছ-মাংস কম খাওয়া হবে। কি ধরনের তরকারি ব্যবহার করা হতো তার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যাবে বিজয় গুপ্তের ‘মনসামঙ্গল’, অথবা অন্যান্য মঙ্গলকাব্যে।

বাঙালির আনুষ্ঠানিক ভোজে নাকি খাদ্য অপচয়ে চূড়ান্ত হতো, এমন কথা লিখে গেছেন চীনা পবিভ্রাজক ই-ৎ সিঙ। তার দেখা ব্যঞ্জনের তালিকায় রয়েছে দই আর রাই সরষে দিয়ে রান্না করা পদ, যা খেয়ে অতিথিদের মাথা ঝাঁকাতে ও মাথা চাপড়াতে হতো। তীব্র ঝালের আক্রমণে।

প্রাচীন বাঙালির প্রিয় খাদ্য ছিল হরিণের মাংস; সম্ভবত এজন্যই চর্চাপদে লেখা হয়েছেঃ ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী। হরিণের মাংস সুস্বাদু বলে সবাই এসে আগে হরিণ মারে।’

বাঙালির বিয়ের ভোজে হরিণের মাংস অনিবার্যভাবে অতিথিদের পাতে পরিবেশিত হতো। সঙ্গে থাকতো ছাগ ও পাখির মাংস। বাঙালিদের মধ্য আর্যদের মতো গোমাংস খাওয়ার চলছিল না। তাই বিকল্প হিসেবে রাখা হতো মাংসের স্বাদ যুক্ত- সুস্বাদু ব্যঞ্জনা। কচি কাঠালকে এখনও হিন্দুসমাজে বলা হয় ‘গাছপাঠা’। শেষ পাত্রে মিষ্টি আর দই। পায়েস বা পরমান্ন খাওয়াবার তাগিদ থাকতো শুধু বড়লোকদের আহারের পর মশলাযুক্ত পানের খিলি।

ভাত-মাছ চিন-জাপান-বার্মা, পূর্ব দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ও দ্বীপপুঞ্জ, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশে চিরকালই প্রধান খাদ্য। মাংসের প্রতি বিরাগ বাঙালির কোনোদিনই ছিল না। কালকেতুর শিকার করা পশুমাংস ব্যাধরমণী ফুল্লরা বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাতো। কালে কালে উত্তর ভারতে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবে মাংস আহার নিষিদ্ধ করা হয়। আর্য ব্রাহ্মণ ভারত ক্রমেই নিরামিষ আহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে এই প্রবণতা আংশিক কার্যকর হয়েছিল। বহুদিন আমিষ খাওয়ার অভ্যাস থাকায় বাঙালিরা আর নতুন নিরামিষ খাবারে মুখ দিতে বেশ সময় লেগেছিল।

দুই
এই গেল ডাল-ভাতের কথা এবং মাংস ভোজকে মন দেয়া, যা.... কথায় বলে মাছের নামে গাছও হা করে। বাঙালি সাধারণত স্বল্পকথায় খাবার উল্লেখ করে তখন বলে ডাল-ভাত, না হয় দুধ-ভাত, কিংবা মাছ-ভাত। মাছ-ভাত সম্বন্ধে মঙ্গলকাব্যগুলোতে মাছের এবং মাছ রান্নার ছড়াছড়ি। আর মাছের ব্যাপারে বরাবরই পূর্ববাংলা ছিল মাছের রাজত্ব। কেনা জানেন নদী-নালা, বিলঝিল হাওড়-বাওড়ের সোনালি সুতোয় বোনা পূর্ববঙ্গ যেন এক মছলি কাদার মাটি। বিজয় গুপ্ত কিংবা দ্বিজ বংশীদাসের (দুজনই পূর্ব বাংলার মানুষ) বর্ণনা থেকে সামান্য উদ্ধৃতি দিলে স্পষ্ট হবে পূর্ববাংলার মাছ এবং মাছের রন্ধন বৈচিত্র্যের ব্যাপ্তি- মনসামঙ্গলে বরিশালের বিজয়গুপ্ত লিখেছে,

‘রান্ধি নিরামিষ ব্যঞ্জন হলো হরষিত।
মৎস্যের ব্যঞ্জন রান্ধে হয়ে সচকিত\
মৎস্য মাংস কুটিয়া থুইল ভাগ ভাগ।
রোহিত মৎস্য দিয়া রান্ধে কলকাতার আগ\
মাগুর মৎস্য দিয়া রান্ধে গিমা গাচ গাচ\
ঝাঁঝ কটু তৈলে রান্ধে খরসুল মাছ\
ভিতরে মরিচ-গুঁড়া বাহিরে জড়ায় সূতা।
তৈলে পাক করি রান্ধে চিঙড়ির মাথা\
ভাজিল রোহিত আর চিতলের কোল।
কৈ মৎস্য দিয়া রান্ধে মরিচের ঝোল\
ডুম ডুম করিয়া ছেঁচিয়া দিল টই।
ছাইল খসাইয় রান্ধে বাইন মৎসের কৈ\...

বারমাসি বেগুনেতে শৌল মৎস্যের মাথা।... ইত্যাদি।

ময়মনসিংহর দ্বিজ বংশীদাস তার মনসামঙ্গলে ছিলেছেন

‘নিরামিষ রান্ধে সব ঘৃতে সম্ভারিয়া।
মৎসের ব্যঞ্জন রান্ধে তৈল পাক দিয়া
বড় বড় কই মৎস্য, ঘন ঘন আঞ্জি।
জিরা লঙ্গ মাখিয়া তুলিল তৈলে ভাজি\
কাতলের কোল ভাজে, মাগুরের চাকি।
চিতলের কোল ভাজে রসবাস মাখি\
ইলিশ তলিত করে, বাচা ও ভাঙ্গনা।
শউলের খণ্ড ভাজে আর শউল পোনা\
বড় বড় ইচা মৎস্য করিল তলিত।
রিঠা পুঠা ভাজিলেক তৈলের সহিত\
বেত আগ পলিয়া চুঁচরা মৎস্য দিয়া।
শক্ত ব্যঞ্জন রান্ধে আদা বাটিয়া\
পাবদা মৎস্য দিয়া রান্ধে নালিতার ঝোল।
পুরান কুমড়া দিয়া রোহিতের কোল\’...ইত্যাদি।

এবার পশ্চিমবঙ্গের প্রসঙ্গে আসি। সেখানকার মানুষ সমগ্র মৎস্যপ্রেমী যদিও প্রাপ্তিযোগে হেরফের অবশ্যই রয়েছে। ভারতচন্দ্রর ‘অন্নদামঙ্গল’-এ রচনাকাল (১৭৫২-৫৩) চোখে পড়ে ভবানন্দ মজুমদার স্ত্রী পদ্মমুখী ব্রাহ্মণ ভোজনের জন্য রাঁধতে বসেছেনঃ

‘নিরামিষ তেইশ রাঁধিলা অনায়াসে
আরম্ভিলা বিবিধ রন্ধন মৎস্য মাসে।
কাতলা ভেটুক কই কাল ভাজা কে
শিক-পোড়া ঝুরি কাঁঠালের বীজে ঝোল।
ঝাল ঝোল ভাজা রান্ধে চিতল ফলুই
কই মাগুরের ঝোল ভিন্ন ভাজে কই।
ময়া সোনা খড়কীর ঝোল ভাজা সার
চিঙ্গড়ির ঝোল ভাজা অমৃতের তার।
কণ্ঠা দিয়া রান্ধে কই কাতলার মুড়া,
তিত দিয়া পচা মাছ রান্ধিলেক গুঁড়া।
আম দিয়া ষোল মাসে ঝোল চড়চড়ি
আড়ি রান্ধে আদারসে দিয়া ফুলবড়ি।
রুই কাতলার তৈলে রান্ধে তৈল শাক
মাছের ডিমের বড়া মৃতে দেয় ডাক।
বাচার করিল ঝোল খয়রার ভাজা
অমৃত অধিক বলে অমৃতের রাজা।
সুমাছ বাছের বাছ আর মাস যত
ঝাল ঝোল চড়চড়ি ভাজা কৈল কত।
বড়া কিছু সিদ্ধ কিছু কাছিমের ডিম
গঙ্গাফল তার নাম অমৃত অসীম।’... ইত্যাদি।

‘চৈতন্য চবিত্রামৃত’-এর লেখক কৃষ্ণদাস কবিরাজে বিবরণ অনুসারে শ্রীক্ষেত্রে সার্বভৌম ভট্টাচার্যের বাড়িতে চৈতন্যদেব কেমন নিরামিষ রান্না অন্নের আহার করিয়ে ছিলেন সংমেতে তা শোনা যাক-

‘বর্তিসা কলার এক আঙ্গেলিয়া পাত,
উচ্চারিত তিন মান তুঁলের ভাত।
পীত সুগন্ধি ঘৃতে অন্ন সিক্ত কৈল,
চারিদিকে পাতে ঘৃত বাহিয়া চলিল।
কেয়া পাতের খোলা ডোঙ্গা সারি সারি,
চারিদিকে ধরিয়াছে নানা ব্যঞ্জন ভরি।
দশবিধ শাক নিম্ব তিক্ত শুক্তার ঝোল,
মরিচের ঝালে ছেঁড়াবড়ি বড়া ঘোল।
দুগ্ধতুম্বী, দুগ্ধ কুষ্মাণ্ড, বেশারী নাফরা,
মোচা ঘণ্ট, মোচা ভাজা, বিবিধ শাকেরা।
ফুল বড়ি ফল মূলে বিবিধ প্রকার,
বৃদ্ধ কুষ্মাণ্ড বাড়ির ব্যঞ্জন অপার।
বৃদ্ধ নিম্ব পত্র সহ ভ্রষ্ট বার্তকি,
ফ‚ল বড়ি, পটোল ভাজা কুষ্মাণ্ড মানচাকী।... ইত্যাদি।

তিন
এক সময় বাঙালির কাছে খিচুড়ি এবং ইলিশ ছিল অভিন্ন, এখন সাধারণ বাঙালির সে যুগ আর নেই। বাঙালির ট্যাকের করুণদশা এতদিনে জানা হয়ে গেছে পদ্মার ইলিশকুলের, তাই তারা উড়ে চলেছে নতুন অজানা সব ঠিকানায়। কিন্তু অভাগা বাঙালিকে তখনও ছেড়ে যায়নি। পুষ্টিকর বলকর খিচুড়ি সহচর জোগাতে বন্ধন পটিয়সী বাঙালি বধূরা যেসব অনুদান আবিষ্কার করেছেন কুছ পরোয়া নেই। তার সংখ্যা অনেক। ইলিশ সব সময় না জুটলে সাধ্যের মধ্যে রয়েছে বেগুনভাজা, বেশন দিয়ে কুমড়া বা বেগুন অথবা বাঙালি মধ্যবিত্তের চিরসখা ডিমের ওমলেট, যাকে আমরা ছেলেবেলায় বলতে শুনেছি মামলেট। অবাঙালিরা নাকি খিচুড়ির সঙ্গে পাপড় আচার বা দই খায়। বাঙালির নিরুপায় হয়ে পাপড় হাত দিলেও-খিচুড়ির সঙ্গে দৈ আচার কদাপি নয়। নৈবনৈবচ।

ভোজনরসিক বাঙালি জেনে খুশি হবে সম্রাট জাহাঙ্গীরের বিত্ত বৈভবের কোনো কমতি না থাকলেও তার প্রিয় খাবার ছিল মাংস, বা মাছ নয়- গুজরাতি খিচুড়ি। আকবর বাদশাহর পোলাও ছেড়ে খিচুড়ির স্বাদ গ্রহণে অরুচি ছিল না। তবে সারা উপমহাদেশে জানে বাঙালির অন্যতম প্রিয় খাদ্য হলো খিচুড়ি- এবং পৃথিবীর যেখানেই বাঙালির বসতি রয়েছে সেখানে খিচুড়ি অবশ্যই মিলবে একমুঠো চাল, একমুঠো ডাল মিশিয়ে নিয়ে হাঁড়ি চড়ালেই হয়ে গেল খিচুড়ি- তীর্থযাত্রীদের জন্য সবচেয়ে কম ঝামেলার খাবার। প্রজ্ঞা সুন্দরী দেবীর বিখ্যাত রান্নার বইয়ের সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তির দিকে আর একবার তাকানো যাক- ‘সৈন্যের গুণে যেমন সেনাপতির খ্যাতি বর্ধিত হয়, সেই রূপ আনুষঙ্গিক খাদ্যের গুণে প্রধান খাদ্য সমধিক রুচিকর হইয়া ওঠে।’

খিচুড়ির এই আনুষঙ্গিক খাদ্যের মধ্যে তখনও প্রধান হলো ইলিশ আরও নির্দিষ্ট করে বললে ইলিশ ভাজা। গলা খিচুড়ি আর ভুনা খিচুড়ি উভয়ই বাঙালির অন্যতম সৃজন শক্তির পরিচায়ক, আর বর্ষাকাল এলেই বাঙালি মাত্রই একটি নির্ভেজাল খিচুড়ি প্রেমিক হয়ে ওঠেন, সেই খিচুড়ি আমিষ বা নিরামিষ যাই হোক না কেন। ‘মনসামঙ্গলে’ আছে ডাবের জল দিয়ে রান্না করা মুগের ডালের খিচুড়ি খেতে চেয়েছিলেন পার্বতীর কাছে এবং শিব কৈলাসে তো নারকেল গাছ নেই যে ডাব পাওয়া যাবে। মনসামঙ্গলের লেখক বিজয় গুপ্ত জন্মেছেন বরিশালে, যেখানে সারা বছরই আছে নারকেল এবং ডাব সুলভ ও সহজলভ্য। ফলে বিজয় গুপ্তের পাশে ডাবের জল দিয়ে খিচুড়ি রান্নার রেসিপি উল্লেখ খুব আশ্চর্যজনক নয়। সংস্কৃতে খিচুড়ির আর একনাম কৃশর অর্থাৎ তিল, মুগডাল ও চালে ঘৃতপক্ক অন্ন। ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’-এ দেখি মুঘলাইখানা বাঙালির বিশেষ করে হিন্দু বাঙালির ঘরেও ঢুকে পড়েছে।
‘কচি ছাগ মৃগ মাংসে ঝোল ঝাল রসা/কালিয়া দোলমা বাঘা সেকচি সমসা/অন্য মাংস শিকাজা কাবাব করিয়া/ রান্ধিলেন মুড়া আলো মসলা পুরিলা।’ -কালীপ্রসন্ন ৫৯

বাংলার আকাশে বাতাসে দিল্লি, আগ্রা, লখনৌ পাকাশালার সৌরভ। এ-হাওয়ার স্থানীয় উৎস মুর্শিদাবাদ, ঢাকা কৃষ্ণনগরু ও বর্ধমানের বাজবাড়ি এবং কলির শহর কলকতায় গড়ে ওঠা দেদার হোটেল, ট্যার্গন, কফি হাউস আর রেস্তোরাঁ। সেখানে যেমন ইউরোপীয় খাদ্য মেনে তেমনি মেনে দেশিয় আর্য মুঘলাই নানা ডিস।

একটু পরে বঙ্কিমচন্দ্র থেকে জানা গেল ফাউলকারিও ঢুকে পড়েছে হিন্দুর হেঁশেলে। নদের কটির চাঁদ এখন আর মালপো ভোগে তেমন আস্থা নেই, তার ফাউলকারি ঠিকমতো তরিবৎ হলো কিনা এ নিয়ে তার বেজায় দুশ্চিন্তা।

কিন্তু বঙ্কিমের খাদ্যরুচির একটু পরিবর্তন পাওয়া যাবে আনন্দমঠে। আহার্য বস্তু তার উপাদানের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে পরিবেশকারীর স্নেহরস। ‘জীবানন্দ ক্ষুধার্ত লিমি তাকে খেতে দিচ্ছে লিমি পিঁড়ি পাতিয়া মল্লিকা ফুলের মতো পরিষ্কার অন্ন, কাঁচা কলাইয়ের দাল, জঙ্গুলে ডুমুরের ডালনা, পুকুরে রুই মাছের ঝোল এবং দুগ্ধ আনিয়া জীবানন্দকে খাইতে দিল।’ সবে দেখা দেয় সেবা মাধুর্যে ছোঁওয়া তখন সে হয় কি অনির্বচনীয়। পরিবেশকারিণী ও পরিবেশিত ভোগ্যের অপরূপ সংযোগের বিকাশ বাংলা সাহিত্যে। শরৎচন্দ্র এ ব্যাপারে নমস্য লেখক। আনন্দ আর শ্রীকান্তকে রাজল²ীর খাওয়ানোর বিবরণ একবার নয় বারবার পাঠ্য। এর পরেই নাম করতে হয় তারাশঙ্কর, বনফুল ও বিভূতিভূষণের। রবীন্দ্রনাথকে বাদ দেবার কোনো উপায় নেই। তিনি আমাদের ছেড়ে যাননি। ‘’যে উপন্যাসের কমলা রমেশের স্টিমার যাত্রার বিচিত্র সরসতা পাঠকের ভুলবার নয়। কমলার রন্ধন নৈপুণ্য এবং উমেশের সংগ্রহ ক্ষমতা মিলে সে এক রসঘন পরিস্থিতি। সজনে ডাটা, লাউডগা, বেগুন কুমড়ো ফুল, রুইমাছ সব মিলিয়ে সে এক কাণ্ড। ‘নৌকাডুবি’ উপন্যাসের সম্পর্ক জটিলতর স্টিমার যাত্রার এই অংশ ক্ষুধাউদ্রেককারী ঝলক নদীর হাওয়া যেন।

তবে দ্রুত রুচি পালটে যাচ্ছে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। উচ্চবর্গের পরিবারগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে পোশাকে-আশাকে, সাহিত্য শিল্পচর্চায় এমনকি খাদ্যরুচিতে পর্যন্ত মুগল প্রভাব। ১৮৩৪ সাল পর্যন্ত ফারসি ছিল আদালতের ভাষা। সেটা উইলিয়াম বেন্টিংকের আমল। সুতরাং ফারসি ছিল বিদ্যানের লক্ষণ এমনকি বাঙালি মেঘের ব্রত কথায় দেখা গেছে ফারসি বিদ্যার প্রচণ্ড আগ্রহ তার প্রার্থনা- ‘আরশি/আরশি। আমার স্বামী যেন পড়ে ফারসি’। ভারতচন্দ্র তো কালিয়া কোপ্তা ও শিক কাবারের কথা আগেই বলেছেন তার অন্নদামঙ্গলে। কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় ‘মধ্যযুগের বাঙলা’ তার এক বন্ধুকে উদ্ধৃত করছেন। পরিস্থিতি দেখে তিনি মন্তব্য করতে বাধ্য হয়েছেন- ‘কোর্মা, কোপ্তা, কারি কটলেট প্রভৃতি ককাবাদি ব্যঞ্জনের প্রকোপে বুঝিবা ঝাল ঝোল দালনা চড়চড়ি আর বাঙালি বাবুর মুখে রুচিবে না।’ কথাটা অতিশয়োক্তির মতো শোনালেও উনিশ শতকের শহরগুলোর উচ্চবিত্তের পরিবারে অন্তত পরিস্থিতি অনেকটা এরকমই ছিল। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, গোয়ালন্দ, বরিশাল খুলনা স্টিমার সার্ভিস চালু হলে সেই স্টিমারের প্রথম শ্রেণির ডাইনিং রুমে- ইংরেজি খাবার বিশেষ করে পুডিং বা ক্যারামেল কাস্টার্ড আস্বাদন করার সুযোগ অনেক সম্পন্ন মফস্বলী বাঙালি পরিবারের একাধিকবার হয়েছিল। এই যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলেও কিছু মুগলাই ও ইংরেজি ডিসের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল বললে ভুল বলা হবে না।

রাজধানীর সম্ভ্রান্ত বাঙালিরা হিন্দু-মুসলিম উভয়েই বাড়িতে সাহেব মেমদের আপ্যায়ন করতে শুরু করেন। সাহেবিখানা আনা হয় বড় বড় হোটেল থেকে। ইয়ং বেঙ্গলরাও পিছিয়ে রইলেন না। তারাও সোৎসাহে হানা দিতে লাগলেন সাহেবি হোটেলে। বাংলা প্রহসনে দেখা দিল ভিনদেশি খানার জন্য কাড়াকাড়ি, ভিনদেশি বলতে একদিকে ইংরেজিখানা, অন্যদিকে মুঘলনাই তথা উত্তর ভারতীয়। শেষ পর্যন্ত মনে হয় ইংরেজি বনাম মুঘলাই-এর লড়াইয়ে বিজয়ী হয়েছিল মুঘলাইখানা। লখনৌর বাদশা কলকাতার মেটিয়া বুরুজে নির্বাসিত হলে তিনি প্রায় পুরো লখনৌ শহরটি সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। সংগীত, নৃত্যচর্চার প্রসার হলো দ্রুত, সঙ্গে লখনৌর বিখ্যাত বিরিয়ানি পান, পোশাক ও নানা বিলাসিতা কলকাতাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। বাঙালি খাদ্য রুচিতে ও এর প্রভাব অপরিসীম বিশেষ করে কলকাতা ঢাকার মুসলিম পরিবারে। এখনও সেই গৌরব অস্তমিত হয়নি। ঢাকার কাচ্চি বিরিয়ানি সেই প্রভাবের ফল, যা আজ মরক্কো জর্দানের কাটুন পত্রিকা বসন্তক-এর আমুদে মন্তব্যঃ ‘হোটেল হইতে খানা আনিয়ে ভবনে/খাওয়াই প্রাণের বন্ধু গণে সযতনে/ কী জানে রাঁধিতে যত দেশী রাঁধুনিতে। জানে থোড় কচু ঘেচু কেবল রাঁধিতে।’

মুসলিমদের প্রভাবের ফলে মধ্যযুগের বাঙালি সমাজের কিছু অংশে নতুন ধরনে খাবারের প্রচলন হয়েছিল বহিরাগত সুলতান, নবাব, আমীর ওমরাহরা উত্তরভারত, ইরান এবং পশ্চিম মধ্য এশিয়া থেকে ভিন্ন ধরনের খাদ্যের ঐতিহ্য ও উপকরণ নিয়ে এসেছিলেন উদাহরণস্বরূপ বলা লুচি-পরোটা যুগল শব্দদুটির প্রথমটি প্রাচীন ভারতীয় খাবার- কড়াই এ ভাজতে হয়- পরোটা মুসলিম প্রভাবের ফসল, ভাজা হয় তাওয়ায়, তাওয়া ও তন্দুর-দুটি উপকরণই মুসলিমদের বাংলাদেশে আগমনের ফসল। এসব মুসলিম প্রভাবিত খাবারের কোনো কোনোটা দেশিয় গরিব মুসলিমদের মধ্যে প্রথমে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে গবেষক গোলাম মুরশিদ অনুমান করেন। এছাড়া যে ধনী হিন্দুরা ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন অথবা বাবা কার্যসূত্রে মুসলিম শাসকদের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এসেছিলেন তারাও ধীরে ধীরে বহিরাগত শাসকদের খাবারের কিছু কিছু অংশ গ্রহণ করেছিলেন। তবে এর জন্য যে কয়েক শতাব্দী লেগেছিল- এমনটি মনে করা স্বাভাবিক, কারণ ভারতচন্দ্রে আগে মোগলাই খাবারের উল্লেখ কোনো অমুসলিম কবির লেখায় পাওয়া যায় না। অর্থাৎ ভারতচন্দ্রের সময়ের আগে পর্যন্ত মুসলিম খাবার হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাঙালি সমাজে প্রবেশ করেনি বলেই অনুমেয়। মুসলিমরা আরো একটি বস্তু এ দেশে এনেছিলেন- তা হলো ছানা, যা থেকে তারা পনীর তৈরি করতেন। দই, ঘি ও নানা মিষ্টি হিন্দু ময়য়াবা তৈরি করলেও বাংলাদেশে এখন পনীর শুধুমাত্র মুসলিম কারিগরাই তৈরি করছেন। সম্ভবত এখনও এটি মুসলিমদের একচেটিয়া ব্যবসা।

মুসলিম শাসকরা তরমুজ খরমুজ প্রভৃতি ফলও নিয়ে এসেছিলেন। কিছু নতুন খাবারের প্রচলন পতুর্গীজদের সঙ্গেও হয়েছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো গোলআলু মধ্যযুগের বাঙালির ভাতের থালা নিরালু অর্থাৎ আলুহীন। পতুর্গীজরা ইউরোপ থেকে আলু এদেশে নিয়ে আসে। কলকাতা-ঢাকা মুর্শিদাবাদ কথা যেমনই হোক বাংলার গ্রামাঞ্চলে আলু পৌঁছেছিল অনেক পরে। বিভূতিভূষণের ‘ইছামতী’ উপন্যাস লালু পাল কলকাতা থেকে তার গ্রামে আলু নিয়ে এলে হুলুস্থুল পড়ে গিয়েছিল।

আলুর চেয়ে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ বা অভূতপূর্ব উপকরণ পতুর্গীজরা আমদানি করেন, তা হলো মরিচ আর তামাক, যা বাংলাদেশের লোক লুফে নিয়েছিল এবং দ্রুত তা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি তিনটি সম্ভবত পতুর্গীজরা এ দেশে এনেছিল। কারণ পতুর্গীজ ভাষায় এদের বলা হয় কোবি- যা থেকে বাংলা কপি- ফুলকপি ইত্যাদি। কথায় বলে একজন কী খায় তা থেকে বলে দেখা যায় সে কীরকম মানুষ। বুদ্ধদেব বসু তার বাংলা খাবার নিয়ে লিখতে গিয়ে বলেছেন ‘ববীন্দ্রনাথের ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসে মধুসূদন ধনাঢ্য ব্যক্তি রুপার থালায় খেলেও তার দৈনন্দিন খাদ্য হলো কলাইয়ের ডাল, কাঁটা চচ্চড়ি, তেঁতুলে অম্বল এবং সবচেয়ে মস্তবড়ো বাটি ভরতি চিনি মেশানো দুধ। এইভাবে বরীন্দ্রনাথ বুঝিয়ে দিলেন ‘বেচারা কুমুদিনী তার বায়বীয় ধরন ধারণ নিয়ে কী রকম শক্ত লোকের পাল্লায় পড়েছে।’

গোপাল হালদার মনে করেন জমিদার তালুকদারদের প্রভৃতি ভোজন ছাড়িয়ে ইংরেজ আমলে বিকশিত বাঙালি শ্রেণি একটি রস ও রুচির মাপকাঠি তৈরি করেছিল। কিন্তু তা রয়ে গেছে পারিবারিক গণ্ডির মধ্যে। কারণ মধ্যবিত্ত জীবনের সীমাবদ্ধ আদান-প্রদানের মধ্যেই গড়ে উঠেছিল সেই বাঙালি ভোজনরীতি। তিনি মনে করতেন বাঙালি খাওয়ার ব্যাপারে ‘না গ্রহণ না বর্জন নীতিতে’ সহনশীল। বাঙালি বাড়ির নিমন্ত্রণে প্রথমে আদি অকৃত্রিম শাক, তারপর আসবে মোগলাই পোলাও কোর্মা, কাবাব এবং শেষে আসবে ইংরেজি-বাঙালি পর্বের চপ কাটলেট থেকে আইসক্রিম পর্যন্ত। লিখেছেনঃ
নিয়ন্ত্রণ তো নয়, এ-বাঙালির ইতিহাস... বাঙালির নিমন্ত্রেণে আজ নিমন্ত্রিত হয় বাঙালি অতিথির তিন জন্মের তিন সত্তা। সেই আদি জন্মের গেঁয়ো বাঙালি সত্তা, তার মধ্যজন্মের আধা-মুসলমানি সত্তা, আর তার ইংরেজি আমলের আধা-ঔপনিবেশিক সত্তা। কিন্তু সত্তা যত বিচিত্র হোক, হায়, উদর মাত্র একটি। মিষ্টান্ন প্রিয় বাঙালির জীবনের মিষ্টির প্রভাব সুবিদিত। সুসংবাদে মিষ্টি আতিথ্যে মিষ্টি, ভদ্রতায় মিষ্টি। বিয়ে-শাদী কুলখানিতে মিষ্টি। সংবাদ আনতে মিষ্টি নিয়ে যাওয়ার বহুল প্রথা সংবাদকেই সন্দেশে রূপান্তরিত করেছে। এক সময় বাড়ির মেয়েরাই বেশির ভাগ মিষ্টি তৈরি করতেন। পিঠে তৈরিতে বাংলার মেয়েরা দৈহিক পরিশ্রম আর মনের আনন্দ মিশিয়ে ফেলেন। এক সময় ঢাকায় পিঠেওয়ালী মহিলারা মহল্লার বাড়ি বাড়ি পিঠে বিক্রি করতে বের হতেন। পিঠে বিক্রির সঙ্গে নানা ধরনের মজার মজার পন্নি ও গুলিয়ে আসতো বিনি পয়সায়। দেবী ঘোষ তার বইয়ে লিখেছেন পূর্ব বাংলার পিঠে তৈরির বৈচিত্র্য পশ্চিমবাংলার তুলনায় বেশি। পূর্ব বাংলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য ‘আসকে পিঠে’ (চিত্রই পিঠা)।

বাঙালি ঘরে নানা অসুবিধার মধ্যে মেয়েদের রান্না করতে হয়। দরিদ্র সংসারে মেয়েরা প্রিয়জনের মুখে অন্ন তুলে দিতে গভীর সংকটে পড়েন। জ্বালানির সংকট, চান সহজে সিদ্ধ হয় না, অথচ খাবার সময় পেরিয়ে যায়। বাড়ির পুরুষরা অসন্তুষ্ট হয়। চট্টগ্রামের একটি চটকা গানে শাশুড়ি, বধূর এমন সংকটের ছবি ফুটে উঠেছে।
‘মাইজান বউয়ে তাহার উপর চাড়াইয়া দিছে ডাইল।
বাড়ির মানুষ শুইনা কত দিবার লাইলাগে গাইল\
বেলা হৈল দুপুর গেল ডাইল গলে না হায়।
নতুন ইস্টির ছামনে এহন ক্যামন দেয়ন যায়\
ত্যক্ত হৈয়া মাইজান বউয়ে ডাইলে মারে ঘাও।
চরকা যেমন ঘ্যাগর ঘ্যাগর কইরবার লৈল রাও\
ভাসুরে করে কিচিরমিচির দেওরে করে রাগ।
ফোটা তিলক কাইটা হউড় সাইজা বইছে বাঘ\’

সৈয়দ মুজতবা আলী তার ভোজন বিষয়ে নিজস্ব ধারণা ও বাঙালির ভোজন বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করেছেন তার ‘জলে ডাঙ্গায়’ বইয়ে, তিনি বলেছেন- ‘আমরা তেতো, নোনা, ঝাল, টক মিষ্টি- এই পাঁচ রস দিয়ে ভোজন সমাপন করি। ইংরাজ খায়, মিষ্টি আর নোনা, ঝাল সামান্য, টক তার চেয়েও কম এবং তেতো জিনিস যে খাওয়া যায়, ইংরেজের সেটা জানা নেই। তাই ইংরেজি রান্না আমাদের কাছে ভোতা ও বিস্বাদ বলে মনে হয়। অবশ্য ইংরেজ ভালো কেক- পেসট্রি পুডিং বানাতে জানে- তাও সে শিখেছে ইতালিয়ানদের কাছ থেকে এবং একথাও বলবো, আমাদের সন্দেশ রসগোল্লার তুলনায় এসব জিনিস এমন কী যে নাম শুনে মূর্ছা যাব।

পশ্চিমবঙ্গের রান্না ও বাংলাদেশের রান্নার পার্থক্য নিয়ে মুজতবা আলীর সরস মন্তব্যটি শোনা যাক। বাংলাদেশের রান্নায় ঝালের প্রাচুর্য পশ্চিমবঙ্গের রান্নায় চিনির। এই বিষয়টাকে আরো সরস করতে তিনি একজনের মন্তব্য তুলে ধরেছেন- সে ব্যক্তি বলেছেন- মাই মোটর কার ইজ সাউন্ড ইন এভরি পার্ট,- একসেপ্ট হর্ন দি হর্ন- ঠিক সে রকম পশ্চিমাবংলার রান্নাতে সুগার ইন এডরিথিং একসেপ্ট ইন রসগোল্লা।

মাছ-ভাত-শাকসবজির মতো দৈনন্দিন খাবারের বেলায় হিন্দু এবং দেশিয় মুসলমানদের রান্নায় বিশেষ পার্থক্য ছিল বলে মনে হয় না। তবে হিন্দু বাড়ির রান্নায় হিঙ্গের ব্যবহার দেশিয় মুসলিম পরিবারে তেমন দেখা যায় না। হিন্দু বাড়ির রন্ধন প্রণালিতে ফোড়নের ব্যবহারের প্রবণতা বাঙালি মুসলিম পরিবারের চেয়ে বেশি। তবে মাংসের ব্যাপারে পার্থক্য প্রচুর। মুসলমানদের মধ্যে মাংস খাবার চলন বেশি। গরুর মাংস তো খেতেনই, মুরগি বা ছাগল বা খাসির মাংসের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। মুকুন্দ রামের লেখায় আমরা দেখেছি মুরগি ও ছাগল জবাই করে মোল্লা পারিশ্রমিক নিচ্ছেন। এ-থেকে মুসলিমদের খাদ্যাভাসের সঙ্গে সাধারণ বাঙালি হিন্দুর কিছু পার্থক্য অনুমান করা সম্ভব। তবে শাক্তরা ছাগল হরিণ কচ্ছপসহ নানা প্রাণীর মাংস খেতে পছন্দ করতেন।

উপরের খাদ্য তালিকাটি প্রধানত অবস্থাপন্ন মানুষদের প্রসঙ্গে বলা হলো। পাশাপাশি বৃহত্তর সমাজে সেখানেও গরিবদের খাবার ছিল পান্তাভাত। তবে ইলিশ পান্তা তাদের সাধ্যের বাইরে ছিল। পাদরী সিবান্তিয়ান মানরিক ষোলো শতাব্দীতে বঙ্গদেশে ভ্রমণ করেছিলেন বেশ কয়েকবার। তিনি লিখে গেছেন যে গরিবরা নুন আর শাক দিয়ে ভাত খেতেন প্রায় একই সময়ে মুকুন্দরাম দরিদ্র ব্যাধ কালকেতুর খাবারের যে বর্ণনা দিয়েছেন তা থেকে সাধারণ মানুষের খাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। কালকেতুর কপালে জুটতো খুদের জ্যাউ; সঙ্গে লাউ দিয়ে রান্না মুসুর ডাল, ওলকচু, করঞ্জা আর আমড়া দই পেলে কালকেতুর তৃপ্তি পুরো হতো। তবে গরিবের পাতে দুই মিনতো কদাচিৎ। ঘোল মাঠাও জনপ্রিয় ছিল। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন মাঠা মুসলিম অভিযাত্রীরা বঙ্গদেশ এনেছিলেন। খাওয়ার শেষে পান সুপারি এবং মৌরি খাওয়ার ব্যাপক প্রচলন ছিল।

বাঙালির স্বাদ গ্রহণের বিশিষ্ট তার সর্ষে প্রীতি উন্নত স্থান গ্রহণ করেছিল। সর্ষে বাটা দিয়ে মাছ পাতুড়ি চচ্চড়ির স্বাদের বৈচিত্র্য বাঙালি মাত্রেরই জানা। কাসুন্দির কথা সর্ষে প্রসঙ্গে না বলেন চলেন সৈয়দ মুজতবা আলী তার সর্ষে প্রসঙ্গে না বলে সৈয়দ মুজতবা আলী তার সর্ষে প্রীতির পরিচয় দিয়েছেন ‘বাঙালির মেনু’ নিবন্ধে (৫৪)। তিনি লিখেছেন মাছের সঙ্গে সর্ষে, যেন ববীন্দ্রসংগীতে কথার সঙ্গে সুরের মিল। নিতান্ত সন্দেশ রসগোল্লা ছাড়া তিনি নাকি সব খাবারের সঙ্গে সর্ষে খাবার কথা বলেছেন।

বিলিতি মাস্টার্ডের চেয়ে দেশি কাসুন্দি ছিল তার প্রিয়। কাসুন্দিতে থাকে মিঠে কড়া মোলায়েম ঝাঁঝ- আর বিলিতি মাস্টার্ডের বদখত মিষ্টি মিষ্টি ভাব।
মুজতবা আলী বহু দেশ ঘুরেছিলেন, বহু ধরনের রান্না খেয়েছেন। আরব দেশে ভ্রমণের সময় মুর্গী মুসরমা শিক কাবাবের- স্বাদ পেয়েছেন। জাহাজে ঘুরে বেড়াবার সময় আইরিশ আর ইতালিয়ান ম্যকারনি খেয়ে পেটে চড়া পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু প্রাণ কাঁদছিল- চারটি আতব চাল, উচ্ছেভাজা, সোনামুগের ডাল, পটল ভাজা আর মাছের ঝোলের জন্য। কায়রোতে দেখেন দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা Fool's Restaurant' মানে আহাম্মকের রেস্তোরাঁ। পরে বুঝলেন এ-দোকান উত্তম সীম বীচি’ বিক্রি করে। ফুল অর্থ বীন, অর্থাৎ সীমের বীচি।

বাঙালি জীবনে খাবার সাধ আর বঞ্চনা ছড়িয়ে আছে দৈনন্দিন জীবনের পরতে পরতে। সম্পন্নের ভাগ্যে সহজেই জোটে ভালো খাবার। দরিদ্র তো ক্ষুধা নিবৃত্ত করতেই জানে না, নিমন্ত্রণের অধিকার থাকে না। ‘পথের পাঁচালী’-তে অপুর পূর্বপুরুষের সমৃদ্ধির দিন গত হয়েছে বহুদিন। অপু বাবার সঙ্গে সম্পন্ন গৃহে খাবারের যে আপ্যায়ন পেয়েছিল তাতে তাদের ঘরের দৈন্য সম্পর্কে একটা ধারণা জন্মে। অপুকে মোহন ভোগ খেতে দিয়েছিল তারা। সেই মোহানভোগে ঘি-এর পরিমাণ এত বেশি ছিল যে অপুর আঙুলে মাখামাখি হয়ে যায়। তার মনে পড়ে, মায়ের কাছে মোহনভোগ খেতে চাইলে ‘শুধু সুজির ডালে সিদ্ধ করিয়া একটু গুড় মিশাইয়া পুলটিসের মতো এক দ্রব্য তৈয়ার করিয়া ছেলেকে আদর করিয়া খাইতে দেন।’ আজকের মোহন ভোগ আর মায়ের তৈরি মোহনভোগের সঙ্গে অপু তফাৎ করতে পেরেও সে দরিদ্র মায়ের প্রতি করুণায় ও সহানুভূতিতে পূর্ণ হয়ে গেল ‘খাইতে বসিয়া বারবার তাহার মনে হইতেছিল আহা তাহার দিদি এরকম খাইতে পায় নাই কখনো’। সুস্বাদু খাবার তাকে সুখের বদলে দুঃখ এনে দেয়।

এবার একটি হালকা করুণ গল্প দিয়ে বাঙালির খাদ্যবিন্যাস শেষ করি। গল্পটি পাওয়া গেল অভিনব গুপ্তের ‘জেনো বাসনার সেবা রসনায়’ থেকে পড়তি অবস্থার মুসলমান জমিদার। সেদিন তার খাবারের সংস্থান মাত্র দুটি ক্ষুদ্র মাছ তাও বিড়ালে নিয়ে গেছে। নফর এসে বন্ধু পবিবৃত জমিদার সাহেবকে খবর দিল বিল্লিখা আকে মছলী মহল লুট লিয়া’ জমিদার সাহেব বললেন- তুম জলদি। মসুর খাকে বোলাও। আলু যেখানে এমন পড়তি সংসারে দুর্লভ সেখানে কচুর দম আর আমড়ার টকই বিকল্প খাদ্য। তার ছদ্মবেশী ভাষা- ভুঁই আন্ডা কি কাবাব, আউর আসমান গোলা (আমড়া) কি চাটনি বঞ্চনা ঢাকার জন্যও কতনা প্রচেষ্টায় আভাগা এদেশে।