বুধবার,২৬ Jul ২০১৭
হোম / ফিচার / গ্রামবাংলায় ঈদের খুশি
০৬/১৯/২০১৭

গ্রামবাংলায় ঈদের খুশি

-

ঈদ মানেই আনন্দ। ঈদ মানে বহুদিন পর বাড়ি ফেরার টান, ধুলোমাখা শহরের তপ্ত রাজপথ ছেড়ে কিছুদিনের জন্য হলেও নিজ গ্রামের বাড়ির পুকুর পাড় কিংবা প্রকাণ্ড গাছের ছায়ায় স্নিগ্ধ বাতাস উপভোগ করার সুবর্ণ সুযোগ। ঈদের এই কিছুদিন তাই ধর্মীয় উৎসবের গন্ডি পেরিয়ে আবহমান গ্রামবাংলার প্রতীকি চিত্র বহন করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে আধুনিকতার ছোঁয়া এসেছে ঠিকই তবে মোটা দাগে বলতে এখানে ঈদ উদযাপন শহরের চেয়ে এখনো বেশ ভিন্ন এবং একক বৈশিষ্ট্যময়।

শহুরে জীবনের প্রতি ঝোঁক অনেকটা বেড়ে গেলেও এখনো দেশের অধিকাংশ মানুষের নাড়ি কিন্তু গ্রামের বাড়ির ভিটে-মাটিতে পোঁতা। শহরে থাকাটা এসব মানুষের প্রয়োজন, আর গ্রামীণ জীবন তাদের অভ্যাস। মানুষ মাত্রই অভ্যাসের দাস, তাই এই অল্প কয়েকদিন ঈদের ছুটি এসব মানুষদের জন্য যতটা না ধর্মীয় গাম্ভীর্য্যরে ব্যাপার ঠিক ততটুকুই জাগতিক জীবনে প্রশান্তি লাভের উপলক্ষ। তবে শত বছর ধরে গ্রামে ঈদ উদযাপনের যে চিত্র যুগে যুগে গল্প-উপন্যাস কিংবা সেলুলয়েডের পর্যায় ধরা পড়েছে তা বর্তমানে ডিজিটাল বাংলাদেশে কিছুটা হলেও অনুপস্থিত। প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় বিদ্যুৎ, ডিশ-ক্যাবল, নিত্য নতুন ডিভাইস এখন গ্রামের মানুষের হাতে হাতে এবং তা গ্রামীণ জীবনের উৎসব-আয়োজনের শতবর্ষী পুরনো রীতিতেও ব্যতিক্রম এনেছে। এই যেমন- এক সময় ঈদের দিনে হাডুডু, কাবাডি, দাড়িয়াবান্ধা কিংবা ফুটবল ম্যাচ আয়োজোনের চল এখন অনেকাংশেই কমে গিয়েছে। ঈদের দিনগুলোতে সন্ধ্যা বা রাতে কবিগান, জারি-সারি কিংবা ভাটিয়ালি গানের আসর এখন বিলুপ্ত হতে চলেছে। এ সকল গ্রামীণ বিনোদনের বদলে জায়গা করে নিয়েছে বিভিন্ন চ্যানেলের সপ্তাহব্যাপী ঈদ অনুষ্ঠান কিংবা দেশ-বিদেশের ঈদের সিনেমা।

পাঠক মনে এতক্ষণে হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে- তবে কি গ্রামবাংলায় ঈদ উৎসবের পুরনো জৌলুশ এখন নেই বললেই চলে? না, তা অবশ্যই না। উৎসব-আনন্দের রীতিতে শহুরে ভাব থাকলেও কিছু কিছু জিনিস ঠিক আগের মতোই রয়ে গিয়েছে। এখনো ঈদের আগের দিন গ্রামের দিগন্ত প্রসারিত মাঠে চাঁদ দেখার জন্য অসংখ্য মানুষের ভিড় হয়। ‘চাঁদ উঠেছে, চাঁদ উঠেছে’ বাক্যটার আঞ্চলিক রূপ নিয়ে শিশু-কিশোরদের পাড়া বেড়িয়ে আনন্দ করতে দেখা যায়। এই রাতেই নানা রঙের কাগজ মুড়িয়ে ঈদগাহ প্রাঙ্গণে দোকান খুলে বসে গ্রামের উঠতি কিশোর দল। সন্দেশ, বাতাসা, প্লাস্টিকের খেলনা, বাজি-পটকা, টিনের পিস্তল-আর ও কত কি থাকে তাতে! আজও দেশের কোনো কোনো প্রান্তের কোনো এক গ্রামের নারীরা ঈদের আগের রাতে কুপি, হারিকেন কিংবা ল্যাম্প জ্বালিয়ে মনের সুখে গান গাইতে গাইতে নিজ হাতে কাঁচা সেমাই, পিঠা তৈরি করে। এই হাসি-আনন্দগুলো একেবারে অকৃত্রিম, প্রাচীন এবং মনের গহিন কোণ থেকে উঠে আসা বিশুদ্ধ আবেগ। ঈদের দিন সকালে পুকুরপাড়ে সবাই মিলে গোসল করা, বিশাল মাঠের ঈদগাহে নামাজ শেষে গ্রামের মেঠোপথ ধরে একে একে আশপাশের সব বাড়িতে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময়, তারপর গলা অবধি ভোজনপর্ব শেষে গ্রামের মাঠে প্রীতি ম্যাচ- এসবই যেন শিল্পীর ক্যানভাসে আঁকা এক গ্রামীণ জীবনের শিল্পকর্ম যার প্রতিটি তুলির টানে রয়েছে অপরিমেয় আবেগ-অনুভূতি, ভালবাসা, হাসি-কান্নার মিলিত উপাখ্যানের শেষে মধুর সমাপ্তি চিহ্ন। ব্যস্ত শহর ছেড়ে ঈদের আনন্দ করতে তাই গ্রামে একবার না গেলেই নয়।

পল্লী বাংলার কপালে প্রযুক্তির আশীর্বাদের হাত দিনে দিনে প্রসারিত হোক, শহুরে চল আরো একটু বেড়ে যাক। তাতে ক্ষতি নেই। তবে দিন শেষে স্বকীয়তাটুকু টিকে থাকুক। টিকে থাকুক ঈদের দিনে রঙ-বেরঙের কাগজে সাজানো গ্রাম্য ঘর, অদ্ভুত-রঙিন নতুন জামায় শিশুর উল্লাস কিংবা মনের সুখে গুনগুনিয়ে গান করে চলা গ্রাম্য বধূর ঠোঁটের কোণের একচিলতে হাসি।

- নাসিফ রাফসান