সোমবার,২৩ অক্টোবর ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / ম্যানভিলে মা
০৬/১১/২০১৭

ম্যানভিলে মা

মারজরি কিনান রোলিং

- অনুবাদঃ মোজাফ্ফর হোসেন

মারজরি কিনান রোলিং (১৮৯৬-১৯৫৩) মার্কিন কথাসাহিত্যিক। তিনি ফ্লোরিডায় বাস করতেন। তার লেখায় আমেরিকার গ্রামীণজীবন উঠে আসতো। তাঁর সেরা কাজ দ্য ইয়ার্লিং উপন্যাসটি। এটার জন্যে তিনি ১৯৩৯ সালে পুলিৎজার পুরস্কার পান। পরে উপন্যাসটি থেকে চলচ্চিত্রও নির্মাণ করা হয়। উপন্যাসের পাশাপাশি তিনি ছোটগল্প লিখেও খ্যাতি অর্জন করেন। রোলিংয়ের মাদার ইন ম্যানভিল গল্পের অংশবিশেষ বাংলাদেশের মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠ্য ছিল।

এতিমখানাটি ছিল ক্যারোলিনা দ্বীপপুঞ্জের ওপরে। শীতকালে মাঝে মধ্যে এত তুষারপাত হত যে সেটি দ্বীপপুঞ্জের পাদদেশে অবস্থীত গ্রামগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত। দ্বীপের চূড়াগুলো কুয়াশার ভেতর নেই হয়ে যেত। তুষার উপত্যকা গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে আসত। এবং এত তীব্রভাবে বাতাস বইত যে, এতিমখানা থেকে যে সকল ছেলেরা দিনে দুইবার দুধ নিয়ে বেবি কটেজে যেত তাদের হাতের আঙুলগুলো শীতে কাটার মতো বিঁধত।
‘অথবা আমরা যখন রান্নাঘর অসুস্থদের জন্য খাবারের ট্রে নিয়ে যেতাম তখন আমাদের উন্মুক্ত মুখমণ্ডল টনটন করে ফেটে যেত।’ জেরি বলল। ‘আমার হাত মোজা আছে।’ সে যোগ করল। ‘কারো কারো আবার তাও নেই।’
বিগত শরৎকাল তার পছন্দের ছিল, সে জানাল। রোডেনড্রন ফুলের চাদরে সমস্ত দ্বীপপুঞ্জ ঢেকে যায়। ‘এটা খুব সুন্দর দেখায় যখন লওরেল ফোটে।’ সে বলল। ‘কিছু তার সাদা, কিছু গোলাপী।’
আমি সেখানে হেমন্তে গিয়েছিলাম। আমার খানিক নীরবতা আর একাকীত্বের দরকার ছিল, কিছু জটিল লেখা শেষ করার জন্যে। এতিমখানার একটি কেবিন ভাড়া করে উঠেছিলাম। এতিমখানার মূল ভবন থেকে এটি অর্ধমাইল দূরে অবস্থীত। যখন কেবিনটি ভাড়া নিই, আমি একটা ছেলে অথবা লোককে এসে আমার জন্যে কাঠ চেরাই করে রেখে যাওয়ার জন্যে বলেছিলাম। শুরুর দিককার ক’টা দিন ছিল উষ্ণ। কেউ আর এলো না। আমিও আমার প্রয়োজনের কথা ভুলে গেলাম।
এক বিকেলে আমি টাইপরাইটার থেকে চোখ তুলে একটু ধাক্কা খেলাম, একটি কিশোর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এবং আমার পোষা সবসময়ের সঙ্গী কুকুরটি তার পক্ষ নিয়ে দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে। একবারও শব্দ করে অপরিচিত একজনের উপস্থিতি সম্পর্কে সে আমাকে সজাগ করেনি! ছেলেটির বয়স খুব সম্ভবত বারো হবে। তবে বয়সের তুলনায় একটু খাটো। পরনে ছিল ছেড়া জামা; খালি পা।
‘আজ আমি কিছু কাঠ কেটে রেখে যাব।’ সে বলল।
‘কিন্তু এতিমখানা থেকে একটি ছেলে আসার কথা আছে।’ বললাম আমি।
‘আমিই সেই ছেলে।’
‘তুমি? কিন্তু তুমি তো অনেক ছোট!’
‘কাঠ চেরাইয়ের জন্যে ছোট-বড় কোনো বিষয় না।’ সে বলল। ‘অনেক বড় ছেলেরাও ভাল কাঠ চিরতে পারে না। আমি অনেকদিন থেকে এতিমখানায় কাঠ চেরাইয়ের কাজটি করে আসছি।’
আমার আগুনের জন্য অপর্যাপ্ত এবং এবড়ো থেবড়ো কিছু কাঠ পড়ে থাকার বিষয়টি আমার চোখে চোখে ভাসছিল। আমি আমার কাজের ভেতর বুদ হয়ে ছিলাম, তাই আর আলাপ বাড়ালাম না। আমি একটু ঘোরের মধ্যে ছিলাম।
‘ঠিক আছে। ওখানে কুড়াল আছে। যাও, দেখ কিছু করতে পার কি-না।’ আমি দরজা লাগিয়ে কাজে বসে গেলাম। শুরুতে কাঠ টানাটানির খসখস শব্দে আমার বিরক্ত লাগছিল। এরপর সে চেরাই করা শুরু করল। কোপগুলো ছিল ছন্দময় এবং জায়গা মতো। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি তার কথা ভুলে গেলাম। শব্দটা আর মোটেও বিঘ্ন করার মতো মনে হল না, মনে হচ্ছিল একটানা বৃষ্টি পতনের শব্দ শুনছি। আমার ধারনা, দেড় ঘণ্টা কেমন করে যেন চলে গেল। আমি যখন টাইপ থামিয়ে দিলাম এবং দরজার কাছে ছেলেটির পায়ের শব্দ পেলাম, তখন সূর্য পাহাড়ের ওপর গড়িয়ে বাড়ি ফেরার পায়তারা করছে।
‘আমাকে এখন রাতের খাবার খাওয়ার জন্যে যেতে হবে। আমি আবার কাল সন্ধ্যায় আসব।’ ছেলেটি বলল।
‘তোমার পাওনাটা আমি এখনই মিটিয়ে দিচ্ছি।’ বললাম আমি। এইভেবে যে আমার হয়ত আর একটু শক্ত-সামর্থ লোক লাগবে। ‘ঘণ্টা প্রতি দশ সেন্স?’
‘আপনার যা ভাল মনে হয়।’
আমরা একসঙ্গে হেঁটে কেবিনের পিছন দিক পর্যন্ত গেলাম। আশ্চর্য রকমের চেরাই কাঠের স্তুপ পড়ে ছিল। তার ভেতর চেরির ডালপালা এবং রোডোডেনড্রনের ভারি গোড়া পর্যন্ত ছিল।
‘কিন্তু তুমি তো দেখছি একজন বড় মানুষের সমান কাঠ চেরাই করে ফেলেছ! এটা যথেষ্ট। আমি এই প্রথমবারের মতো তার দিকে ভাল করে তাকালাম। তার চুলগুলো ছিল ভুট্টার খোসার মতো। আর চোখ- তীক্ষ্ণ, বৃষ্টি জমে থাকা পাহাড়ি মেঘের মতো, ধূসর, আড়ালে নীল আকাশের লুকোচুরি খেলা। আমি কথা বললাম, একটা উজ্জ্বল আভা তার ভেতর থেকে বের হয়ে এল, যেন পড়ন্ত সূর্য যে সম্মান জানিয়ে পাহাড়কে ছুঁয়ে যায়, সেই স্পর্শটা ওকে দিয়ে গেল। আমি তাকে একটা কয়েন দিলাম।
‘তুমি কাল এসো।’ বললাম আমি। ‘এবং তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ।’
সে একবার কয়েন এবং একবার আমার দিকে তাকাল। মনে হল সে কিছু বলতে চায়, কিন্তু না পেরে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল।
‘আমি কাল খড়িগুলো গুছিয়ে দেব।’ সে তার ঘাড় ঘুরিয়ে বলল। ‘আপনার আগুন জ্বালাতে খড়ি এবং মাঝারি সাইজের কাঠের দরকার পড়বে।’
দিনের আলোয় কাঠ চেরাইয়ের শব্দে আমি অর্ধঘুমন্ত অবস্থায় থাকতাম। শব্দটা এত ছন্দময় ছিল যে, আমি আবার ঘুমিয়ে পড়তাম। যখন আমি শীতের বরফজমা সকালে বিছানা ছেড়ে উঠতাম, ততক্ষণে সে এসে আবার চলেও যেত। এবং কেবিনের একপাশের দেয়ালে সুন্দর করে খড়িগুলো সাজানো থাকত। সে বিকেলে স্কুল শেষ করে আবার আসত। এবং যতক্ষণ এতিমখানার বাইরে থাকা যেত, ততক্ষণ থাকত। ওর নাম জেরি। বয়স বারো বছর। চার বছর থেকে এই এতিমখানায় ছিল। আমি তার চার বছর বয়সের সেই ছবিটা দেখতে পেতাম, একই রকম ধূসর-নীল চোখ। আর একইরকম স্বাধীনচেতা? না ঠিক স্বাধীনচেতা নয়, যে শব্দটা আমার মাথায় আসছে তা হল, সদিচ্ছা। এই শব্দটির আমার কাছে বিশেষ একটি অর্থ আছে। খুব মেপেজুকে আমি ওটা ব্যবহার করি। আমার বাবার গুণটা ছিল। আরও একজনের ছিল হয়ত। আমার জানা আর কোনো ব্যক্তির ভেতর আমি ঐ গুণটির এমন খাঁটি উপস্থিতি পাইনি। কিন্তু জেরির ভেতর সেটা ছিল। এটা সাহসিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু তা নির্ভীকতার চেয়ে বেশি কিছু। এটা সৎ কিন্তু সততার চেয়ে বেশি কিছু। একদিন কুড়ালের হাতলটা ভেঙে গেল। জেরি বলল যে, এতিমখানার কাঠমিস্ত্রিরা ঠিক করে দেবে। আমি ওটার জন্যে টাকা দিতে চাইলে সে নিতে চাইল না।
‘আমি এটার খরচ মিটিয়ে দেব।’ সে বলল। ‘আমার অসচেতনতার কারণেই এটা ভেঙেছে।’
‘কিন্তু কেউই প্রতিবার সঠিকস্থাে কোপ-লাগাতে পারে না।’ আমি তাকে বললাম। ‘সমস্যাটা ছিল হাতলের কাঠে। যার কাছ থেকে কিনেছি, তাকে ওটা দেখাব।’ এটা বলার পর তবেই ও টাকাটা হাতে নিলো। সে তারপরও তার অপরাধবোধের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। সে ছিল মুক্তচেতনার। সাবধানে কাজ করতে পছন্দ করত। এবং যদি সে ব্যর্থ হত, কোন অজুহাত না দেখিয়ে তার দায়দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিত। সে প্রায়ই আমার জন্য কিছু অদরকারি কাজ করত, খুব মূল্যবান কিছু কাজ, যা কেবল মহৎ মনের মানুষরাই করে থাকে। সে যে কাজগুলো করত, তা প্রশিক্ষণ দিয়ে শেখানোর নয়। আগুন ধরানোর স্থানের পাশে একটা তাবুর মতো জায়গা ছিল। সেটা আমি আগে লক্ষ করিনি। ও দেখে তার মধ্যে কিছু খড়ি ও মাঝারি সাইজের জ্বালানি কাঠ রেখে দিয়েছিল, যাতে করে হঠাৎ বৃষ্টি এলে আমি শুকনো জ্বালানি পেতে পারি। কেবিনে চলার পথে একটা টুকরো ইট বেরিয়ে পড়েছিল, সে সেটি সুন্দর করে সেঁটে দিয়েছিল। যদিও সে নিজে ঐ রাস্তা ব্যবহার না করে শর্টকাট পথ ধরে চলাচল করত। আমি লক্ষ করে দেখেছিলাম, এসব কারণে আমি যখন ওকে প্রতিদানস্বরূপ চকলেট কিংবা আপেল জাতীয় কিছু দিতে যেতাম, ও চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকত। যেন অভিব্যক্তি প্রকাশে ‘ধন্যবাদ’ শব্দটির কোন ব্যবহার তার জানা ছিল না, কেননা তার ভদ্রতা ছিল সহজাত। সে শুধু উপহার সামগ্রী আর আমার দিকে তাকাত, এবং চোখের পর্দাটা সরে যেত, যে কারণে আমি তার গভীরে প্রবেশ করে তার কৃতজ্ঞতাবোধটুকু, তার চরিত্রের শক্ত খোলসের ভেতর নরম আঁশটা, দেখে আসতে পারতাম।
সে যেনতেন কারণ দেখিয়ে আমার কাছে আসত এবং বসত। আমি একবার তাকে বললাম, আমাদের দেখা করার উপযুক্ত সময় হল দুপুরের খাওয়ার পর, যখন আমার আর লিখতে ইচ্ছে করে না। এরপর সে আমার লেখা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করত। একদিন প্রায় রাত পর্যন্ত লিখেছিলাম। কেবিনের বাইরে গেলাম, ওর কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। আমি ওকে চাঁদের আলোয় পাহাড় বেয়ে এতিমখানার দিকে চলে যেতে দেখলাম। যখন আমি আামার বসার স্থানে এসে বসতাম। সে আমার পোশা কুকুরটির সঙ্গে খেলত। কুকুর এবং বালকের মাঝে অদ্ভুত একটা সম্পর্ক আছে। খুব সম্ভবত তারা একই ধরনের সরল মনের অধিকারী, একই ধরনের প্রাঙ্গতা। এটা বলে বোঝান মুশকিল, তবে এটা আছে। সপ্তাহে বন্ধের দিনে যখন আমি ঘুরতে বেরুতাম, তখন কুকুরটিকে জেরির কাছে রেখে যেতাম। আমি তার হাতে কুকুরের বাঁশি ও আর কেবিনের চাবিটা তুলে দিতাম। এবং পর্যাপ্ত খাবার রেখে যেতাম। সে দিনে দু-তিনবার এসে কুকুরটি বাইরে বের করে খাওয়াত এবং ব্যায়াম করাত। আমি রবিবার রাতে ফিরে আসতাম। জেরি রবিবার বিকেলে শেষবারের মতোন কুকুরটিকে বের করে খাইয়ে আসত এবং আমাদের গোপন সংকেত মতো চাবিটা রেখে আসত। আমার ফিরতে দেরি হত। পাহাড়ি রাস্তা কুয়াশায় ঢেকে যেত, সরু রাস্তাগুলো তখন এত ছলনাময়ী মনে হত যে, আমার আর গাড়ি চালিয়ে আসার সাহস হত না। পরদিন সকাল পর্যন্ত কুয়াশা থাকতো। আমার বাসায় ফিরতে সোমবার দুপুর গড়িয়ে যেত। ঐদিন সকালেও কুকুরটিকে খাইয়ে রাখা হত। বিকেলে আগেভাগে জেরি আসত। ওকে খুব উদ্বিগ্ন দেখাত।
‘এতিমখানার গার্ড বলল যে, এমন কুয়াশায় কারও পক্ষেই গাড়ি চালিয়ে আসা সম্ভব না।’ সে বলল। আমি গতরাতে ঠিক শোবার আগে একবার এসেছিলাম। দেখলাম, আপনি তখনও আসেননি। তাই আমি আমার সকালের নাস্তা থেকে কিছুটা এনে ওকে খাইয়েছি। আমি ওর কোনো ক্ষতি হতে দিতাম না।’
‘সে বিষয়ে নিশ্চিত ছিলাম। তাই চিন্তা করিনি।’
‘যখন আমি কুয়াশার কথা জানলাম, ভাবলাম আপনিও শুনে থাকবেন।’
তাকে কাজের জন্য এতিমখানায় দরকার ছিল। তাই তৎক্ষণাৎ ফিরে যেতে হল। আমি তাকে এক ডলার দিলাম। সে ওটির দিকে তাকিয়ে চলে গেল। তবে সেই রাতে অন্ধকারে সে আবার এল।
‘ভিতরে আসো জেরি।’ আমি বললাম। ‘যদি তোমার এত রাত পর্যন্ত বাইরে থাকতে সমস্যা না হয়।’
‘আমি হয়ত কোনো গল্প বলতাম’, সে বলল। ‘আমি তাদের বললাম, মনে হয় আপনি আমার সঙ্গে দেখা করতে চাচ্ছেন।’
‘হুম চাচ্ছিলাম।’ আমি তাকে আস্বস্ত করলাম। এবং দেখলাম সে নিশ্চিন্ত হল। ‘আমি জানতে চাই, তুমি কিভাবে কুকুরটাকে সামলালে।’
সে আমার সাথে আগুনের পাশে বসত, আর কোনো আলো থাকত না। এরপর সে ঐ দুদিনের গল্প শোনাত। কুকুরটি তার পাশে শুয়ে আরাম বোধ করত। আমার মনে হত, জেরির কুকুরটির সঙ্গে থাকা, যত্ম নেওয়া, এসব কারণে আমি আর জেরিও কাছাকাছি চলে এসেছিলাম। যে কারণে সে মনে করত, কুকুরটির মতো সে আমাকেও আপন করে ফেলেছিল।
‘ও সবসময় আমার সাথে থাকতো।’ সে বলল। ‘শুধুমাত্র সে যখন লরেলের ভেতর দৌড়িয়ে যেত, সেই সময় ছাড়া। ও লরেল পছন্দ করে। আমি ওকে পাহাড়ের ওপরে নিয়ে যেতাম। এরপর আমরা দুজনেই দৌড়াতাম। একজায়গায় উঁচু ঘাস আছে। আমি ঘামের ওপর শুয়ে নিজেকে আড়ালে রাখতাম। টের পেতাম ও আমাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। সে আমার হদিশ পেলে ডাকাডাকি শুরু করত। আর যখন খুঁজে পেত তখন তো পাগলের মতো করত। আমার চারপাশে খালি ঘুরতে থাকত।’
আমরা আগুনের শিখার দিকে তাকিয়ে থাকতাম।
‘ওটা আপেল গাছের গোড়া।’ সে বলল। ‘এটা সবচেয়ে ভাল জ্বলে।’
আমরা খুব কাছাকাছি বসে থাকতাম।
সে হঠাৎ করে এমন কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাইতো যে বিষয়ে আগে আমাদের ভেতরে কখনও কথা হয়নি। কিংবা আমি কখনও জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করিনি।
‘আপনি কিছুটা আমার মায়ের মতো দেখতে।’ সে বলে। ‘বিশেষ করে অন্ধকারে আগুনের পাশে।’
‘কিন্তু জেরি তুমি তখন মাত্র চার বছরের ছিলে যখন তুমি এখানে আস। তুমি এতটা বছর মনে রেখেছে, সে দেখতে কেমন ছিল?’
‘আমার মা ম্যানভিলে বাস করে।’ সে বলল।
তার মা আছে শুনে হঠাৎ করে আমি একটা বাড়ি খেলাম। জানি না এই খবর শুনে আমি এত আহত হলাম কেন। এরপর আমি বুঝতে পারলাম, আসলে আমি ভীষণভাবে মনে করতাম যে, কোনো মায়ের পক্ষে তার সন্তানকে এভাবে রেখে যাওয়া সম্ভব না। এমন একজন ছেলে? এতিমখানা খারাপ জায়গা না। কর্মকর্তারা হৃদয়বান। ভাল লোক, খাবার পর্যাপ্ত, ছেলেরা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, কোনো শক্ত কাজ করতে হয় না। নিশ্চিন্ত হওয়ার মতোই হয়ত, যে ছেলেরা কোনো অভাববোধ করবে না। আমার মনে অনেক প্রশ্ন জড় হল, কিন্তু ও কষ্ট পাবে বলে আর সেদিকে গেলাম না।
‘তুমি কি পরে তাকে দেখেছ-জেরি?’
‘আমি তাকে প্রতি গ্রীষ্মে দেখি। সে আমাকে ডেকে পাঠায়।’
আমি চিৎকার দিয়ে বলতে চাইলাম- ‘তুমি কেন তার সাথে থাকছ না? কি করে সে তোমাকে আবার এখানে আসতে দেয়?’
সে বলল, ‘সে এখানে ম্যানভিল থেকে আসে। যখনই সে সুযোগ পায়। তার এখন কোনো কাজ নেই।’
তার মুখমণ্ডল আগুনের আভায় দেখা যাচ্ছিল।
‘সে আমাকে একটা কুকুরছানা দিতে চেয়েছে। কিন্তু এখানে কুকুর রাখার নিয়ম নেই। আপনার মনে আছে, যে পোশাকটা আামি গত রোববার পরে এসেছিলাম, ওটির কথা?’ তাকে খুব গর্বিত দেখাচ্ছিল। ‘সে আমাকে ক্রিসমাসের উপহারস্বরূপ ওটি পাঠিয়েছিল। গত ক্রিসমাসের আগের ক্রিসমাসে’- সে টেনে একটা শ্বাস নিল, স্মৃতি ঝালিয়ে নেওয়ার জন্য- ‘সে আমাকে একজোড়া স্কেটস পাঠিয়েছিল।’
‘রোলার স্কেটস?’
আমার মন ব্যস্ত ছিল ঐ মহিলার ছবি তৈরি করতে, তাকে বুঝতে। সে তার মানে পুরোপুরি একে ভুলে যায়নি। তাহলে কেন- আমি ভাবলাম, ‘আমার নিশ্চয় সবকিছু না জেনে তার ওপর দোষ চাপানো উচিত হবে না।’
‘রোলার স্কেটস। আমি অন্য ছেলেদেরও ওটা ব্যবহার করতে দিই। তারা সবসময় ধার চায়। তবে তারা ওটি বেশ যত্নে ব্যবহার করে।’
দারিদ্রতা ছাড়া আর কি কারণ থাকতে পারে-
‘আপনি আমাকে যে ডলার দিয়েছেন আমি সেটা কুকুরের যত্ন নেয়ার জন্যে আর তাকে একজোড়া হাতমোজা কিনে দেয়ার জন্যে গুছিয়ে রেখেছি।’ সে বলল।
আমি শুধু বললাম, ‘সে তো খুব ভাল কথা। তুমি কি তার হাতের আকার জানো?’
‘আমার মনে হয়, সাড়ে আট।’ সে বলল।
সে আমার হাতের দিকে তাকাল।
‘আপনি কি সাড়ে আট পরেন?’ সে জানতে চাইল।
‘না, আমি আরও ছোট পরি। ছয়।’ আমি বললাম।
‘ওহ, তাহলে তার হাত আপনার চেয়ে বড়ই হবে।’
আমার তার ওপর ঘৃণা হচ্ছিল। দারিদ্রতা নাকি অন্যকিছু, পৃথিবীতে ভাত-রুটি ছাড়াও অন্য ক্ষুদা আছে। এবং শরীরের মতোই আত্মাও খাবার না পেলে শুকিয়ে যায়। ও তার পয়সাগুলো জমিয়ে ঐ বড়বড় পাষণ্ড হাতগুলোর জন্যে মোজা কিনে নিয়ে যাবে। এবং সে ছেলেটিকে দূরে ঠেলে দিয়ে ম্যানভিলে বেশ আরামেই আছে। স্কেটস পাঠিয়ে ভাবছে, অনেক কিছু করছে!
‘সে সাদা গ্লাভস পছন্দ করে বেশি।’ ও বলল। ‘আপনার কি মনে হয়, এক ডলারে হবে?’
‘হুম, হবে হয়ত।’ বললাম আমি।
সিদ্ধান্ত নিলাম, তার সঙ্গে দেখা না করে এবং এমনটা সে কেন করেছে সেটা না জেনে আমি এখান থেকে যাচ্ছি না, এটা আমার নিজের জন্যেই। মানুষের মন বড়ই বিক্ষিপ্ত। বাতাসের মতো আজ এখানে তো কাল ওখানে। আমার কাজটি শেষ হল। আমি ওটা নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলাম না। আবার অন্য কাজে মন লাগালাম। আমার কিছু মেক্সিকান তথ্য-উপাত্ত লাগবে। ফ্লোরিডা ছাড়ার বন্দোবস্ত করছিলাম। যদি সব ঠিক থাকে তবে মেক্সিকোয় গিয়ে বাকিটা শুরু করব। তারপর আলাক্সায় ভাইয়ের ওখানে, এরপর কি করি-কোথায় যায়, একমাত্র ঈশ্বর মালুম।
ম্যানভিলে গিয়ে জেরির মায়ের সঙ্গে দেখা করার কিংবা তার বিষয়ে এতিমখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার মতো সময় আমার হাতে ছিল না। নতুন পরিকল্পনা ও কাজের চিন্তায় ছেলেটির কথাও প্রায় ভুলে যাচ্ছিলাম। তাকে নিয়ে আমার যে উদ্বিগ্নতা ছিল, সেটা কেটে গিয়েছিল। সে একা নয়, কাজেই আমার চিন্তার কোনো মানে হয় না।
সে প্রতিদিন আসত, কাঠ চেরায় করত, অনন্যা কিছু উপকার করত, এবং আলাপ করার জন্যে বসে থাকত। ঠাণ্ডা আরও বেড়ে গিয়েছিল। আমি প্রায়ই তাকে কেবিনের ভেতর বসাতাম। সে একহাত কুকুকের গায়ে রেখে আগুনের পাশে বসে থাকত। দুজনেই আমার জন্যে অপেক্ষা করত। অন্যদিন দুজনে বাইরে ছুটোছুটি করে আমার জন্যে কিছু নিয়ে ঘরে ফিরত। আমি যাওয়ার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।
আমি তাকে বললাম- ‘তুমি আমার অনেক ভাল বন্ধু ছিলে, জেরি। তোমার কথা আমার মনে থাকবে। কুকুরটিও তোমাকে খুব মিস করবে। কালই যেতে হচ্ছে।’
সে কোনো উত্তর করল না। যখন সে চলে গেল আমি লক্ষ করলাম, পাহাড়ের ওপরে নতুন চাঁদ উঠেছে। আমি তাকে পাহাড়ের গা বেয়ে নীরবে এতিমখানার দিকে চলে যেতে দেখলাম। আশা করেছিলাম পরের দিন জেরি আসবে, কিন্তু ও এল না। আমার কাপড়চোপড়, এটা-সেটা গোছগাছ, গাড়িভর্তি এসব করতেই দুপুর গড়িয়ে গেল। কেবিন বন্ধ করে গাড়িতে উঠলাম। লক্ষ করলাম, পশ্চিম আকাশ বেয়ে সূর্য নেমে যাচ্ছে। রাত নামার আগেই পাহাড় থেকে বের হয়ে যেতে পারলে ভালই হবে। এতিমখানার পাশে গাড়ি থামিয়ে বিদ্যুৎ বিল ও চাবিটা মিস ক্লার্কের হাতে বুঝিয়ে দিলাম।
‘আপনি কি জেরিকে একটু ডেকে দিবেন, ওকে বিদায় জানিয়ে যেতাম?’
‘আমি জানি না ও এখন কোথায়।’ তিনি বললেন। ‘আমার মনে হয় ওর শরীরটা ঠিক নেই। আজ দুপুরে কিছু খাইওনি। ছেলেরা তাকে পাহাড়ের ওদিকটাই যেতে দেখেছে। আজ বিকেলে বয়লারে তার আগুন দেয়ার কথা ছিল। ও তো এমন না; ভীষণ কর্তব্যসচেতন ছেলে।’
তাকে আর কখনও দেখতে পাবো না ভেবে একটু নির্ভারই হলাম। তাকে বিদায় বলতে না পারাটাই ছিল স্বস্তিদায়ক।
বললাম, ‘আমি ওর মায়ের বিষয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই-ও এখানে কেন- আমাকে এত দ্রুত চলে যেতে হবে ভাবতে পারিনি। তার সঙ্গে দেখা করার আর প্রশ্নই আসে না। আর এখানে ওর জন্যে কিছু টাকা রেখে গেলাম, ওকে ক্রিসমাসে এবং জন্মদিনে কিছু কিনে দেবেন। আমার জন্যে ওখান থেকে কিছু পাঠানোর চেয়ে এভাবেই সহজ হবে। স্কেটস হতে পারত।’
সে তার সহজ সরল চোখের পাতাজোড়া একটু কাঁপাল।
‘এখানে স্কেটসের তেমন দরকার হয় না।’ সে বলল।
মহিলার মূর্খতায় আমি বিরক্ত হলাম।
‘আমি যা বোঝাতে চেয়েছি তা হল, ওর মা যা পাঠিয়েছে তার হুবহু আমি কিছু দিতে বলছি না। আমি হয়ত স্কেটস দিতেই বললাম, যদি না জানতাম যে তার মা আগেই সেটা পাঠিয়েছে।’
সে আমার দিকে অবাক চোখে তাকাল।
‘আমি ঠিক বুঝলাম না।’ সে বলল। ‘তার তো মা নেই। স্কেটসও নেই।’