সোমবার,২৩ অক্টোবর ২০১৭
হোম / বিনোদন / ভুবনমাঝি
০৬/০৮/২০১৭

ভুবনমাঝি

-

‘ভুবনমাঝি’ এবছরের এখন পর্যন্ত মুক্তিপ্রাপ্ত একমাত্র মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা। সেই সঙ্গে বাংলাদেশি সিনেমাজগতের অন্যতম বিরল নন-লিনিয়ার স্টোরি। লাইন কনসেপ্টও দেখা যায় এই চলচ্চিত্রটিতে।

সিনেমাটির মূল গল্প ২০১৩ সালের। কুষ্টিয়ায় একজন লালন সাধুর মৃত্যুকে ঘিরেই সিনেমার আসল গল্প বাঁক নিয়েছে। সাধুর সৎকারের সময় এলাকার কথিত মুসল্লিরা জানাজা পড়তে অপারগতা জানায়। অন্যদিকে সাধুর সাংবাদিককে বলা জীবন কাহিনিতে থাকে তাঁর মুক্তিযুদ্ধে আসার কাহিনি ও সে-সময় ঘটে যাওয়া ট্র্যাজেডি। মারা যাবার আগে সাধু বলে যান তাঁর বন্ধু, পরিবার, প্রতিবেশী, রাষ্ট্র ও প্রেয়সীর কাহিনি। পরিচালক এখানে চেষ্টা করেছেন তিনটি গল্পকে এক সুতোয় বাঁধার।

চলচ্চিত্রতে ১৯৭০-৭১, ২০০৩-০৪ আর ২০১৩-এর সময়ের যোগাযোগ দেখানো হয়েছে। সিনেমাটির সূচনা হয় কেন্দ্রীয় চরিত্র- মফস্বল শহরে বাস করা সাদামাটা নহির ও বাস্তববাদী ফরিদাদের নিয়ে, সময়টি মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কাল। কুষ্টিয়া শহরে পড়তে আসা নহিরকে অবশ্য মুক্তিযুদ্ধ ভাবায় না, তার চিন্তাজুড়ে শুধু থিয়েটার আর ভালোবাসার মানুষ ফরিদা। সাধারণ ছেলের মতোই চিন্তাধারা নহিরের, যুদ্ধের রুক্ষতায় নয়, ভালোবাসার মমতায় পুরোজীবন সে পার করতে চায় ফরিদার হাত ধরে। তার হৃদয়ে উপস্থিতি লালন, নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের গড়াই নদীর কূল ধরে হেঁটে যাওয়া দৃশ্য কিংবা রেললাইনকে সাক্ষী রেখে এর দুপাশে বসে থাকা হয়তো নহিরের এই ইচ্ছারই ইঙ্গিত। নহিরের চরিত্রে ওপার বাংলার সুদর্শন পরমব্রতের অভিনয় বরাবরের মতোই দারুণ।

বাংলাদেশের যুদ্ধের চরিত্রে কলকাতার নায়ক নেয়ার কারণে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল তা অনেকাংশেই দূর হয় সিনেমাটিতে পরমব্রতকে এদেশের বাংলা শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করতে দেখে। তবে এই সিনেমায় নজর কেড়ে নেয় অপর্ণার অনবিদ্য অভিনয়। অপর্ণার ৭০ দশকের গ্রামবাংলার রমণীর অসাধারণ প্রতিকৃতি ফরিদার চরিত্রকে করে তুলেছে জীবন্ত, যোগ করেছে এক নতুন মাত্রা।

প্রধান চরিত্রদের কেমিস্ট্রির সঙ্গে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে লালনগান স্বর্গীয় করে তোলে সিনেমার কিছু মুহূর্ত। সিনেমাটিতে দেখানো হয়েছে ভালোবাসা কালের গর্ভে হারিয়ে যায় না- পরমব্রত এবং অপর্ণার ৭০ দশকের প্রেম আর ওয়াকিল এবং নওশবার ২০০৮ সালের ভালোবাসা সমান্তরালভাবে দেখিয়ে গল্পবলায় মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন পরিচালক। ‘ভুবনমাঝি’ সিনেমার পার্শ্বচরিত্রদের অভিনয়ও অতুলনীয়, অতিরিক্ত কোনো আবেগ-ভারাক্রান্ত ডায়লগ ছিল না, ছিল না ভাঁড়ামি।

পরিচালক ও চিত্রনাট্যকারের সিনেমার প্লটের ভিন্ন তিনটি সময়ের মাঝে যোগাযোগ আনার প্রচেষ্টা কিছুটা ব্যর্থ হয়েছে। কাহিনির শেষের দিকে দর্শকদের কনফিউজ করে কিছুটা খেই হারিয়ে ফেলে ‘ভুবনমাঝি’। লিনিয়ার সিনেমা হলেও কাহিনী বলার ধারাবাহিকতার অভাব ছিলো কিছুক্ষেত্রে এবং এর ফলে শক্তিশালী কাহিনি হওয়া সত্ত্বেও কারিগরিতার দিক দিয়ে পিছিয়ে যায় সিনেমাটি। সিনেমাটির কসটিউম ডিজাইনিং প্রশংসনীয়, তবে কমতি থেকে গেছে চরিত্রদের মেকআপ এর ক্ষেত্রে।

‘ভুবনমাঝি’ মুভির গল্পে ইতিহাসের সত্যতা কতটা ফুটে উঠেছে এটা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও এটা মেনে নিতে হবে যে এখানে সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টি উঠে এসেছে এক নতুন আঙ্গিকে। সরকারি অনুদানে নির্মিত সিনেমাটির অন্যতম দুটি শৈল্পিক দিক ছিল কিছু কিছু সিনেমাটিক শট এবং এর মিউজিক। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর থেকে শুরু করে সবকটি গান ছিলো অর্থপূর্ণ, প্রাসঙ্গিক ও হৃদয়ে নাড়া দেয়ার মতো। জাদুকরী ‘আমি তোমারই নাম গাই’ গানটির জন্য তাই চলচ্চিত্রটি উৎসর্গ করা হয়েছে সদ্যপ্রয়াত কালিকা প্রসাদকে। ‘ভুবনমাঝি’র গল্পে রয়েছে মানবিক সব অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। একজন সাধারন মানুষের যুদ্ধকালীন মানসিকতা, কীভাবে অনিচ্ছুক এক ছেলে হয়ে যায় যোদ্ধা।

সিনেমাটি গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, এক সাদামাটা যুুবকের বিপ্লবী হওয়া, দুটি যুগলের ভালোবাসা ও স্বাধীনতা বোধের সমন্বয়ে।

- আরিয়ান ইসলাম অর্ণব