বুধবার,২৬ Jul ২০১৭
হোম / খাবার-দাবার / ইফতার ও ঐতিহ্যের পুরান ঢাকা
০৫/২৮/২০১৭

ইফতার ও ঐতিহ্যের পুরান ঢাকা

-

ইফতার কথাটা উঠলে প্রথমেই মনে আসে পুরান ঢাকার কথা। ধর্মপ্রাণ রক্ষনশীল পুরান ঢাকার মানুষের কাছে সারাদিন রোজা রাখার পরে ইফতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দায়িত্ব। দুপুরের পর থেকেই পাড়া-মহল্লা, আনাচে-কানাচে, রাস্তার দুপাশে সর্বত্র নানা মুখরোচক বাহারি ইফতারের এক বিশাল আয়োজন ও সমারোহ দেখা যায় যা চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে। শাহী ইফতার মানেই পুরান ঢাকার মানুষের পছন্দনীয় ইফতারের নানা আইটেম। তবে মোগল আমলের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় চলে আসা এই সব রকমারী ইফতারি এখন পুরান ঢাকা ছাড়াও রাজধানীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লেও পুরান ঢাকার ইফতারের স্বাদে এখনও রয়ে গিয়েছে ঐতিহ্যগত ভিন্নতা যা অন্যত্র অনুপুস্থিত।

বাহারি ইফতারের কথায় প্রথমেই পুরান ঢাকার ব্যবসায়ের প্রাণকেন্দ্র চকবাজারের নাম আসবে। চকবাজার ঐতিহ্যবাহী শাহী মসজিদের সামনের সড়কটিতে রমজানের একমাস ঐতিহ্যবাহী নানা ইফতারের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানীরা। আর তা কিনতে দূর-দূরান্ত থেকে ভীর আর ট্র্যাফিক ঠেলে আসে অগনিত ক্রেতা - অন্তত একবারের জন্য হলেও। এত পদের ইফতার আর তার ঐতিহ্যের জৌলুস একমাত্র চকবাজারেই মিলবে।

চকবাজার তথা পুরান ঢাকার ইফতার এত পদের যে লিখে শেষ করা কঠিন। শুধু চকবাজারেই পাওয়া যায় আস্ত খাসীর রানের রোস্ট, আস্ত মুরগীর রোস্ট, আস্ত কবুতর ও কোয়েল পাখির রোস্ট, বিখ্যাত সুতি কাবাব, শাহী টুকরা, কাচ্চি বিরিয়ানী, শাহী মোরগ পোলাও, শাহী হালিম, জালি কাবাব, কাঠি কাবাব, কিমা ও টানা পরোটা, তেহারি, দইবড়া, দই ও নানা ধরনের শরবত যেমন পেস্তা বাদাম/বেল, নানা পদের রোল, চিকেন টিক্কা, বেগুনি, পিঁয়াজু, সমুচা। রয়েছে আলাউদ্দিন সুইটস এর ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি যার মধ্যে বিখ্যাত নেসেস্তার হালুয়া অন্যতম। এছাড়াও রয়েছে মাংসের বড়া, ভাজা/কাঁচা ছোলা, ঘুগনি, মাঠা, বিশাল সাইজের শাহী জিলাপী, চিকন জিলাপী, সমুচা ও সিংগারা, নানা ফল ও নানা পদের আচারসহ অসংখ্য মুখরোচক ইফতার আইটেম।

মজার ব্যপার হল, মিডিয়ার কল্যানে কিছু খাবার বিশেষ খ্যাতি পেয়েছে যা কিনা অনেক স্থানীয়রা চেখে দেখেন না বললেই চলে। যেমন 'বড় বাপের পোলা খায়' নামক খাবারটি। এই খাবারটি স্থানীয়দের কাছে মোটেই সমাদৃত নয়। আর রোজার মাস ছাড়া অন্য কোন সময় এই খাবারটি পাওয়াও যায় না। খাবারটি ৩০টির বেশি উপকরণ দিয়ে মাখানোর ফলে দ্রুত টক হয়ে যায় যা হজমে সমস্যা হতে পারে। এছাড়াও যারা দূর থেকে এসে এই খাবার নিয়ে যান তাদের জন্য সারাদিন রোজা রেখে এটি খাওয়া একেবারেই অনুচিত।

পুরান ঢাকার চকবাজার ছাড়াও ইফতার বিক্রির ধুম পরে যায় আরও কিছু স্থানে, যেমন রায়সাহেব বাজার। এখানে অনেক নামী রেস্তোরাঁ মাসব্যাপী শাহী ইফতারের আয়োজন করে থাকে। একাধারে অবস্থিত এই রেস্তোরাঁগুলো এমনিতেও সারা বছর প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত খোলা থাকে। এখানেই রয়েছে বিখ্যাত বিউটির লাচ্ছি ও ফালুদার দোকান, রয়েছে বহু পুরনো মাখনের পোলাও এবং জনপ্রিয় মানিক সুইটমিট। পুরান ঢাকার নারিন্দায় অবস্থিত বিখ্যাত ঝুনুর পোলাও রয়েছে আর আছে সৌরভের মাঠা, তানিমস সুইটস সহ অনেকগুলো সেরা মানের খাবারের প্রতিষ্ঠান যেখানে দূর-দুরান্ত থেকে খাদ্যরসিকেরা ছুটে আসেন প্রিয় ইফতারের খোঁজে। সেরা ইফতারের আয়োজনে বংশালে অবস্থিত হোটেল আল রাজ্জাক তাদের হালিমসহ আরও নানা ধরনের ইফতারের জন্য বিখ্যাত।

প্রিয় ইফতারের আরেকটি সম্ভার হল লালবাগ এলাকা যেখানে রয়েছে জনপ্রিয় রয়েল রেস্টুরান্ট। তাদের রয়েছে লাবাং, পেস্তা শরবতসহ প্রায় শত পদের শাহী ইফতারের পসরা। এছাড়াও লালবাগের কেল্লার আশেপাশে রয়েছে একাধিক রেস্তোরাঁ আর নান্না বিরিয়ানীর মত জনপ্রিয় দোকান। এছাড়াও পাওয়া যাবে বাকরখানী রুটি, ঢাকাই পনীর ইত্যাদি। পুরান ঢাকার সাত রওজায় রয়েছে বিখ্যাত আনন্দ কনফেকশনারীর প্রধান শাখা যেখানে ঢাকার সেরা সুতি কাবাবসহ মিলবে নানা মুখরোচক ইফতার আইটেম। এই রোডেই পাওয়া যায় ঢাকার অনেক জনপ্রিয় সব কাচ্চি বিরিয়ানী আর মোরগ পোলাও এর দোকানসহ মিস্টির দোকান যা অনেকেরই ইফতারে পছন্দনীয় আইটেম।

এছাড়াও দয়াগঞ্জ, লক্ষীবাজার, সদরঘাট, কলতাবাজার, পোস্তা, ইসলামপুর, তাঁতিবাজার, কসাইটুলী, সুত্রাপুর, ধুপখোলা মাঠ বাজার, টিকাটুলি, আরমানীটোলা, নর্থ-সাউথ রোড, নবাবপুর, টিপুসুলতান রোড, সুরিটোলা, চানখাঁরপুল, ওয়ারী, সিদ্দিকবাজার, বাবুবাজার, সুরিটোলা, চানখাঁরপুল, আজিমপুর, ঠাটারীবাজারে রয়েছে নানা বাহারি ইফতারের আয়োজন।

পুরান ঢাকার মানুষের সর্বাধিক প্রিয় আইটেমের একটি হল ইফতারের শেষে মুড়ির ভর্তা আর হালিম। মুড়ি ও সরিষার তেলে মাখানো নানা উপকরণের মিশ্রনে বানানো মুখরোচক মুড়ি ভর্তা বোধকরি আদি পুরান ঢাকার মানুষই করে থাকেন। পুরান ঢাকার মানুষের ইফতারে প্রিয় পানীয়ের মধ্যে মাঠা অন্যতম। এই সময় অনেক মোড়ে দোকান পেতে মাঠা আর ছানা বিক্রির ধুম পরে যায় বিকেল থেকেই।

একসময় পুরান ঢাকার অনেক স্থানে সেহেরী আর ইফতারের সময় সাইরেন বাজত আজানের পাশাপাশি। এছাড়াও ইফতারের আগে রাস্তার ধারে বরফ বিক্রি হত যখন ঘরে ঘরে ফ্রিজ ছিলনা। একটা ধারালো লোহা দিয়ে খন্ড করা হত আর বিক্রেতা চিৎকার করে হাক দিত "পাহাইড়া বরফ!" যেন হিমালয়ের পাহাড়ের চূড়া থেকে কেটে আনা বরফ খন্ড। এলাকাবাসীরা সেই বরফ দিয়ে বানাতেন নানান শরবত ও পানীয়। ঘরে ঘরে ফ্রিজ সহজলভ্য হওয়াতে এই রীতিগুলো কালক্রমে হারিয়ে গেছে।

পবিত্র রমজানে মাগরিবের ঠিক আগ মুহূর্তে থমথমে হয়ে আসে কোলাহলের নগরী, এইসময় ইফতার সামনে নিয়ে আজানের অপেক্ষায় রত মুহূর্তটিই অনেকের কাছে পবিত্র রমজানের প্রতিক। প্রতিবছরের মত রমজানের অপার আনন্দে এবারও ইফতার বাজার ও বাহারি ইফতার আয়োজনে মুখরিত হয়ে উঠবে পুরান ঢাকার শত বছরের অলিগলি ও রাস্তাঘাট।

- মোহাম্মদ ওয়াসিম
ক্রিয়েটর ফেইসবুক পেইজঃ Puran Dhakar Khabar, এডমিনঃ আপনার রান্নাঘর