বুধবার,২৬ Jul ২০১৭
হোম / বিবিধ / ‘সাহসী মেয়ে’ শারমিন
০৪/৩০/২০১৭

‘সাহসী মেয়ে’ শারমিন

-

প্রতিটি মানুষের জীবনে কিছু স্বপ্ন থাকে। সমাজের জন্য ক্ষতিকারক না এমন স্বপ্ন বাস্তবায়ন প্রতিটি মানুষের জন্মগত অধিকার। কিন্তু আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে জন্ম ও অধিকার এমন শব্দগুলোকে লিঙ্গভেদে ভিন্ন ভিন্ন কাতারে ফেলা হয়। মাত্র ১৪ বছরের কিশোরী শারমিন আক্তারের স্বপ্ন তাই বাল্যবিবাহের অভিশাপে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ভেতর দিয়ে সংসার-দাসে পরিণত করার চক্রান্ত আঁটা হয়েছিল। কিন্তু অদম্য সাহসী, প্রতিবাদী এই কিশোরী তা হতে দেয়নি। নিজের বাল্যবিবাহ ঠেকিয়ে এগিয়ে গেছে স্বপ্নপূরণের পথে। এজন্য তাকে সমাজ তো বটেই নিজের মায়ের বিরুদ্ধে ‘আইনি সাপোর্ট’ নিতে হয়েছে। এই সাহসী পথচলার কারণেই ঝালকাঠির মেয়ে শারমিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘সাহসী নারী’র সম্মাননা পেয়েছে। লক্ষ লক্ষ নির্যাতিত নারীর প্রতিনিধি হয়ে জোরালোভাবে জানিয়ে দিয়েছে, সাহসী-আত্মপ্রত্যয়ী নারীকে কোনো কালই দমিয়ে রাখতে পারেনি, আগামীতেও পারবে না।

শারমিনের ভাষ্যে, ‘আমি বিয়ের ব্যাপারে শুরুতেই মাকে না করে দিই। কিন্তু মা কিছুতেই এটা মানেননি বরং চাপ প্রয়োগ করেছেন। শারীরিক নির্যাতন করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে আমি কী করব, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। বাবা বিদেশে থাকেন। কার কাছে যাব, কী করব, সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। একবার চিন্তা করি আত্মহনন করে এই নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্ত হব। আবার ভাবি, এটাও হবে হেরে যাওয়া।’

‘সাহসী নারী’ শারমিন
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের ডিন এচেসন মিলনায়তনে ফার্স্টকেডি মেলানিয়া ট্রাম্প শারমিনের হাতে ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ অ্যাওয়ার্ড’ পদক তুলে দেন। বিভিন্ন দেশের আরও ১২জনের সঙ্গে এই বিশেষ সম্মানে সিক্ত শারমিন সম্পর্কে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে- মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিবাহ দেওয়ার ব্যাপারে তার পরিবারের চেষ্টার বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে রুখে দাঁড়ান শারমিন আক্তার। অব্যাহত রাখেন লেখাপড়া। যা শারমিনের মতো একই রকম চাপের সম্মুখীন দক্ষিণ এশিয়ার কিশোরী মেয়েদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

যারা ব্যক্তিগত ঝুঁকি সত্ত্বেও শান্তি, ন্যায় বিচার, মানবাধিকার, নারী-পুরুষের সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়নে অবদান রেখেছেন, তাদের অসাধারণ সাহসিকতা ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি দিতে প্রতিবছর এই পুরস্কার দিয়ে থাকে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর।

একজন শারমিন ও তার সংগ্রাম
‘সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে শিউরে উঠি। বয়স কম হলেও এটুকু বুঝতে পারছিলাম, আমার ওপর যা হচ্ছে তা পুরোপুরি অন্যায়। আমার মায়ের ইচ্ছায়, পৃষ্ঠপোষকতায় সেই অন্যায় সিদ্ধান্ত আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। একে তো আমার বিয়ের বয়স হয়নি। হঠাৎ মা একদিন বললেন, ‘এই ছেলে তোর স্বামী, এখন থেকে পড়াশোনা বন্ধ করে ওর সঙ্গে ঘর-সংসার করতে হবে তোকে!’ নিছক কৌতুক করে তিনি এটা বলেননি। সত্যি সত্যিই বলেছিলেন। সে মতো কাজও করলেন। আমাকে ওই ছেলের সঙ্গে একটি ঘরে থাকার নির্দেশ দিলেন। এমনকি ইচ্ছার বিরুদ্ধে এক ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে আটকেও রাখলেন। কিন্তু আমার তো বিয়ে হয়নি। বিয়ের বয়সও হয়নি। বিয়ের আয়োজন হয়নি, কবুল বলিনি, কোনো কাগজে সইও করিনি। কীভাবে এটা হলো। এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে খুব অসহায় লাগছিল।” নিজের বীভৎস অভিজ্ঞতা সম্পর্কে এভাবেই গণমাধ্যমে বলছিলেন শারমিন। সময়টা ছিল ২০১৫ সালের জুলাই মাস। সেসময় ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণির ছাত্রী শারমিনের সঙ্গে প্রতিবেশী স্বপন খলিফার বিয়ে ঠিক করেন তার মা। সদ্যকৈশোরে পা রাখা মেয়েটির মতের তো কোনো গুরুত্বই দেয়া হয়নি, উল্টো জোর করে বিয়ের আগেই ঐ ছেলের সঙ্গে একঘরে থাকতে বাধ্য করা হয় শারমিনকে। চিকিৎসা করানোর কথা বলে তাকে খুলনায় মামার বাড়িতে আনা হয় যেখানে আগে থেকেই ছিল মানুষরূপী নরপশু স্বপন। তাতে রাজি না হওয়ায় রীতিমতো মারধর করে শারমিনকে সে ঘরে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। পরদিন সকালে ঐ বাসা থেকে কৌশলে পালিয়ে যায় শারমিন। তবে হায়েনার দল তারপরও তার পিছু ছাড়েনি। পিরোজপুর থেকে স্বপনের লোকজন শারমিনকে ধরে ফেলে এবং তাকে পুনরায় আটকে রাখা হয়।

তবে অদম্য সাহসী এই কিশোরী হার মানেনি, বরং দৃঢ়ভাবে রুখে দাঁড়িয়েছে। আশপাশের হায়েনাদের রক্তচক্ষু এড়িয়ে ঠিকই নরক থেকে নিজেকে মুক্ত করেছে। শারমিনের ভাষ্য মতে, “সিদ্ধান্ত নিই যে আমাকে যে করেই হোক রুখে দাঁড়াতে হবে। সুযোগ বুঝে একদিন তাই বাড়ি থেকে পালিয়ে এক সহপাঠীকে সব জানাই। এরপর সরাসরি থানায় গিয়ে নিজের মা এবং ঐ ছেলের নামে মামলা করি।”

২০১৫ সালের ১৬ আগস্ট বন্দিদশা থেকে আবারো পালিয়ে সহপাঠী নাদিয়ার সহযোগিতায় রাজাপুর থানায় হাজির হয় শারমিন। মা ও কথিত স্বামীর বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করে। পরে পুলিশ শারমিনের মা গোলেনূর বেগম ও কথিত স্বামী স্বপন খলিফাকে গ্রেপ্তার করে। আর তাকে ঝালকাঠির জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১–এর বিচারক মো. শফিকুল করিম তার দাদি দেলোয়ারা বেগমের জিম্মায় দেন। এরপর থেকে সে দাদির কাছে থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। শারমিনের এই সাহসিকতার জন্য স্বর্ণকিশোরী ফাউন্ডেশন ২০১৫ সালে তাকে স্বর্ণকিশোরী পুরস্কার দেয়।

দাদি দেলোয়ারা বেগমের ভাষ্যে, ‘ওরে নিয়া খুব চিন্তা আমার। প্রতিদিন স্কুলে নিয়া যাই, আবার সঙ্গে নিয়া আসি। বাইরে কোথাও গেলে সঙ্গে যাই। ওর জীবনটা ধ্বংসের মুখে ফেলে দিয়েছিল ওর মা। খুব সাহস করে একাই এর প্রতিবাদ করেছে। শত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও নিজের সিদ্ধান্ত পাল্টায়নি। এখন সবাই ওকে নিয়ে গর্ব করে। আমরাও গর্বিত।’

কিশোরী শারমিনকে নিয়ে গর্ববোধ করছে গোটা দেশ। তার কাছ থেকে অনুপ্রেরণা খুঁজছে তার মতো হাজার হাজার মেয়ে। শারমিন এখন নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের ভেতর দিয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠার পথ খুঁজে নিতে চান। তিনি তার সেই দৃঢ়চেতা মনোভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই। আইনজীবী হওয়ার ইচ্ছা আছে। আর বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা এবং সচেতনতা বাড়ানোর জন্য কাজ করতে চাই।’ অদম্য সাহসী এই শারমনিদের স্বপ্নগুলো বেঁচে থাকুক, ভালো থাকুক বাংলাদেশ। [সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো]

- শাহরিয়ার মাহী