শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / কবিতা
০৪/১৮/২০১৭

কবিতা

-

অশ্রু, তোমার জন্যে
আবুল কাসেম

অশ্রু, তোমার-আমার অন্তরের গহিন গাঙে
হাজার কথার প্রবহমানতা কেমন নীরবে ব’য়ে চলে!
অশ্রু, তোমার জন্যে আমার কথার নদীতে বান ডাকে-
অশ্রু, তোমার জন্যে আমার ভালোবাসার গহিন গাঙে
জোছনার ঝিলিমিলি লাগে।
অশ্রু, তোমার জন্যে আমার ভালোবাসার শব্দগুলো
চোখের সামনে কেমন সার হয়ে দাঁড়ায়।

অশ্রু তুমি আমার ভালোবাসার আকাশের তারা।
অশ্রু তুমি আমার জোছনা রাতের মত্ততার সাথী।
অশ্রু তুমি আমার অন্তরের অতল অবগাহন নদী।
অশ্রু তুমি আমার স্বর্গের অপ্সরী প্রেমের দেবী।

অশ্রু শুধু তোমার-আমার অন্তরে আমাদের
নিষ্কলুষ প্রেমটা বেঁচে থাক-
অশ্রু তোমার-আমার সুখ-স্মৃতিগুলো আমাদের
অন্তরের অতুল সম্পদ।
অশ্রু সেই কবে তোমার-আমার কথা হলো-
সেদিন মদালসা ফাগুনের রাত ছিল জোছনাময়।
সেদিন বাতায়ন পাশে মিষ্টি হাওয়ারা কেমন
খেলা করছিল!

অশ্রুসিক্ত তুমি সেদিন মনের আকুতি মিশিয়ে
আমায় বলেছিলে-
‘অরু, তোমার প্রেমের শব্দগুলিই আমার শরীর,
তোমার শাশ্বত কবিতা আমি,
আমাদের প্রেমকে বাঁচিয়ে রেখ প্রিয়।’

আর তাই-
‘অশ্রু, তোমার জন্যে আমার প্রেমের শব্দগুলি
তোমাকে উপহার দিলাম,
এই প্রেমের শব্দগুলিই তোমার শরীর,
তুমি শাশ্বত কবিতা আমার!
তুমি বেঁচে থাক অনন্তকাল আমার মাঝে
বেঁচে থাক প্রিয়।’


নীল নীল কষ্ট
নাসরীন নঈম

কতগুলো ‘অ’-এর প্রচণ্ড প্রতাপে
সময় আমার সূর্য দেখতে পাচ্ছে না
বয়সি হৃদয় কেবল কষ্টের পাথরবাটিতে
ডুবে আছে।

অন্যায়
অসত্য
অত্যাচার
অবহেলা
বিশেষভাবে চারটি ‘অ’-এর অবিরাম
চাবুকে ঝলসে যাচ্ছে নিত্যদিনের জীবন
এবার আমাকে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে
এই চারটি মদ্যপকে হত্যা করে আমি জেলে যাব।

তারপর-
শ্রদ্ধা
স্নেহ
ভালোবাসা
সকলে মিলেই
আমার জামিন দেবে।


তোমাকেই বলছি
খোদেজা মাহবুব আরা

এখন দহন বেলা
তুমি কি জানো?
ঝরাপাতার ক্রন্দন
আর শূন্যতায় ডুবে থাকা
দুঃস্বপ্নের দীর্ঘশ্বাসের খবর?
জীবন এখন প্রয়োজনহীন
টুকরো সময়ের সমাবেশ।
আবর্জনার স্তূপে পড়ে আছে
সুখ সন্ধানী পাখির ডানা।
কোন বসন্ত পাখি আর ডাকে না।
প্রত্যাশার ছেঁড়া পালে নেই
শীতল বাতাসের স্পর্শ।
একদিন যে জীবন ছিল কাব্যময়
যেখানে জমা ছিল
মুঠো মুঠো স্বপ্নের বীজতলা,
এখন জীবন ঠুকরো পাওয়া যায়
শুধু দুঃখের প্লাবন।

পূর্ণিমা
মিজানুর রহমান বেলাল

জুয়িমার রঙিন সূতোর নকশিকাঁথায়-জমে আছে দীর্ঘশ্বাসের সূঁচ

হাতের তালুতে লেগে আছে হারানো সময় ব্লাউজের বোতামখোলা রাত
নারকেল পাতার পাটিতে জমে আছে-খোলস খোলা লাজ

বুকের সবুজ প্রান্তরে-ঘুড়ি উড়ার বিকেলে ভরেছিল বীজতলা
সুখের কোকিল সুরে সুরে ভরে দিয়েছিল বৈঠকখানা...

আহা! সেই দিন-চোখের বাগানে ঝরে কাচের কুয়াশা
সিঁথির সিঁদুর শীতের ঝড়ে উড়ে গিয়ে হয়েছিল সোনালি কফিন
সেই থেকে জুমিয়ার মুখে হাসির প্রজাপতি একদম মলিন।

আর আমার চোখের তারায় জুমিয়ার নকশিকাঁথা
তা দেখে-জোছনারও জাগে বাসনা; নামায় পূর্ণিমা...


কেন দূরে চলে যায়
বোরহান উদ্দিন আহমদ

প্রিয়জন কত কাছে চলে আসে
আবার কত দূরে চলে যায়
জানি না কেন চলে যায়।
হৃদয়ে ভালোবাসা রয়ে যায়
হৃদয়ের রক্তক্ষরণ রয়ে যায়।
কাছে এসেছিল
মনে মনে হাজার পঙ্ক্তি লিখেছি তার জন্য সে আনন্দে।
দূরে চলে গেছে
মনে মনে লক্ষ পঙ্ক্তি লিখি তার জন্য সে বেদনায়।
হৃদয়ের নদী তার তরে একদিন দূকুল ছাপায়
আবার শুকায়।
সে এসেছিল আঁধার ঘরে পূর্ণিমা এসেছিল তুমুল
সে এসেছিল মরানদী থৈ থৈ যৌবনবতী হয়েছিল
আজ সে নদী মরুপথে হারায়।
প্রিয়জন কেন দূরে চলে যায়
সে কেন দূরে চলে যায়
বেদনা রয়ে যায়
হৃদয়ের এই নিরালায়।


একুশের দুপুর
জান্নাতুল পান্না

এক পলাশ ফোটা রুদ্র দুপুরে আঁতকে উঠলাম।
মনের কোণে ভাই হারানোর যাতনা পাথর চাপা দিলো।
অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করছে।
গলাটা ভরাট লাগছে। কথা আটকে আসছে।
চোখের কোণে ভাসছে একুশের সেই রক্তেরাঙা দিনগুলোর কথা।
আমার মায়ের কথা। মায়ের ভাষার কথা।
মুহূর্তেই পাল্টে গেল আমার অবয়ব।
চিৎকার করতে চাইলেও পারছি না।
বলতে পারছি না, ‘এই ধরিত্রীর মনুষ্যজনেরা, একবার বাংলায় এসো।
দেখে যাও- বাঙালিরা বীরের জাতি।’
তারা মায়ের জন্যে মায়ের ভাষার জন্যে জীবন দিয়েছে।
মৃত্যুর কাছে পরাজিত হয়েছে। তবু শত্রুর কাছে নয়।
আমরা ভাষার জন্যে লড়াই করেছি। প্রাণ দিয়েছি।
ভাষাকে রক্ষা করেছি। সম্মানিত করেছি গোটা জাতিকে।
তাই তো- একুশ এলেই প্রাণের মেলায় একাকার হই।
একুশ এলেই খালি পায়ে আস্তে ধীরে শহিদ মিনারে এগিয়ে যাই।
হৃদয় ভারি করে বলতে থাকি-
‘ আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারির আমি কি ভুলতে পারি’।
২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭।

উদ্ভাসিত আলোর বিভায়
নাসরিন সুলতানা

কিছু আগেই ছিলে তুমি আশেপাশে,
সকালে সূর্য আর তোমার দিকে চেয়ে মনে হলো,
কে বেশি ঐশ্বর্যময়, তুমি না সূর্য?
সূর্য অত দূর থেকে যেমন পৃথিবীকে,
তেমনি তুমিও আমায় শক্তি দাও, তাতিয়ে তোল।
এমনকি সূর্য যখন থাকে না, তখনো।
কি শান্ত, গভীর তোমার মুখচ্ছবি!
অথচ অলৌকিক বিভায় উদ্ভাসিত- তুমি
আমায় আলোকিত কর।

কাচ চশমার জলছাপ
সুমী সিকান্দার

১.
পুরোনো সেই সুর ধরে ফেরার পথ খুঁজে পাচ্ছি না আর। লাল ইট দালানটার পাশেই জানালাহীন মহড়াঘর, তাতে কারো খেই ছিলো না। ঘরপালানো বিকেলের ডোবার সঙ্গে পায়রা ঘাড় বাঁকিয়ে নাচ করতো। মাঝে মাঝে কাছে এসে ঠোঁটে ঠোঁট ঘষে দিতো দুদ্দাড় আমাদের দেখাদেখি। তখন কী যেন ফুলটা ফুটতো ঘ্রাণ মনে আছে। যমঢোলা পাঞ্জাবি পকেটে তাড়াহুড়োয় রেখেছিলাম স্বরবিতানের ৫০ নম্বর ছেঁড়াপাতা। তাতে তান লেখা ছিলো। ১৬ মাত্রার। আর ছিলো বুকের ওপর ঝুঁকে থাকা লকেটের বর্ণনা। (শুধু লকেটের নয়) ছিলো লালসুতোয় জড়ানো শান্ত মন্দিরার টংশব্দ, পাতার শিস। ছিলো চশমাটাও। তবে কালো ছিলো না কখনই। তোমার মন কিংবা চশমা কোনটাই কালো ছিলো না ভাঙা অব্দি।

২.
অগুনতি গাছের ছায়াপড়া সবুজ জলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তোমার জল চোখের কালোতিল মনে এলো। মনে এলো চশমা খুলে টেবিলে রাখা। মাত্রই টের পেলাম। বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার আগে যেমন গাছেরা টের পায়, তেমনি। গায়ে বৃষ্টির ফোঁটা ঝরার আগে গাছেরা যেমন টের পায়, মেঘ করে আসার আগে রোদের মনে যেমন জানান দেয়, তেমনি করে। হলদে হাত আলতো ধরে ছুটে চলা পথটার গায়ের ধূলো ফেলে একাকার উধাও পানে, যেন চেনা কেউ চিনতে না পারে অচেনারাও। সেই জানালাহীন মহড়া ঘরের পাশগেঁষে বেগুনী ফুলের উপচানো গর্বে ভাসা কচুরিপানার মত আমারও গর্ব হয়। আমি দিশাহারা টের পাই সকল দামামায় সে আসছে। তোমার চোখ টেবিলে রাখা অলস চারদিকে আর আমার, তোমার দিকে...