শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭
হোম / ভ্রমণ / রোজ গার্ডেন: দৃষ্টিনন্দন এক স্থাপত্যশৈলী
০৪/১৮/২০১৭

রোজ গার্ডেন: দৃষ্টিনন্দন এক স্থাপত্যশৈলী

-

ঐতিহাসিক পুরান ঢাকার নানা স্থাপত্যের মাঝে "রোজ গার্ডেন" যেন অনন্য। নির্মাণশৈলীর অভিনবত্বে এই ভবনটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যকলার এক অনুপম নিদর্শন। বাড়িটির পরিচিতি এতটাই যে আপনি ঢাকার যে-কোনো স্থানেই অবস্থান করেন না কেন টিকাটুলির হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি বললেই চালক যথাস্থানে আপনাকে পৌঁছে দেবে - যেখানে বাড়ির ফটকে রোজ গার্ডেন নামটি শোভা পাচ্ছে। সুবৃহৎ ভবনটির নান্দনিক শোভা ও কারুকাজ ঢাকার বৃটিশ শাসনামলে নির্মিত যে-কোনো অট্টালিকার চাইতে সৌন্দর্যমন্ডিত। দর্শনীয় বিশাল এই বাগানবাড়ির চারপাশে ঘিরে রয়েছে বাগান তথা সবুজের সমারোহ যার সৌন্দর্য অট্টালিকার সবদিক থেকে দৃশ্যমান।

প্রাসাদোপম এই ভবনটির প্রত্নতাত্বিক মূল্য অসীম আর রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পটভূমি সবদিক থেকেই রয়েছে অসাধারণ ইতিহাস, তাছাড়া রোজ গার্ডেন নির্মাণের পিছনে বঞ্চনা আর অপমানের ইতিহাসও প্রচলিত আছে। হৃষিকেশ দাস নামে এক ধনাঢ্য হিন্দু জমিদার ছিলেন এই প্রাসাদটির মূল মালিক। জানা যায়, উনিশ শতকের শেষের দিকে নির্মিত বাগানবাড়ি বর্তমানে যা ‘বলধা গার্ডেন’ নামে পরিচিত - সেখানে এক জলসায় অংশগ্রহনের জন্য উপস্থিত হন হৃষিকেশ দাস। কিন্তু বলধা গার্ডেনের মালিক হৃষিকেশ দাস নিম্নবর্ণের সনাতন হিন্দুধর্ম অনুসারী হওয়ায় তাকে অপমান করে তার সাথে সাক্ষাৎ করতেও অস্বীকার করেন। অপ্রত্যাশিত সেই অপমানের প্রতিশোধ নিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হৃষিকেশ দাস আরও দৃষ্টিনন্দন একটি বাগানবাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। এর ফলশ্রুতিতে তিনি ক্রয় করেন ২২ বিঘার (সাত একর) জমি যা বলধা গার্ডেনের খ্যাতি আর ঐশ্বর্যকে ম্লান করে দিতে পারে।

চাহিদা ও মনমতোভাবে তৈরি করার জন্যে রোজ গার্ডেনের মূল নকশাটি কমপক্ষে তিনবার পরিবর্তন করা হয়। পুরো বাড়িজুড়ে করা হয় অসাধারণ সুক্ষ কারুকাজ আর নকশা। বাড়িটির সম্মুখে রয়েছে চারটি সুউচ্চ কলাম, প্রতিটি জানালার উপরে অর্ধবৃত্তাকার খিলান, পেঁচানো সিঁড়ি, বারান্দা সবকিছুই নিঁপুণ হাতের ছোঁয়ায় নির্মিত। বিশাল সাদা অট্টালিকাটির মূল আকর্ষণ হচ্ছে ডান্স হলরুম যেটিতে আছে ১৬টি দরজা, যার দশটি ব্রাজিলিয়ান সবুজ রঙের কাঁচ আর বাকি দরজাগুলো সাদা কাচে নির্মিত। ঘরের সিলিংগুলো হাতে আঁকা আর কাচের মাধ্যমে শোভিত করা। এছাড়াও এর অভ্যন্তর জুড়ে রয়েছে নানা দৃষ্টিনন্দন ডিজাইন, যা ভবনের আভিজাত্য আর সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে। বাড়িটির সৌন্দর্য আরো বৃদ্ধি করতে এতে দুটি পুকুর খনন করা হয়, যার একটি বাড়িটির সামনে আর অপরটি পিছনে।

রয়েছে নানাজাতের, রঙের গোলাপ; এর মধ্যে রয়েছে কিছু বিরল প্রজাতির গোলাপ ফুলের গাছ। বেশির ভাগই দেশের বাইরে থেকে সংগ্রহ করা। অপরূপ এই গোলাপ গাছের সংগ্রহের কারনেই বাড়িটির নাম দেয়া হয় রোজ গার্ডেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে হৃষিকেশ দাস খুব বেশিদিন এই বাড়িতে বসবাস করতে পারেননি। তার বেহিসেবি আর অসংযত জীবনযাপন তাকে ক্রমাগত দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর পর্যায়ে নিয়ে যায়। যেখান থেকে তিনি একসময় একেবারেই নিঃস্ব ব্যক্তিতে পরিণত হন।

১৯৩৬ সালে প্রাসাদতুল্য রোজ গার্ডেন বিক্রি হয়ে যায় জনাব খান বাহাদূর কাজী আবদুর রশিদ, বি.এ.এম.এল.সি. (মেম্বার অফ লেজিসলেটিভ কাউন্সিল)-এর কাছে। খান বাহাদুর কাজী আবদুর রশিদ ছিলেন একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি, যার জীবনী তৎকালীন ১৯৪০ সালে আমেরিকার নিউইয়র্ক বিশ্বকোষে স্থান পায়। তিনি ছিলেন একজন লেখক ও প্রকাশক। তিনি জন্মগ্রহন করেন ১ সালে, ঢাকা জেলার সোনাগাঁয়ে যেটি একসময় ঈশা খাঁর রাজধানী ছিল। কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনা করে তিনি ১৯১৫ সালে বি.এ. সনদপত্র লাভ করেন। এরপর ‘প্রভিন্সিয়াল লাইব্রেরি’ নামে পুস্তক বিক্রয় ও প্রকাশনা ব্যবসায়ের প্রতিষ্ঠা করেন তিনি যেখানে ঐসময়ের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে ছাপাখানা পরিচালনা এবং বই বাঁধাই করা হতো। খান বাহাদূর কাজী আবদুর রশিদ ১৯৪৪ সালে ইন্তেকাল করেন।

রোজ গার্ডেন নির্মাণকালীন সময়ে হৃষিকেশ দাস কাজী রশিদ-এর কাছ থেকে ঋণ গ্রহন করেন আর তাই পরবর্তীকালে এটি ক্রয়ের অগ্রাধিকার কাজী রশিদকেই দেয়া হয়। কাজী আবদুর রশিদের মৃত্যুর পরে উনার বিশাল সম্পত্তি ও ব্যবসা তার জ্যেষ্ঠ পুত্র কাজী মোহাম্মদ বাশার (হুমায়ুন সাহেব) দেখাশুনা করা শুরু করেন। তিনি ছিলেন রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক ও পূর্ব পাকিস্তান সময়কালীন মিউনিসিপ্যালের দুই বার নির্বাচিত চেয়ারম্যান।

উত্তরাধিকারসূত্রে মরহুম খান বাহাদূর কাজী আবদুর রশিদের দ্বিতীয় পুত্র মরহুম ব্যারিস্টার কাজী আবদুর রাকিব রোজ গার্ডেনের মালিকানা পান। তিনি আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ও পরবর্তীসময়ে ---- থেকে বার-এট-ল শেষ করেন। তিনি নানা সংগঠন ও অর্গানাইজেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। মরহুম ব্যারিস্টার কাজী আবদুর রাকিব একজন মানবদরদি ও বিশিষ্ট সমাজকর্মী ছিলেন, যিনি তার জমিদারির একটা অংশ দান করে গিয়েছেন মানবকল্যাণে।

ঐতিহ্যবাহী রোজ গার্ডেন নিয়ে নানা তথ্য জানান তার কনিষ্ঠ পুত্র কাজী আহমেদ সাজেদ। তিনি রোজ গার্ডেনের ইতিহাস আর নানা তথ্য নিয়ে একটি বই বের করেছেন। যেটি ---- ইমেলে যোগাযোগের মাধ্যমে সংগ্রহ করা যাবে।

ব্যারিস্টার কাজী আবদুর রাকিব ১৯৯৫ সালে ইন্তেকাল করেন। তিনি তার স্ত্রী মিসেস লায়লা রাকিব, একমাত্র কন্যা রুমানা তাবাসসুম ও দুই পুত্র ইঞ্জিনিয়ার কাজী আহমেদ রাশেদ ও ইঞ্জিনিয়ার কাজী আহমেদ সাজেদকে ওয়ারিশ রেখে যান।

রোজ গার্ডেনের বর্তমান মালিক রশীদের বংশধরগণ। ’৭০ সালের দিকে বাড়িটি লিজ দেয়া হয় ‘বেঙ্গল স্টুডিও’কে। রোজ গার্ডেন সিনেমা, নাটক ও টেলিফিল্ম শুটিংস্পট হিসেবে দীর্ঘদিন ব্যবহৃত হয়েছে। প্রত্নতত্ব বিভাগ কর্তৃক রোজ গার্ডেনকে সংরক্ষিত ভবন বলে ঘোষণা করা হয় ১৯৮৯ সালে। পুরান ঢাকার বুকে কালের সাক্ষী রোজ গার্ডেন যেন ঐতিহ্যবাহী বর্ণাঢ্য ঢাকার প্রতিচ্ছবি।

- মোহাম্মদ ওয়াসিম
ক্রিয়েটর ফেইসবুক পেইজ: Puran Dhakar Khabar
এডমিন: আপনার রান্নাঘর