বৃহস্পতিবার,২৭ এপ্রিল ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / হারানো সাগরের কাছে
০৪/০৫/২০১৭

হারানো সাগরের কাছে

- আফরোজা পারভীন

কলির মাঝে মাঝে এক দৌড়ে পেছনে চলে যেতে ইচ্ছে করে। ছেলেবেলায় পেছনে হাঁটতো তারা। এটা ছিল এক ধরনের খেলা। সে খেলা খেলা যেত তখন। এখন আর ইচ্ছে করলেই পেছনে হাঁটা যায় না। জীবনে কোন রিওয়াইন্ড বাটন নেই যে সামনে পেছনে করা যাবে। করা গেলে কলি ফ্রক দুলানো, বেণী ঝুলানো বালিকা হয়ে যেত। যে বালিকার চোখে ছিল অপার বিস্ময়, নিত্য আবিষ্কারের খেয়াল আর জীবনকে ভালবাসার দ্যুতি।

কলি ভালবাসত গাছ, ফুল, পাখি, নদী, কবিতা। আজও বাসে। লুকিয়ে কবিতা লিখত। কোথাও গাছ পেলে এনে পুঁতে দিতো উঠোনের কোণে। ফুল ফুটলে অপলকে চেয়ে থাকত। কে সেই কারিগর যিনি তৈরি করেন এমন একটি নিটোল ফুল যার রং ধুলেও ওঠেনা! আর পাঁপড়িতে কি ব্যঞ্জনা। যেন এক একটি পাঁপড়ি একটি করে কবিতা।

কলি কবিতা লিখত, শুনানোর লোক পেতনা। কবিতা শুনাতে চাইলেই দৌড়ে পালাতো সবাই। এসএসসি পরীক্ষার আগে আচমকা একদিন পেয়ে গেল সেই লোক, লোক নয়, বালক। ঠিক বালকও নয়, বয়ঃসন্ধিতে আছে ওরই মতো। বড়ভাবির ভাই, বেড়াতে এসেছে। কলিকে একদিন সিঁড়িঘরে লুকিয়ে কিছু লিখতে দেখে পেছন থেকে আচমকা বলে উঠল, ‘কি লিখছ লুকিয়ে লুকিয়ে, প্রেমপত্র বুঝি?’

হাত থেকে খসে পড়ল কাগজ কলম। কাঁপুনি উঠল পায়ে। শুনেছে সে, বন্ধুরা কেউ কেউ প্রেমে পড়েছে। প্রেমপত্রও নাকি লিখছে! লজ্জা লজ্জা! ছেলেদের সাথে প্রেম করে কি করে। কি লেখে, কি বলে!

‘কি হল বললে না কি লিখছ? না বললে কিন্তু কেড়ে নেব।’

ও কেড়ে নিতেই পারে। খুবই দুষ্টু আর বেয়াড়া। ঢাকায় থাকে, চটপটে শুধু না পাকা। সবকিছু শিখেছে আগে আগে। একথা আপা প্রায়ই বলে। মৃদুস্বরে কলি বলে, ‘কবিতা।’

‘তাই বল। তা তুমি কবিতা লেখ নাকি? শুনতে পারি তোমার কবিতা?’

অন্য সময় কবিতা শুনানোর জন্য পাগল হলেও একে শুনাতে লজ্জা করে। শুনে কি না কি বলবে।

‘না না কিছু হয়নি। আমি পারি না। চেষ্টা করি।’

কলি দৌড়ে পালাতে গিয়েছিল। খপ করে চেপে ধরেছিল ওর বেণী ওই ডেঁপো ছেলেটা। কি আর করা। কাঁপা কাঁপা গলায় কবিতা শুনেয়েছিল কলি। মন দিয়ে শুনেছিল সে। নিবিড় শ্রোতা যেন। তারপর বড় মানুষের মত বলেছিল, ‘ভাল হয়েছে, বেশ ভাল। কাল আমাকে নিয়ে একটা কবিতা লিখবে। মনে থাকবে তো?’ কথা বলেনি কলি। মুখ নিচু করে দাঁড়িয়েছিল। ‘কি হল বললে না, লিখবে কিনা? না লিখলে কিন্তু খবর আছে তোমার।’

এমনভাবে তাকিয়েছিল যে রক্ত হিম হয়ে গিয়েছিল কলির। ও ছেলে খবর করতেই পারে। বয়সের তুলনায় পাকা ও। অনেক কিছু জানে। কোন বাধা মানে না। হয়ত জাপটে ধরবে কলিকে।

সেদিন কবিতা লিখতে বসে অদ্ভুত এক ঘোর লেগেছিল কলির মনে। ও অনেকক্ষণ তাকিয়েছিল আধভাঙা চাঁদের দিকে, উঠোনের আধফোটা ফুলের দিকে। সব এখন আধা আধা, পূর্ণ হবার অপেক্ষায়। চোখে ভেসেছিল ওর ধবল মসৃণ ত্বক, সুচারু নাক, ভাসা ভাসা চোখ! আর গলার স্বর কী দারুণ। মা বলেন, ‘যার চোখ ভাসা ভাসা সে মানুষ ভালো।’ ওকি মানুষ ভালো? ভালো নিশ্চয়ই নাহলে কলির অমন পঁচা কবিতা মন দিয়ে শুনলো কেন?
পরদিন সকালেই বারান্দায় মুখোমুখি ছেলের। ‘তুমি কবিতা লেখনি?’
‘লিখেছি।’
‘এইত লক্ষ্মী মেয়ে।’ ভাবখানা এমন যেন উনি কতবড় একটা মানুষ। ছোট্ট একটা মেয়েকে লক্ষ্মী বলছে। কলি মনে মেনে ভেচিং কেটেছিল। ‘তাহলে শুনাও। কবিতা শুনব বলে সারারাত ঘুম হয়নি।’
কি বলে এই ছেলে! অদ্ভুত তো!
আবারও সিঁড়িঘর আর কাঁপা কন্ঠের কবিতা।
মন দিয়ে আবার শোনে। বলে,‘দারুণ হয়েছে। কাগজ কলম দাও, তোমাকে লিখে দিচ্ছি একদিন রবীন্দ্রনাথের মত বড় কবি হবে। না না, তুমি তো মেয়ে। মেয়েদের মধ্যে মস্তবড় কবি কে বলত? তার মতো হবে।’
‘যাহ’
এরপর এদিক ওদিক তাকায় ওই ছেলে। তারপর বলে, ‘কাল কবিতা নয়, আমাকে একটা প্রেমপত্র লিখবে। এবার আমরা প্রেমে পড়ব। মনে থাকবে?’
‘না না প্রেম করে বড়রা। প্রেম করা খারাপ।’
‘শোন আমরাও বড়। এইত সামনেই এসএসসি পরীক্ষা, তারপর কলেজ। আগের দিনে ছেলেরা এই বয়সে বিয়ে করত জানো। আর মেয়েদের বিয়ে হত বারো বছর বয়সে। আমার মায়েরও হয়েছিল। প্রেমপত্র কিন্তু চাই।’

প্রেমপত্র লিখেছিল কলি। না লিখে উপায় ছিল না। মন চাইছিলো ওর। ওই ছেলেও উত্তর দিয়েছিল। আর লিখতে লিখতে একসময় দুজনই বুঝেছিল প্রেম কাকে বলে। তারপর একদিন কোর্ট বিল্ডিংএর ছাদে ঘন হয়ে বসেছিল ওরা। আর একদিন পালতোলা নৌকায় চিত্রার বুকে, উদ্দাম হাওয়ায়। ওই ছেলে যার নাম ফরিদ ওর কোলে মাথা রেখে শুয়েছিল। আর কি করতে হবে বোঝেনি ওরা। অথবা বুঝেও তুলে রেখেছিল আগামীর জন্য। তবে চোখে চোখে অনেকক্ষণ তাকিয়েছিল।

এর পরদিন ওই ছেলে চলে গেল তার বাড়িতে। আপা লম্বা একটা শ্বাস ফেলে বললেন, যাক বাঁচা গেল!
ফরিদ কলির নাম দিয়েছিল ‘বন্যা’ আর কলি ওর নাম দিয়েছিল ‘সাগর।’ আরো বড় হয়ে কলি জেনেছে ওই বয়সে যারা প্রেম করে তারা বেশিরভাগ এই নামই দেয়। সম্ভবত প্রেমিকরা ‘শেষের কবিতা’ পড়ে প্রেমিকার নাম লাবণ্য অথবা কলি যাই-ই হোক না কেন, নামকরণ করে ফেলে ‘বন্যা।’ কিন্তু সাগর নামের কোন ব্যাখ্যা নেই। কলি তখন সদ্য ‘উপল উপকূলে’ পড়েছে। তাই সাগরের কথাই তার মনে হয়েছিল। কলির জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ও নতুন করে পড়ে বার বার পড়া কবিতা। নিজে হয়ে যায় সব কবিতার নায়িকা।

দেশে তখন রাজনৈতিক ডামাডোল। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিলেন। আজ কারফু তো কাল ব্ল্যাক আউট। এমন সময়ে একদিন প্রেমপত্র এলো। অনেক আবেগঘন কথা লেখার পর সাগর জানালো, ‘আসছি কাল।’
কলির মনে উৎসবের আমেজ। ও সিনেমা টিভিতে দেখেছে প্রেমিকের কাছে যাবার আগে মেয়েরা শাড়ি পরে, সুন্দর করে সাজে। কলি আগে শাড়ি পরেনি। কিন্তু প্রেমে পড়েছে যখন শাড়ি পরতে হবে, চুলে গুঁজতে হবে ফুল। কলি মায়ের অর্ধশতবর্ষী ট্রাঙ্ক খুলে অনেক যত্নে পাট করে রাখা একটা লাল জর্জেট ক্ষীণ শরীরে জড়ালো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে কেমন পাটকাঠি পাটকাঠি মনে হল। খুলে ফেলবে নাকি! কিন্তু না, সাগর একবার লিখেছিল, শাড়ি তার পছন্দ। তারপরও সাজ সম্পূর্ণ হলো না। বেণীতে গোঁজার জন্য কোন ফুল খুঁজে পেলনা কলি। বাড়িতে এত ফুল। যুদ্ধ শুরু হবার পর থেকে যেন ফুটতে ভুলে গেছে ওরা। হয়ত আছে দেশ স্বাধীনের অপেক্ষায়!

বড়বোন আড়চোখে দেখতে লাগল কলির সাজগোজ। একবার কলিকে শুনিয়ে বলল, ‘ফরিদ ছেলেটা বড্ড ডেঁপো। এধরনের ছেলেদেরই বলে বখাটে, এঁচড়ে পাকা।’ কলি গায়ে মাখল না। বইপত্র পড়ে আর আশপাশের দু’চারটে প্রেম দেখে ততদিনে সে জেনে গেছে, গার্জিয়ানরা কখনও প্রেমকে ভাল চোখে দেখে না। সে যত ভাল ছেলে আর ভাল মেয়েই হোক।
সাগর এল। কলি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল বড়বোনের কঠিন দৃষ্টি উপেক্ষা করে। কলির দিকে হা করে তাকিয়ে থাকল সাগর। তারপর বলল, ‘কী সুন্দর যে তোমাকে লাগছে দেখতে। ঠিক কবিতার মতো! তা ফুল পরোনি কেন?’
কলি লজ্জিত মুখে বলল, ‘পাইনি।’
‘তাই বলো, জানতাম পাবে না। এই নাও। না না আমিই পরিয়ে দি।’

বেণীর গোড়ায় গুঁজে দিল ফুল। কলির মনে হল হাজার বীণার তার বেজে উঠল একসাথে। ও তাকিয়ে রইল নির্ণিমেষ।
শুরু হল যুদ্ধ। আর শেষ হল সাগর বন্যার ইতিহাস। যুদ্ধে বন্যার বড় ভাই শহীদ হলেন। আর বড় ভাইয়ের বৌ ছিলেন সাগরের বোন। তিনি আবার বিয়ে করলেন যুদ্ধের মধ্যেই। দু’পরিবারের বন্ধন ছিন্ন হল। তারপরও চেষ্টা করেছিল সাগর-বন্যা। চিঠি লিখেছিল অনেকগুলো দুজন দুজনকে। সাগরের একটা চিঠিও বন্যার হাতে পৌঁছেনি। আর দেখা করতে এসে বাড়ির সামনে অনেক অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে গেছে সাগর। চোখের কঠিন পাহারায় বেধে রাখা হয়েছে বন্যাকে যেন সে বাইরে যেতে না পারে। বিচ্ছিন্ন হল সাগর- বন্যা। ফুল ফোটার আগেই ঝরে গেল।

তারপরও জীবন এগিয়ে চলল। কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে জামানের সাথে শুরু হল ডিবেট কমপিটিশন। জামান কলেজের সবচেয়ে সুদর্শন অর মেধাবী ছেলে, তুখোড় বক্তা। তার নাম সবার মুখে মুখে। কলিই বা কম কিসে। সেও ভাল ছাত্রী। তারও আছে ডিবেটের একাধিক রেকর্ড। সুতরাং মুখোমুখি দাঁড়াল দুই ক্যাপটেন। আর আশ্চর্য হয়ে সারা কলেজ দেখল, জামান কলির যুক্তির পাশে দাঁড়াতেই পারল না। দলের অন্যান্য অংশিজন চেষ্টা করেও হার থামাতে পারল না। ক্যাপটেন যদি তো তো করে জিতবে কি করে দল। জামানের হার হল ডিবেটে। তবে জিতে নিলো কলির অন্তর।

জামানের আর্থিক অবস্থা ততটা ভাল না। একটা টিনের ঘরের বারান্দা ঘিরে ছোট্ট একটা ঘর বানানো হয়েছে। সেখানেই সে থাকে। সে ঘরের দেয়ালে থরে থরে সাজানো নিউটন এডিসন আর্কিমিডিস আরো কত বৈজ্ঞানিকের ছবি। ওদের নাম কলি জানে না। ও ঘরে কলির অবারিত যাতায়াত। কলি একদিন জানতে চাইল, ‘তোমার ঘরে কবি সাহিত্যিকের কোন ছবি নেই কেন? তুমি কবিতা পড়ো না?’

‘আরে বিজ্ঞান পড়েই সময় পাইনা। কবিতা পড়ব কখন। তবে হ্যা ডিবেট করার জন্য দরকার হলে পড়ি। অকারণে পড়ে লাভ কি?’
বিজ্ঞানের সাথে কোন বিরোধ নেই কলির। কিন্তু কবিতা! কবিতা যে দুঃসময়ের সঙ্গি একাকীত্বের দোসর। যে কবিতাকে সাথি করতে পেরেছে সে জীবনে অনেক কিছু পেয়েছে, অনেক। অনেক অনেক কবিতার বই জামানকে উপহার দিলো কলি। বলল, ‘এগুলো পড়বে। কবিতা পড়লে দেখবে তুমি অন্য মানুষ হয়ে গেছ।’

কলেজ শেষ করে মেডিকেল কলেজ। অনেক অমিলের মাঝেও দুটিতে মানিকজোড় যেন। রাতে বসে দুুজনে স্কেলিটন আর ভিসেরা পড়ে। জামান কলিকে পড়ায়। মেডিকেলের পড়া কিছুই ঢোকেনা কলির মাথায়। বাড়ির চাপে পড়তে এসেছে ঠিকই কিন্তু খাপ খাওয়াতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে তার। ভাগ্যিস জামান আছে! জামানের সাথে পড়তে বসে কলি আনমনা হয়ে যায় মাঝেমাঝে। ভাবে, আশেপাশে তো কেউ নেই। আশ্চর্য জামান কেন ওর হাতটা ধরেনা, ওকে কাছে টানে না, ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ায় না!

পথে যেতে যেতে জ্যামে দাঁড়িয়ে পড়ে রিক্সা। ফুলওয়ালি ওদের সামনে বাড়িয়ে ধরে বেলীমালা, গোলাপ। জামান তাকিয়েও দেখে না। কখনও বলে, ‘যাও সরো।’ অনর্গল বলে যায় মেডিকেলের কঠিন কঠিন বিষয়গুলো। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের খুঁটিনাটি। কলির মন চায় জামানের কাঁধে মাথা রাখতে। রাখেও দু একবার। জামান সরিয়ে দেয়, ‘করছ কি। লোকে দেখছে, এটা রাস্তা।’

কলি মনে মনে বলে, ‘তুমি তো ঘর পথ সব একাকার করে ফেলেছ জামান। তুমি কি জানো নির্জনতা কাকে বলে? কাছে পাওয়ার আনন্দ জানো তুমি? কখনও ফুলের সৌরভ নিয়ে দেখেছ, ছুঁয়ে দেখেছ পাতার শরীর, বৃষ্টি মেখেছ গায়ে?’ কলির রোমান্টিকতা জামানের বাস্তবতার গায়ে ধাক্কা খায়। কলি জামানের পাশে বসে একা হয়ে যায়। তারপরও সে জামানকে ভালবাসে গভীরভাবে। সে ভালবাসার কোন ব্যাখ্যা নেই।

বিদেশে স্কলারশিপ পেল জামান। অনেক বলেছিল কলিকে সাথে যেতে। যায়নি কলি। জামান সাফ জানিয়ে ছিল, ওখানেই থেকে যাবে। ফিরবে না এদেশে। কলির সামনে অপশন, হয় জামান নয় দেশ। দেশকে বেছে নিয়েছিল কলি। এদেশ, এ মাটি ছেড়ে সে কোথাও যাবে না। এ দেশে আছে মা, বাবা, শহীদ ভাই, গৌরবের ইতিহাস। এ দেশের নদী দিয়ে যে স্রোত বয়ে চলে সেটা তার নিজের, যে ফুল গন্ধ ছড়ায় সেটাও নিজের। আর যে আকাশ ছায়া দেয় সেটাও একান্ত নিজের। যে দেশে কবি ফিরতে চায় মানুষ না হলেও শঙ্খচিল শালিখ হয়ে সে অপরূপা দেশ ছেড়ে কোথায় যাবে সে!

এরপর অনেকেই কাছে আসতে চাইল। সহপাঠি, সদ্য ডাক্তার, বন্ধু বান্ধবের ভাইয়েরা। নিঃসঙ্গ কলি নিজেও সঙ্গ চাইল। ভাবল, প্রেম ভালবাসা একজন মানুষের মনে অফুরন্ত জমা থাকে। নতুন করে জন্মও হয় প্রতিনিয়ত। একজনে তা ফুরোয় না। আর অন্যজনকে ভালবাসলে আর একজনের তাতে কমতিও হয় না। সে একা। একজন সাথি হলে বেশ হয়। যে তাকে কবিতা শুনাবে, গানের কলি আওড়াবে, খোপায় গোঁজার ফুল এনে বলবে, ‘তোমার জন্য আনলাম।’ কিন্তু না, টাকা আনা পাই, এফসিপিএস, এমআর সিপি, কেরিয়ারের হিসেবের বাইরে কাউকে পেলো না কলি। এমন কাউকে পেলো না যার মনের ঘুলঘুলিতে দখিনের বাতাসের আকাক্সক্ষা আছে!

ডাক্তার হল কলি । বেশ নামকরা ডাক্তার। চিকিৎসার সাথে যখন অন্তরের ভালবাসা যোগ হয় তখন সেটা হয় প্রকৃত চিকিৎসা। সেটাই চেষ্টা করে কলি। সময় গড়ালো। বিয়ের প্রচন্ড চাপ। মা বললেন, ‘তোর বয়স চলে যাচ্ছে মা। তুই কি আমাকে একটু শান্তিতে মরতে দিবি না।’ বাবা তো মেয়ের বিয়ে মেয়ের বিয়ে করে অস্থির হয়ে চলেই গেলেন। প্রস্তাব আসতে থাকল একের পর এক। কলি মন স্থির করতে পারল না। সে জানে না, বিয়ে মানে কি। বিয়ে মানে কি খোপায় গোঁজা ফুল, কবিতা, নাকি কঠোর বাস্তবতা। ভয় পেলো কলি। নিজের বিশ্বাস, ভাললাগার সাথে আপোস করতে শেখেনি সে। তাই এই বেশ, বিয়ে নয়।

মাঝে মাঝে খারাপ লাগে। একাকীত্বে জরাগ্রস্ত হয়ে পড়তে চায়। মনে পড়ে একদিন কবিতা লিখত। কবিতার খাতায় আঁকিবুকি কাটে। মেলে ধরে রবীন্দ্রনাথ জীবনানন্দ। ওদের কাছে ফিরতে চায়। বারন্দায় রাখা গাছপালাকে আদর করে, ওদের আহার আর পানি দেয়। একসময় মনে হয় ও আর একা নয়। সাথে আছে কেউ। তবু যেন কোথায় সঙ্গোপনে একটু ক্ষীণ হাহাকার গুমরে মরে যা সে বলে না কাউকে। ওকে বুঝল না কেউ, ওর চাওয়া না চাওয়াকে মূল্য দিলো না কেউ!

একদিন ডিউটিতে থাকা অবস্থায় কলি জানতে পারল, ফিমেলওয়ার্ডে কেউ একটা সদ্যজাত শিশুকে ফেলে রেখে চলে গেছে। শিশুটা তারস্বরে কাঁদছে। তার কোন আত্মীয় স্বজন পাওয়া গেল না। ছুটে গেল কলি। অনেক খোঁজ-খবর করল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। লাভ হলো না। কলি শিশুটিকে নিয়ে এল নিজের বাড়িতে। থানায় জিডি করল, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলো। কোন দাবিদার জুটলো না। শিশুটা রয়ে গেল কলির কাছে। কলি ওকে বুকে তুলে নিলো। নাম দিলো কাঁকন। ওর দিন রাতে অনেকটা সময় এখন কাঁকনের জন্য বরাদ্দ। কাঁকন বসতে শিখল, হাঁটল। আর একদিন কলিকে অস্ফুটে ডাকল ‘মা।’ কলির চোখে বন্যা নামল সব পাওয়ার আনন্দে। এখন কাঁকনই কলির অস্তিত্ব। কলি ওকে নামকরা স্কুুলে ভর্তি করলো। টিচার রেখে গান শিখালো। সকালে ওকে স্কুলে দিয়ে হাসপাতালে যায়। বিকেলে ওকে বাসায় নামিয়ে বুয়াকে বারবার ওর খেয়াল রাখার কথা বলে যায় চেম্বারে। একদিন কাঁকন বলল, ‘মা তুমি অত রাত করে বাড়ি ফিরো না। তোমার শরীরের ক্ষতি হবে। তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে।’ কলি রাত করে বাড়ি ফেরে বলে নয়, ওর শরীরের ক্ষতি হবে বলে কাঁকনের দুঃশ্চিন্তা। আশ্চর্য কেউ একজন ভাবছে তার কথা!

আর একদিন কাঁকন ওকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘অত খাটতে হবে না তোমাকে। আমরা মাত্র দুটো মানুষ। আমাদের অত কিছু চাই না।’ আশ্চর্য এই মেয়ে এত অল্প বয়সে এত ভারি ভারি কথা শিখল কি করে। ও কিছুই চাইছে না, চাইছে কলিকে! সেদিন হাসপাতালে একটা এমার্জেন্সি রোগি ছিল, আটকে গেল কলি। কাঁকনের স্কুলের সময় পার হয়ে যাচ্ছে। নিরুপায় কলি বুয়াকে ফোন করে বলল, ‘গাড়ি পাঠাচ্ছি, স্কুল থেকে কাঁকনকে নিয়ে এসো সাবধানে।’

অনেক রাতে বাড়ি ফিরল কলি। আর তখনই ঝুম বৃষ্টি নেমে ঘন আঁধারে ঢেকে দিল একটু আগে চাঁদের আলোর বানে ভাসা চারদিক। কলি বন্ধ জানালার কাঁচ দিয়ে নিকষ আঁধারে তাকিয়ে ফিরে গেল তার শৈশব কৈশোরে। একটা লাল শাড়ি, কবিতা, একগোছা ফুল তাকে দোলাতে লাগল। সে দুলুনি বন্ধ করে দিল নিউটন এডিসন আর্কিমিডিস এনাটমি ফিজিওলজি, ভিসেরা স্কেলিটন। কেমন যেন গা গুলোতে লাগল কলির। চোখ ভরে কান্না এল। আর তখনই পদশব্দ শুনল। গুটি গুটি পায়ে ঘরে এল কাঁকন। ওর পেছনে লুকানো দু’হাত।
সলজ্জ মুখে বলল, ‘মা তোমাকে একটা কথা বলব। রাগ করবে নাতো?’ মেয়ের এমন লাজমাখা মুখ কমই দেখেছে কলি। বলল, ‘কেনরে রাগ করব কেন? কি করেছিস?’ ‘আমি একটা কবিতা লিখেছি।’ কলির বুকে চিত্রার উথাল পাথাল। ‘বলছিস কি তুই! কবিতা লিখেছিস। কই দেখি দেখি!’
‘তুমি শুনবে?’ ‘অবশ্যই।’
কাঁকন পেছন থেকে সামনে আনল এক হাত। একটা খাতা মেলা হাতে। বলল, ‘পড়ি?’
কবিতা পড়ল কাঁকন। কলি জড়িয়ে ধরল ওকে। আর জড়িয়ে ধরেই বলল, ‘তোর মাও ছেলেবেলায় তোর মতো কবিতা লিখত জানিস। এখন সে কবিতা হারিয়ে গেছে।’ ‘তো ফিরিয়ে আনো।’
‘এবার ঠিক ফিরবে দেখিস। কিন্তু তোর পেছনে কি লুকিয়ে রেখেছিস বলত? আরও কবিতা আছে বুঝি?’
এবার কাঁকন সামনে নিয়ে এলো বাকি হাতটা। সে হাতে ধরা একগাছি বেলি ফুলের মালা।
‘তোমার জন্য আনলাম মা। রাগ করবে না কিন্তু। বুয়াকেও বকবে না। ওকে বললাম, ‘গাড়ি থামাও, মার জন্য ফুল নেবো। ও শুনছিলো না। ড্রাইভার ভাইও না। কিন্তু আমি..’ বলতে বলতে মালাগাছি জড়িয়ে দিলো কলির বেণীর গোড়ায়।
এখন কলির বুকের মাঝে জড়ানো কাঁকন। কলির চোখে জলের বন্যা। এ বন্যা বুঝি গড়িয়ে গড়িয়ে চলে যাবে হারানো কোন সাগরে!
পান্থপথ, ২৩.৯.১৬