বৃহস্পতিবার,২৭ এপ্রিল ২০১৭
হোম / ফিচার / মহীয়সী ইলা মিত্র -- নাচোলের রাণীমা
০৪/০৪/২০১৭

মহীয়সী ইলা মিত্র -- নাচোলের রাণীমা

-

সময়টা ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি। তৎকালীন পাকিস্তানের এক জমিদার পুত্রবধূ সঙ্গীদের নিয়ে সাঁওতাল বেশ ধারণ করে নাচোল থেকে ভারতে পালানোর সময় রেল স্টেশনে ধরা পড়েন এবং সাথে সাথে পুলিশের পাশবিক অত্যাচারের শিকার হন। টানা চার দিন অমানবিক অত্যাচারের পর তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্ত ঝরছিল, গায়ে ছিল অসহনীয় জ্বর। তবুও নির্যাতন থেমে থাকেনি; বারংবার ধর্ষণ থেকে শুরু করে চলেছে বিবস্ত্র অবস্থায় প্রহার, শরীরের নাজুক অঙ্গে বুটের আঘাত, গোপনাঙ্গে গরম ডিম প্রবেশ করানো, বাঁশকল, অনাহারে রাখা, পায়ের গোড়ালিতে লোহার পেরেক ঢুকিয়ে দেওয়া এবং আরও বিভিন্ন ধরনের নৃশংস নিপীড়ন। এই নিপীড়িত জমিদার পুত্রবধূ আর কেউ নন, নাচোলের রানী-সাঁওতালদের মহানায়িকা ইলা মিত্র। বিলাসের মোহ ছেড়ে বাংলার শোষিত ও বঞ্চিত কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি সংগ্রাম করে গেছেন সারাটি জীবন, ভোগ করেছেন উপর্যুপরি নির্যাতন।

ইলা মিত্র পরিচিতি
১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন বাংলার মহীয়সী নারী ইলা সেন। তাঁর পিতা নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের অধীন বাংলার একাউন্ট্যান্ট জেনারেল। পিতার চাকরির সুবাদে কলকাতায় বেড়ে ওঠা ইলা সেনের। কৈশোরে খেলাধুলায় তুখোড় ছিলেন চঞ্চল ইলা; সাঁতার, বাস্কেটবল ও ব্যাডমিন্টন খেলায় ছিল সমান পারদর্শিতা। প্রথম বাঙালি মেয়ে হিসেবে ইলা সেন ১৯৪০ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকের জন্য নির্বাচিত হন। খেলাধুলা ছাড়াও গান, অভিনয়সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। কলকাতার বেথুন স্কুল ও বেথুন কলেজ পেরিয়ে পরে স্নাতক শ্রেণিতে বি.এ. ডিগ্রী অর্জন করেন ইলা। ১৯৫৮ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে এম এ পাস করে পড়ালেখার পাট চুকান এবং সেকালেই নিজেকে একজন সুশিক্ষিত ও তুখোড় নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। বেথুন কলেজেই রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় তাঁর। ১৯৪৩ সালে কলকাতা মহিলা সমিতির সদস্য হয়ে পরবর্তীকালে তিনি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন।

বাংলার কৃষকের রাণীমা ইলা
ইলা সেনের জীবনে পরিবর্তন আসে ১৯৪৫ সালে বিয়ের পিঁড়িতে বসার পর, তিনি হয়ে যান ইলা মিত্র। স্বামী কমিউনিস্ট মতাদর্শী রমেন্দ্র মিত্রের অনুপ্রেরণায় জীবনধারা বদলে যায়। রমেন্দ্র মিত্র নিজে একজন জমিদারপুত্র হওয়া সত্ত্বেও পারিবারিক ঐতিহ্য ও মোহ ত্যাগ করে সারাটি জীবন ব্যয় করেছেন জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে। স্কুল শিক্ষিকা ইলা মিত্রও স্বামীর কাছে বাংলার চাষীদের প্রতি তৎকালীন জমিদার ও জোতদারের বঞ্চনা, শোষণ ও নিগ্রহের কাহিনী জানতে পেরে ঘরে বসে থাকতে পারেননি। আজীবন এই কৃষকদের জন্যই তিনি সংগ্রাম করেছেন, হয়েছেন তাদের পরম শ্রদ্ধেয় রাণীমা।

ইলা মিত্র এবং তেভাগা
তেভাগা আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ করে চাষিদেরকে তাদের উৎপাদিত ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ মালিকানা প্রদান করা। চল্লিশের দশকে এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন বাংলার কৃষকদের রাণীমা ইলা মিত্র।

১৯৪৬ সালে ইলা মিত্র নোয়াখালীর হিন্দু মুসলিম সম্প্রদায়কে ঘিরে শুরু হওয়া দাঙ্গায় বিধ্বস্ত গ্রাম হাসনাবাদে সেবা ও পুনর্বাসনের কাজে এগিয়ে যান।
এরপর আসে ঐতিহাসিক ১৯৪৭, দেশ বিভাগের সাল। তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের কঠোর দমননীতির কারণে তেভাগা আন্দোলনের শীর্ষস্থানীয় নেতারা আত্মগোপন করতে বাধ্য হন এবং সেই পরিস্থিতিতেই কমরেড ইলা মিত্র ও রমেন্দ্র মিত্রের পৃথক নেতৃত্বে নাচোল ও তার আশপাশের অঞ্চলে শুরু হয় এক নতুন আন্দোলনের। এভাবে ভারত পাকিস্তান আলাদা হওয়ার পরেও তেভাগা আন্দোলন অব্যাহত থাকে পূর্ব-পাকিস্তানের অনেক স্থানে।

১৯৪৯ সালে তাঁদের নেতৃত্বে হাজার হাজার ভূমিহীন কৃষক সংগঠিত হয়। ছত্রভঙ্গ কৃষকদের সংগঠিত করতে ইলা মিত্র ছুটে যান গ্রাম থেকে গ্রামে, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মহাজনদের বিরুদ্ধে দুর্বার এক বাধা তৈরি হয় এবং এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে শোষকদের মাঝে। নাচোলে সাঁওতাল ও ভূমিহীনদের সমন্বয়ে এক শক্তিশালী তীরন্দাজ ও লাঠিয়াল বাহিনীরও প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৪৯ সালে কৃষকের ধান জোতদারদের না দিয়ে সরাসরি কৃষক সমিতির উঠোনে তোলায় অভিযান শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঘটে সংঘর্ষ। এতে বহু কৃষক ও কিছু পুলিশ মারা যায়। পুলিশের সঙ্গে দ্বন্দ্বে পালানোর সময়েই ধরা পড়েন ইলা মিত্র ও তাঁর সঙ্গীরা, পরবর্তীকালে অসহনীয় অত্যাচার সহ্য করতে হয় তাঁদের। কারণ যেভাবেই হোক স্বীকার করাতে হবে পুলিশ কর্মকর্তা ও কনস্টেবল হত্যার পিছনে তাঁর ইন্ধন ও পরিকল্পনা ছিল। পরে ইলা মিত্র নিজে সেই বীভৎস অমানবিক নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছিলেন।

পরবর্তী জীবন
সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে তাকে ছেড়ে দেওয়ার জোরালো দাবির মুখে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নির্দেশে ইলা মিত্রকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। সুস্থ হয়েও ঘরে বসে থাকেননি মহীয়সী ইলা, থেমে যায়নি তাঁর আদর্শের লড়াই।

ইলা মিত্র কলকাতায় স্বামী রমেন্দ্র মিত্র, একমাত্র পুত্র, পুত্রবধূ ও নাতিকে নিয়ে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন। ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা সিটি কলেজে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেন এবং এর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগঠনের জন্য কাজ করে গেছেন আজীবন। কলকাতায় বাস করা স্বত্তেও বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের জন্য তাঁর আত্মার টান ছিল, এর চাক্ষুষ প্রমাণ মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম। ৭৭ বছর বয়সে ২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন এই কিংবদন্তি নারী, নাচোলের রাণী, তেভাগার নেত্রী। ভারত সরকার তাঁকে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে স্বতন্ত্র সৈনিক সম্মানে তাম্রপত্র পদকে ভূষিত করে। বলাই বাহুল্য, ইতিহাসের পাতায় এবং সাধারণ মানুষের মনের মণিকোঠায় ইলা মিত্র নামটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে আজীবন।

- এন ইসলাম